কয়েক দশকের ব্যবধানে বেশকিছু শস্য আবাদে স্বল্প পরিসরে হলেও যান্ত্রিকীকরণের ছোঁয়া লেগেছে। বেশকিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি আশা জাগাচ্ছে। ফসলের মৌসুমে এখনো দেশে ৩৫-৪০ শতাংশ শ্রমিকের সংকট থাকে। ধান কাটার ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণের প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। শ্রমিক সংকট কিংবা আবহাওয়াজনিত কারণে ধান যদি ক্ষেতে পড়ে থাকে, তাহলে ঝরে যাবে না হয় ইঁদুরে খাবে। সরকার ভর্তুকি দেয়ার কারণে কৃষক ধান কাটার জন্য কম্বাইন হারভেস্ট বা রিপার ব্যবহার করছে। তবে সেটি এখনো প্রয়োজন অনুসারে হতে পারেনি। আবার সামনের দিনে গ্রামীণ শ্রমিক শিল্প বা উৎপাদনশীল খাতে বিদেশে স্থানান্তরিত হবেন। তখন শ্রমিক সংকট আরো দীর্ঘ হবে। এ সংকট মোকাবেলায় আমরা আদৌ কি প্রস্তুত আছি?

যদি যন্ত্রপাতি দিয়ে ধান আবাদ করা যায়, বিশেষ করে চাষ করা, পানি দেয়া, ধান লাগনো ও হারভেস্ট করা যায়, তাহলে মোট উৎপাদন খরচ ৩০ শতাংশ কম হয়। এখন আমাদের এক কেজি ধান উৎপাদন করতে খরচ হচ্ছে প্রায় ২০-২২ টাকার কাছাকাছি। কৃষি যন্ত্রপাতি দিয়ে যদি এসব কর্মকাণ্ড সম্পাদন করা যায়, তাহলে ৩০ শতাংশ প্রায় ৭ টাকা ব্যয় কমানো সম্ভব। সেক্ষেত্রে খরচ কমিয়ে কৃষককে মুনাফার মাধ্যমে সম্পদশালী করা সম্ভব। আবার ভোক্তাদের স্বল্পমূল্যে কৃষিপণ্য পৌঁছানো সম্ভব। তাই যান্ত্রিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। ফলে সার্বিক কৃষি ব্যবস্থাপনায় যন্ত্রের প্রয়োজন রয়েছে। তবে ছোট আকারের যন্ত্র বেশি ফল দেবে নাকি বড় আকারের যন্ত্র বেশি ফল দেবে, সেটি নিয়ে বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো এখন অন্যতম চ্যালেঞ্জ। উৎপাদন বাড়ানো না গেলে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে। আমদানিনির্ভরতাও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে না। কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি সমস্যা রয়েছে। দেশের কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার খুবই সীমিত। উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক আধুনিক যন্ত্র তুলনামূলক কম খরচে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। বর্তমানে আমাদের দেশে শিক্ষিত তরুণ বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। কৃষিতে সম্পৃক্ত করতে তাদের হাতে আধুনিক যন্ত্রপাতি তুলে দিতে হবে। কেননা প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থায় শিক্ষিত তরুণদের আগ্রহ কম। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। ফলে যত দিন যাচ্ছে, রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে বসে কৃষিকাজ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এজন্য কৃষকদের আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়েছে। 

সরকারের এসডিজি বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ। এসডিজি লক্ষ্যে উৎপাদনশীলতা ও মানুষের আয় বাড়নোর কথা বলা হয়েছে। যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হলে সর্বোপরি আমাদের কৃষির উৎপাদনশীলতা বেড়ে যাবে। ফলন বেড়ে গেলে কম মূল্যে কৃষক ধান বিক্রি করে লাভবান হতে পারতেন। যারা ধান ক্রয় করে চাল করে খায়, তারাও সহনীয় মূল্যে ক্রয় করতে পারত। গ্রামীণ অর্থনীতি ও বাংলাদেশ অর্থনীতিতে একটা ভারসাম্য তৈরি হতো। জাতীয় আয়ে অবদান অনেক বেড়ে যেত। তবে কৃষি যন্ত্রটি ছোট নাকি বড় হবে, গবেষণার মাধ্যমে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সম্প্রতি একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, ছোট জমিতে ট্রাক্টর দিয়ে আবাদ করা যাবে না—এমন ধারণা রাখার সুযোগ নেই। এখন ছোট জমিতেও বড় কৃষিযন্ত্র পরিচালনা করা সম্ভব। ট্রাক্টরের টার্নিং রেডিয়াস পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। ফলে এখন ১৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৫ ফুট প্রস্থের কৃষিজমি ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করা যায়। অন্যান্য অনেক বিষয় দেশের ছোট জমি উপযোগী করে দেয়া হয়েছে। ফলে ট্র্রাক্টর এখন অতিজনপ্রিয় এবং নিম্নব্যয়ে আবাদের যন্ত্র হয়েছে। ছোট জমিতে বড় যন্ত্রপাতি কার্যকর হবে কিনা দেখতে হবে, তারপর চাষ শুরু করতে হবে। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ জমিতে ধান আবাদ হচ্ছে। বড় যন্ত্রে যদি ধান চাষ ভালো হয়, তাহলে অন্যান্য ফসলও খুব দ্রুত কার্যকর করা সম্ভব হবে। যান্ত্রিকীকরণ ছাড়া দেশের উৎপাদনশীলতা এবং কৃষকের আয় বাড়ানো সম্ভব নয়। রোপণ, বপন, কাটা, মাড়াই, পরিচর্যা, বস্তাবন্দি করা, পরিবহনসহ সব কাজ করতে পারে এমন কৃষিযন্ত্রের প্রয়োজন। সেটি কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছাতে হবে। যান্ত্রিকীকরণের পাশাপাশি সম্প্রসারণ কর্মীদের আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।

