মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। এ প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় ৩৫ বছর পর প্রথমবারের মতো সাধারণ জনগণের জন্য গাড়ি চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের কথা বিবেচনা করছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী কু ইউন চিওল জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছালে এমন পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে।
যদি এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়, তবে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর এটিই হবে দক্ষিণ কোরিয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য প্রথম বড় ধরনের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
সোমবার দিনের শুরুতেই বৈশ্বিক তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়, যেখানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে ইয়েমেনভিত্তিক ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ফলে তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া তার প্রয়োজনের সিংহভাগ জ্বালানি তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। ফলে এই অস্থিতিশীলতা দেশটির অর্থনীতির ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
অর্থমন্ত্রী কু ইউন চিওল সম্প্রচার মাধ্যম কেবিএসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরো অবনতি হলে আমাদের সংকটকালীন সতর্কতার স্তর ওয়ার্নিং বা সতর্ক পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। আর সেই পর্যায়ে পৌঁছালে জ্বালানি খরচ কমানোর কোনো বিকল্প থাকবে না।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় সরকারি ভবনগুলোতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ রোটেশনাল ব্যবস্থা চালু আছে। এ পদ্ধতিতে লাইসেন্স প্লেটের শেষ সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট গাড়িগুলো প্রবেশ করতে পারে। সরকার এখন এ ব্যবস্থাটি বেসরকারি খাত বা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণের কথা ভাবছে।
সরকার আশা করছে, পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং যুদ্ধের অবসান ঘটবে যাতে সাধারণ মানুষের ওপর এই কঠোর ব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে না হয়। তবে তেলের দাম যদি ১২০ থেকে ১৩০ ডলারের সীমার মধ্যে ঘোরাফেরা করে, তবে জনস্বার্থে এই কঠোর সহযোগিতা প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন নীতি-নির্ধারকরা।
দেশটির অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা বিবেচনা করছি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য রোটেশনাল ব্যবস্থাটি বেসরকারি খাতেও সম্প্রসারণ করা যায় কি না, যাতে জনগণের সহযোগিতা নিশ্চিত করা যায়। তবে আমরা আশা করি যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত শেষ হবে এবং এমন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
পাশাপাশি, দেশটি কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপরও ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সম্প্রতি কাতারের এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আমদানিকারক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জ্বালানি তেলের এই ধাক্কা সামাল দিতে দক্ষিণ কোরিয়া তার বিদ্যুৎ উৎপাদন কৌশলেও পরিবর্তন আনছে। তেলের আকাশচুম্বী দামের কারণে দেশটি তাদের পুরনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত করেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাময়িকভাবে পরিবেশগত ছাড় দিয়ে হলেও কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর আগে ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রভাবে দক্ষিণ কোরিয়ায় জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছিল। তখন ১৯৯১ সালে টানা দুই মাস ১০ দিনের একটি গাড়ি রোটেশন ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছিল। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির জটিলতা সেই ৩৫ বছর আগের স্মৃতিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে।










