গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের ফুলচাষী দেলোয়ার হোসেন বাণিজ্যিকভাবে টিউলিপ চাষ করে সফল হয়েছেন। তার এ সফলতা এখন ছড়িয়ে দিতে পারলে দেশের ফুল বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যুক্ত করা সম্ভব হবে

টিউলিপ মূলত পার্বত্য এলাকার ফুল। পাহাড়ি আবহাওয়া ও শীতকালে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত টিউলিপ চাষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। এ কারণে ইউরোপ, মধ্য এশিয়া, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া ও ভূমধ্যসাগরের পাশের দেশগুলোয় সবচেয়ে বেশি টিউলিপ জন্মায়। তবে নেদারল্যান্ডসের টিউলিপের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। দেশটিতে মাইলের পর মাইল জমিতে রঙবেরঙের টিউলিপের বাণিজ্যিক চাষ হয়।

আমাদের দেশের আবহাওয়া টিউলিপ চাষের জন্য যথার্থ নয়। এ কারণে দেশে এর আগে ফুলটির বাণিজ্যিক চাষের উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায়নি। ফুলপ্রেমীরা নিজেদের বাগানে শখের বশে টিউলিপ গাছ লাগিয়েছেন। তবে বাড়তি যত্ন নিলে দেশেও টিউলিপের বাণিজ্যিক চাষ সম্ভব। আর এ ধারণা বাস্তব করেছেন গাজীপুরের ফুলচাষী দেলোয়ার হোসেন।

গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের সফল কৃষকদের মধ্যে দেলোয়ার হোসেন অন্যতম। ২০১২ সাল থেকে তিনি বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ করছেন। শুরু থেকেই তিনি জারবেরা, গোলাপ, অর্কিড, গাঁদাসহ দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ফুল চাষ করছেন। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মৌমিতা ফ্লাওয়ার্স। জেলায় বাণিজ্যিক ফুল চাষ বিস্তারে ভূমিকা রাখায় ২০১৭ সালে তিনি বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক লাভ করেন।

এবার দেলোয়ার হোসেন টিউলিপ চাষে মনোযোগ দিয়েছেন। তিনি জানালেন, দেশে বিদেশী ফুলের চাহিদা অনেক। মানুষ রঙবেরঙের ফুল বেশি পছন্দ করে। জারবেরা, অর্কিড ও চায়না গোলাপ বিদেশী ফুল। আমাদের দেশে এসব ফুলের বাণিজ্যিক চাষ সম্ভব হলে টিউলিপ চাষ কেন সম্ভব হবে না?—প্রশ্নটি অনেক দিন ধরেই মাথায় ঘুরছিল। এ প্রশ্নের উত্তর পেতেই মৌমিতা ফ্লাওয়ার্সে টিউলিপ চাষ শুরু হয়।

গত বছরের শেষ দিকে নেদারল্যান্ডস থেকে একটি প্রজাতির চার রঙের সহস্রাধিক টিউলিপ বাল্ব সংগ্রহ করেন দেলোয়ার হোসেন। পরে দেশে আনার পর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় নিজের বাগানে ফুলটির বাণিজ্যিক চাষ শুরু করেন তিনি। ৪৫ দিনের পরিচর্যা শেষে গত জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ফুল ফুটতে শুরু করে। রঙবেরঙের টিউলিপে ভরে উঠেছে দেলোয়ার হোসেনের বাগান। দৃষ্টিনন্দন এ ফুল দেখতে প্রতিদিনই উত্সুক মানুষের ভিড় লেগে রয়েছে।

তিনি বলেন, টিউলিপের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ। ফুলটি চাষ করতে হলে তাপমাত্রা ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকা প্রয়োজন। এবার শীত বেশি পড়েছে। তাপমাত্রাও ছিল তুলনামূলক কম। এ আবহাওয়া টিউলিপ চাষে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। উত্তরের জেলাগুলোয় শীত মৌসুমে তাপমাত্রা অনেকটাই কমে যায়। তখন এসব জেলায় টিউলিপের বাণিজ্যিক চাষ করা যেতে পারে। তা না হলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শেড দিয়ে টিউলিপ চাষ করতে হবে। নিতে হবে বাড়তি যত্ন।

দেশে টিউলিপের চাষ নিয়ে কথা হলো বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ফুল গবেষক ফারজানা নাসরিন খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিদেশী ফুল হলেও টিউলিপ আমাদের দেশে একবারে নতুন নয়। শীত মৌসুমে অনেকেই ঘরের পাশের ছোট্ট বাগানে টিউলিপ গাছ লাগান। তবে এসবই ছোট ছোট ব্যক্তি উদ্যোগ। শখ বলা যায়। দেশে টিউলিপের বাণিজ্যিক চাষের কথা আগে শোনা যায়নি। তবে শীত মৌসুমে তাপমাত্রা কমে গেলে এ ফুল চাষ করা সম্ভব। দেলোয়ার হোসেনের এ উদ্যোগ দেশে ফুলের বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যুক্ত করতে পারে।

গাজীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মাহবুব আলম বলেন, দেশে ফুলের বাজারে টিউলিপের চাহিদা রয়েছে। উচ্চমূল্যে আমদানির মাধ্যমে এ চাহিদা পূরণ করা হয়। এখন দেশেই টিউলিপের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হলে সরবরাহ বেড়ে দাম কমে আসবে। এক্ষেত্রে দেলোয়ার হোসেন নতুন একটি চ্যালেঞ্জ হাতে নিয়েছেন। সফল হয়েছেন। এখন দেশজুড়ে এ ফুলের বাণিজ্যিক চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করা যেতে পারে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি খাতে যুক্ত হতে পারে টিউলিপ।

 

মো. হাজিনুর রহমান শাহীন, গাজীপুর