এক সময় গ্রামবাংলার পরিচিত একটি মাছ ছিল শিং। নদী, পুকুর, খাল, বিলে প্রাকৃতিকভাবেই শিং মাছ পাওয়া যেত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ মাছের এসব প্রাকৃতিক উৎস সংকুচিত হয়ে এসেছে। শিং এখন পরিচিতি পেয়েছে চাষের মাছ হিসেবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনেক মত্স্যচাষী বাণিজ্যিকভাবে শিং মাছ চাষাবাদ করছেন। অনেকেই প্রচলিত পদ্ধতিতে একই পুকুরে শিং মাছের সঙ্গে অন্য মাছও চাষ করেন। তাদের লক্ষ্য থাকে অল্প সময়ের মধ্যে একই পুকুর থেকে অধিক আয় করা। তবে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে একটি পুকুরে শুধু শিং মাছ চাষ করলে আরো বেশি আয় করা সম্ভব। এজন্য রয়েছে নতুন একটি পদ্ধতি। এরই মধ্যে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে সফলতা পেয়েছেন কয়েকজন মাছচাষী। তাদের পথ ধরে ধীরে ধীরে দেশজুড়ে জনপ্রিয় হচ্ছে শিং মাছের নতুন এ চাষ পদ্ধতি।
বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) দীর্ঘ গবেষণার পর শিং মাছের নতুন এ চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। পদ্ধতিটির নাম শিং মাছের নিবিড় চাষ। সাধারণত দেশজুড়ে আধা নিবিড় পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করা হয়। এতে একাধিক প্রজাতির মাছ একসঙ্গে একই পুকুরে বড় হয়। তবে নতুন এ পদ্ধতিতে একই পুকুরে শিং মাছের সঙ্গে অন্য কোনো প্রজাতির মাছ চাষ করা যাবে না। এ পদ্ধতিতে শুধু স্ত্রী শিং চাষ করলে ব্যাপক সাফল্য পাওয়া সম্ভব হবে। ছোট পরিসরের একটি পুকুরে পোনা ছাড়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে মাছ সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
পোনা ছাড়ার সময় থেকে মাছ সংগ্রহ পর্যন্ত চাষীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেবে বিএফআরআই। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএইচএম কোহিনুর জানান, নতুন এ পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে পুকুর নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা। কোনোভাবেই যেন পুকুরের পানি নষ্ট না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। পুকুরে চার-পাঁচদিন পরপর বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা খুবই জরুরি। এতে মাছের অক্সিজেনের ঘাটতি হবে না। বিকাশ দ্রুত হবে। নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় একই পুকুরে শুধু স্ত্রী শিং মাছ চাষ করে বড় ধরনের সাফল্য লাভ করা যাবে।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার সুহিলা গ্রামের তরুণ মাছচাষী আবু রায়হান গত বছর ২০ শতাংশ আয়তনের একটি পুকুরে নিবিড় পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করেছিলেন। তিনি প্রতি শতক জমিতে চার গ্রাম ওজনের পাঁচ হাজার পোনা ছাড়েন। এতে তার ব্যয় হয় সাড়ে ৬ লাখ টাকা। পাঁচ মাস পর প্রতিটি শিং মাছের ওজন হয় গড়ে ৫২ গ্রাম। ছয় মাসের মধ্যে শিং মাছ বিক্রির উপযুক্ত হয়ে ওঠে। তিনি প্রায় ২৫ লাখ টাকার শিং মাছ বিক্রি করেন। তার নিট লাভ হয়েছে ১১ লাখ টাকা।
আবু রায়হান বলেন, চার বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে শিং মাছ চাষ করছি। আগে প্রচলিত পদ্ধতিতে একই পুকুরে একাধিক মাছ চাষ করতাম। পরে নিবিড় চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারি। আগে যে পুকুর থেকে ৩২ মণ শিং মাছ পাওয়া যেত, এখন চাষ পদ্ধতি পরিবর্তনের ফলে উৎপাদন ১০৫ মণে উন্নীত হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বিএফআরআইয়ের পরামর্শে নিবিড় পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করে সফলতা পেয়েছি। এটার বড় কারণ প্রতিনিয়ত পুকুর ও চাষাবাদ পর্যবেক্ষণে রাখা। এতে মাছের রোগবালাই হওয়ার ঝুঁকি কমে আসে। যেকোনো বিষয়ে সহজে ও সময়মতো পরামর্শ পাওয়ায় লাভের পরিমাণ বেশি হয়।
সদর উপজেলার মাঝিহাটি গ্রামের দুলাল ব্যাপারীও নিবিড় পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করে সফলতা পেয়েছেন। তিনি এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে ৩২ শতাংশ আয়তনের পুকুরে শিং মাছ চাষ করেছেন। লাভও হয়েছে প্রচুর। এ পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করে সফলতা পেয়েছেন।
সুহিলা ও মাঝিহাটি গ্রামের এ দুই মত্স্যচাষীর সফলতার খবর ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের এলাকায়ও। তাদের দেখে স্থানীয় অনেকেই নিবিড় পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এখন ময়মনসিংহের ত্রিশাল, ফুলবাড়িয়া, মুক্তাগাছা, নান্দাইল, হালুয়াঘাট, ভালুকা, শেরপুরের নকলা ও নোয়াখালীর চাটখিলের মত্স্যচাষীরা এ পদ্ধতিতে শিং মাছের নিবিড় ও বাণিজ্যিক চাষাবাদ শুরু করেছেন।
বিএফআরআইয়ের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, বাংলাদেশে শিং অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মাছ। ফ্যাটের পরিমাণ কম এবং প্রচুর পরিমাণে উচ্চমানের সহজপাচ্য আমিষ থাকায় শিং মাছের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। রুইজাতীয় মাছের চেয়ে এর বাজার মূল্য অনেক বেশি। নিবিড় পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করা হলে মত্স্য খাতে এক নতুন মাত্রা সংযোজন হবে।
মুহাম্মদ আলমগীর কবীর, ময়মনসিংহ





