আপনার কাজের দিকে দৃষ্টি দিলে জোরালোভাবে যে বিষয় কিংবা চরিত্রটি সামনে আসে সে হলো নারী। নারীর জীবন নিয়ে আপনার এসব নিরীক্ষার প্রেরণাটা কী? নারী শিল্পী বলেই কি নারী ও তার জীবন আপনার কাজে প্রাধান্য পেয়েছে?

আমি নারী শিল্পী বলেই আমার কাজে নারী প্রাধান্য পেয়েছে—এ কথার চেয়েও জরুরি হলো নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান। কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেই নারীদের আসলে যেখানে থাকার কথা, তারা সেখানে নেই। নারীরা শুধু নারী হয়েই উঠতে পেরেছে এখনো। একে অতিক্রম করে ওঠা সম্ভব হয়নি। এই যে নারী ও পুরুষের ভেদাভেদ—পুরো ব্যাপারটাই ছিল আমার কাজের পেছনে অনুপ্রেরণা। কারণ নারী সাবজেক্টটিকে অনেক বেশি অবজেক্টিফাই করা হয়েছে বিভিন্ন অনুষঙ্গের মাধ্যমে, সেটাই এখন আমার কাজ করার মূল বিষয়। নারী কোনো অখণ্ড বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় সমাজের জন্য। নারী মানব সম্প্রদায়েরই একটা গ্রুপ মাত্র।

বহুকাল ধরেই শিল্প-সাহিত্যে নারীকে ‘‌সুন্দর’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা আছে। কিন্তু আপনি নারীকে শক্তিশালী, সাহসী হিসেবে তুলে ধরেছেন। আপনার এ উপস্থাপনা কি শুধুই শিল্পী নাজিয়া আন্দালিব প্রিমার ভাবনা, নাকি এটা যুগ বদলের ইঙ্গিত বহন করে? 

শিল্পী নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা হলো একটি পরিচয়। নারী আসলে আমার কাছে সর্বজনীন। এটা পৃথিবীরই আরেকটা পরিচয়। কারণ নারী থেকেই সবকিছুর সূত্রপাত। নারী বিষয়টা সহজ নয় বলেই পেছনে তাকে খাটো করার কর্মযজ্ঞও বিরাট। আমরা দেখি, সবকিছুই বাজে রাজনীতির দখলে। আরেকজনকে খাটো করে নিজেকে বড় করার রাজনীতি। একটা জায়গা থেকে নারী সুন্দর হতে পারে। কিন্তু পুরুষরাও তো সুন্দর। তার পরও কেবল নারীকেই কেন সুন্দর বলা হয়। এই যে বিশেষভাবে নারীকে দেখানো, এর পেছনে বিশেষ ধরনের রাজনীতি কাজ করে। নারী আসলে ওই জায়গায় যেতে পারছে না, তাকে যেতে দেয়া হচ্ছে না; যেখানে গেলে নারীকে আলাদা করে দেখার কিছু থাকবে না। নারী এ সমাজেরই একটা অংশ হিসেবে থাকতে পারছে না। সেটাই হলো তাদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর।

নারীকে নিয়ে আপনার কয়েকটি আলোচিত সিরিজ আছে। অপলক নারী, কনসেপ্ট অব মডার্ন রাধা, কসমোপলিটন উইমেন—এ সিরিজগুলোর বিষয়বস্তু নির্ধারণের ভাবনাগুলো শেয়ার করবেন?

আমি এ উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের একজন নারী। সাংস্কৃতিকভাবে আমি বাঙালি। এ সংস্কৃতিতে নারীর চরিত্রগুলো নানাভাবে এসেছে। মুসলিম নারীর রূপ আছে, দ্রৌপদীরও আছে, রাধা চরিত্রেরও বয়ান আছে। প্রত্যেকটা জিনিসকেই সতর্ক চোখে অবলোকন করা যায়। আমি ক্রিটিক্যালি ও অ্যানালিটিক্যালি জিনিসগুলোকে দেখি। প্রত্যেকটা গল্পের মধ্যে কিছু মিল আছে। অযাচিত কারণে দেখা যাবে প্রত্যেকটা গল্পে পুরুষের শক্তি আছে আর নারীর আছে দুর্বলতা, কমনীয়তা। দুটো মিলে এক ধরনের উপস্থাপনা করা হয়েছে নারীকে। নারী হিসেবে তাকে উপস্থাপন। আমার নিজস্ব ভিজুয়াল ন্যারেশনে ওটারই রূপ হলো কসমোপলিটন উইমেন, যে নারী শহুরে নারী। আরেকটা হলো কনসেপ্ট অব মডার্ন রাধা—যে নারী প্রেমিকা বা রাধার অনুষঙ্গ।

প্রত্যেকটা নারীর এই যে অবয়ব, সে অবয়বগুলো একদিকে প্রচণ্ড আকর্ষণীয়। কিন্তু একইভাবে এটা প্রশ্নবিদ্ধও বটে। নারীকে এত নামে ও সাজে অভিহিত করার কারণ কী। পুরুষেরও তো এমন নানা রূপ আছে। কিন্তু নারীকে নিয়ে এত চর্চিত ব্যাপারটাই আসলে সংকট। এই যে নারীচর্চা, এটাই একটা বঞ্চনা। তার একটা দুর্বলতাও বটে। অবশ্য নারীকে আলাদাভাবে দেখানোর প্রয়োজন আছে বলেই আমার সিরিজটা তৈরি করা। আলাদাভাবে দেখানোর প্রয়োজন আছে, কিন্তু সেটা অন্য বিষয়। সেদিন ভাবছিলাম একটা গভীর বিষয়। এই যে পৃথিবীটা চলছে, তা কিন্তু চলছে বিভিন্ন স্টিগমার মাধ্যমে। ধর্ম, সংস্কৃতি, সমাজ ব্যবস্থা। এতসব স্টিগমার কোনো দরকার ছিল না। মানুষ যদি তার সেন্সটাকে কাজে লাগাত। যদি বোধটাকে কাজে লাগাত। তাহলে বুঝে যেত নারীর অবস্থান, পুরুষের অবস্থান কিংবা মানুষের অবস্থান কেমন। এত রকম তকমা দিয়ে দিয়ে মানুষ বোধটাকে নষ্ট করে ফেলেছে। আর্টে এ জিনিসই আসলে আমি তুলে ধরি। 

আপনি পারফর্মিং আর্টকেও গুরুত্ব দেন। এক্ষেত্রে আপনার অনেক কাজ বেশি আলোচিত। আপনার কাজের এদিক নিয়ে বলবেন?

পারফরম্যান্স আর্ট বা কৃৎশিল্প—যাকে আমরা লাইভ আর্ট বলি, ওটা আমি ২০০৯ সালে বাংলাদেশে করি। সেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আমার মধ্যে এসেছে। আমি খুবই বহুমুখী। প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙে গড়তে চাই। এটাই আমার প্রবৃত্তি। মানবিক সহজাত প্রবৃত্তি। আমরা কোনো মুহূর্তেই আগের মতো থাকি না। আমরা প্রকৃতিরই একটা অংশ। বাতাস, আলো বা কোনো প্রাকৃতিক উপাদানকে পরিমাপ করা হলে দেখা যাবে, কোনো সময়ের সঙ্গে আরেকটি সময়ের কোনো মিল নেই। এজন্য বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী ভ্যান গঘ একটা ছবি, ল্যান্ডস্কেপকে দিনের কয়েকটি সময়ে ভাগ করে এঁকেছেন। মানুষ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল পৃথিবীর একটি অংশ। এজন্যই পারফরম্যান্স আর্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমার মধ্যে প্রবেশ করেছে। আমি আর্ট করি না, আর্ট আমার ওপর ভর করে। শিল্প বা সৃষ্টি আমার ওপর ভর করে। প্রকৃতি যেমন সৃষ্টির অংশ। আমিও তেমন প্রকৃতির অংশ। আমি এটা থেকে বিচ্ছিন্ন নই বলেই আমার কর্মটাও খুবই স্বাভাবিক গতিতে এসেছে।  

সমাজে নারীর অবস্থানকে শক্তিশালী করতে শিল্প কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?

শিল্পে নারীর যে উপস্থাপন সম্ভব, সেটাকে কাজে লাগালে সমাজে যে প্রভাব পড়ে, তা তুলনাহীন। তবে একটা কথা আছে। শিল্পে নারীর অবস্থান সবসময় দেখানো হয় দুর্বলতার সঙ্গে মিলিয়ে, রোমান্টিক জায়গায়। কিন্তু আমার কাছে নারী ভীষণভাবে একটা বডি অব ভয়েস। সেটি কিন্তু ইমোশনাল নয়। সাংঘাতিক ইন্টেলেকচুয়াল বিষয়ও আছে। যদি আমরা নারীকে নিয়ে কাজ করি, উপস্থাপন করি, ভাবি, চিন্তা করি ও সেভাবে প্রকাশ করি, তাহলে নারীর জন্য প্রাপ্য জায়গাটা তৈরি হবে। নারীশক্তিটা আসলে নারীকে অনুভব করতে হবে এবং শিল্পে তার রূপ ওইভাবে প্রকাশ হতে হবে। আমি নিজে অনুভব না করলে তা কখনো হবে না। সমাজ-নারী-শিল্প সবকিছুই একটি আরেকটির সঙ্গে জড়িত। যেটাকে আমি ‘কানেক্টিং দ্য ডটস’ বলি। পৃথিবীতে কোনো বিন্দুই কোনো বিন্দু থেকে আলাদা নয়। বিন্দুগুলোকে যখন আলাদা করে ফেলি, তখন তার সমষ্টিগত যে শক্তি, তা নষ্ট হয়ে যায়। শিল্পের সব বিন্দু পুরো সমাজের মধ্যে দিতে হবে। তাহলেই আসলে নারীর যে রূপ, তা স্বীকৃত হবে, বলা হবে, তৈরি করা হবে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: শানজিদ অর্ণব