টানা সপ্তম দিনে গড়িয়েছে ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা। গতকাল ইরানের অন্তত দুটি পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে তেল আবিব। অন্যদিকে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে তেহরানও। যার মধ্যে ইরানি হামলার শিকার হয়েছে একটি হাসপাতাল। দুই পক্ষের ‘চড়া মূল্যর’ হুমকির মধ্যে যুদ্ধ থামাতে আলোচনার টেবিলে বসার চেষ্টা করছে ইউরোপীয় দেশগুলো। জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জেনেভায় আজ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা করতে যাচ্ছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, শিগগিরই ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তার আগে এ আলোচনাকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের ‘সর্বশেষ প্রচেষ্টা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ ইউরোপের নেতারা যেকোনো মূল্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়াতে চাইছেন। এদিকে ইরানে হামলা না করতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রচ্ছন্ন বার্তা দিয়ে রেখেছে চীন-রাশিয়া। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জানিয়েছেন, বড় শক্তিগুলোর উচিত ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নেয়া, বাড়ানো নয়। কূটনৈতিক পথে হাঁটার বিষয়ে একমত হয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও। একই সঙ্গে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলো থেকে রুশ বিশেষজ্ঞদের প্রত্যাহার করবে না মস্কো। এ বার্তাগুলো এমন এক সময়ে এসেছে যখন মধ্যপ্রাচ্য কার্যত বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ যুদ্ধ আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
টানা সপ্তম দিনে হামলা-পাল্টা হামলা: টানা সপ্তম দিনের মতো অব্যাহত রয়েছে ইরান-ইসরায়েলের মধ্যকার হামলা-পাল্টা হামলা। গতকাল তেল আবিব ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, তারা ইরানের আরাক অঞ্চলের খোন্দাব পারমাণবিক চুল্লিতে হামলা চালিয়েছে। ওই চুল্লিটি এখনো নির্মাণাধীন একটি হেভি ওয়াটার রিসার্চ রিঅ্যাক্টর। হেভি ওয়াটার চুল্লিগুলো পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত প্লুটোনিয়াম উৎপাদনে সক্ষম হওয়ায় এগুলো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। ইরানি সংবাদমাধ্যম জানায়, চুল্লির আশপাশে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। তবে আগেই এলাকাটি খালি করে ফেলা হয়েছিল এবং তেজস্ক্রিয়তার কোনো ঝুঁকি নেই। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আরো জানায়, তারা নাতাঞ্জ এলাকার একটি স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে। সেখানে পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য ব্যবহৃত বিশেষ যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম ছিল।
অন্যদিকে গতকাল সকালে ইরানের একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের জনবহুল এলাকাগুলোয় আঘাত হেনেছে। হামলা হয়েছে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বিরশেভার সোরোকা মেডিকেল সেন্টারে। গতকাল ভোরে চালানো এ হামলায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ বেশ কয়েকটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। আহত হয়েছেন অন্তত ৭০ জন। এর মধ্যে রয়েছেন রোগী, চিকিৎসক ও হাসপাতালের অন্যান্য কর্মী। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য ইরানকে ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু। গতকাল দিনভর তেল আবিবের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সক্রিয় অবস্থায় দেখা যায়। একই সঙ্গে সকাল থেকে শোনা যায় বিস্ফোরণের শব্দ। ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানায়, তেল আবিবের মধ্যাঞ্চলেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হেনেছে। ইসরায়েলের জরুরি সেবা কর্তৃপক্ষ জানায়, কয়েকটি স্থানে ইরানের হামলায় অন্তত দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে।
এদিকে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ইরান গতকাল একটি ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করেছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ)। ওই মিসাইলের সঙ্গে ছিল ‘ফ্র্যাগমেন্টিং ক্লাস্টার ওয়্যারহেড’। এটি এক ধরনের বিস্ফোরক যা আকাশে থেকে ছোট ছোট বোমায় বিভক্ত হয়ে বিস্তৃত এলাকায় আঘাত হানে। আইডিএফ বলছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি যখন প্রায় সাত কিলোমিটার উচ্চতা থেকে নেমে আসে, তখন এর ওয়্যারহেড ফেটে গিয়ে প্রায় ২০টি ছোট মুনিশন (উপ-বোমা) চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, যা প্রায় আট কিলোমিটার ব্যাসার্ধজুড়ে এলোমেলোভাবে মাটিতে পড়ে। এসব ছোট বোমার নিজস্ব প্রপালশন নেই, ফলে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পড়ার কারণে এগুলো অপ্রত্যাশিত জায়গায় বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। তবে এ বিষয়ে তেহরানের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বার্তা দিলেন জিনপিং: চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, ‘ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষত যেসব বড় শক্তি এ দুই পক্ষের ওপর বিশেষ প্রভাব রাখে, তাদের উচিত উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নেয়া, উল্টোটা নয়।’ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপে তিনি এ কথা বলেন। যদিও শি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করেননি, তবে বিশ্লেষকদের মতে, তার এ মন্তব্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থানকে লক্ষ্য করেই দেয়া।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফোনালাপে শি ও পুতিন উভয়েই ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলাকে ‘নিন্দনীয়’ আখ্যা দেন এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান। চীনা প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, ‘সংঘাতরত পক্ষগুলো, বিশেষ করে ইসরায়েল যেন দ্রুত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে না চলে যায় ও যুদ্ধ অন্যত্র ছড়িয়ে না পড়ে।’
