১৯৪৬ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক, ১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলনের জনক সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা, ১৯৫৪-৫৮ সালে যুক্তফ্রন্টের বোয়ালখালী চট্টগ্রামের পটিয়া-চন্দনাইশ থেকে পার্লামেন্ট সদস্য, ১৯৬২ সালে মিরপুর বাঙলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনার মহান পুরুষ প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ১৯২০ সালের ২৮ জুন চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ থানার ছেবন্দী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উপরে উল্লেখিত অবদানের সঙ্গে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের সব শাখার শিক্ষা বিস্তারে তিনি যে অপরিসীম অবদান রেখে গেছেন সে সম্পর্কে আধুনিক প্রজন্মের অনেকেই আমরা তেমন অবগত নই।

প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ছিলেন বিজ্ঞানের ছাত্র। এ মেধাবী-প্রতিভাবান লোকটি তার নিজ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান সাধনায় নিয়োজিত থাকলে জাতিকে দিতে পারতেন মহামূল্য অবদান।

তিনি সেদিকে গেলেন না। তিনি মাথায় নিয়েছিলেন ভিন্নতর দায়িত্ব। তিনি বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। যার হওয়ার কথা ছিল শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, তাকেই হতে হলো বাংলা ভাষা রক্ষার সেনাপতি। পাকিস্তান জন্মের ১৫ দিন পর ভাষা আন্দোলনের জনক সংগঠন তমদ্দুন মজলিস গঠন করা হয়।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রেডিও পাকিস্তানের বাংলা অনুষ্ঠানে অদ্ভুত উর্দু ও ফারসি ভাষার ব্যবহার শুরু হয় রেলের টিকিটে বাংলা নেই, ডাকটিকিটে বাংলা নেই, ঢাকায় বাংলা নেই, আছে কেবল ইংরেজি ও উর্দু। আপাত দৃষ্টিতে, অনেকের কাছেই এসব ছিল তুচ্ছ ও গুরুত্ব পাওয়ার অযোগ্য। কিন্তু আবুল কাসেমের অতিমাত্রায় সেনসিটিভ হূদয়ে এসব তুচ্ছ ব্যাপারই ভবিষ্যৎ বিপদের বহুমাত্রিক ডাইমেনশন নিয়ে প্রতিভাত হয়। এ বিপদের পদধ্বনি তাকে বিপদ মোকাবেলার  জন্য সক্রিয় করে তোলে। পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় স্থান পেয়েছে আটটি ভাষা কিন্তু পাকিস্তানের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলা স্থান পায়নি। প্রচণ্ড প্রতিরোধে ফেটে পড়লেন আবুল কাসেম। পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু অংশের মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থান পাবে না, এ অবস্থাকে স্বীকার করে নেয়া আত্মহত্যার শামিল। এ আত্মহত্যা থেকে জাতিকে বাঁচানোর জন্যই এক দুঃসাহসিক প্রশ্ন তুলে ধরেন আবুল কাসেম। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু? এ প্রবন্ধ লিখে পদার্থ বিজ্ঞানের আবুল কাসেম তৈরি করলেন পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অ্যাটম বোমা। এভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাসেম ১৯৪৭-৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্ব দান করেছেন। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরেই পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জন্ম নিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বলা যায়, বুদ্ধিবৃত্তি ও মেধার দিক দিয়ে প্রিন্সপাল আবুল কাসেমই প্রকৃত পক্ষে এ রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা।

আবুল কাসেম তার এ স্বপ্নের দেশের বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা বাংলায় সম্প্রসারণের জন্য নিজের ব্যক্তিগত সুখ-শান্তি ও আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে মোহাবিষ্টের মতো কাজ করেছেন তার যৌবনে, মধ্য ও শেষ বয়সে। বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার করতে তিনি যে শ্রম দিয়েছেন, সেটা বর্তমান প্রজন্মের কাছে হয়তো অজানাই বয়ে গেছে।

বাংলার মাধ্যমেই এদেশের সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন শিক্ষাদান করা হচ্ছে। অগণিত লেখক লিখেছেন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পাঠ্যপুস্তক বাংলা ভাষায়। আজকের এ অবস্থান থেকে পেছনের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এদেশে বাংলায়ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বাংলায় লেখাপড়ার সূচনাপর্বে প্রধান পথিকৃতের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ। আর তিনি হচ্ছেন প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম।

