আমার আব্বা প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে ধার্মিক মানুষ। এতটা সহজ-সরল এবং চিন্তাচেতনা ও কাজে এতটাই সাদৃস্যপূর্ণ ছিলেন যে তার তুলনা বিরল। যেকোনো ধরনের সমস্যাও অত্যন্ত সহজভাবে সমাধান করার আর্শ্চয ক্ষমতা ছিল তার। ছোটবেলায় পাটিগণিতের কঠিন অংকগুলো এমন সহজভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে সেটা আর ভোলার সাধ্য ছিল না। তার সেই কৌশল ব্যবহার করে অন্যান্য সমস্যাও সুন্দরভাবে সমাধান করতে শিখেছিলাম। অনেক বিরল গুণের অধিকারী ছিলেন তিনি, যার সবই ছিল গঠনমূলক। কোনো রকম জড়তা ছিল না তার মাঝে। পাছে লোকে কিছু বলে—এ ভাবনাও ছিল না, যা সবার জন্য ভালো মনে করতেন তা-ই করতেন। অর্থ, ক্ষমতা বা খ্যাতির জন্য মোটেই লালায়িত ছিলেন না। জীবনের শুরুর দিকে অর্থকড়ির প্রচণ্ড অভাব ছিল। তা সত্তেও অনেক বড় বড় কাজ করতে সক্ষম হয়েছিলেন তার সহজ-সরল চিন্তা ও সমাধানের আশ্চর্য ক্ষমতার জন্য। কোনো বাধাকেই বড় মনে করতেন না। অদম্য সাহসী ছিলেন তিনি।

সন্ধ্যা ৭টায় আব্বা রাতের খাবার খেতেন। খাবার তৈরি না হলে কখনো বকাবকি করতেন না, যা আছে তা দিয়েই চুপচাপ খেয়ে নিতেন। দুপুরবেলা বড় একটি টেবিলের চারধারে সবাইকে বসিয়ে খাবার খেতেন। আমরা যাতে সব ধরনের খাবার খেতে শিখি সেদিকে তার নজর ছিল। তিনি কোনো আদেশ করলে না বলার উপায় ছিল না। তাই সেই ছোটবেলাতেই আমরা সব ধরনের খাবার খেতে শিখেছিলাম—শাকসবজি, সামুদ্রিক মাছ, শুঁটকি ইত্যাদি। অর্থাৎ, বাড়িতে যা রান্না হত সবই, একমাত্র বিট বাদে-যেটা আমরা চুপি চুপি টেবিলের নিচে ফেলে দিতাম। যে খাবারে আসক্তি বা নির্ভরতার সৃষ্টি হয়, সেগুলোর অনুমতি ছিল না বাড়িতে। মেহমান এলে চা দিয়ে কখনই আপ্যায়ন করা হতো না এবং সরলভাবেই তা বলে দিতেন। বাইরের খাবারেরও অনুমতি ছিল না আমাদের। শুধু ঈদের দিন তিনি ফ্লাস্কে করে ভালো মানের আইসক্রিম কিনে আমাদের খাওয়াতেন। মনে আছে, বিয়ের পর প্রথম আমি আমার স্বামীর সঙ্গে বাইরের চটপটি খেয়েছি। তিনি সুন্দর কবিতা বা ছড়া লিখতে পারতেন। ১৯৬৭/৬৮ সালে আব্বা আম্মাকে নিয়ে হজে যান। আমাদের সব ভাই-বোনকে তিনি আলাদা খামে ঈদকার্ড পাঠান। সঙ্গে সবার নামে প্রশংসা করে সুন্দর সুন্দর ছড়া। ছড়া না পাঠালে তার ঈদকার্ড পাঠনোর কথা হয়তো মনেই থাকত না। খুব ব্যস্ত মানুষ ছিলেন তিনি। এত ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের খুব ছোটবেলায় শাড়ির মাঝখানে দড়ি দিয়ে বেঁধে নাচের পোশাক বানিয়ে উল্টাপাল্টা নাচ, রিহারর্সেল ছাড়া এক এক ভাইবোনের তত্ক্ষণাৎ যা মনে আসে বিভিন্ন ভূমিকার নাটকে ধৈর্য ধরে হাসিমুখে বসে থাকা ইত্যাদি আজও মনে পড়ে। ছোটবেলায় মাঝেমধ্যেই ভাই-বোনদের নিয়ে জ্ঞানের আসর বসাতেন। কোনো ভালো কাজে সবসময়ই তিনি প্রশংসা করতেন, উৎসাহ দিতেন ও মাঝে মাঝে পুরস্কৃত করতেন। আমাদের যখন নয়-দশ বছর বয়স তখন থেকেই বুঝে নামাজ পড়ার জন্য তাগিদ দিতেন। সবাই যেন বুঝে নামাজ পড়ে, সেজন্য ‘বুঝে নামাজ পড়’ নামে একটি পুস্তিকা লেখেন, যেখানে উৎসাহ দেয়ার জন্য এবং এটা যে অসম্ভব নয় তা বোঝানোর জন্য আমাদের কথা উল্লেখ করেছেন।

