১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণপরিষদে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শাসনতান্ত্রিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে। সেই হিসেবে ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সাফল্যজনক সমাপ্তি ১৯৫৬ সালে হয়েছে বলে ধরা গেলেও ভাষা আন্দোলনের লক্ষ্য অদ্যাবধি বাস্তবায়ন হয়েছে কিনা এ প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়ে গেছে।

প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমও মনে করতেন ভাষা আন্দোলন এখনো শেষ হয়নি। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের আমলে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও মওলানা ভাসানীর মুখবন্ধ-সমৃদ্ধ ‘একুশ দফার রূপায়ণ’ নামক গ্রন্থে সর্বস্তরে বাংলাকে চালু করার সমস্যা ও তার সমাধান নির্দেশ করেছিলেন। কিন্তু বহু প্রচেষ্টা ও দাবির পরও কার্যত যুক্তফ্রন্টের আমলেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর কোনো অগ্রগতি সাধিত হয়নি।

বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব

এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার চিন্তাভাবনা শুরু করেন। ১৯৫৯-৬১ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে কার্জন হলে অনুষ্ঠিত একাধিক আলোচনা সভায় আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে তিনি বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রাখেন। এ প্রস্তাব রাখতে গিয়ে তিনি বলেন: ‘পশ্চিম পাকিস্তান বহু আগে থেকে উর্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করে উর্দুকে সরকারি ভাষা ও সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যম রূপে গড়ে তোলার সঠিক প্রচেষ্টায় অনেক দূর এগিয়ে গেছে, উর্দু কলেজকে পাকিস্তান সরকার বিপুল অর্থ ও জমি দিয়ে সাহায্য করেছে। অথচ এত আন্দোলন সত্ত্বেও বাংলাকে সর্বস্তরে চালু করার উদ্দেশ্যে আমরা বাঙলা কলেজ গড়ে তুলতে পারলাম না। সরকারও এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে। সেই সভাগুলোতে আমি এও বলেছিলাম: সরকার এগিয়ে না এলে আমরা নিজেরাই অদূর ভবিষ্যতে বাংলা প্রচলন করে দেখানোর উদ্দেশ্যে বাঙলা কলেজ স্থাপন করব।’

১৯৬১ সালেই প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম শুভাকাঙ্ক্ষী ও সমর্থকদের সহযোগিতায় বাঙলা কলেজ স্থাপন করে বাংলাকে ব্যবহারিকভাবে শিক্ষার মাধ্যম ও অফিসের ভাষণ হিসেবে চালু করে দেখানোর সিদ্ধান্ত নেন। এ ব্যাপারে তিনি প্রথম ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে আলাপ করলে তিনি আন্তরিকভাবে সমর্থন জানান। এ সম্পর্কে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁকে জানালে তিনিও প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমকে সমর্থন জানান ও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে উৎসাহিত করেন। এভাবে আলাপ-আলোচনা এগিয়ে যাওয়ার পর একটি প্রস্তুতি কমিটি গঠন হয়। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ, ডক্টর ইন্নাস আলী ও তমদ্দুন মজলিসের কয়েকজন কর্মী নিয়ে এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির কয়েকটি ঘরোয়া বৈঠকের পর দেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে বাংলা একাডেমিতে এক সভা ডাকার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলা একাডেমিতে তিনটি, রাইটার্স গিল্ড অফিসে (যে অফিস বাংলা একাডেমি ভবনেই অবস্থিত ছিল) একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা একাডেমিতে সভা হয় ১৯৬১ সালের ১৫ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি এবং ১৮ জুনে আর রাইটার্স গিল্ডে ১৯৬২ সালের ৪ মার্চ। অধিকাংশ সভায় সভাপতিত্ব করেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। এসব সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রিন্সিপাল ইরাহীম খাঁ, খান বাহাদুর আবদুর রহমান খাঁ, কবি জসীম উদ্দীন, কবি গোলাম মোস্তফা, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, পাকিস্তান অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালাম, তোফাজ্জল হোসেন, ডক্টর ইয়াস আলী, ডক্টর কামালউদ্দীন, টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রিন্সিপাল ওসমান গনি, বাংলা একাডেমির তত্কালীন পরিচালক সৈয়দ আলী আহসান, প্রাক্তন ডিপিআই আবদুল হাকিম, ডক্টর হাসান জামান, অধ্যাপক আবদুস সাত্তার, কবি জাহানারা আরজু, আখতার-উল-আলম  এবং আরো অনেকে। সাংগঠনিক কাজে তমদ্দুন মজলিসের যে কয়েকজন বিশিষ্ট কর্মী প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের সঙ্গে কাজ করেছেন তারা হলেন—মতিয়ুর রহমান, আবু বকর, শাহ মোস্তাফিজুর রহমান, নুরুল হক, সৈয়দ মোস্তফা জামাল প্রমুখ। পরে তাদের অনেকেই বাঙলা কলেজের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেছেন।