আসুন জেনে নিই বাংলায় বিজ্ঞান শিক্ষার সূচনাপর্বে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের ভূমিকা। আবুল কাসেম তরুণ বয়সে বাংলা ভাষার চর্চা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেতন ছিলেন বলে ভাষা আন্দোলনের পূর্বলগ্ন থেকেই এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। নিজের মধ্যেই বাংলা ভাষায় শিক্ষা, বিশেষ করে বাংলা ভাষাকে বিজ্ঞান শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারে সচেষ্ট হন। এ সচেতনতা প্রথম প্রকাশ পায় (১৯৪৬-৫৩) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিদ্যায় অধ্যাপনা করার সময়। তিনি পদার্থ বিদ্যার মতো বিষয়কে বাংলা ভাষার মাধমে অধ্যাপনা শুরু করেন। একজন নবীন অধ্যাপকের পক্ষে ১৯৪৬ সালে বাংলায় অধ্যাপনা ছিল একটা সুঃসাহসিক কাজ। আজিমপুরের নিজ বাসায় সাইক্লোস্টাইল মেশিনে পদার্থ বিদ্যায় লিখে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিদ্যা বিভাগে ছাত্রদের বিলি করে দিতেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সংসদ নির্বাচনে বাংলা ভাষা সমর্থক দলগুরো নিরংকুশ বিজয় লাভ করে। প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য থাকা অবস্থায় প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম বাংলাকে সরকারি-অফিসারদের ভাষা ও শিক্ষার বাহন করার দাবিতে প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং তা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয় এবং সংবিধানে গৃহীত হয়। বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠান করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তিনি ‘বাংলা একাডেমির’ মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। বিজ্ঞানের সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলাকে ব্যবহার ও বই রচনার সময় পরিভাষা বা বাংলায় নতুন শব্দ তৈরি করে বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম প্রায় হাজার খানেক পরিভাষা প্রণয়ন করে তার রচিত বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে ব্যবহার করেছেন। সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনে এসব পরিভাষা বর্তমানে বাংলায় বিজ্ঞান শিক্ষায় নিঃসন্দেহে বিশেষ অবদান রাখছে। নিচে তার প্রবর্তিত পরিভাষার সংক্ষিপ্ত একটি তালিকা দেয়া হলো:

(ক) Vibgyor-বেনীআসহকলা

বেগুনি, নীল, আকাশি, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল এ সাতটি শব্দকে প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এ সাত রঙের ‘বেনীআসহকলা’ শব্দটি প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম সর্বপ্রথম আজিমপুরের নিজ বাসায় অবস্থিত ‘আমাদের বিজ্ঞান প্রেস’ থেকে প্রকাশিত সপ্তম-অষ্টম শ্রেণীর ‘বিজ্ঞান প্রকাশ’ বইয়ে ব্যবহার করেছিলেন। ৪০ দশকের শেষ ভাগে পরবর্তী সময়ে প্রায় সব লেখকই শব্দটিকে তাদের পাঠ্যবইয়ের আলোর অধ্যায়ে অনুসরণ করেছেন।

উল্লেখ্য, রসায়ন, প্রাণিবিদ্যা ও জীববিদ্যার বইয়ের শব্দের পরিভাষা তৈরিতে তিনি বিশেষভাবে অবদান রেখেছেন। তিনি ১৯৫৮-৬৪ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমির নির্ধারিত কাউন্সিলর ছিলেন। প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা ও কাউন্সিলর থাকাকালীন বানান সংস্কার ও শব্দের পরিভাষা তৈরিতে ‘উপরে উল্লেখিত’ বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

বিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ের সংকট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনাকালেই প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম বিশেষভাবে অনুভব করেন। এ উপলব্ধি থেকেই তিনি পঞ্চাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা জীবনে সর্বপ্রথম ইংরেজিতে উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি ক্লাসের পদার্থ বিজ্ঞানের পাঠ্যবই লিখেছিলেন। এ বই ছাত্র ও শিক্ষকমহলে বেশ সমাদৃত ও প্রশংসিত হয়। এরপর তিনি বাংলায় উচ্চ মাধ্যমিক পদার্থিকা (পদার্থ বিজ্ঞান) বইটি লেখেন। পাকিস্তান আমলে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের লিখিত ‘মাধ্যমিক পর্দাথিকা’ পূর্ব পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ড পুরস্কার লাভ করে।