আমরা এখন পর্যন্ত শস্যের ভিত্তিতে আলাদা আলাদা যন্ত্র ব্যবহারে মনোযোগ দিইনি। একই যন্ত্র সব ধরনের শস্যে ব্যবহার হয়। উদহারণস্বরূপ চা খাতে যন্ত্রের নানামুখী ব্যবহার রয়েছে। ধান ও গম উৎপাদনে কিছু কিছু যন্ত্রের ব্যবহার হয়। রবিশস্য, সবজি উৎপাদনেও যন্ত্রের বহুমুখী ব্যবহার শুরু করতে হবে। বিশ্ববাজারে প্রতিটি শস্যের জন্য আলাদা আলাদা যন্ত্র পাওয়া যায়। এগুলোর ব্যবহার জানতে হবে।

একই সঙ্গে দেশের কৃষিতে তুলনামূলক বড় যন্ত্রের ব্যবহার শুরু করতে হবে। এর নানামুখী লাভ রয়েছে। বড় যন্ত্রের যন্ত্রাংশ তুলনামূলক কালো হওয়ায় ধোঁয়া নির্গমনের পরিমাণ কম থাকে। এতে পরিবেশের ক্ষতিও তুলনামূলক কম হয়। বড় আকারের যন্ত্র জ্বালানিসাশ্রয়ী হয়। আবাদ পর্যায়ে একটি মিনি হারভেস্টারে এক হেক্টর জমি আবাদে ২০ লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হয়। একই পরিমাণ জমিতে বড় আকারের হারভেস্টারে জ্বালানি লাগে ১৫ লিটার। দেখা যাচ্ছে, বড় আকারের হারভেস্টার ব্যবহারে জ্বালানি ব্যবহার ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। আবার ট্রান্সপ্লান্টিংয়ের ক্ষেত্রে ছোট যন্ত্রে এক হেক্টর জমি আবাদে সাড়ে চার লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হয়। বিপরীতে বড় যন্ত্রে জ্বালানি লাগে চার লিটার। এক্ষেত্রে বড় যন্ত্রের ব্যবহারে ১২ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় করা যায়। একইভাবে এক হেক্টর ফসলের মাঠে পাওয়ার টিলার চালাতে যেখানে ২৪ লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হয়, সেখানে একটি ট্রাক্টর দিয়ে একবারে কাজ শেষ করতে সাকল্যে সাড়ে ১২ লিটার জ্বালানির প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে এক হেক্টর জমি আবাদে পাওয়ার টিলারের বদলে ট্রাক্টর ব্যবহারে প্রায় অর্ধেক জ্বালানি সাশ্রয় হয়। পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও কমে আসে। ফলে জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমিয়ে আনা সম্ভব। এতে কৃষকের যেমন আয় বাড়ে, তেমন জ্বালানি দক্ষতা বাড়িয়ে তোলা সম্ভব।

একসময় পাওয়ার টিলারের ব্যবহার ছিল না। ওই সময় ট্রাক্টরের ব্যবহার ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। ট্রাক্টর দিয়ে ছোট জমি চাষ করা সম্ভব না। এর চেয়ে গরুর লাঙল ঢের ভালো। পরবর্তী সময়ে পাওয়ার টিলারের ব্যবহার বাড়তে থাকায় গরুর লাঙল প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। গত চার-পাঁচ বছরে ট্রাক্টরের ব্যবহার নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। আমাদের দেশে কৃষিজমির আকার তুলনামূলক ছোট। নানা জোতে বিভক্ত। ট্রাক্টর দিয়ে চাষের ক্ষেত্রে এটা আসলেই একটি সমস্যা। তবে ট্রাক্টরের টার্নিং রেডিয়াস বদলে ফেলায় এখন অল্প জমিও সুন্দরভাবে চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। প্রযুক্তির সুবিধা এটাই। প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করে নিলে তা দিয়ে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নেয়া সম্ভব।