মনে পড়ে রান্নাঘরের সামনে চেয়ারে বসে আমাকে ও আমার পিঠাপিঠি বোনের (ডা. তৌহিদা) মাছ কুটতে শেখানোর কথা। জ্যান্ত কই মাছ (গাজীপুরের পুকুরের) আব্বার ভয়ে কোনো রকমে ধরে বটিতে দেয়ামাত্র সেটি বেঁকে যাওয়ায় ‘ওরে বাবারে’ বলে আমার লাফিয়ে ওঠায় হাসতে হাসতে আব্বার চলে যাওয়া এবং আমাদের রেহাই দেয়া। দর্শনীয় ও শিক্ষণীয় স্থানে তিনি মাঝে মাঝেই আমাদের বেড়াতে নিয়ে যেতেন—চন্দ্রঘোনা পেপার মিল, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ইত্যাদি খুব অল্প বয়সেই আমাদের নিয়ে গেছেন। ভারতেশ্বরী হোমসের ক্লাস ওয়ানে পড়ি তখন। ‘সমুদ্রে গোসল করেছি’ সহপাঠীদের বলায় তারা ‘সমুদ্র খুব গভীর সেখানে তো আমি ডুবে যাব’ বলে হাসাহাসি করেছে, কিন্তু তাদের বোঝানোর মতো ক্ষমতা তখন আমার ছিল না। প্রচণ্ড ঝড়ে একবার ডেমরায় তিনতলা বিল্ডিংয়ের একটি ছাদ উড়ে গিয়েছিল। মহান আল্লাহর বাতাসের শক্তির স্বরূপ দেখানোর জন্য পরদিনই আব্বা আমাদের সেখানে নিয়ে যান। প্রায় প্রতি সপ্তাহে গাজীপুরের বাঙালগাছে (সম্ভবত আব্বার দেয়া নাম) আম্মাসহ আমাদের নিয়ে যেতেন। উদ্দেশ্য জমি দেখাশোনা করা ও বেড়ানো। সেখানে মাঝে মাঝে তার বন্ধুদেরও নিয়ে যেতেন। ভক্সওয়াগন গাড়িতে আমাদের ঠাসাঠাসি করে বসিয়ে নিয়ে যেতেন। খুবই আনন্দের ছিল সেই দিনগুলো। এমনও হয়েছে, গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন, সে সময় হয়তো স্কুল ছুটি হয়নি। তিনি শিক্ষকের কাছে চিঠি লিখতেন তার মেয়েদের যেন আগে ছেড়ে দেয়া হয়। স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষার পর লম্বা সময়ের জন্য দাদাবাড়ি (চট্টগ্রাম), নানাবাড়ি (জামালপুর) এবং বেশির ভাগ সময়ে খালার বাড়ি (জামালপুর) নিয়ে যেতেন।

আমাদের পোশাকের বিষয়েও তার নজর ছিল। একবার বেলবটমের যুগ এল, আমরা বোনেরা ঈদে বেলবটম পাজামা নিলাম, নিচের দিকে হঠাৎ ঢোলা এসব পাজামার। আমাদের এক ভাই আব্বার কাছে অভিযোগ করল, ‘আব্বু, মনি আপা, তৌহিদা আপা ও ঝরনা ঈদের জন্য বেলবটম পাজামা নিয়েছে। আমরা ভয়ে অস্থির। পরদিন ঈদ, এই বুঝি সব বাতিল হয়ে যায়। ভাঁজ করা কাপড়গুলো আব্বার সামনে আনা হলে তিনি উল্টেপাল্টে দেখলেন—কোনো টাইট পোশাক নয়—বললেন ঠিক আছে। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তিনি ভাবতেন বেলবটম মানে টাইট পোশাক। আমাদের ছোটবেলায় তিনি কখনো টিভি দেখেছেন বলে মনে পড়ে না। একদিন টিভিতে ইংরেজি সিরিয়াল দেখছি আমরা, আব্বা সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, টিভিতে একটি স্বাস্থ্যবতী ইংরেজ মহিলা আঁটসাঁট টাইট পোশাক পরে হেঁটে যাচ্ছিল। আব্বা বললেন, ‘মেয়েটি সুন্দর তবে বেলবটম পরায় খারাপ লাগছে।’ পরে আমরা হাসতে হাসতে বাঁচি না।