বাংলায় পাঠ্যবই প্রকাশের জন্য তিনি ‘কামরুল আহসান অ্যান্ড ব্রাদাস’ নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও ‘আমাদের বিজ্ঞান প্রেম’ নামে ৩২-২ আজিমপুরের নিজ বাসার নিচতলায় ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর উল্লেখিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজের লেখা বিজ্ঞান ও অংকের পাঠ্যবইগুলো প্রকাশ করতে শুরু করেন। ষাটের দশকে তার রচিত এ ধরনের প্রায় ৩০টি বই প্রকাশিত হয়। এ বইগুলো বাংলা মাধ্যমে বিজ্ঞান শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে অপরিসীম অবদান রাখে ও উদ্দীপনা সঞ্চার করে।

বইয়ের তালিকা প্রকাশ

উল্লেখ্য, মিরপুর বাঙলা কলেজের মাধ্যমে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও সহকর্মীদের চেষ্টায় উচ্চ মাধ্যমিক ক্লাসে বিজ্ঞানের বই বাংলায় পড়ানোর ব্যবস্থা চালু হলে তার বাংলায় লিখিত পাঠ্যবই সারা দেশের ও ঢাকার অনেক কলেজে পাঠ্য হয়।

প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম তিনি একমাত্র ব্যক্তি, যিনি বাংলাকে ছেড়ে যাননি। ঢাকা বিদ্যালয়ের পদার্থ বিদ্যার শিক্ষক হিসেবে পদার্থ বিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয় বাংলায় শিক্ষা দিয়েছেন। ১৯৪৮ ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্ব থেকেই শুরু করে ১৯৫২ বিজয় পর্ব পর্যন্ত সক্রিয় থেকেছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর অনেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু প্রিন্সিপাল কাসেম বাংলাকে ছেড়ে যাননি। ১৯৫৪-৫৮ সালে যুক্তফ্রন্টের পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে বাংলার পক্ষে কাজ করেছেন। বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৬২-৮১ পর্যন্ত মিরপুর বাঙলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল হিসেবে কর্মরত থেকে বিজ্ঞানের সব শাখার শিক্ষা বাংলার মাধ্যমে প্রদানের পথকে সুগম করেছেন। আজকের এ অবস্থান থেকে পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে, এদেশে বিজ্ঞান শিক্ষার সূচনাপর্বে প্রধান পথিকৃতের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ। আর তিনি হচ্ছেন প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম।

প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম রচিত বইগুলোর একটি তালিকা নিচে দেয়া হলো:

