বাংলাদেশ তথা দুনিয়াজুড়েই নারীদের যে অসম পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়, নানা নিপীড়নের শিকার হতে হয় তা আপনার চিত্রকর্মে সে ব্যাপারগুলো তীব্রভাবে হাজির হয়। নারীর জীবন নিয়ে আপনার এসব নিরীক্ষার প্রেরণা বা উৎসটা কী?

আমার কাজে নিপীড়নের বিষয় নয় বরং ব্যক্তিগত বিষয়গুলোই চলে এসেছে। আমার ও আমার আশপাশের মানুষের জীবন বা কোনো একটির পরিপ্রেক্ষিতেই আমার বেশির ভাগ কাজ। আমি হয়তো কোথাও গেছি, সেখানে মানুষের জীবন সম্পর্কে জানলাম তখন সে জিনিসের প্রভাব পড়ে আমার কাজে। বিষয়টি এমন নয় যে নারীরা শোষিত হচ্ছে, শুধু সেগুলো নিয়েই কাজ।

হ্যাঁ, অবশ্যই পৃথিবীজুড়ে এখনো নারীদের শোষিত হওয়ার একটি বিষয় আছে। তবে শুধু নারী নয়, মানুষ মাত্রই শোষণের বিষয়টি আছে। উচ্চ শ্রেণীর কাছে নিম্ন শ্রেণী শোষিত হচ্ছে, ফলে শ্রেণী বিভেদ তৈরি হয়েছে। তাই এ বিষয়ে নারীকে নিয়ে আলাদা করে বলার বিশেষ কিছু নেই। বিশেষত, আমার কাজের ক্ষেত্রে। তবে হ্যাঁ, জেন্ডার একটি ইস্যু। আমি শুধু নারীকেন্দ্রিক কাজ করেছি সেটি কিন্তু নয়, ট্রান্সজেন্ডার নিয়েও কাজ করেছি। একটি মেয়ের বয়স নিয়ে যে ভাবনা থাকে, বয়স নিয়ে যে ভয় কাজ করে, যে পরিবর্তনগুলো হয় সেগুলো নিয়ে আমার অনেক কাজ ছিল। আমার ক্যারিয়ারের শুরুর দিয়ে আমাকে নিয়েই আমার কাজগুলো ছিল। আমি তখন আমার পোর্ট্রেট এঁকেছি অনেক। 

আপনার দুটো বিখ্যাত ছবি নিয়ে জানতে চাই। একটা হচ্ছে ব্লাউজ পরিহিতা একজন নারী, তার শরীরে অনেক নকশা আঁকা। তার মুখটা দেখা যাচ্ছে না। অন্যটি একজন নারীর মুখের অবয়বের ওপর, চারপাশে অসংখ্য পুতুল। মনে হচ্ছে নারীটি ঘুমিয়ে আছেন, তার জগৎকে ঘিরে আছে পুতুলগুলো...

প্রথম ছবিটির পেছনে খুবই মজার একটি গল্প আছে। ছবিটি আমি ২০০৮ সালে এঁকেছিলাম। সেটির জন্য আমি দুবার নেপালে গিয়েছিলাম। ২০০৮ সালে আমার একটি শো ছিল সেখানে। তার আগেই আমি চলে যাই। নেপালের জনকপুরের মৈধালিতে নারীপ্রধান সমাজ ব্যবস্থা রয়েছে। তারা দেখা যায় মানসিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী। সেখানকার সংস্কৃতি নারীদের ঘিরে, কিন্তু তারা খুবই দরিদ্র, কারণ মৈধালির পুরুষরা কোনো কাজ করে না। নারীরাই সেখানে সব কাজ করে এবং অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। ওই নারীদের শরীরে নানা রকমের নকশা আঁকা থাকে। আমি সেখানে সে নারীদের ব্যক্তিগত গল্প শুনতাম এবং তাদের নিয়ে কাজ করতাম। দ্বিতীয় ছবিটি অনেক পুরনো কাজ। আমার ২০০৩-০৪ সালের আঁকা চিত্র। এ রকম দুটো ছবি আমি এঁকেছিলাম। একটি চোখ বন্ধ ছিল, অন্যটি খোলা। চোখ খোলা ছবিটি এশিয়াটিক আর্ট বিনালে ছিল। এবং অন্যটি আমার একক প্রদর্শনীতে ছিল। দুটো কাজের নামই ছিল ‘আমার ছেলেবেলা’। ছেলেবেলার যে বিষয় থাকে পুতুল নিয়ে খেলা, নিজের পছন্দের বাইরে অনেক কিছু ঘটে যাওয়া। ওই সময়ে আসলে জীবনটা প্রভাবিত হয় পুতুল খেলার ছলে। দুটো ছবিই আমার পোর্ট্রেট নিয়ে করা। বর্তমানে একটি বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে আছে এবং অন্যটি দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের সংগ্রহে আছে।

আপনি চিত্রকর্মের বাইরে স্টেইলনেস স্টিলের তৈরি রেজর ব্লেড ব্যবহার করে অভিনব সব শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছেন। এ রকম উপাদান ব্যবহারের কারণটা জানতে চাই।