১৯৬১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত সভায় প্রিন্সিপাল কাসেমের উত্থাপিত নিচের প্রস্তাবটি আলোচনার পর সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়। ‘বাঙলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অবিলম্বে ঢাকায় একটি বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হোক।’

বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হওয়ার পর কলেজের জন্য সর্বপ্রথম একটি বাড়ি জোগাড় করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। প্রিন্সিপাল কাসেম সরকারের জিম্মায় রয়েছে এমন একটি পরিত্যক্ত বাড়ি খোঁজার জন্য উঠেপড়ে লেগে যান। কারণ সরকারের কাছে কলেজের জন্য একটি বাড়ি বরাদ্দের আবেদন করা হলে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হয়, এরূপ একটি বাড়ির সন্ধান জানানোর জন্য।

দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও বাড়ি না পাওয়ার পর নিরুপায় হয়ে নবকুমার স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমার বিশিষ্ট বন্ধু আবদুল মান্নানের শরণাপন্ন হন। তার কাছে নবকুমার স্কুল ভবনে নৈশ কলেজ হিসেবে বাঙলা কলেজ চালু করার প্রস্তাব দেন। তিনি অনেক চেষ্টা করে স্কুল পরিচালনা কমিটিকে এ প্রস্তাব গ্রহণে সম্মত করান।’ উল্লেখ্য, আবদুল মান্নান পুরান ঢাকার অত্যন্ত বৈরী পরিবেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলার সপক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। পুরান ঢাকার জনগণের মধ্যে সামাজিক কাজের মাধ্যমে বাংলা ভাষাবিরোধী মনোভাব দূর করার জন্য তাকে আহ্বায়ক করে ‘ঢাকা মজলিস’ নামে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানও গঠন করা হয়েছিল।

এভাবে ১৯৬২ সালের মধ্যভাগে কলেজের সব আয়োজন সম্পন্ন করে অক্টোবরে বহু প্রতীক্ষিত বাঙলা কলেজের ক্লাস শুরু করা হয়। প্রথমে শুরু হয়েছিল বিজ্ঞানসহ উচ্চ মাধ্যমিক কয়েকটি বিষয়। পরে কমার্স বিভাগও খোলা হয়। এর পরের বছর রাষ্ট্রনীতি, বাংলা, অর্থনীতি ও ইসলামী ইতিহাস পড়ানোর ব্যবস্থা করে ডিগ্রি ক্লাস খোলা হয়। বাংলা মাধ্যমে ডিগ্রি পাস করে বাংলা মাধ্যমে এমএ পড়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বা অন্য কোথাও ব্যবস্থা ছিল না বলে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ প্রমুখ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের সহযোগিতায় বহু চেষ্টা করে বাঙলা কলেজে প্রথমে বাংলা, রাষ্ট্রনীতি ও ইসলামী ইতিহাস বিষয়ে এমএ খোলার অনুমতি নেয়ার ব্যবস্থা করেন।

কলেজের আসবাবপত্রের অভাব পূরণের জন্য ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এক ছেলে এবং প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী ও অনুরাগীরা কিছু চেয়ার, টেবিল ও আলমারি জোগাড় করে দিয়েছিলেন। নবকুমার স্কুল ভবনে অফিস করার মতো স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রিন্সিপাল কাসেম তার ১৯ নং আজিমপুরের বাসভবনের আসবাবপত্র, টেলিফোন ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাদিসহ একটি কক্ষ কলেজের অফিস কক্ষ হিসেবে ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দেন।

এমএ ক্লাসের জন্য ডক্টর শহীদুল্লাহকে কিছুদিনের জন্য অবৈতনিকভাবে ক্লাস নেয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হলে তিনি সম্মত হন। এ সময়ে কলেজে আরো যারা অধ্যাপনা করেছিলেন তারা হলেন ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ, ডক্টর হাসান জামান, অধ্যাপক শাহেদ আলী, অধ্যাপক আশরাফ ফারুকী, অধ্যাপক হেদায়েতুল ইসলাম খান, অধ্যাপক (পরে ডক্টর) মতিয়ুর রহমান, অধ্যাপক আখতারুজ্জামান, অধ্যাপক আনোয়ারুল হক খান মজলিস এবং আরো অনেকে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও বোর্ডের অনুমোদন