পাঠ্যবই শ্রেণী প্রকাশ

১) উচ্চ মাধ্যমিক পদার্থিকা (১ম ভাগ), একাদশ, ১৯৬৪-৭৪ (রাইটার্স গিল্ড পুরস্কার প্রাপ্ত)। ২) উচ্চ মাধ্যমিক পদার্থিকা (২য় ভাগ),      দ্বাদশ ১৯৬৪-৭৪। ৩) উচ্চ মাধ্যমিক রসায়ন (১ম ভাগ), একাদশ, ১৯৬৪। ৪) উচ্চ মাধ্যমিক রসায়ন, (২য় ভাগ) দ্বাদশ, ১৯৬৪।  ৫) লেবরেটরি পদার্থিকা (১ম ও ২য় ভাগ স্বতন্ত্র), একাদশ ও দ্বাদশ, ১৯৬৪-৭৪। ৬) সহজ পদার্থিকা টিউটর (১ম ভাগ), একাদশ, ১৯৬৪-৭৫। ৭। New Physics             (১ম ও ২য় ভাগ স্বতন্ত্র), একাদশ ও দ্বাদশ, ১৯৬৪-৭৫। ৮) জৈব রসায়ন, দ্বাদশ, ১৯৬৪-৭৪। ৯) লেবরেটরি রসায়ন (১ম ও ২য় ভাগ স্বতন্ত্র), একাদশ ও দ্বাদশ। ১০) উচ্চ মাধ্যমিক অ্যালজেবরা, একাদশ (আবুল কাসেম ও রমজান আলী যৌথভাবে লিখেছেন) ১১) মাধ্যমিক ত্রিকোণমিতি, ১৯৬৪-৭২। ১২) উচ্চ মাধ্যমিক ত্রিকোণমিতি, একাদশ, ১৯৬৪-৭২। ১৩) উচ্চ মাধ্যমিক ডিনামিকস, দ্বাদশ, ১৯৬৮-৭৪। ১৪) উচ্চ মাধ্যমিক স্ট্যাটিস্টিকস, একাদশ, ১৯৬৭-৭৪। ১৫) উচ্চ মাধ্যমিক ক্যালকুলাস, দ্বাদশ, ১৯৬৬-৭৪। ১৬)  লগ তালিকা: চার অংকের, ১৯৬৩-৭৮। ১৭) লগ তালিকা: পাঁচ অংকের। ১৮) Degree Physics (General Properties of Mattor Abul Quasem, Prof. Quasem Ali, Syed Mozaffar Hossain & Others। ১৯) ডিগ্রি পদার্থিকা, ১৯৭১। ২০) বিজ্ঞান প্রকাশ, (৭ম, ৮ম, ৯ম), ১৯৫৫-৫৯, ১৯৫৫-৫৯, ১৯৬০-৭৩। ২১) লেবরেটরি, দ্বাদশ। ২২) সহজ পদার্থিকা (১ম ভাগ), একাদশ। ২৩) সহজ পদার্থিকা (২য় ভাগ), দ্বাদশ। ২৪) লেবরেটরি পদার্থ বিজ্ঞান, ৯ম। ২৫) লেবরেটরি রসায়ন, ৯ম। ২৬) আধুনিক কারবার পদ্ধতি ও পত্রালাপ: এএমএফ ফজলুল হক (সম্পাদনা: আবুল কাসেম)। ২৭) ইসলামের তমুদ্দুনিক ইতিহাস। ২৮) রাষ্ট্রবিজ্ঞান। ২৯) পাকিস্তানের অর্থনীতি। ৩০) সহজ বাংলা (সম্পাদনা)। ৩১) লগ তালিকা (ছয় অংকের)। ৩২) লেবরেটরি পদার্থ বিজ্ঞান, ১০ম। ৩৩) লেবরেটরি রসায়ন, ১০ম। ৩৪) বিজ্ঞান প্রকাশ, ১০ম। ৩৫) ফিজিকস টিউটর (১ম ও ২য় ভাগ), ১৯৭৪। ৩৬) অংক টিউটর। ৩৭) ডিগ্রি রসায়ন (পাণ্ডুুলিপি)। ৩৮) লেবরেটরি জীববিজ্ঞান (১ম ও ২য় ভাগ) রচনায় আবুল কাসেম সাহেব সাহায্য করেছেন, লেখক অধ্যাপক আবদুর রব ও অধ্যাপক হাবিবুর রহমান। ৩৯) উচ্চ মাধ্যমিক জ্যামিতি: রচনা ও সম্পাদনায় আবুল কাসেম। সহযোগিতায় অধ্যাপক আবুল খায়ের। ৪০) উচ্চ মাধ্যমিক স্ট্যাটিস্টিকস রচনা ও সম্পাদনায় আবুল কাসেম, সহযোগিতায় অধ্যাপক আবুল খায়ের ও অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামান।

বাংলা ভাষা ও বানান সংস্কার সম্পর্কে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের অভিমত হচ্ছে, বাংলাদেশের জনসাধারণ যেসব শব্দ ব্যবহার করে, আমি সেসব সহজ শব্দ আমার লেখায় ব্যবহার করতে আগ্রহী। দুর্বোধ্য সংস্কৃত বা অন্য কোনো ভাষার দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহারে আমি অপারগ। আবশ্যকতা বোধে সহজ ও সুন্দর হলে আমি সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, ইংরেজি সব ভাষার শব্দ ব্যবহার করতে ইচ্ছুক। আমার মতে, শব্দ যে ভাষারই হোক বাংলাদেশের বোধগম্য ও ব্যবহূত সব শব্দই বাংলার শব্দ। তবে এসব শব্দের রূপই আমি পছন্দ করি—মূল ভাষার বানান ও উচ্চারণ আমি পছন্দ করি না।