তার ব্যক্তিত্ব এমন ছিল যে আমরা তার কোনো কথার অবাধ্য হতে পারতাম না। যখন কোনো ব্যাপারে কোনো কিছু জানতে চাইতেন, সত্য কথাটাই বেরিয়ে আসত। কেন জানি মিথ্যা কথা বলতে বা কথা লুকাতে পারতাম না। আম্মার সঙ্গে অভিমান করে কখনো কখনো কয়েক বেলা না খেয়ে থাকতাম এবং মনে মনে দোয়া করতাম আব্বা যেন না জানেন। কারণ যত অভিমানই হোক তিনি যদি বলতেন, ‘ওঠ খেয়ে নে, বড়দের কথার অবাধ্য হতে নেই’—মন্ত্রমুগ্ধের মতো উঠে খেতে হতো এবং তখন আম্মার ওপর রাগ হতো, কেন তিনি আব্বাকে জানালেন! একতলা ও দুইতলায় দুটো বেশ বড় হল ঘর ছিল। দুইতলার হলঘরে অনেক চেয়ার পাতা থাকত। এখানে আব্বা সভা করতেন। অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিও আসতেন। প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর লাঠিতে ফোঁটা ফোঁটা কিছু দাগ ছিল। আমার মেজো ভাই তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘চাচা আপনার লাঠিতে এত দাগ কেন?’ রসিক মানুষ, তাই উত্তর দিয়েছিলেন, ছোটবেলায় লাঠির বসন্ত রোগ হয়েছিল, তাই দাগ হয়েছে। ছোটবোন (কাওসার) খুব ছোটবেলায় মায়াবী ও আদুরে ছিল। কাজের মেয়ে তাকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াত। ডা. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার সঙ্গে দুষ্টামি করায় কে যেন তার নাম দিয়েছিল ‘মিসেস শহীদুল্লাহ’। সেই থেকে কেউ তার নাম জিজ্ঞেস করলে সে জবাব দিত তার নাম ‘মিসেস শহীদুল্লাহ’। সেই ঘরে আব্বা একটি টেবিলের ওপর দেড় ফুট বাই এক ফুট সাইজের ছোট এবং সামনের দিকে ঢালু একটি টেবিল বসিয়ে দাঁড়িয়ে লেখার কাজ করতেন। আব্বা কখনো সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে আমরা দাঁড়িয়ে যেতাম। কারণ এটা দেখতে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম। মনে হতো যেন ঘুমের মধ্যেও দাঁড়িয়ে যাব। অথচ আজকাল প্রায়ই ছেলেমেয়েরা বসে থাকার সময়ে গুরুজন দেখলে উঠে দাঁড়ায় না।

রাত ৯টা বাজলেই আব্বা ঘুমাতে যেতেন। সে সময় হয়তো টেলিভিশনে নাটক চলছে এবং আমরা ভাই-বোনেরা উপভোগ করছি। তিনি টিভি বন্ধ করে দিতেন এবং রুম থেকে আমরা সবাই বের হলে রুমে তালা ঝুলিয়ে দিতেন, যাতে আমরা সবাই তাড়াতাড়ি ঘুমানোর অভ্যাস করি। ছোটবোনের একবার হাত বেশ খানিকটা কেটে গেল সেলাই দরকার। আব্বা আমাদের কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে গেলেন। কাওসার ছিল চুপচাপ, শান্ত প্রকৃতির। সেলাই করার সময় তার নিচু স্বরে কঁকানি শুনে আব্বা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। এর একটু পরে আমিও হঠাৎ দাঁড়ানো অবস্থা থেকে পড়ে যাই। পরে শুনেছিলাম, ডাক্তার সাহেব বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, ‘একজন একজন করে ঢোকে আর ঠাস করে পড়ে যায়।’ স্ট্রেচারের লোহার পায়ার সঙ্গে মাথায় আঘাত পাওয়ায় বহুদিন ব্যথাটি ছিল। ফেরার পথে আব্বা বারবার জিজ্ঞেস করলেন আমার অজ্ঞান হওয়ার কারণ। আমার সত্যিই জানা ছিল না, তাই বললাম ‘জানি না’। এভাবে হঠাৎ অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা আব্বা বেঁচে থাকার সময়ে আর ঘটেনি।

