সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ও প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের দেশ ত্যাগের খবরের মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় শেষ হচ্ছে তার দীর্ঘ সময়ের শাসন। বিদ্রোহীদের মাত্র দুই সপ্তাহের অভিযানে আসাদের এ পরিণতি ঘটল। বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে রয়েছে হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) নামে সশস্ত্র ইসলামী গোষ্ঠী। দীর্ঘ সময়ের শাসনের অবসান হওয়ায় সাধারণ মানুষ উল্লাস ও স্বস্তি প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে দেশটির প্রতিবেশী দেশসহ মধ্যপ্রাচ্যে ঘটনাটি অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। খবর বিবিসি ও এপি।
সিরিয়ায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শাসন করেছে বাশার আল-আসাদ পরিবার। সামরিক কর্মকর্তা থেকে ১৯৭১ সালে দেশের প্রেসিডেন্ট হন হাফিজ আল-আসাদ। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ২০০০ সালের জুনে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সিরিয়া শাসন করেছিলেন। তার কাছ থেকে সে বছরের জুলাইয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতা পান চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র ও ছেলে বাশার আল-আসাদ। সেই সঙ্গে, বাথ পার্টির নেতা ও সামরিক বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। এর ১১ বছর পর যখন সিরিয়ার জনগণ গণতন্ত্রের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে, আল-আসাদ কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে এর জবাব দেন। আরো বেশি সিরীয় জনগণ বিক্ষোভে যোগ দেয়। বাশার তখন তার বিরোধীদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করে দমন-পীড়ন আরো বাড়াতে থাকেন, যা শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
এর পরের বছরগুলোয় নিহত হয় সিরিয়ার কয়েক লাখ মানুষ। বাশার আল-আসাদকে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগেও অভিযুক্ত করা হয়। অনেকটা যুদ্ধের বাতাবরণেই তিনি সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোয় নির্বাচন আয়োজন করেছিলেন। তবে সেসব নির্বাচন অনেকের কাছেই অগণতান্ত্রিক বলে অগ্রহণযোগ্যই থেকে যায়। যুদ্ধে কখনই জিততে না পারলেও বাশার আল-আসাদ তার অনুসারীদের সমর্থন ও সংখ্যালঘু আলাওয়ি রাজনৈতিক দলের সহায়তায় সংকীর্ণভাবে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন।
সিরিয়ায় ২০১১ সালে শুরু হওয়া আসাদবিরোধী আন্দোলন মাঝে স্তিমিত হয়ে এলেও চলতি বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে বিদ্রোহীরা নতুন করে আক্রমণ শুরু করে। ফলে আলেপ্পো, হামা, হোমস জয়ের পর দ্রুতই রাজধানী দামেস্কের দিকে অগ্রসর হয় বিদ্রোহী এইচটিএস। তাদের আক্রমণ শুরু হওয়া মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই বাশার আল-আসাদের পতন হয়েছে বলে ঘোষণা দেয় বিদ্রোহীরা।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি আসাদের সেনারা। প্রেসিডেন্ট আসাদ দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও ইরানের সমর্থন পেয়ে আসছেন। সম্প্রতি ইউক্রেন নিয়ে বেশি ব্যস্ত রাশিয়া। মস্কো থেকে সাহায্য বলতে গেলে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। অন্যদিকে ইরানি সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের সহায়তায় আসাদ তার শাসন টিকিয়ে রেখেছিলেন। এ মিলিশিয়াদের মধ্যে অন্যতম হলো হিজবুল্লাহ। সম্প্রতি ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় তাদের কাছ থেকেও সহায়তা পাচ্ছিলেন না আসাদ। এছাড়া ইসরায়েল সিরিয়ায় ইরানি মিলিশিয়া ও হিজবুল্লাহর ওপর আক্রমণ জোরদার করেছে। এসব আক্রমণে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সরবরাহ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে আসাদ বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ায় বিদ্রোহীরা বড় ধরনের সুযোগ পায়, যা শেষ পর্যন্ত পতন ঘটিয়েছে বাশার আল আসাদের দীর্ঘ দুই যুগের শাসনের।
বছরের পর বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের গভীর ক্ষত এখনো দৃশ্যমান দেশটিতে। তাই সিরিয়া এখনো মতাদর্শগত কারণে অনেকাংশেই বিভক্ত। গত চার বছর ধরে চলা অচলাবস্থা ও স্থিতিশীল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মাত্র দেড় সপ্তাহ আগে বিদ্রোহীদের কঠোর আঘাতে ভেঙে পড়তে শুরু করে বাশারের প্রতিরোধব্যূহ। বিদ্রোহীদের হঠাৎ আঘাতে আসাদ বাহিনী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।
আরব নেতাদের মধ্যে একঘরে থাকার অবস্থান থেকে বাশার বেরিয়ে এলেও গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সিরিয়ার জনগণের জন্য একটি কার্যকর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কোনো পরিকল্পনা বা বাস্তবায়ন কিছুই হয়নি তার আমলে। বরং ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার দিকে তার কেন্দ্রীভূত মনোযোগে পুঞ্জীভূত হয়েছে জনগণের ক্ষোভ, যার বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে আলেপ্পো বা দামেস্কের রাজপথে জনগণের উল্লাসে।










