লেবাননে ইসরায়েলের স্থল অভিযানের দ্বিতীয় সপ্তাহ শেষের পথে। এদিকে ৭ অক্টোবর হামাস ও ইসরায়েলের যুদ্ধের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। ফলে ইসরায়েল যুদ্ধে জড়ানোর দ্বিতীয় বছরে পদার্পণ করল। গত বৃহস্পতিবার রাতে বৈরুতে বিমান হামলার পর যুদ্ধবিরতির অনুরোধ জোরালো হচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের ওপর দ্বিতীয় দিনের মতো হামলা করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
সংঘাত অবসানের আহ্বান সত্ত্বেও নতুন করে হামলা শুরু হয়েছে গাজার উত্তরাঞ্চলের জাবালিয়া শহরে। ইসরায়েলের সহযোগীরা দেশটিকে গত সপ্তাহের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রেও ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছে। এত কিছুর পরও সব চাপ উপেক্ষা করে ইসরায়েল তার নিজের পথে এগিয়ে চলেছে। এর কারণ হলো তিনটি—৭ অক্টোবর, বেনয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্র।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে দামেস্ক থেকে রাতের এক ফ্লাইটে করে বাগদাদে নেমেছিলেন ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। তিনি ইরানের এলিট বাহিনী কুদস ফোর্সের প্রধান ছিলেন, যা মূলত ইরানের বিপ্লবী গার্ডের গোপন শাখা।
কুদস ফোর্সের প্রধান শত্রু ইসরায়েল। লক্ষ্য অর্জনে এ বাহিনী ইরাক, লেবানন, ফিলিস্তিন ও অন্যান্য স্থানে তার প্রক্সি বাহিনীকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করা, প্রশিক্ষণ দেয়া ও অর্থায়নে কাজ করছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পর কাসেম সোলাইমানিকে দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে মনে করা হতো। সোলাইমানির গাড়িবহর বিমানবন্দর ছাড়া মাত্রই ড্রোন থেকে ছোড়া মিসাইলে তিনি নিহত হন। এ হামলায় ইসরায়েল গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছে। আর ড্রোনটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু নয়, বরং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছিলেন। পরে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, কাসেম সোলাইমানির ওপর হামলার ঘটনায় তিনি ইসরায়েলের কাছ থেকে আরো সক্রিয় ভূমিকা আশা করেছিলেন।
চার বছর পর চলতি বছর এপ্রিলে বেনয়ামিন নেতানিয়াহু দামেস্কে ইরানের কূটনৈতিক কম্পাউন্ডে বোমা হামলার নির্দেশ দেন। যেখানে নিহতদের মধ্যে দুজন ইরানি জেনারেলও ছিলেন। এরপর জুলাইয়ে বৈরুতে বিমান হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর শীর্ষ কমান্ডার ফুয়াদ শোকরকে হত্যার অনুমোদন দেন তিনি। ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত এবং রাজনৈতিক, সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার বিপর্যয়কর দিন হচ্ছে গত বছরের ৭ অক্টোবর। এ দুটি বিষয়ই ইসরায়েলকে চলমান যুদ্ধে জড়িত হতে সহায়তা করে।
ইসরায়েলে হামাসের হামলার মাত্রা ও ব্যাপকতা ইসরায়েলি সমাজ ও এর নিরাপত্তাবোধের ওপর প্রভাব ফেলেছে, যে কারণে এবারের যুদ্ধ সাম্প্রতিক সব সংঘাতের চেয়ে আলাদা।
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন ইসরায়েলকে শত শত কোটি ডলারের অস্ত্রসহায়তা দিচ্ছে। এদিকে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু ও গাজার দুর্ভোগ তাদের জন্য অস্বস্তির ও রাজনৈতিকভাবেও ক্ষতিকর। এপ্রিলে ইসরায়েলে ইরানের হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানও সক্রিয় ছিল, যা পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিষয়ে এর সবচেয়ে বড় সহযোগী কতটা ভূমিকা রাখে। এ গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব অনুমোদন ছাড়াই ইসরায়েল হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ইসরায়েলের দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জানেন যে উপেক্ষা না করেও কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সামলানো যায়।
নেতানিয়াহু ইসরায়েলের রাজনৈতিক মূলধারার বাইরে গিয়ে কাজ করছেন-এমনটা ভাবা ঠিক হবে না। সেজন্য হিজবুল্লাহর ওপর শক্ত আঘাত হানার চাপ বাড়তে পারে, এমনকি ইরানের বিরুদ্ধেও। হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের গালিলি এলাকায় হামলা চালাতে চাইছে।
ঝুঁকি বিষয়ে ইসরায়েলের ধারণাও পাল্টে গেছে। গত কয়েক বছরে এমন অনেক কিছু ঘটেছে, যা সর্বাত্মক সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে আছে তেহরান, বৈরুত, তেল আবিব ও জেরুজালেমের মতো শহরে ব্যাপক বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।