ক্রেমলিনের বিবৃতি অনুযায়ী, পুতিন এ সংকটে মধ্যস্থতার প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন এবং চীনের সঙ্গে একমত পোষণ করেন যে সংঘাত যত দ্রুত সম্ভব শেষ হওয়া উচিত।
রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা ইরান ছাড়বেন না: রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ‘ইরানে অবস্থানরত রুশ বিশেষজ্ঞরা দেশটি ছাড়ছেন না। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৬০০ রাশিয়ান রয়েছেন।’ তেহরানে ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কার মধ্যেই পুতিন এ মন্তব্য করেন, যা ইরানের প্রতি রাশিয়ার সরাসরি সহানুভূতির ইঙ্গিত বলে ধরা হচ্ছে। পুতিন বলেন, ‘আমাদের বিশেষজ্ঞরা বুশেহর পারমাণবিক স্থাপনায় কাজ করছেন, সংখ্যায় প্রায় ২৫০। অন্যান্য ব্যবসায়ী ও প্রকৌশলী মিলিয়ে এ সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। আমরা সেখান থেকে সরছি না। এটিই কি সমর্থন নয়?’ পুতিনের এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ইরানের ওপর ইসরায়েলি ও যুক্তরাষ্ট্রীয় চাপের মধ্যেও রাশিয়া সরাসরি ইরানের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত। এবং এ মুহূর্তে ইরানে থাকা রুশ বিশেষজ্ঞদের সরিয়ে নেয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই, যা গোটা মধ্যপ্রাচ্য সংকটে রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থান আরো জোরালো করছে। রয়টার্সের অনুবাদ অনুযায়ী, মস্কোয় শীর্ষ সংবাদ সংস্থার সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকে পুতিন আরো বলেন, ‘আমরা ইরানিদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগে আছি। আজ আছি, আগামীকালও থাকব। আমাদের সম্পর্ক চলমান।’ তিনি জানান, ইরান এ মুহূর্তে রাশিয়ার কাছ থেকে অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা চায়নি এবং মস্কোও তেমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে তাহলে কী প্রতিক্রিয়া হবে—এ প্রশ্নের উত্তরে পুতিন সংক্ষিপ্ত ও কৌশলী ভাষায় বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করতে চাই না। আমি শুধু শুনছি, কিন্তু আলোচনা করতে চাই না।’ পুতিন আরো বলেন, ‘আলোচনার পথ খোলা থাকা উচিত। ইরানের পারমাণবিক ও শান্তিপূর্ণ প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি ইসরায়েলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি সংবেদনশীল, তবে আমি বিশ্বাস করি, দুই পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করেই সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।’
রাশিয়া থেকে ইরানে অস্ত্র সহায়তার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আগেও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, কিন্তু ইরান তখন আগ্রহ দেখায়নি। এখনো তাদের পক্ষ থেকে তেমন কিছু চাওয়া হয়নি। অতীতে কিছু সামরিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা হয়েছে, কিন্তু বর্তমান সংকটের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই।’
আজ ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসছেন ইউরোপীয় নেতারা: জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জেনেভায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা করতে যাচ্ছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জার্মানির একটি কূটনৈতিক সূত্র এমন তথ্য জানিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী সপ্তাহেই ইরানের যৌথ হামলার বিষয়ে জোর ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার আগে বিষয়টির কূটনৈতিক সমাধানের শেষ চেষ্টা হিসেবে এ উদ্যোগ নিয়েছেন ইউরোপের নেতারা। সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়াতে তাদের এ উদ্যোগকে শেষ চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানায়, আলোচনা শুরুর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শীর্ষ কূটনীতিক কায়া কালাসের সঙ্গে জার্মানির স্থায়ী মিশনে একটি বৈঠক করবেন ইউরোপের ওই তিন মন্ত্রী। এরপর তারা একসঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন।
ইউরোপের তিন দেশের মন্ত্রীরা এমন এক সময়ে ইরানের সঙ্গে এ বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছেন, যখন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়ে উঠছে। গত সপ্তাহে ইসরায়েল ইরানের ওপর ব্যাপক সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে। তার জবাবে ইরানও ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো স্পষ্ট করে বলেননি, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে যুক্ত হবে কিনা। এতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
জার্মানির সূত্রটি জানায়, এ বৈঠক যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো ইরানকে বোঝানো, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি যেন শুধুই বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়—এ নিশ্চয়তা দেয়া জরুরি। বৈঠকের পর বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আরো বিস্তারিত ও গঠনমূলক আলোচনা হবে বলেও সূত্রটি জানায়। অন্যদিকে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ভাডেফুল ইরানের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিশ্চয়তা দেয়ার একটি সমাধানে আসার এখনো সময় আছে। আলোচনার টেবিলে আসতে কখনই দেরি হয়ে যায় না।’