তবে বেশি কাদাযুক্ত জমি ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করা সম্ভব না। এসব জমি চাষ করতে পাওয়ার টিলার লাগবে। রাস্তা থেকে ভেতরের দিককার জমিও ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করা যায় না। এক্ষেত্রেও পাওয়া টিলার প্রয়োজন। তবে সব জমি যদি সামাজিক কৃষির আওতায় আনা যায়, তাহলে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিয়ে অল্প খরচে অধিক পরিমাণ জমি চাষ করা যাবে। উৎপাদন ব্যয় কমে আসবে। নির্ধারিত জমি থেকে একাধিক কৃষিপণ্য উৎপাদন করা যাবে। কৃষকের আর্থিক লাভ হবে।


শুরুর দিকে কৃষকদের হাতে আধুনিক কৃষিযন্ত্র তুলে দিতে হবে। এজন্য আমদানিনির্ভরতার বিকল্প নেই। কেননা আমাদের শিল্প খাত এখনো চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। ফলে আমদানি করা কৃষিযন্ত্র দিয়েই পরিবর্তনের সূচনা নিশ্চিত করতে হবে। তবে আমদানি করা কৃষিযন্ত্রের দাম তুলনামূলক বেশি। অনেক যন্ত্র দেশীয় কৃষকদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি দিতে হবে। এখনো অনেক যন্ত্র ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহ করছে সরকার। আগামী দিনগুলোয় এ খাতে ভর্তুকি আরো বাড়ানোর বিকল্প নেই।

তবে সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো কৃষির আধুনিকায়নে গবেষণা ও যান্ত্রিকীকরণ খাতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো। এতে কৃষিযন্ত্রের বাজারে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনা যাবে। শুধু সারে ভর্তুকি দিলেই কৃষির উন্নয়ন করা যাবে না। বরং এ খাতের ভর্তুকির বাড়তি অর্থ কৃষি গবেষণা ও যান্ত্রিকীকরণে ব্যয় করলে দীর্ঘমেয়াদে সফলতা পাওয়া যাবে।

কৃষির উন্নয়নে সার্ভিস প্রভাইডারদের মূলধনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের স্বল্পসুদে ঋণ দিতে হবে। তাহলেই এসব সার্ভিস প্রভাইডার প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে তুলনামূলক কম ব্যয়ে কৃষকদের হাতে আধুনিক কৃষিযন্ত্র তুলে দিতে পারবে। তা না হলে কোম্পানিগুলোর ওপর বিদ্যমান চাপ কমবে না। কৃষিযন্ত্রের জন্য কৃষকদের বাড়তি অর্থ গুনতে হবে।

একদিকে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো, অন্যদিকে কৃষির আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণ একসঙ্গে দুটো ক্ষেত্রে মনোযোগ দেয়া জরুরি। এমনকি কৃষি যন্ত্রাংশ আমদানির পরিবর্তে স্থানীয় উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা এসব যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৩৫-৫০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। আমদানি শুল্ক না কমালে স্থানীয় পর্যায়ে যন্ত্রাংশ উৎপাদন করতে হবে। তা না হলে কৃষকদের সামর্থ্যের মধ্যে থেকে কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে না। আর স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনে গেলে দেশে কর্মসংস্থান তৈরি করাও সম্ভব হবে।

সরকারের নতুন কৃষি নীতিমালা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। কৃষক ও দেশের উন্নয়ন. দেশের মানুষের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য এ ধরনের নীতি খুবই কার্যকর। এতে বেসরকারি খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে। তবে তা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। কেননা দেশের কৃষির বড় একটি অংশ বেসরকারি খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কাজেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বেসরকারি উদ্যোগগুলোকে একই সুতায় গাঁথতে কৃষি নীতিমালায় বেসরকারি খাতকে আরো বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন ছিল। এতে বেসরকারি খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ত। বিনিয়োগ ও ব্যবসা বাড়ত। কৃষি মানে শুধু মাঠে ফসল উৎপাদন নয়। এতে বড় একটি সাপ্লাইচেইন জড়িত। কৃষি নীতিমালায় পুরো চেইনটিকে সমান গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে স্বল্পসুদে ঋণ দেয়া নিয়ে নানা ধরনের কথাবার্তা শোনা যায়। তবে বাস্তবে এমন কিছুর দেখা মেলে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি বড় একটি সমস্যা। এক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আগ্রহে ঘাটতি রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ খাতে স্বল্পসুদে ঋণ বিতরণে দেশী-বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আইনগতভাবে বাধ্য করতে হবে। এসব কার্যক্রমেই যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণ হবে। দেশে কৃষি সমৃদ্ধ হবে।

লেখক: এমডি ও সিইও, এসিআই এগ্রিবিজনেস