বাংলাদেশে নারী ও পুরুষ শিল্পীরা যেভাবে নারীকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন তার বিবর্তনটা জানতে চাইছি। ষাট-সত্তরের দশকের সঙ্গে এ নতুন সহস্রাব্দে কতটা পরিবর্তন এসেছে?
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে শিল্প-সাহিত্যে, কবিতায়, চিত্রকলায় নারীর প্রতি সমাজের প্রতিষ্ঠিত দৃষ্টিরই প্রতিফলন দেখা যায়। যেমন আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই—মেয়েদের কাজ সেবা করা। আমরা চেষ্টা করি মা ও শিশুকে, প্রসাধনরত নারীকে চিত্রের বিষয়বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করতে। কিন্তু একজন নারীর স্বকীয়তা, তার নিজস্ব জীবন এবং নারী যে একজন সৃজনশীল মানুষ হতে পারেন সে ভাবনাটাই আমাদের আগে ছিল না। ফলে ষাট-সত্তরের দশকে আমাদের শিল্পীরা নারীর প্রথাবদ্ধ চিত্রই এঁকেছেন। অর্থাৎ প্রতিনিয়ত একটা দূরবর্তী দৃষ্টি থেকে নারীকে দেখা হয়েছে। যেন একজন নারীর নিজের কোনো জিজ্ঞাসা নেই, নিজস্ব কোনো জীবন নেই।
তবে বিংশ শতাব্দীর পর থেকে নারীকে নিয়ে ভাবনার জায়গাটায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। নারী এখন নিজের ভাবনাকে প্রকাশ করতে চায়। আমার কথাই যদি বলি, আমি যখন প্রথম জন বার্জারের ‘ওয়েজ অব সিইং’ পড়লাম তখন আমার ভাবনায় ব্যাপক একটা পরিবর্তন এল। আমি বুঝতে পারলাম আমি যা দেখি তা আসলে আমাকে দেখানো হয়। তখন থেকে আমি আমাকে খোঁজার চেষ্টা করি। নিজেকে খুঁজতে গিয়ে প্রথম যে প্রশ্নটা মাথায় আসে সেটি হলো সমাজ কেন আমার সীমারেখা নির্ধারণ করে দেবে? আমার কাছে যখন এ প্রশ্ন প্রকট হয়ে ধরা দিল তখনই আমার কাজের বিষয় হয়ে উঠেছে নারী ও নারীর প্রতি হওয়া বৈষম্য।
দুনিয়ায় নারীদের যে অসম পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়, নানা নিপীড়নের শিকার হতে হয় তা আপনার চিত্রকর্মে নানাভাবে হাজির হয়। নারীর জীবন নিয়ে আপনার এসব নিরীক্ষার প্রেরণা বা উৎস কী?
আমি যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ভর্তি হই, তখন ১৯৭৬ সাল। একবার আউটডোর ক্লাসে সব বন্ধুরা মিলে একটা ইটের ভাটায় গিয়েছিলাম ছবি আঁকতে। ভাটায় যখন ইট আগুনে পুড়ছে, আমার বন্ধুরা তখন ওখানে বসে কাজ করছিল, আমি ওদের কাজ দেখতে ওপরে উঠেছিলাম। তখন কিছু শ্রমিক এসে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করে আমাকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়। কারণ তারা বিশ্বাস করত, ইটের ভাটায় নারী উঠলে ইট নষ্ট হয়ে যায়।
এই যে সমাজের একটা নিচু মানসিকতা, এটাই আমাকে আজকের জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। এছাড়া আমার আজকের অবস্থানের পেছনে আমার মায়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। আমার মা স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন। মা বলতেন, নিজের কথাটা বলার জন্য মেয়েদের শিক্ষা দরকার, অর্থনৈতিক মুক্তি দরকার। আমার মনে হয় ছোটবেলায় এ কথাগুলো অবশ্যই কোথাও না কোথাও আমার মনে দাগ কেটেছিল।
আপনার কাজের কেন্দ্রীয় চরিত্র নারী। তাকে আপনি চিত্রকর্মের বাইরে সূচের কাজ, আলোকচিত্রসহ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে অভিনব সব শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছেন। এসব উপাদান ব্যবহারের কারণটা জানতে চাই। উপাদানগুলোকে কি আপনি বিষয়বস্তুর সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে বাছাই করেন?