অত্যন্ত দূরদর্শী ছিলেন তিনি। দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়াকালীনই তিনি বলেছিলেন, ‘আমার এই মেয়ে প্রফেসর হবে।’ অথচ সেই সময়ে আমি তা মোটেও হতে চাইতাম না। দূরদর্শী ছিলেন বলেই তিনি পাকিস্তান হওয়ার পর পরই এ দেশের জনগণের কথা ভেবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আমার প্রথম সন্তানকে বাসায় রেখে একটি ওষুধের কোম্পানিতে চাকরি করতাম জেনে আব্বা বলেছিলেন, বাচ্চাকে যেন অফিসে নিয়ে যাই এবং তাকে দুধ থেকে বঞ্চিত না করি। সে সময় কথাটি অদ্ভুত মনে হয়েছিল। কিন্তু কথাটি যে কতটা সুদূরপ্রসারী তা আজ অনুভব করি।

আব্বার বিরুদ্ধে আম্মা কখনই কোনো অভিযোগ করেননি। কিন্তু তার সরলতা নিয়ে হাসির গল্প শোনাতেন। একবার কাদায় আব্বার চশমা পড়ে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গেই হাত দিয়ে তুলে পানিতে একটু ধুয়েই পরে নিলেন। আম্মা দেখেন চশমার কোনায় ময়লা লেগে আছে। কেউ কোনো কথা বললে সহজেই বিশ্বাস করতেন। চাকরির খোঁজে কেউ এলে তাকে তার যোগ্যতা অনুসারে কাজ দিতে চেষ্টা করতেন। যখন বাইরে কোথাও কাজে লাগাতে পারতেন না তখন বলতেন, ‘আমার ছেলেমেয়েদের পড়াও।’ এভাবে একবার আমাদের বেশ কয়েকজন হুজুর ও গৃহশিক্ষক হয়েছিল।

১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে আমি কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে গ্লাসগো যাই। আব্বা খুব খুশি হয়েছিলেন। হঠাৎ করে জানানোয় কিছুটা বিহ্বল দৃষ্টি ছিল তার। সারা জীবন আশা করেছেন আমাদের সার্বিক উন্নতির। বলতেন, তোরা প্রিন্সিপালের সন্তান হয়েও ভালো কিছু করলি না। সে সময় তিনি অনেক অসুস্থ ছিলেন। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করায় খুশি হয়েছিলেন। সভা-সমিতি বা বেড়ানো, যেকোনো জায়গায় আব্বা একা যেতে পছন্দ করতেন না। বিয়ের পর যেকোনো সভা বা সংবর্ধনার দাওয়াত তিনি কার্ডে দিতেন আর খামের ওপর লেখা থাকত ‘অধ্যাপক শেখ নজরুল ইসলাম ও অধ্যাপক মনিরা আহসান’। অথচ আমরা দুজনেই তখন প্রভাষক। একজন প্রভাষক ও একজন অধ্যাপকের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তার মতো জ্ঞানী লোকের অজানা ছিল না। কেন লিখতেন জানি না, তবে আমরা দুজনই তার দেয়া এ সম্মানে আনন্দিতই হতাম। ২০০২ সালে আমরা অধ্যাপক হই, কিন্তু এর ১০ বছর আগেই তিনি ইন্তেকাল করেছেন। কিন্তু দুটি অদ্ভুত ঘটনার ব্যাখ্যা আমার আজও অজানা। একটি হলো আমার পরপর তিনবার অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা। আব্বা যে বেশি দিন আমাদের মাঝে থাকবেন না, সেটা আমি গ্লাসগোয় যাওয়ার সময়েই আশঙ্কা করেছিলাম। লন্ডন থেকে প্রকাশিত পুরনো বাংলা পত্রিকা পড়ে ইঞ্জিনিয়ার শাহজাহান স্যার নজরুলকে জানান, আমার আব্বা আর নেই। ১১ মার্চ ইন্তেকাল করেছেন। ১৭ দিন পর এ কথা শুনে আমি পরপর তিনবার অজ্ঞান হই। অথচ অনেক বেশি আঘাত পেয়েছিলাম নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন আমার ছোটভাইয়ের হঠাৎ ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনায়। তখন অজ্ঞান হইনি। আরেকটি হলো ১১ মার্চ আব্বার ইন্তেকাল করা। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সারা দেশে সফলভাবে ধর্মঘট পালন করা হয়, যার ফলে মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ভাষা আন্দোলনের সব দাবি মেনে নিয়ে চুক্তি করতে বাধ্য হন। এটিই ভাষা আন্দোলনের প্রথম সফলতা।