বাঙলা কলেজের কাজ শুরু করার পর বিশ্ববিদ্যালয় ও বোর্ডের অনুমোদন পাওয়ার ব্যাপারে বহু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। এফিলিয়েশন না পেলে ছাত্র-ছাত্রীরা ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারবে না, ফলে কলেজ অচল হয়ে পড়বে, এমন আশঙ্কাও দেখা দেয়। এ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম বলেন, ‘বহুদিন ধরে বোর্ড অফিসে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোটাছুটি করতে হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও সংগ্রামের পর উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি অনুমোদন পাওয়া গেলেও এমএ ক্লাসের অনুমোদন দিতে বিশ্ববিদ্যালয় অস্বীকার করে। এমএ ক্লাসের অনুমোদন না পাওয়া ও এমএ ক্লাসে পড়ার সুযোগ না থাকলে তাদের উচ্চ শিক্ষা লাভ করাই অসম্ভব হয়ে পড়বে—এ অনিশ্চিত অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাই শেষ পর্যন্ত অনুমোদনের অভাবে আমাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও এমএ ক্লাস বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।’

বাঙলা কলেজের নিজস্ব জমি ও ভবনের ব্যবস্থা

নিজস্ব জমি ও ভবনের অভাবে বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার সময় থেকে প্রায় সাত বছর নবকুমার স্কুল ভবনে নৈশ কলেজ হিসেবে চালু ছিল। স্কুলটি ডক্টর শহীদুল্লাহ কলেজ নামে পরিচিত হওয়ার প্রস্তাব উত্থাপিত হলে বাঙলা কলেজকে তা ছেড়ে দিতে হয়। এ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে। প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম বলেন: ‘বাঙলা কলেজ ও বাঙলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উপযুক্ত জায়গা একোয়ার করে দেয়ার জন্য আমরা সরকারের কাছে আবেদন করি। অনেক চেষ্টার পরও মূল ঢাকা শহরে কোনো জায়গা না পাওয়া যাওয়ায় আমি তখনকার মীরপুরের জঙ্গলপূর্ণ একটি পতিত জায়গা পছন্দ করি। আর সেই জায়গা একোয়ার করে দেয়ার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই। দুই বছর ধরে অনেক সাধ্য-সাধনা ও চেষ্টার পর তখনকার সময়ের কয়েকজন বাঙালি অফিসারের ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও সেই পাকিস্তানি আমলে সরকারের ঊর্ধ্বতন কমিটি কর্তৃক একোয়ারের প্রস্তাব পাস করাতে সমর্থ হই।’

‘এ খবর জানাজানি হলে এ জমির অন্যতম মালিক (পার্শ্ববর্তী বিপুল জায়গার মালিক) পশু বিভাগের এক পদস্থ অফিসার এর বিরুদ্ধে প্রবল বাধার সৃষ্টি করেন। অফিসার মহোদয় সর্বপ্রথম আমাকে আমার আজিমপুরের বাসায় এসে অনুরোধ-উপরোধ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এ জমির একোয়ার ছেড়ে দেয়ার জন্য প্রবল চাপ দেন। তাতে রাজি না হলে আমার জীবননাশেরও ভয় দেখানো হয়। আলামত ভালো নয় দেখে নিরাপত্তার জন্য আমাকে মীরপুর থানায় অভিযোগ পেশ করতে হয়েছিল। এরপর ওই ব্যক্তি একোয়ারের বিরুদ্ধে একটা মোকদ্দমা দায়ের করেন। এ মোকদ্দমায় হেরে গেলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটা আপিল মোকদ্দমা দায়ের করেন। সৌভাগ্যবশত সেখানেও তিনি হেরে যান। দীর্ঘকাল পরেও কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রথম ভাগে নানা কাজে বাধা দিতে এ অফিসার কোনো সময় কার্পণ্য করেননি।’

১৯৬৪ সালের দিকে কলেজের জন্য ওই জায়গা (প্রায় ১২ একর) আয়ত্ত করা হয়। এ সময় জমির মূল্য পরিশোধ ও তাতে বাড়ি তৈরির ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে শিক্ষা বিভাগের তখনকার ডিরেক্টর শ্রদ্ধেয় মুরব্বি ফেরদাউস খানের শরণাপন্ন হন আবুল কাসেম। প্রধানত তারই পরামর্শে ও চেষ্টায় বাঙলা কলেজ সরকারের উন্নয়ন স্কিমভুক্ত হয়। এ বাবদ কলেজের নামে কয়েক লাখ টাকা মঞ্জুর হয়। সেই টাকা দিয়ে কিস্তিতে জমির মূল্য শোধ, আর কলেজের ডিগ্রি সেকশনের আংশিক ল্যাবরেটরিসহ মূল দালান ও হোটেলের একাংশের দোতলা তৈরির কাজ শেষ করা হয়।