অবশ্যই। এত বছরের পথচলায় ২০০৮ সালে এসে আমার মনে হয়, আমি একই ভাষায় সব ছবি আঁকছি। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের বাইরে যাচ্ছি না। তখন আমার মনে হলো আমি একটু নারীদের ভাষা বলি। আমি লক্ষ্য করেছি আমাদের লোকজ শিল্পগুলোতে হয়তো নারীর একটা ভাষা ফুটে ওঠে। যার মধ্যে অন্যতম হলো নকশিকাঁথা। নিজের মনে, নিজের মতে, নিজের ভাবনা অনুযায়ী নারী নকশিকাঁথা সেলাই করে। এর পরই ২০০৮ সালে আমি নকশিকাঁথা সেলাইয়ের মতো চিত্রকর্ম আঁকা শুরু করলাম। সে চিত্রকর্মগুলোর শিরোনাম ও বিষয়বস্তু ছিল ‘তাহাদের কথা’ অর্থাৎ নারীদের কথা।
এছাড়া আজ থেকে চার-পাঁচ বছর আগে আমি সেক্স ওয়ার্কারদের নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি করেছিলাম। করোনার সময় আমি সেখানকার অডিওগুলো আবার শুনি। এটা করতে গিয়ে আমার হঠাৎ মনে হলো সেক্স ওয়ার্কারদের আন-অফিশিয়াল একটা ড্রেসকোড আছে—পেটিকোট ও ব্লাউজ। এটা যখন আমার মাথায় এল তখন মনে হলো তার শরীরের সঙ্গে যে অত্যাচারটা হয় সেটাকে আমি পেটিকোট ব্লাউজের ওপরে আঁকতে চাই, সেলাই করতে চাই। আমি যে খুব পরিকল্পিতভাবে সুঁইয়ের কাজ করতে গিয়েছিলাম এমনটা কিন্তু নয়। বিষয়, ধারণা ও কনসেপ্টের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তখন।
একজন নারী শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশে আপনার জার্নিটা নিয়ে শুনতে চাই।
আমি একটি শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি। ভাই-বোনের মধ্যে ওই রকম বৈষম্য ছিল না। তাই সে জায়গাটায় স্বস্তি ছিল। কিন্তু পরিবারের বাইরের সমাজটায় পদে পদে আমি বাধার সম্মুখীন হয়েছি।
যেমন আমি যখন ভালো কাজ করতে থাকলাম, তখন আমার বিয়ে হয়েছে। তখন আমারই বন্ধুবান্ধব, আশপাশের লোকজন বলা শুরু করল, ‘ওহ!, এটা নিশ্চয়ই তোকে তোর স্বামী করে দিয়েছে?’ কারণ তারা মনে করত, মেয়েরা ভালো কাজ করতেই পারে না। অর্থাৎ, আমরা নারীরা যে অবস্থানেই থাকি না কেন, একটা হীন মানসিকতার কাছে আমাদের প্রতিনিয়ত পরীক্ষা দিতে হয়।
তবে সহমর্মী মানুষ যে ছিল না তা নয়। সবচেয়ে বড় সহমর্মী মানুষটা ছিল আমার ঘরে—আমার স্বামী। এমনও সময় গেছে যখন আমার কাজ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, তখন একমাত্র ব্যক্তি ছিল আমার বন্ধু-স্বামী যে আমার পাশে থেকেছে, সাহস দিয়েছে, শক্তি জুগিয়েছে।
আপনি যখন নারীকে এঁকেছেন, তখন রঙের ব্যবহারে আপনার নিজস্ব ভাষা কীভাবে নির্মাণ করেছেন?
চিত্রকর্মে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক যে ফর্মটা তৈরি আছে, সেই পশ্চিমা স্টাইলের মডেল আমার পছন্দ হতো না। কেন পছন্দ হতো না তার কারণ আমি যে ধরনের অনুভূতি প্রকাশ করতে চাই, আমার মনে হতো প্রাতিষ্ঠানিক কাজগুলোয় আমি তা পারছি না। তাই আমি ফোক আর্টের দিকে মনোনিবেশ করি। সেই সঙ্গে সঙ্গে তাদের রঙের দিকেও আমি ঝুঁকে যাই। এছাড়া আমার কাজে ভায়োলেট কালার বেশি আসে। আমি শিবের রঙ ব্যবহার করি, নারী যে সমাজের সব ময়লা-আবর্জনা নিজের শরীরে শিবের মতো গ্রহণ করে আমি সেটিকেই উপস্থাপন করতে চাই। মূলত আমাদের দেশের প্রচলিত রঙের ব্যবহারই আমি বেশি করি।
সমাজে নারীর অবস্থানকে শক্তিশালী করতে শিল্প কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?
প্রথম কথা, নারীকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নিজের কথাটা জোরালো কণ্ঠে বলতে শিখতে হবে। কিন্তু আসলেই কি কেউ শোনে? সত্যিই কি শোনে কেউ? তা-ও বলতে হবে। অনেকটা সিসিফাসের পাথর ওঠানোর মতো। ক্রমাগত পাথর সরিয়ে এগোতে হবে। অর্থাৎ নিজের জায়গা নারীর নিজেকেই করে নিতে হবে। আর আমার বিশ্বাস নারীরা নিজেরাই নিজেদের পথ খুঁজে নেবে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: শাকেরা তাসনীম ইরা





