সিএনএনের প্রতিবেদন জানায়, মাছির এই প্রজাতিটি জীবিত প্রাণীর শরীরের ক্ষতস্থানে ডিম পাড়ে এবং ডিম ফুটে বের হওয়া লার্ভা ধীরে ধীরে সেই প্রাণীর মাংস খেতে থাকে। ২০২৩ সাল থেকে প্যানামা, কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা, বেলিজ ও এল সালভাদর—এই সাতটি দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এই পরজীবী। এত বড় মাত্রায় সংক্রমণ দুই দশকের মধ্যে এটাই প্রথম। সম্প্রতি মাছিটির উপস্থিতি ধরা পড়েছে দক্ষিণ মেক্সিকোতেও। এতে সমস্যাটি যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশংকা সৃষ্টি হয়েছে।

টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. ফিলিপ কাউফম্যান জানান, এই মাছিগুলো মৃতদেহে নয়, বরং জীবিত প্রাণীর ক্ষতস্থানে ডিম পাড়ে। একটি স্ত্রী মাছি একবারে ২০০ থেকে ৩০০টি ডিম দিতে পারে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সেই ডিম ফুটে বের হয় মাংসখেকো লার্ভা, যা ক্ষতের ভেতর ঢুকে প্রাণীর টিস্যু খেতে থাকে। কয়েকদিন পর এই লার্ভারা মাটিতে পড়ে গিয়ে গুটি (পিউপা) আকারে রূপান্তরিত হয় এবং পরে পূর্ণবয়স্ক মাছিতে পরিণত হয়। যথাসময়ে চিকিৎসা না হলে, আক্রান্ত পশু দুয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মারা যেতে পারে।

২০২৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এ ধরনের ৩৫ হাজারের বেশি সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। আক্রান্ত প্রাণীর মধ্যে ৮৩ শতাংশই গরু। এই রোগ প্রতিরোধে এখনো কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন বা প্রাকৃতিক প্রতিরোধক নেই। ফলে গ্রীষ্মকালে পশুর শরীরে ক্ষত সৃষ্টির মতো কার্যকলাপ যেমন ব্র্যান্ডিং, ট্যাগিং বা কাটাছেঁড়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, সেই ক্ষতই ডিম পাড়ার উপযুক্ত স্থান হয়ে দাঁড়ায়। শুধু গৃহপালিত পশুই নয়, হরিণ, পাখি ও ইঁদুরের মতো বন্যপ্রাণীরাও এই সংক্রমণের শিকার হতে পারে। এতে করে সংক্রমণ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ—উভয়ই কঠিন হয়ে পড়ছে।

Untitled্ে্

ছবি— সিএনএন

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ফিরছে এক পুরনো অথচ পরীক্ষিত পদ্ধতিতে—স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক (এসআইটি)। ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো এই কৌশল ব্যবহার করে স্ক্রুওয়ার্ম নির্মূলে সফল হয়েছিল। এ পদ্ধতিতে স্ক্রুওয়ার্ম প্রজাতির পুরুষ মাছিকে গামা রশ্মি দিয়ে বন্ধ্যা করে তোলা হয়। এসব পুরুষ মাছি স্ত্রী মাছিদের সঙ্গে মিলিত হলেও, নিষ্ক্রিয় শুক্রাণুর কারণে ডিম নিষ্ফলা থাকে, ফলে নতুন লার্ভার জন্ম হয় না। যেহেতু স্ত্রী স্ক্রুওয়ার্ম মাছি জীবনে মাত্র একবারই প্রজননে অংশ নেয়, তাই একবার বন্ধ্যা পুরুষ মাছির সঙ্গে মিলনের পর আর কোনো কার্যকর প্রজনন সম্ভব হয় না। যত বেশি বন্ধ্যা পুরুষ ছেড়ে দেয়া হয়, তত দ্রুত প্রাকৃতিক জনসংখ্যা হ্রাস পায়।

এসব মাছি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কন্টেইনারে ভরে বিমান থেকে নির্দিষ্ট এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া হয়। লক্ষ্য থাকে বিচ্ছিন্ন গ্রামীণ অঞ্চল, বনাঞ্চল কিংবা বন্যপ্রাণী সংলগ্ন খামার। শহরের আশপাশে মাছি ছড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না।

Untitled্ে

ছবি— রেন্টোকিল ডট কম

এই কৌশলের প্রভাব দ্রুত নয়, তবে নিশ্চিত। কয়েক মাস বা বছর ধরে নিয়মিত বন্ধ্যা মাছি ছাড়লে স্ক্রুওয়ার্মের প্রাকৃতিক সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এতে সংক্রমণের চক্র ভেঙে পড়ে, গবাদিপশু সংক্রমণ থেকে রক্ষা পায় এবং খামারিরা ফিরে পান অর্থনৈতিক স্বস্তি। তবে সমস্যা হচ্ছে—বন্ধ্যা পুরুষ মাছির ঘাটতি। প্যানামায় একটি মাত্র ‘ফ্লাই ফ্যাক্টরি’ রয়েছে, যেখান থেকে সপ্তাহে প্রায় ১০ কোটি মাছি উৎপাদন করে মধ্য আমেরিকায় ছড়িয়ে দেয়া হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে হুমকি বাড়ায় আরো অনেক বেশি পরিমাণ মাছি প্রয়োজন।

এই ঘাটতি পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ গত ১৮ জুন ঘোষণা দেয়—টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তের কাছাকাছি মুর এয়ারবেসে তৈরি করা হবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ফ্লাই ফ্যাক্টরি। এর জন্য প্রাথমিক বাজেট ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার, আর পুরো প্রকল্পের সম্ভাব্য খরচ প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি, মেক্সিকোর একটি পুরনো বন্ধ্যা মাছি উৎপাদন কেন্দ্র সংস্কারে আরো ২১ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে ইউএসডিএর।

Untitled্ে্

ছবি— সিএনএন

এই বিনিয়োগকে যুক্তিযুক্ত বলছেন খামারিরা। টেক্সাস ও দক্ষিণ-পশ্চিম পশুপালক সমিতির সহ-সভাপতি স্টিফেন ডাইবেল বলেন, ‘এই মাছির কারণে যদি ১০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির আশংকা থাকে, সেখানে ৩০০ মিলিয়নের বিনিয়োগ একেবারে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। দেশেই উৎপাদন কেন্দ্র থাকলে আরো দ্রুত ও নিখুঁতভাবে মাছি ছড়িয়ে দেয়া যাবে।’

গত বছর সংক্রমণের ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তের কিছু পশু বাণিজ্য বন্দর বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ইউএসডিএ জানিয়েছে, সফল মাছি বিতরণ ও নজরদারির ফলে এখন ধাপে ধাপে সেই বন্দরগুলো আবার চালু করা হচ্ছে।