নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে তা পর্যাপ্ত নয় বলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে এ প্রতিক্রিয়া জানান তিনি।

এ সময় ফাহমিদা খাতুন বলেন, আমরা এরই মধ্যে দেখেছি, এখানে (দেশে) মূল্যস্ফীতির চাপ অত্যন্ত বেশি। পাশাপাশি বৈদেশিক খাতে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সঞ্চালন ইত্যাদি ক্ষেত্রেও অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেগুলো মোকাবেলা করতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করা নিঃসন্দেহে দুরূহ কাজ ছিল। অর্থমন্ত্রী সে চ্যালেঞ্জগুলো মাথায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করেছেন। বাজেটের শুরুতে তিনি ছয়টি মূল উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছেন। সেখানে প্রধান প্রধান চ্যালেঞ্জ তিনি চিহ্নিত করেছেন। সেগুলোর মধ্যে একটি রয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের মূল্যবৃদ্ধিজনিত বর্ধিত ভর্তুকির জন্য অর্থের সংস্থান করা। তৃতীয়ত, বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ব্যবহার এবং মন্ত্রণালয় বিভাগের উচ্চ অধিকারসম্পন্ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করা। চতুর্থত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়ন। পঞ্চমত, অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজন কর সংগ্রহের পরিমাণ এবং ব্যক্তি আয়করদাতাদের সংখ্যা বাড়ানো। ষষ্ঠত, টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সন্তোষজনক পর্যায়ে রাখা।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেটজুড়ে মূল্যস্ফীতি শব্দটি বহুবার এসেছে। কিন্তু আমাদের কাছে মনে হয়েছে মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে সেগুলো একেবারেই পর্যাপ্ত নয়। আমাদের বাজেট প্রস্তাবে আমরা কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর থেকে বিভিন্ন ধরনের কর উঠিয়ে দেয়ার কথা বলেছিলাম। কিছু কিছু পণ্যের ওপর থেকে কর উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো পর্যাপ্ত নয়। কারণ এর বাইরেও মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ভোগ করতে হয়। বাজেটে গম ছাড়া আর কোনো পণ্য দেখা যাচ্ছে না। আমরা বলেছিলাম, চাল-চিনিসহ অন্যান্য পণ্যের ওপর করছাড়ের কথা।

ব্যক্তি খাতে ন্যূনতম করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা করতে বলেছিলাম। কিন্তু সেটা ৩ লাখই রয়েছে। এক্ষেত্রে যারা ভালো অবস্থানে আছেন তাদের সুবিধার জন্য কিছু কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বেতনের বাইরে যে সুযোগ-সুবিধা থাকে, যেমন—যাতায়াত, বাড়ি ভাড়া, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদির ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা কিন্তু সাড়ে ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এটা তো একেবারে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য করা হয়নি। 

তিনি আরো বলেন, আমরা বলেছিলাম, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভর্তুকি চালিয়ে যেতে হবে, বিশেষ করে জ্বালানি ও কৃষি খাতে। কিন্তু সেগুলোও আমরা পুরোপুরি পাইনি। কৃষির ক্ষেত্রে বাড়িয়েছেন ১২ হাজার কোটি থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা। সেটাকে আমরা সাধুবাদ জানিয়েছি। কিন্তু অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ক্রমান্বয়ে সমন্বয় করা হবে। তার মানে হচ্ছে দাম বাড়ানো হবে। কিন্তু এ সময় এটি বাড়ালে জনগণের ব্যয়ের ওপর চাপ পড়বে। সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় কম বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া বৈদেশিক সাহায্য ও অর্থের ব্যবহার ও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট পথনির্দেশনা নেই। মেগা প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে বেশির ভাগ প্রকল্প এখন পিছিয়ে রয়েছে। একই অবস্থা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের।

কর আহরণের ক্ষেত্রে নতুন কোনো ব্যবস্থা দেখছি না। বরং নিম্ন আয়ের তুলনায় উচ্চ আয়ের মানুষদের এক্ষেত্রে সুবিধা দেয়া হয়েছে। বিদেশ থেকে টাকা আনার ব্যাপারে বিভিন্ন রকম করছাড়ের কথা বলা হয়েছে, যা একেবারেই অনৈতিক।