একটা সময় শিল্পচর্চায় মেয়েদের সুযোগ ও অংশগ্রহণ বেশ সীমাবদ্ধ ছিল। বাংলাদেশের শিল্পজগতে নারী চিত্রশিল্পীদের অবস্থান কখন থেকে উল্লেখযোগ্য বা দৃশ্যমান হয়ে উঠতে শুরু করে?

এটা আসলে একবারে হয়নি। একটু একটু করে হয়েছে। আমার মনে হয় ১৫-২০ বছর ধরে মেয়েদের অবস্থানটা দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশে নারী চিত্রশিল্পীদের অগ্রযাত্রার কথা এলে আপনার নাম আসে। আপনি আরো কয়েকজন নারী চিত্রশিল্পীর নাম বলবেন কি, যারা আপনার বিবেচনায় এ দেশে অগ্রদূতের ভূমিকা রেখেছেন?

নারী শিল্পীদের অবস্থান নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই নভেরার নাম আসে। নিজেকে তিনি অনেক স্ট্রাগলের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাংলাদেশে ওনার কাজ এখনো দৃশ্যমান। আমাদের প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তার কাজ আছে। আমার প্রজন্ম কিংবা আগের জেনারেশন কিন্তু নভেরার কাজ থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছে। নভেরা এত আধুনিকমনস্ক ছিলেন যে এখন পর্যন্ত আমাদের অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছেন। সাহসী শিল্পী হিসেবে শামীম শিকদারের নামও আনা যায়। তিনি সে সময়ে সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন। কাজের বিচারের মধ্যে যাচ্ছি না। একজন নারী হিসেবে শিল্পকলার জগতে কীভাবে তিনি দাঁড়িয়েছেন, কীভাবে ছেলেদের পাশাপাশি কাজ করেছেন, ছেলেদের অনেক রকম টিটকারি ও উপেক্ষাকে আমল না দিয়ে কাজ করে গেছেন, সেটাও কিন্তু ভাবতে হবে। সমসাময়িক আরো অনেকেই ছিলেন। তবে তারা অতটা লাইমলাইটে আসতে পারেননি। তারপর আমরা অবস্থানগতভাবে ফরিদা জামানের নামটা আনতে পারি। কারণ ফরিদা আপা ১৯৭৬-৭৭ সালে ভারত থেকে পড়াশোনা শেষ করে প্রধান নারী শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। নারী শিল্পী হিসেবে তিনিই প্রথম শিক্ষক হয়ে যোগ দিয়েছিলেন চারুকলায়। তাকে আমরা পেয়েছি প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার সময়। কাজের পরিধি ও যোগ্যতা সবকিছু মিলিয়েই তিনি অনেক উঁচু পর্যায়ের শিল্পী ছিলেন। আমরা ছাত্রাবস্থায় তাকে অনুসরণ করেছি। তার কাছে আমরা অনেক উৎসাহ পেয়েছি। সমসাময়িকদের মধ্যে নাজলী লায়লা মনসুরও আছেন। ওনার কাজ অসম্ভব শক্তিশালী নারীবাদী কাজ। তারপর আসে রোকেয়া সুলতানার নাম। রোকেয়া সুলতানা প্রথম সারির একজন শিল্পী। একজন ফিল্মমেকার হিসেবে উনি হয়তো পড়াশোনা করেছেন, তবে পেইন্টিংয়েও পিছিয়ে নেই। দিলারা বেগম জলি আছেন। আরো তরুণ হিসেবে বিবেচনা করলে লিপি ও নূপুরের কাজ অনেক ভালো।

একজন নারী ও পাহাড়ের নারী—আপনার যাত্রাপথটা কেমন ছিল?

বিষয়টা অনেক বন্ধুর ছিল। অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। সব নারীকেই আসলে সংগ্রাম করতে হয়। আদিবাসী নারী বলেই যে আমাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে বেশি, তা কিন্তু নয়। আমাদের মনে হয়, সমতলের নারীদেরও অনেক সংগ্রাম করতে হয় ও হচ্ছে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েদের অবস্থানটা কোনোভাবেই সহজে আসে না। আমাদের নিজেদের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করা, নিজের অবস্থানকে শক্ত করতে গেলে একটু চড়াই-উতরাই পার হতেই হবে। সংগ্রামটা আমাদের সবসময়ই করতে হয়। সেটা আমরা আদিবাসী নারী বলি বা সমতলের নারী—সংগ্রাম কিন্তু এখানে সবারই আছে। সংগ্রাম থাকবেই। সেটার জন্য আমরা কাজ করে যাব। তাতে আমাদের থেমে থাকলে চলবে না।

চিত্রকর্মে নারী মানেই সুন্দরের প্রতিভূ, এমন একটা ধারণা চালু আছে। আপনি আপনার ছবিতে নারীকে কীভাবে দেখতে চেয়েছেন?