১৯৪৭ সালে অনেক সংগ্রামের পর ২০০ বছর পর স্বপ্নের স্বাধীনতা পেয়েছে জনগণ। ভারতে হিন্দি রাষ্ট্রভাষা এবং পাকিস্তানে উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা—এটিই সবাই ধরে নিয়েছিল। যারা পাকিস্তান হওয়ার আগে লেখালেখি করেছেন বাংলার পক্ষে, তারাসহ অনেকেই এ দেশের মুসলিম জনসাধারণের সেন্টিমেন্টের বিরুদ্ধে গিয়ে সহসাই উর্দুর বিরুদ্ধে কথা বলার চিন্তা করেননি। কিন্তু উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে তত্কালীন পাকিস্তান সরকার তড়িঘড়ি করে বেশকিছু মারাত্মক পদক্ষেপ নিয়েছিল। আব্বা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের একজন নবীন প্রভাষক। তিনি বুঝলেন, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে এ দেশের জনগণ চাকরি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হবে এবং যা করার দরকার তা প্রথমেই করতে হবে। নতুন এ দেশের মানুষকে ইসলামী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাদের সার্বিক মুক্তির একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা তার ছিল। তাই পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র ১৭ দিন পরই তিনি গঠন করলেন তমদ্দুন মজলিস এবং এর মাধ্যমেই তিনি ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অত্যন্ত সাহসিকতা ও ঝুঁকি নিয়ে তিনি কয়েকটি পদক্ষেপ নেন। ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি একটি পুস্তিকা বের করেন ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা— না উর্দু?’ এতে বাংলার সপক্ষে অতিগুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরেন কাজী মোতাহার হোসেন ও আবুল মনসুর আহমদ। আব্বা লিখলেন, দুটোই হবে রাষ্ট্রভাষা, পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য উর্দু এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বাংলা। কাউকে আধিকারবঞ্চিত করা তার ইচ্ছা নয়। এটিই ছিল সবার মুক্তির জন্য সহজ সমাধান। তিনি বুঝেছিলেন, দুর্বার আন্দোলন গড়ে না তুললে পাকিস্তান সরকারকে টলানো যাবে না, তাই জনমত গড়ে তুলতে হবে। দিনে-রাতে সাইকেল চালিয়ে লোকজনকে বোঝাতে শুরু করলেন। অনেক অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়লেও একবারের জন্যও দমে যাননি। দ্রুত সর্বাত্মক জনমত গঠনের জন্য বের করলেন ‘সৈনিক’ পত্রিকা। অর্থাভাব থাকলেও আন্দোলনের স্বার্থে কয়েকজন নিষ্ঠাবান তরুণকে নিজের বাড়িতে রাখলেন। সে সময় তাদের পান্তাভাত ও মুড়ি দিয়ে আপ্যায়ন করলেও তারা তৃপ্ত থাকতেন এবং কেউ কেউ নিজের ডিগ্রির চিন্তা বাদ দিয়ে এ আন্দোলন সফল করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। মানুষকে প্রভাবিত করার তার অসাধারণ গুণের কারণে এসব সম্ভব হয়েছিল।

আব্বার নেতৃত্ব ও অন্যান্য গুণ ছোটবেলাতেই প্রকাশ পায়। ছোটবেলায় অর্থাভাবের কারণে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময়ে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র ও দশম শ্রেণীতে পড়ার সময়ে দশম শ্রেণীর ছাত্রকে পড়াতেন। সে সময়ে তিনি দেখেছিলেন অংক ও ইংরেজি না জানার কারণে ছাত্ররা অনেক পিছিয়ে আছে। এজন্য তিনি স্বেচ্ছায় তাদের অংক ও ইংরেজি শেখাতেন। যৌতুকের কারণে মেয়েদের বিয়ে ভেঙে যাওয়া কিশোর ও তরুণদের সিগারেটে আসক্ত হওয়া এবং বড়দের দুর্নীত তাকে কষ্ট দিত। এজন্য সে সময়েই কয়েকজন আদর্শ ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে নেশা, দুর্নীতি ও কুসংস্কারবিরোধী (নেদুকুবি) আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি তাদের মাঝে বক্তৃতা দিতেন ও শেখাতেন, বিতর্কের আয়োজন করতেন। নামাজে তাগিদ দিতেন এবং খেলাধুলারও আয়োজন করতেন।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেও তার অবদান কম নয়। চট্টগ্রাম শহরে কলেজে পড়ার সময়ে তিনি বক্তৃতা শেখানোর জন্য বক্তৃতা পরিষদ গঠন করেন এবং ‘তরুণ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সমাজকল্যাণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং গরিব ছেলে-মেয়েদের জন্য প্রতিষ্ঠিত নৈশ বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাসের ব্যবস্থা করেন।

