আপনার কাজে উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার দেখা যায়। বিশেষত গোল্ডেন বেঙ্গল সিরিজে এ বৈশিষ্ট্য হাজির ছিল। এ রঙের ব্যবহার নিয়ে জানতে চাই।

ধারাবাহিকভাবে যারা আমার কাজ দেখেন তারা লক্ষ করে থাকবেন, গোল্ডেন বেঙ্গল সিরিজের আগে আমার কাজে রঙের ব্যবহার আরেকটু চাপা ছিল। কিন্তু সিরিজটায় এসে এত রঙের সমারোহ দেখতে পাওয়ার একটা কারণ আছে। কভিডের সময় আমরা সারা পৃথিবীর মানুষ তো একটা অন্ধকারে ছিলাম, সেই সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত যে দুঃখবোধ তা ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা, কভিড-১৯ থেকে বেরিয়ে আসা, পৃথিবীর সৌন্দর্যকে আবার দেখতে চাওয়া। এর সবকিছুর প্রভাবই ছিল গোল্ডেন বেঙ্গল সিরিজে। এছাড়া আমি মনে করি, রঙের আলাদা একটা শক্তি আছে। একটা রঙ মানুষের মন ভালো করে দিতে পারে, আবার যেকোনো একটা রঙ মানুষকে বিষণ্ন করে দিতে পারে। সেসব বিষয় মাথায় রেখে আমি কভিডের পরে মানুষের আবার বেঁচে থাকার যে অনুপ্রেরণা সেটিকেই উজ্জ্বল রঙের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছি।

নারী শিল্পী হিসেবে চিত্রকর্মে নারীকে উপস্থাপন বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?

চিত্রকর্মে নারীকে উপস্থাপনে আমরা বহু বছর ধরে নারীকে দেখেছি তথাগত চরিত্রে। কিন্তু আমি বিশ্বের সব নারীকে সম্মানের জায়গায় দেখতে চাই। আমি চাই তারা খুব সম্মানের জায়গায় থাকুক, স্বাবলম্বী হোক। আমরা পুরুষতান্ত্রিক পৃথিবীতে বসবাস করি এবং কনজিউমার ক্যাপিটালিস্ট ওয়ার্ল্ডে নারীদের নানাভাবে ভোগ্যপণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এখানে প্রতিনিয়ত নারীকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। আমরা নারীরা আসলে একটা অনিরাপদ পৃথিবীতে বসবাস করছি। এমনকি উন্নত পশ্চিমা সমাজেও কিন্তু নারীরা নানাভাবে নির্যাতিত। তাই সর্বোপরি আমি নারীকে সব জায়গায় একটা নিরাপদ অবস্থানে দেখতে চাই। সেই সঙ্গে আমি মনে করি নারী যখন অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করবে, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে, তখনই তারা একটা সম্মানের জায়গায় আসতে পারবে।

একজন নারী শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশে, তারপর কানাডায় আপনার জার্নিটা নিয়ে শুনতে চাই।

আমি ২০১৪ সালে শিল্পী হিসেবে কানাডার পিআর কার্ড পেয়েছিলাম। কানাডায় আসার আগে আমি ভেবেছিলাম বিদেশে আমার যাত্রাটা মসৃণ হবে, জীবন সহজ হবে, কিন্তু ব্যাপারটা তেমন না। অন্যদিকে বাংলাদেশে থাকাকালীন আমি মনে করি না যে এ সময় বাংলাদেশে আমার শিল্পীজীবনে কোনো বাধা ছিল। কারণ আমার পারিবারিকভাবে অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা ছিল। সেই সঙ্গে আমি অনেক দৃঢ় মানসিকতার বলে সেভাবে কোনো বাধার সম্মুখীন কখনো হইনি। কিন্তু এটা তো আমার একার কথা। আমি জানি বাংলাদেশে অনেক নারী আছেন, যাদের জীবন অতটা সহজ নয়। তবে আমি মনে করি পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে। প্রতিবাদ করতে শিখতে হবে। প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে হবে। 

