আপনি যখন কাজ শুরু করেছিলেন তখন বাংলাদেশে নারী ও পুরুষ শিল্পীরা যেভাবে নারীকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা থেকে এখনকার সময়ে এসে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি?
আমি যখন কাজ শুরু করেছি, তখন বাংলাদেশে পুরুষ শিল্পীরা যেভাবে নারীকে ক্যানভাসে তুলেছেন তার থেকে মূলত পরিবর্তনটা এনেছে নারী শিল্পীদের কাজ। নারী শিল্পীরা অনেক মিডিয়ায়, অনেক অন্তর্নিহিত বিষয় নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু পুরুষ শিল্পীরা এখনো নারীর সৌন্দর্য নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করে।
নারী ও তার জীবন আপনার চিত্রকর্মে কীভাবে উপস্থিত হয়েছে? আপনি তাদের কীভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন?
নারী ও তার জীবন আমার শিল্পকর্মে বিভিন্নভাবে এসেছে, যেমন পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত উপলব্ধির শিল্প প্রয়াস। আমি আমার চারপাশের সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক, ধর্মীয় কিংবা প্রাকৃতিক যেসব ঘটনা আমাকে ভাবায় কিংবা তাড়িত করে তাই নিয়ে ছবি আঁকার চেষ্টা করি।
আমি নিজে একজন নারী—তার জন্য আমি আনন্দিত, কিন্তু সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়ভাবে নারীর প্রতি বৈষম্য আমাকে আহত করে, আমি উপলব্ধি করতে পারি সমাজে নারী তথা আমার অবস্থান। সেসব অনুভূতিই শিল্পকর্মে প্রকাশের চেষ্টা করি। আমি মূলত ক্যানভাস, কাগজ, কিংবা দৃশ্য শিল্পে কাজ করি।
নারী শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশে আপনার জার্নিটা নিয়ে শুনতে চাই।
আমি নিজেকে একজন শিল্পী হিসেবে ভাবতে পছন্দ করি। কিন্তু এ সমাজ, রাষ্ট্র আমাদের শুধু ‘নারী শিল্পী’র তকমা দিতে ভালোবাসে। এটাও একটা জার্নি বটে। তবে একজন শিল্পী হয়ে উঠতে আমার পরিবার আমাকে সবসময় সহযোগিতা করেছে। এখনো করছে। পরিবারের সহযোগিতা নারীকে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করে। কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্র, মিডিয়া আমাকে পদে পদে বুঝিয়ে দেয় নারীর অবস্থান। সেখানেও পরিবর্তন এসেছে। তবে তার প্রভাব সামগ্রিক সমাজে এখনো ক্ষীণ। জার্নি বলি বা অনুভূতি কিংবা উপলব্ধি যাই বলি—সেখান থেকেই আমার শিল্পের সৃষ্টি।
কথাসাহিত্যিকের বড় শক্তি-পরিচয় হয় তার ভাষা। চিত্রশিল্পী হিসেবে রঙের ব্যবহারে কিংবা বিষয় নির্বাচনে আপনি কীভাবে নিজস্ব ভাষা নির্মাণ করেছেন?
একজন কথাসাহিত্যিকের বা শিল্পীর শক্তি-পরিচয় তার লেখা বা রঙের ভাষা নয় বরং বলা যায়, ভাষার অন্তর্নিহিত ভাব বা রূপ কিংবা তাৎপর্যের নিজস্ব একটা ভাষা বা শিল্পকর্মের শক্তি। আমি আমার শিল্পকর্মে সে তাৎপর্য বা কনসেপ্ট দিয়েই নিজস্বতা তৈরির চেষ্টা করেছি।
নারীকে বিভিন্ন যুগে শিল্পীরা বিভিন্নভাবে চিত্রিত করেছেন। অনেকে বলেন, এ যুগে নারীকে আলাদা সত্তা হিসেবে চিত্রকর্মে উপস্থাপনের প্রয়োজন নেই। আপনি কি মনে করেন নারীর প্রতি বৈষম্য বা অন্য কোনো কারণে নারীর জীবনকে ক্যানভাসে রাখার প্রয়োজনীয়তা এখনো বহাল আছে?
সমাজে, রাষ্ট্রে বা পরিবারে যতদিন বৈষম্য থাকবে ততদিন শুধু ক্যানভাসে নয় রাষ্ট্রের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা শিল্প-সাহিত্যের সব জায়গায় নারী সত্তা নিয়ে আলোচনা বা প্রয়োজনীয়তা বহাল থাকবে।
পারিবারিক-সামাজিক বিভিন্ন দায়িত্ব একজন নারীকে তার পুরুষ সহপাঠী/সহকর্মীর তুলনায় শিল্পী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় পিছিয়ে দেয় কিনা?
পারিবারিক বা সামাজিক দায়িত্ব একজন নারীকে শুধু শিল্পী নয় যেকোনো লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়ায় পিছিয়ে দেয়, যখন তার পরিবার, বাবা-মা কিংবা স্বামী অসহযোগিতা করে। মূল কথা শিল্পী হতে চাইলে সাধনা লাগে, শিল্পকর্মচর্চাকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। সব কাজ সেরে শিল্পচর্চা হয় না।
নারীবাদী ভাবনা-দর্শন আপনার শিল্পীজীবনকে কতটা প্রভাবিত করেছে?
এখানে নারীবাদী ভাবনা-দর্শন বলে কিছু নেই। আমি নারীর বৈষম্যকে একটি সামাজের গভীর ব্যাধি মনে করি। এটাই অনেকে বোঝে না। নারীরা ভাবে এটা তাদের দর্শন, পুরুষরাও ভাবে এটা নারীবাদী দর্শন। এখানে তার ভূমিকা নেই। কিন্তু এটা যে সামাজিক সমস্যা, এখানে নারী-পুরুষের উভয়ের ভূমিকা আছে। এ ব্যাধিকে সারিয়ে তুলতে হবে নারী-পুরুষ সবাই মিলে। নারীবাদী ভাবনা নয় বরং সামাজিক ব্যাধিটি আমার শিল্পীজীবনে প্রভাব ফেলে বৈকি! তাই তো বারবার নারীর সামাজিক অবস্থান নিয়ে কথা বলতেই হয়, কখনো ক্যানভাসের ভাষায়, কখনো মুখের ভাষায়। আমার শিল্পকর্মে নারী কখনো প্রতিবাদী, আবার প্রকৃতির মতো শক্তিশালী। নারীই পারে পৃথিবীকে প্রকৃতির মতো সুন্দরের পথে এগিয়ে নিতে।
সমাজে নারীর অবস্থানকে শক্তিশালী করতে শিল্প কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?
যুগে যুগে শিল্প সমাজকে প্রভাবিত করেছে। শিল্পের সব শাখার ভূমিকা আছে বিশ্বে নারীর আজকের এ অবস্থানের পেছনে। শিল্প শুধু নারীকে নয় মানুষের মননকে শক্তিশালী হিসেবে তৈরি করে। সে মানুষ সবাইকে সম্মান করতে শেখে। সবাইকে সহাবস্থানে ভালোবাসে। সেটা নারী-পুরুষ যে-ই হোক।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: ফারজানা রহমান ববি