আমি মূলত ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিংয়ের শিক্ষার্থী। কিন্তু শিক্ষাজীবন থেকেই আমি অনেক ধরনের স্টেইলনেস স্টিলকেন্দ্রিক কাজ শুরু করি, এটা ১৯৯৪ সাল থেকেই। এরপর আস্তে আস্তে অনেক কাজ করেছি। অনেক দিন ধরেই আমার মাথায় রেজর ব্লেড নিয়ে কাজের বিষয়টি ঘুরছিল। এর ব্যবহার আমাদের জীবনে নানাভাবে হয়। সে সময়ে নখ কাটা থেকে শুরু করে পেনসিল কাটা—এছাড়া ভাই, বাবাদের ব্যবহারেও থাকত এটি। পেনসিল তোলানোর জন্য বইয়ের ভেতরে একটি ব্লেড সবসময়ই থাকত। কারণ আমার মফস্বল শহরে নেইলকাটার, পেনসিল শার্পনার পাওয়া যেত না। আমি গাইবান্ধার মেয়ে। আবার সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানকে মায়ের থেকে আলাদা করতেও এটি ব্যবহার হতো। এর পেছনে আরো একটা কারণও ছিল। আমি লাহোরে গিয়েছিলাম একটা রেসিডেন্সি করতে। আমাদের দেশে তখন কেয়ারটেকার গভর্নমেন্টের আদলে দুই বছরের জন্য আর্মি ব্যাকড গভর্নমেন্ট এসেছিল। দেশে সে সময়ে একটি গুমোট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। লাহোরে গিয়ে আমি দেখি সে একই ধরনের পরিস্থিতি। সে সময়ে আমার কিছু বন্ধু, সাংবাদিকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, এমন ধরনের কিছু ঘটনা ছিল। মনের মধ্যে খুব তোলপাড় চলছে। তখন আমি ভেবেছিলাম একটি বড় ইনস্টলেশন করব। ওইখানেই আমি প্রথম কাজ করি। সেখানেই আমার প্রথম রেজর ব্লেড নিয়ে কাজ করা। তিন-চার হাজার ব্লেড নিয়ে ইনস্টলেশন করেছিলাম। এটা ২০০৮ সালের কথা।

নারী শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশে আপনার জার্নিটা নিয়ে শুনতে চাই

আমার মনে হয় এ বিষয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমাদের দেশে এ বিষয়ে শেখার জন্য কতগুলো প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু কতজন পড়াশোনা শেষ করে এ বিষয়ে কাজ করছে? দেখা যায় পাস করে বের হয়ে অন্য একটি কাজ করছে। আবার হয়তোবা আর্টের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কিন্তু আর্টের পাশাপাশি অন্যান্য কাজও করছে। জীবন-জীবিকার জন্য এমন অনেক কিছুই হয়তো করতে হয়। তবে একটি বিষয় হলো ইচ্ছাশক্তি। কে কতটুকু ফোকাসড এটিও জরুরি। এজন্য কাউকে দায়ী না করে নিজেদের দায়ী করা উচিত। আমার জীবনে আমি একটি জিনিস করতে চাচ্ছি, কিন্তু আমাকে কেউ আটকে রাখবে, এমনটি কেন হবে! আমি তো সে জায়গায় আটকে থাকব না।

আপনার শিল্পকর্মের বিষয়বস্তু নির্ধারণে স্পেসিফিকেশন থাকে কিনা? এটা কীভাবে করেন?

থাকে, একেবারেই থাকে না, এমনটা নয়। যেকোনো কাজের একটি গল্প থাকে। প্রতিটি শিল্পকর্মের পেছনে একটি পরিকল্পনা থাকে। দেখা যায়, আমি এখন কী করছি, কেমন আছি, কী ভাবছি এবং পরিস্থিতি, পরিবেশ বা কখনো দেখা যায় কোনো একটি নিউজ শুনছি সে বিষয়টিও মাথায় থেকে যায়। আমি ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কাজ করি। 

সমাজে নারীর অবস্থানকে শক্তিশালী করতে শিল্প কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?

কাজ করে যেতে হবে। নিজে কী ভাবছি সে বিষয়টিকে পরিষ্কার করতে হবে। মানুষ হিসেবে আমরা পৃথিবীটাকে কীভাবে দেখছি জায়গাটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঘরের দেয়ালকে সুন্দর করার কথা ভাবব নাকি শিল্পী হিসেবে আমার যে বোধ আছে সেটাকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করব। শিল্পী হিসেবে অন্যকে মূল্যায়ন করা, জীবনের অন্যদিকগুলো নিয়ে ভাবা, চিন্তার জগৎ নিয়ে নাড়াচাড়া করা। জরুরি বিষয় হচ্ছে, স্পষ্টভাবে ভাবা, নয়তো সবকিছু বুদবুদের মতো হয়ে যায়। 

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: শাকেরা তাসনীম ইরা