আর কানাডায় এসে আমি বেশকিছু কাজ করেছি। গ্রুপ এক্সিবিশন করেছি। কিন্তু অতিরিক্ত খরচসাপেক্ষ বলে এখনো সলো এক্সিবিশন করা হয়নি। তবে এখান থেকে আমি এক্সিবিশনের জন্য প্রচুর প্রস্তাব পাই। কিন্তু বিভিন্ন কারণে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায়ই আমার বেশির ভাগ কাজ করা হয়।

চিত্রকর্মে বিষয় নাকি রঙ—কোনটা আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

আসলে বিষয় ও রঙ দুটোই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। দুটোরই প্রয়োজন সমান সমান। এছাড়া চিত্রকর্ম তো শুধু দেয়ালে টাঙিয়ে রাখার বা বিনোদনের একটা বিষয় নয়। এটা অনেক স্ট্রং একটা মাধ্যম, যেখানে সমাজ, সমাজের অসংগতিগুলো আছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত সচেতনতা তৈরি করা হয়।

যদি জয়নুল আবেদিন স্যারের কথা বলি, আপনি দেখবেন তার আঁকা দুর্ভিক্ষের যে চিত্রগুলো, সেগুলো তিনি শুধু তুলির আঁচড়ে কালো কালি দিয়ে এঁকেছিলেন। সেখানে কিন্তু কোনো রঙ নেই। যুদ্ধের ভয়াবহতাকে তিনি একটা মাত্র রঙ দিয়েই প্রকাশ করে ফেলেছেন। আবার এরশাদ পতনের সময় কামরুল হাসানের কাজও আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার। অর্থাৎ রঙ ও বিষয়ের সমন্বয়ে চিত্রকর্ম জনগণকে প্রতিবাদে উদ্বুদ্ধ করে, সচেতনতা তৈরি করে। স্পেনের গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতাকে পিকাসো এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা এখনো যুদ্ধের প্রতিবাদ হিসেবে স্মরণীয়।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আপনি ইনস্টলেশন করেছেন। বিষয়টি নিয়ে কবে থেকে কাজ শুরু করেন? ভবিষ্যতে আরো কি করতে চান?

আমার মনে হয় আমরা কভিড-১৯ থেকে কোনো শিক্ষা নিইনি। নিলে আমরা আবার প্রকৃতিকে মেরে ফেলায় মত্ত হতাম না। আমরা ভুলে গেছি পাহাড় আমাদের ভাই, নদী আমাদের বোন। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের ভাই-বোনদের গলা টিপে হত্যা করছি। এ কারণেই আমি অনেক বছর ধরেই ভাবছিলাম জলবায়ু নিয়ে কাজ করব। আমরা কীভাবে শান্তির পথ তৈরি করতে পারি এ ধরনের একটা প্রচেষ্টা আমার মাথায় ছিল। সেখান থেকেই জলবায়ু নিয়ে কাজ করার কথা মাথায় এসেছিল। আমি কাজ করেছিও। আমি মনে করি আমরা শিল্পীরা নিজেদের জায়গা থেকে সচেতনতা তৈরি করতে পারি। সেজন্যই আমি গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ওপর আমার ইনস্টলেশন করি।

আমার যে কাজটা ছিল তাতে বাটুয়াগুলোর মধ্যে ছিল বীজ। শিরোনাম ছিল রিটার্ন টু নেচার। আমি এর মধ্য দিয়ে মানুষকে বলতে চেয়েছি আপনারা প্রকৃতির কাছে ফিরে আসুন। প্রকৃতিকে ভালোবাসুন। প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হন।

সমাজে নারীর অবস্থানকে শক্তিশালী করতে শিল্প কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?

অনেক অনেক বেশি কোনো বিচ্ছিন্ন কিছু না শিল্পকলা। বাংলাদেশ সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা সবকিছুর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এখানেও পরিবর্তনটা আসবে। নারীর পরাধীনতাকে ভাঙতে হলে নারীকেই ভাঙতে হবে। আমাদের নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে হলে আমাদেরই করতে হবে। নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে। দেশের সর্বস্তরে শিক্ষার সমবণ্টন করতে হবে। ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: শাকেরা তাসনীম ইরা