‘পরিভাষায়ও আমি উদারপন্থী। সহজ-সরল বা সুন্দর শব্দ ব্যবহার করি। সহজ-সুন্দর হলে ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার শব্দ রাখতে আমার আপত্তি নেই। এ নীতি অনুসরণ করে আমি আমার রচিত বাংলা ভাষার জ্যামিতি অ্যালজেবরা, ত্রিকোণমিতি, পদার্থিকা ও রসায়নে আমি বহু সহজ শব্দ ব্যবহার করেছি এবং কয়েকশ নতুন শব্দ তৈরি করেছি। বলাবাহুল্য, উচ্চতর শ্রেণীর এসব বাংলা বইয়ের আমিই এখানে সর্বপ্রথম লেখক। এজন্য আমি স্থিতিস্থাপক elasticity-এর পরিবর্তে স্থিতিয়তা তৈরি করেছি। এ রূপে স্থিতিস্থাপক গুণাংকের (Modulus of Elasticity) স্থলে করেছি স্থিতিয়াংক। পদার্থবিজ্ঞান না লিখে আমি শুধু পদার্থিকা লিখতে চাই। বানানে আমি আর্থিক ঠিক রাখতে রাজি, কিন্তু রাসায়নিক পারমাণবিককে রসায়নিক ও পরমাণবিক দেখতে চাই।’

বাংলা ও ইংরেজিতে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম লিখিত ও সম্পাদিত এ পর্যন্ত যেসব বই বের হয়েছে, তা সবই সহজ ও সাবলীল ভাষায় রচিত। বইগুলো তিনি নিজে, তমদ্দুন মজলিস কিংবা কামরুল আহসান ও ভাইয়েরা কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত বইগুলোর নাম: একুশ দফার রূপায়ণ (শিক্ষা, অর্থনীতি ও সমাজনীতিবিষয়ক বই ১৯৫৫), আধুনিক চিন্তাধারা (বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, সাহিত্য ও দর্শন, ২য় সংস্করণ ১৯৬৪, ৩য় সংস্করণ ১৯৭৫), সংগঠন (১ম সংস্করণ ১৯৫২, ২য় সংস্করণ ১৯৬৪), মুক্তি কোন পথে (রাজনীতি, ১ম সংস্করণ ১৯৫২, ২য় সংস্করণ ১৯৫৩), প্রেষণা (মেনিফেস্টো, ১ম সংস্করণ ১৯৫২, ২য় সংস্করণ ১৯৫২, ৩য় সংস্করণ ১৯৫৪, ইংরেজি সংস্করণ ১৯৫৮), ইসলাম কী দিয়েছিল ও ইসলাম কী দিতে পারে (রোজের গারোদির লেখার তরজমাসহ অধ্যাপক আবুল কাসেমের বক্তব্য—প্রথম প্রকাশ, জুন ১৯৫২), পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা (১৯৪৭), একমাত্র পথ (সমাজতত্ত্ব ও দর্শন ১৯৪৯, ২য় সংস্করণ ১৯৬৭), বিবর্তনবাদ, সৃষ্টিতত্ত্ব ও আল্লাহর অস্তিত্ব (১৯৫২), দুইটি প্রশ্ন (সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি ১৯৫৫), শ্রেণী সংগ্রাম (থিসিস-সমাজতত্ত্ব ১৯৫৩), শাসনতান্ত্রিক মূলনীতি (১৯৫৩, ইংরেজি সংস্করণ, ১৯৫৩), ইসলামী রাষ্ট্রনীতি (১৯৬৭, ২য় সংস্করণ ১৯৭৩), বিজ্ঞান বস্তুবাদ ও আল্লাহর অস্তিত্ব (১৯৬৯, ২য় সংস্করণ ১৯৭৫), কোরানিক অর্থনীতি (১৯৭১, ২য় সংস্করণ ১৯৭৫), আমাদের ভাষার রূপ (৩য় সংস্করণ, ১৯৬৮), ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস (১৯৫২, ৩য় সংস্করণ ১৯৭৯), বুঝো নামাজ পড় (১৯৬৯)।

 

ডা. শেখ আব্দুর রাজ্জাক: সাবেক অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিভাগ), জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট
ও হাসপাতাল