বলাবাহুল্য, কলেজকে বাঙলা বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার উদ্দেশ্যে সরকারের কাছে দেয়া মূল পরিকল্পনায় ১ কোটি টাকার উপরে একটি স্কিম দেয়া হয়েছিল। এ উদ্দেশ্যে একোয়ার করা জমির পাশে আরো প্রায় ১৮ পাখি জমি আর্থিক অনটনের মধ্যেও আবুল কাসেমকে ক্রয় করতে হয়। কলেজের দালান তৈরি আংশিকভাবে সম্পন্ন হলে ১৯৬৯ সালে ওই দালানে দিনের বিভাগ উদ্বোধন করে বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ক্লাস শুরু হয়।

বাঙলা কলেজের সাফল্য

কলেজের সাফল্য সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম বলেন: ‘১৯৬৪ সাল থেকে বাঙলা কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ফাইনাল পরীক্ষা দিতে আরম্ভ করে। তখন পর্যন্ত আমরা নবকুমার স্কুলে নৈশ কলেজ হিসেবে লেখাপড়া করাচ্ছি। সেই সময়েও কয়েক বছর আমাদের কলেজের পরীক্ষা পাসের হার ছিল শতকরা ৬০ ভাগ থেকে ৮৫ ভাগ। এভাবে আমরা হাতে-কলমে দেখাতে সমর্থ হই যে, মাতৃভাষার মাধ্যমে লেখাপড়া হলে ছেলেমেয়েরা সহজে ও ভালোভাবে পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ সময় এই কলেজের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া যাতে ভালো হয় সেজন্য অধ্যাপকদের রুটিন করে দিয়ে শিক্ষার্থীদের বাসায় পাঠিয়ে তাদের লেখাপড়ার অসুবিধা ও অগ্রগতি সম্পর্কে লিখিত রিপোর্ট নিতাম। তারই ভিত্তিতে ছাত্র-ছাত্রীদের সঠিক সাহায্য করা হতো। কোনো শিক্ষার্থী গরহাজির থাকলে তার কারণ অনুসন্ধান করা হতো। তিনদিনের বেশি গরহাজির থাকলে তার লিখিত কৈফিয়ত নেয়া হতো। অভিভাবকদের কাছে সেজন্যে চিঠি লেখা হতো, এমনকি কৈফিয়ত সন্তোষজনক না হলে জরিমানা করার ব্যবস্থাও ছিল। এসব তদারক, ঘনিষ্ঠতা ও কড়াকড়ির ফলে কলেজের লেখাপড়া ও শৃঙ্খলার মান হয়ে উঠেছিল অনেক উন্নত।’

আগেই বলেছি, প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ ও ড. শহীদুল্লাহ বাঙলা কলেজ স্থাপনে ও পরিচালনায় সার্বক্ষণিক সহযোগিতা দিতে কার্পণ্য করেননি। তাছাড়া কলেজের বিভিন্ন কাজে কলেজের তখনকার অধ্যাপক, অধ্যাপিকা ও ছাত্র-ছাত্রীরা নানাভাবে আন্তরিক সহযোগিতা দিয়েছিলেন।

বাঙলা কলেজের শুরু থেকে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এর সভাপতি এবং প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁকে সেক্রেটারি নির্বাচিত করা হয়েছিল। খান বাহাদুর আবদুর রহমান খাঁ (প্রাক্তন এডিপিআই ও জগন্নাথ কলেজের প্রিন্সিপাল) সহসভাপতি ও প্রাক্তন ডিপিআই আবদুল হাকিম ট্রেজারার হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীকালে হাকিম সাহেবের অসুস্থতার জন্য ন্যাশনাল ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাহমুদ ট্রেজারার মনোনীত হন। বহু বছর পর মারাত্মক অসুস্থতার কারণে ড. শহীদুল্লাহর অবসর গ্রহণের পর সাবেক মন্ত্রী মফিজুদ্দিন আহমদ কিছুদিন এ কলেজের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

একাডেমি ও উন্নয়ন বোর্ড কেউ সাহায্য করেনি

এ কাজ বহু সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ বলে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম বাংলা একাডেমি ও বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বারবার আবেদন করেন। তারা যেন এ কাজে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। উন্নয়ন বোর্ড হতে প্রথমে তারা কোনো উত্তরই পাননি। পরে এর পরিচালক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন: উন্নয়ন বোর্ড ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের কোনো বই প্রণয়ন করবেন না। আর বাংলা একাডেমির ডিরেক্টর জানান, তারা ইন্টারমিডিয়েট বা ডিগ্রি ক্লাসের কোনো পাঠ্যবই প্রণয়ন ও প্রকাশে হাত দেবেন না।