আমার ছবিতে আমি নারীকে বিভিন্ন রূপে দেখিয়েছি। নারীর কমনীয়তার পাশাপাশি নারী শক্তির প্রতীক হিসেবে এসেছে আমার পেইন্টিংয়ে। ভেতরকার ইচ্ছাশক্তিকেই আমি অনেক বেশি প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি। বাইরের সৌন্দর্য, কমনীয়তা ও ছন্দ আছে তার জীবনে। হাসি-আনন্দ, দুঃখ-বেদনা সবকিছু কিন্তু আমরা মুখের মধ্যে প্রস্ফুটিত দেখতে পাই। একজন মানুষের মুখের মধ্যেই সুখ-দুঃখ ভেসে বেড়ায়। সেটাই কিন্তু মানুষ বুঝতে পারে। অন্যেরটা আমি বুঝতে পারি, আর আমারটা অন্য কেউ। মুখ হচ্ছে একটা আয়না। সেখান থেকেই আমরা ধারণা করতে পারি কখন সুখ, কখন দুঃখ, কখন বেদনা।

নারীর ইচ্ছাশক্তি ও চাওয়া-পাওয়ার চেতনা থাকতে পারে। নারীরা তো অনেক কাজ করে আমাদের দেশে। আগে নারীদের অবস্থা এমনটা ছিল না। এতদূর আসার পেছনে নারীদের অবশ্যই একটা স্ট্রাগল আছে। আমরা যে কষ্টগুলো পাচ্ছি, যে সংগ্রামের মধ্যে যেতে হচ্ছে আমাদের, সেগুলো যেন আমাদের পরের প্রজন্ম না পায়। আমরা যেন একটা সুন্দর পৃথিবী এবং সুন্দর প্লাটফর্ম রেখে যেতে পারি। ফলে ‍আমাদের ভেতরের যে শক্তি আছে, সে শক্তিকে জাগ্রত করা দরকার। যেন আমাদের ভেতরের চেতনাবোধটা সুন্দরভাবে আনতে পারি। আমার ছবিতে আমি এটাই সবসময় চাই। নারীর কমনীয়তার পাশে তার শক্তিটাও যেন আসে। ছন্দের পাশাপাশি যেন তাদের ভেতরের চেতনাকে আনতে পারি। সেটার বহিঃপ্রকাশই আমি ঘটাতে চাই আমার পেইন্টিংয়ে।

আপনি যখন নারীকে এঁকেছেন তখন রঙের ব্যবহারে আপনার নিজস্ব ভাষা কীভাবে নির্মাণ করেছেন?

আমার ছবিতে উজ্জ্বল রঙ থাকে। উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করি দেখে মানুষ ভাবতে পারে, এত উজ্জ্বল রঙে নারীরা বিচরণ করছে, তাদের দুঃখ কোথায়? তাদের বেদনা কোথায়? উজ্জ্বল রঙের মধ্যেই তারা ভেসে বেড়াচ্ছে। আমার উজ্জ্বল রঙের মধ্যে নারীরা মিশে থাকে। ভালোবাসা, আনন্দ, উৎসবে তারা মিশে থাকে রঙের মধ্যে। কখনো কিন্তু দুঃখে, বেদনায় খণ্ডিত হতে থাকে হৃদয়টা, তখন কিন্তু নীল কালো ছায়ায় সব বিলীন হতে থাকে। তখন আবার ওদের শরীর মুখ ও ভঙ্গিমা সবকিছুই কিন্তু এসব রঙের মধ্যে মিলেমিশে থাকে। আমার ছবির বহিঃপ্রকাশে রঙ একটি প্রধান ভূমিকা নিয়েছে, রঙের মধ্যে কিন্তু আমি বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি।

কখনো কখনো ধূসর রঙ ব্যবহার করেছি উজ্জ্বল রঙের পাশাপাশি। ধূসরতাও কিন্তু মাঝে মাঝে ছুঁয়ে গেছে আমার রঙ। কখনো আমি শুধু পেনসিলে কিংবা শুধু সাদা-কালো কালি কলমে এঁকেছি। সেখানে কেবল নিরেট একটা কালো রঙের আভা থাকে, যেখানে আমি নারীদের আঁকি। সেখানে নারী অনেক দুঃখে, সংগ্রামে, বেদনায় বিলীন হয়ে আছে। এভাবে আমি নারীর রক্তক্ষরণকে, ভেতরের কষ্টগুলোকে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। তারপর কখনো লাল রঙের প্রখরতায় কিন্তু তারা ডুবে যায়। লাল রঙের মধ্যে যখন নারীরা অবগাহন করে, তখন কিন্তু তারা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। লাল রঙকে কখনো প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছি। দেখা যাবে, একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হয়তো মলিন চেহারা, চোখটা ঢেকে আছে, শুধু একটু চিবুকের মধ্যে একটু খানি আলো পড়েছে পেছনে। সম্পূর্ণ লাল রঙের খেলা দেখা যায়। এটা হচ্ছে নারীর ভেতরে একটা সংগ্রাম, দুঃখ। ভেতরে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে দুঃখে বেদনায়, অনেক রকম নিগ্রহের শিকার হয়, তার প্রতিবাদ হিসেবেই লাল রঙকে কোনো না কোনো সময় কিন্তু ভীষণভাবে ব্যবহার করি। 

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: ফারিহা আজমিন