জীবনের প্রতিটি ধাপে তার গঠনমূলক নেতৃত্ব ও প্রতিভার ছাপ রেখে গেছেন। তার চিন্তাচেতনা ও কাজের মধ্যে কোনো অমিল ছিল না। তিনি সবার জন্য যা ভালো মনে করতেন তা করতে এতটুকুও দেরি করতেন না। কোনো প্রতিদান বা সুনামের জন্য তিনি লালায়িত ছিলেন না। মনে আছে, একবার টিভিতে ভাষা আন্দোলন উপলক্ষে আলোচনা চলছে। ১৯৮০ সালের আগে টিভি তেমন দেখতেন না। কেউ বলায় হয়তো সেদিন দেখেছেন। তার এক সহকর্মী নিজের সব কৃতিত্বের কাহিনী বললেন, কিন্তু একবারও আব্বার নাম উচ্চারণ করলেন না। বিনয়ী ছিলেন আব্বা, তাই অনুষ্ঠান শেষে আব্বা ফোন করে তার প্রশংসা করলেন, কিন্তু তার সহকর্মী অত্যন্ত লজ্জা পেলেন এবং বললেন, ‘আপনার কথা বলতে আমি একদম ভুলে গিয়েছিলাম। আব্বা বললেন, না না ঠিক আছে।’ এমন ছিলেন বলেই হয়তো ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া সত্ত্বেও তিনি উপেক্ষিত। ভাষা আন্দোলনের কথা উঠলে সবাই আজ বায়ন্নর ভাষা আন্দোলনের কথা বলেন। কিন্তু ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের চুক্তি ভঙ্গের কারণেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন হয়েছিল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে আমাদের রক্ত ঝরার পরও সরকারকে টলানো যায়নি। আব্বা নিয়মতান্ত্রিকভাবেই হয়তো এগোতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তান সরকার যাতে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়, সেজন্যই তিনি ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মনোনয়ন নেন এবং আইন পরিষদের সদস্য হন। সেখানে তিনি ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ও শিক্ষর মাধ্যম করার প্রস্তাব দেন, যা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় এবং ১৯৫৬ সালে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়’। বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেল। উচ্চতর শ্রেণীতে বাংলা যে একটি মাধ্যম হতে পারে তা বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য তিনি অতিপরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠা করেন বাঙলা কলেজ এবং বাংলায় বিজ্ঞানের বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক লেখায় মন দেন। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নসহ গণিতের বেশকিছু পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। বাংলায় পদার্থবিজ্ঞানের বই (উচ্চ মাধ্যমিক পদার্থিকা) লেখার জন্য তিনি রাইটার্স গিল্ড পুরস্কার লাভ করেন। বাংলা ভাষাকে সহজ করার জন্য তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ নেন এবং আমৃত্যু কাজ করেছেন।

প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম স্মারক গ্রন্থে অধ্যাপক শাহেদ আলী লিখেছেন, ‘তাকে পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য একেএম আহসান বলেছেন, কাসেমের মতো অমন মেধাবী লোকের সাক্ষাৎ জীবনে আমি পাইনি। এ মেধাবী, প্রতিভাবান লোকটি তার নিজ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান সাধনায় নিয়োজিত থাকলে জাতিকে দিতে পারতেন মহামূল্য অবদান। অধ্যাপক ও পণ্ডিত হিসেবে উঠতে পারতেন খ্যাতির শিখরে।’ হয়তো তিনি সেই শিখরের জন্য লালায়িত ছিলেন না। জাতির প্রয়োজনের স্বার্থেই তিনি হেঁটেছেন অন্য এক দুর্গম পথে।

 

ড. মনিরা আহসান: অধ্যাপক, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের কন্যা