এখানে একটা কথা উল্লেখ করা দরকার যে, প্রায় ছয় বছর আগে উচ্চ মাধ্যমিক ক্লাসের জন্য লিখিত পদার্থবিজ্ঞান, জৈব রসায়ন ও রসায়নের কয়েকটি পাণ্ডুলিপি বাংলা একাডেমির কাছে প্রকাশের জন্য পেশ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের তিনজন প্রধান অধ্যাপক (হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট) একাডেমির অনুরোধে পরীক্ষা করে বইগুলোর প্রশংসা করেন এবং প্রকাশের জন্য বাংলা একাডেমির কাছে সুপারিশ করেন। দুঃখের বিষয়, একাডেমির কাউন্সিলে বইগুলো প্রকাশের প্রস্তাব পাস হওয়া সত্ত্বেও একাডেমি কর্তৃপক্ষ বইগুলো প্রকাশ না করে দীর্ঘকাল চেপে রাখেন। বহু হাঁটাহাঁটি, তদবির এবং অনুরোধেও যখন ফল হলো না, তখন বাধ্য হয়ে বইগুলো ফেরত নিয়ে আসেন আবুল কাসেম এবং বহু কষ্টে একটি প্রকাশকের মাধ্যমে সেগুলো প্রকাশ করা হয়। বলা দরকার, এ বই না হলে তত্কালে বিজ্ঞান ক্লাস খোলা সম্ভব হতো না। আবুল কাসেমের রচিত বই পড়ে শত শত ছাত্র বিজ্ঞান পরীক্ষা দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। এদিকে ডিগ্রি ক্লাসের বইয়ের অভাবে কলেজের ছাত্রেরা ভীষণ অসুবিধায় পড়ে এবং তাড়াতাড়ি বই প্রণয়ন ও প্রকাশের জন্য চাপ দিতে থাকে। শুধু বাঙলা কলেজের ছাত্ররাই নয়, প্রদেশের বিভিন্ন স্থান হতেও কয়েকশ ছাত্র বাংলার মাধ্যমে ডিগ্রি পরীক্ষা দিতে প্রস্তুতি নেয় এবং বইয়ের জন্য বহু চিঠি লিখতে থাকে। একাডেমি ও উন্নয়ন বোর্ডের কাছে নিরাশ হয়ে আবুল কাসেম বাঙলা কলেজের অধ্যাপকদের তাদের ভাষণ লিখে সাইক্লোস্টাইল কপি ছাত্রদের বিলি করার নির্দেশ দেন। সেই সাইক্লোস্টাইল কপি পরে সম্পাদন করে বই আকারে ছাপানোর ব্যবস্থা করা হয়। কোনো কোনো ক্লাসে বইয়ের এক একটি ফরমা দিয়েও ছাত্রদের বইয়ের অভাব দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ড. মাহমুদ হোসেন উপাচার্য থাকার সময় উচ্চতর শ্রেণীর বাংলা পাঠ্যবই রচনা ও প্রকাশের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আবুল কাসেমকে অনুরোধ করেছিলেন। গবেষণা বই ছাড়া অন্য কোনো পাঠ্যবই ছাপানোর কোনো ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মাবলিতে নেই বলে তিনি তা পারেননি।

এভাবে সবার কাছে নিরাশ হয়ে নানা আর্থিক দুরবস্থায় ভুগে কয়েকটি বই রচনা ও প্রকাশের ব্যবস্থা করে বাংলার মাধ্যমে পড়ুয়া ছাত্রদের অভাব দূর করার চেষ্টা করা হয়। বলা বাহুল্য, বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার পর প্রদেশের বিভিন্ন কলেজের বহু অধ্যাপক বাংলায় বই লিখে প্রকাশ করেছেন ও করছেন।

প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম এভাবেই নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বাঙলা কলেজ ও বাঙলা শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আজ তারই হাত ধরে মিরপুরে গর্বের সঙ্গে কলেজটি দাঁড়িয়ে আছে, যদিও পরবর্তীতে এর সংস্কার ও উন্নয়নের কাজ খুব একটা হয়নি বলে চলে। তিনি বাঙলা কলেজকে এতটাই ভালোবেসেন যে মৃত্যুর পরও তার ইচ্ছা অনুযায়ী কলেজ প্রাঙ্গণে তাকে সমাহিত করা হয়। এখনো তিনি সেখানেই আছেন।

 

মাহমুদ বিন কাসেম: প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের পুত্র ও প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক