প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম আমাদের জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে একজন বিরল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তমদ্দুন মজলিসের মাধ্যমে তিনিই ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেন। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর তার উদ্যোগে এবং নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনের জনক-সংগঠন ‘পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস’ গঠিত হয়। ’৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিসংবলিত প্রথম পুস্তিকা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা— না উর্দু?’ প্রকাশ করেন।

সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরী (আমি যখন সাংবাদিক ছিলাম) লিখেছেন, ’১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা— না উর্দু?’  শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে তমদ্দুন মজলিস। ওইদিন বিকালেই অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্রাবাস নূপুর ভিলায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও উর্দু করা হোক’ শীর্ষক এক ঘরোয়া সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সভাপতিত্বে সেমিনারে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ, কবি জসীম উদ্দীন, অধ্যাপক কাজী আকরাম হোসেন, অধ্যাপক শামসুল হক, শাহেদ আলী।’

 ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা— না উর্দু?’

সব প্রতিকূলতা ও সমালোচনা উপেক্ষা করে অধ্যাপক আবুল কাসেম তমদ্দুন মজলিসের কর্মী, সমর্থক ও সহকারীদের নিয়ে এগিয়ে গেছেন। তার উদ্যোগে ও সম্পাদনায় ’৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিসংবলিত ভাষা আন্দোলনের আলোড়ন সৃষ্টিকারী প্রথম পুস্তিকা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা— না উর্দু?’ এ ঐতিহাসিক পুস্তিকা তমদ্দুন মজলিস কর্তৃক বংশালের বলিয়াদী প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত ও ১৯, আজিমপুর থেকে প্রকাশিত হয়।

এ পুস্তিকায় তিনজনের লেখা সন্নিবেশিত ছিল। এরা হলেন অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, তত্কালীন ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ এবং অধ্যাপক আবুল কাসেম। ওই বইয়ে সন্নিবেশিত প্রবন্ধগুলোয় যথার্থ যুক্তির দ্বারা প্রমাণ করা হয়, বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হওয়ার উপযুক্ত। বইটির মুখবন্ধে অধ্যাপক আবুল কাসেমের যে প্রস্তাবনা সন্নিবেশিত ছিল, তাতে বলা হয়:

প্রস্তাব

১. বাংলা ভাষাই হবে—

ক. পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন;

খ. পূর্ব পাকিস্তানের আদালতের ভাষা;

গ. পূর্ব পাকিস্তানের অফিসাদির ভাষা।

২. পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা হবে দুটি—বাংলা ও উর্দু।

৩. ক. বাংলাই হবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা বিভাগের প্রথম ভাষা। পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ১০০ জনই এ ভাষা শিক্ষা করবেন।

খ. পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু হবে দ্বিতীয় ভাষা বা আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা, যারা পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে চাকরি ইত্যাদি কাজে নিযুক্ত হবেন, শুধু তারাই এ ভাষা শিক্ষা করবেন। এটি পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৫ থেকে ১০ জন শিক্ষা করলেও চলবে। মাধ্যমিক স্কুলের উচ্চতর শ্রেণীতে এ ভাষা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিক্ষা দেয়া যাবে।

গ. ইংরেজি হবে পাকিস্তানের তৃতীয় ভাষা বা আন্তর্জাতিক ভাষা। পাকিস্তানের কর্মচারী হিসেবে যারা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চাকরি করবেন বা যারা উচ্চতর বিজ্ঞানশিক্ষায় নিয়োজিত হবেন, তারাই শুধু ইংরেজি শিক্ষা করবেন। তাদের সংখ্যা পূর্ব পাকিস্তানে হাজারে একজনের চেয়ে বেশি হবে না। ঠিক এ নীতি হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলোয় (স্থানীয় ভাষার দাবি না উঠলে) উর্দু প্রথম ভাষা, বাংলা দ্বিতীয় ভাষা আর ইংরেজি তৃতীয় ভাষার স্থান অধিকার করবে।

৪. শাসনকাজ ও বিজ্ঞানশিক্ষার সুবিধার জন্য আপাতত কয়েক বছরের জন্য ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষাতেই পূর্ব পাকিস্তানের শাসনকাজ চলবে। এরই মধ্যে প্রয়োজনানুযায়ী বাংলা ভাষার সংস্কার করতে হবে।

দেশের শক্তির যাতে অপচয় না হয় এবং যে ভাষা লিখতে, শিখতে ও বলতে পারে, সে ভাষাই হবে রাষ্ট্রভাষা। এ অকাট্য যুক্তিই উপরোক্ত প্রস্তাবের প্রধান ভিত্তি।

আর না হয় ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ যেমন জনগণের মত না নিয়ে বা তাদের সুবিধা-অসুবিধার দিকে লক্ষ না রেখে ইংরেজিকে আমাদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিয়েছিল, শুধু উর্দু কিংবা বাংলাকে সারা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করলে ঠিক সেই সাম্রাজ্যবাদী অযৌক্তিক নীতিরই অনুসরণ করা হবে। অথচ এ অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক প্রচেষ্টাই আজ কোনো কোনো মহলে দেখা দিয়েছে, এটি সত্যিই বড় লজ্জাকর ও দুর্বল মনের অভিব্যক্তি। একে সর্বপ্রকারে বাধা দিতে হবে। এর বিরুদ্ধে বিরাট আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এর সূচনা হিসেবে আমরা কয়েকজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের প্রবন্ধ প্রকাশ করছি এবং সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যেককে এ আন্দোলনে যোগ দেয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।

প্রত্যেক স্কুল-কলেজ ও প্রত্যেক শহরে সভা করে অন্যের ভাষাকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাস করে কায়েদে আজম ও অন্যান্য নেতার কাছে পাঠাতে হবে। গণপরিষদে প্রত্যেক সদস্যের কাছে ডেপুটেশনে গিয়ে তারা যেন বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে মত দিয়ে বাঙালির আত্মহত্যার পথ সুগম না করেন তা স্পষ্ট করে বোঝাতে হবে।

কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ প্রত্যেক প্রদেশের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করে নিয়েছেন। এমনকি লাহোর প্রস্তাবেও পাকিস্তানের প্রত্যেক ইউনিটকে তাদের নিজ নিজ প্রাদেশিক রাষ্ট্রভাষা কী হবে তা নির্ধারণ করার স্বাধীনতা দিতে হবে (পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু। 

রাষ্ট্রভাষা বাংলার সুস্পষ্ট দাবিসংবলিত এসব প্রস্তাব নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম সব তত্পরতা ও শক্তি নিয়োজিত করেন। তিনি তমদ্দুন মজলিসের নেতা, কর্মী ও অনুরাগীদের নিয়ে দেশের সর্বত্র মজলিসের শাখা ও ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। ঢাকায় এবং পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন জেলায় ধীরে ধীরে ভাষা আন্দোলনের মানসিক পরিবেশ গড়ে উঠতে থাকে।

তখনকার পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম নিজেই এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘ক্যাম্পাসে তখনকার শ্রেষ্ঠ শিক্ষা কেন্দ্র ‘মুসলিম হল’ ও ‘ফজলুল হক হল’-এও আমরা রাষ্ট্রভাষা বাংলার ব্যাপারে বৈঠক করার চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছি। শুধু তা-ই নয়, আমরা রুমে রুমে গিয়েও ব্যক্তিগত আলোচনা চালিয়েছি। কিন্তু দু-একজন ছাড়া প্রায় ছাত্রই এ বিষয়ে বিরূপ ভাব দেখিয়েছেন। উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলেই বা কী, এ নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছু নেই। এই ছিল তখনকার সাধারণ মনোভাব।’

এ প্রসঙ্গে ড. নুরুল হক ভূঁইয়ার বক্তব্য উল্লেখযোগ্য: ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিই প্রথমে তমদ্দুন মজলিসের প্রধান কর্মসূচি হয়ে দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম সাহেবের কর্মতত্পরতা জাতির কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ রাখা প্রয়োজন।’

‘একেবারে প্রথম দিকে তো রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা হতে পারে, এ ব্যাপারটি অনেকেই বুঝতে চাননি। এর গুরুত্ব অনুভব করেননি। বাংলা ডিপার্টমেন্ট তো রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে চরম নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করে। কোনো বাংলার শিক্ষক এ ব্যাপারে তখন আগ্রহ পোষণ করে এগিয়ে আসেননি। প্রথম দিকে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নটি নিয়ে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে আমাদের রীতিমতো নাজেহাল হতে হয়েছে।...’

‘সম্ভবত ’৪৭-এর অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে যখন মনিঅর্ডার ফরম, ডাকটিকিট এবং মুদ্রায় বাংলাকে বাদ দিয়ে একের পর এক উর্দু ও ইংরেজির ব্যবহার শুরু হলো, তখন আমরা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। সমর্থক কিছু ছাত্র ও তমদ্দুন মজলিসের কর্মী ছাড়া কেউ তখন প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে তত্পর ছিলেন না।’

এমন বিরূপ পরিবেশেও প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম তমদ্দুন মজলিসের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে অব্যাহত সংগ্রামের পথে অটল ছিলেন। ক্ষণিকের জন্যও তিনি উদ্যম হারাননি।

তমদ্দুন মজলিস বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এবং বাইরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে অনুকূল পরিবেশ ও জনমত গঠনের জন্য অব্যাহত কাজ শুরু করে। তমদ্দুন মজলিসের প্রাথমিক কর্মসূচিগুলোর মধ্যে ছিল ক্যাম্পাসসহ বিভিন্ন স্থানে রাষ্ট্রভাষা বাংলার সমর্থনে সাহিত্য সভা ও সেমিনার। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক ও ছাত্ররা অংশগ্রহণ করতেন। তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত লনে ও ফজলুল হক মুসলিম হল মিলনায়তনে সাধারণ ৩সভা ও সাহিত্য সভার আয়োজন হয়েছিল বহুবার। এছাড়া রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য বিবৃতি ও হ্যান্ডবিল প্রকাশ করা হতো।

এ সম্পর্কে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম নিজে বলেন, ‘তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আমরা এর উদ্যোগে ক্যাম্পাসে ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে চেষ্টা করে আসছিলাম। পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূল হলে আমরা বিভিন্ন হলে নিয়মিত আলোচনা ও সাহিত্য সভা অনুষ্ঠান করতে থাকি। এসব সভা রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রশ্নে সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। ১৯৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর ফজলুল হক হলে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে একটা ব্যাপক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করি। এ সভায় সভাপতিত্ব করেন তখনকার মন্ত্রী হাবীবুল্লাহ বাহার, আর বক্তৃতা করেন জসীমউদ্দীন, কাজী মোতাহার হোসেন এবং আরো কয়েকজন মন্ত্রী। এ সভা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে বেশ প্রাণের স্পন্দন জাগিয়েছিল। মন্ত্রীদের মধ্যে তখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে দুটি দলের সৃষ্টি হয়। একটি তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন সাহেব ও হামিদুল হক সাহেবকে কেন্দ্র করে। এরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরোধী ছিলেন। অন্যটি ছিল হাবিবুল্লাহ বাহার ও আফজাল হোসেনসহ আরো কয়েকজন মন্ত্রীকে নিয়ে। ...এরা গোপনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি সমর্থন করতেন। ফজলুল হক হলের সভাতেই প্রথমে আমার বিশেষ অনুরোধে হাবিবুল্লাহ বাহার সাহেব কয়েকজন মন্ত্রীসহ অংশগ্রহণ করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন। তাদের বক্তব্য তখন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আন্দোলন দানা বেঁধে উঠলে রাজনৈতিক কারণে তারা নিশ্চুপ হয়ে যান। অবশ্য পরবর্তীকালে তারা সবাই বাংলা ভাষাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।’

এ সম্পর্কে অধ্যাপক শাহেদ আলী বলেন, ‘ভাষা প্রশ্নটি অধ্যাপক আবুল কাসেম তার দিবারাত্রির স্বপ্ন করে তুলেছিলেন। আমরা ছিলাম তার স্বপ্নের সাথী। আমাদের তখন আর অন্য কোনো ভাবনা ছিল না। ঢাকা হলের (যার বর্তমান নাম শহীদুল্লাহ হল) একটি একতলা দালানের পশ্চিম দিকের বারান্দায় প্রায়ই ভাষাকর্মীদের বৈঠক হতো। পুকুরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ছিল দালানটি। অনেক পোস্টার আমরা এ বারান্দায় এসে লিখেছি।’

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের এসব তত্পরতায় প্রেরণার উৎস ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম। তমদ্দুন মজলিসের মাধ্যমে অথবা ভিন্ন যেকোনো ফোরামের অনুষ্ঠানে তিনি সুযোগ পেলেই রাষ্ট্রভাষার দাবি সোচ্চার কণ্ঠে তুলে ধরতেন। রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত যেকোনো অনুষ্ঠানে, তা ক্যাম্পাসে বা ক্যাম্পাসের বাইরে যেখানেই হোক না কেন, তিনি ছুটে যেতেন।

রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত স্মারকলিপি

রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য অধ্যাপক আবুল কাসেম তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে এ সময়ে স্বাক্ষর অভিযান পরিচালনা করেন। রাষ্ট্রভাষার দাবিসংবলিত স্মারকলিপিতে দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক নেতা ও প্রখ্যাত ব্যক্তিদের স্বাক্ষর নেয়ার জন্য তমদ্দুন মজলিসের নেতাকর্মীরা চেষ্টা চালান। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এ স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানে বেশ সাড়া পাওয়া যায়। এমনকি অনেক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারীও স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন।

এ ধরনের একটি স্মারকলিপি সরকারের কাছে পেশ করা হয় আর তার কপি কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। এ ব্যাপারে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল মরহুম আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিত কলকাতার দৈনিক ইত্তেহাদ ও মরহুম আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক ইনসাফ পত্রিকা। ইনসাফ ঢাকা থেকে প্রকাশিত হতো। সম্ভবত ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর এটা প্রথম প্রকাশিত হয়। ইত্তেহাদের প্রকাশনা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে। সৈনিক তখনো বের হয়নি। বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়ে আরেকটি স্মারকলিপি পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে পেশ করা হয়। এ স্মারকলিপির প্রধান উদ্যোক্তা ও তমদ্দুন মজলিসের সেক্রেটারি হিসেবে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ছিলেন তিন নম্বর স্বাক্ষরকারী। পূর্ব পাকিস্তানের শত শত নাগরিক, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সংগীতজ্ঞ, আইনজীবী, অধ্যাপক, আলেম-ওলামা, ছাত্র, রাজনৈতিক নেতা, ডাক্তার, নারী এ স্মারকপত্রে স্বাক্ষর করেন। পাকিস্তানের বাংলাভাষী মন্ত্রীরাও এ দাবির প্রতি সমর্থন জানান। ’৪৭ সালের ১৮ নভেম্বর দৈনিক আজাদে স্বাক্ষরকারীদের নামসহ স্মারকলিপিটি প্রকাশিত হয়।

’৪৭-এর নভেম্বরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির প্রশ্নটি কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো কাজ করে। পাকিস্তানের তত্কালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের শ্বেতাঙ্গ সচিব গুডইন ১৫ নভেম্বর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে উচ্চতম সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বিষয়াদি সম্পর্কে একটি সার্কুলার পাঠান। এ সার্কুলারে ৩১টি বিষয় দেয়া হয়। এর মধ্যে নয়টি ছিল ভাষা। এর মধ্যে উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি, জার্মান, ফ্রেঞ্চ এমনকি মৃত ভাষা লাতিনও স্থান পায়। কিন্তু স্থান পায় না পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাতৃভাষা বাংলা।

এ সার্কুলারের কঠোর সমালোচনা করে অধ্যাপক আবুল কাসেম কলকাতার দৈনিক ইত্তেহাদে একটি বিবৃতি দেন। ৩০ ডিসেম্বর ওই বিবৃতি এবং এ সম্পর্কে পত্রিকার সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদের লেখা কড়া সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়।

রাষ্ট্রভাষার দাবিতে প্রথম সভা ও মিছিল

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ১১৪ দিনের মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বটতলায়’ অধ্যাপক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদ সভায় মিলিত হন এবং সেখান থেকে প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। এ দিনটি ছিল ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর।

’৪৭ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহটিতে করাচিতে চলছিল শিক্ষা সম্মেলন। সংবাদপত্রে খবর ছাপা হয়: উর্দুই হবে পাকিস্তানের অভিন্ন ভাষা (লিংগুয়াফ্রাংকা)। রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গটি মীমাংসিত হবে পাকিস্তানের সংবিধান সভায় (গণপরিষদ)। এটা ছিল সম্মেলনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।

এ সম্পর্কে ৬ ডিসেম্বরের মর্নিং নিউজে পরস্পরবিরোধী দুটি রিপোর্ট বের হয়। একটি রিপোর্টে বলা হয়, হাবিবুল্লাহ্ বাহার ও আবদুল হামিদ শিক্ষা সম্মেলন থেকে ফিরে ঢাকা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।’ এপিআই পরিবেশিত অন্য এক রিপোর্টে বলা হয়, ‘শিক্ষা সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে উর্দুকে পাকিস্তানের লিংগুয়াফ্রাংকা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। পাকিস্তানের সংবিধানই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নের মীমাংসা করবে।’

৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত মর্নিং নিউজের এ রিপোর্ট ঢাকার ছাত্রদের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। সেদিনই ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা দলে দলে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলায় (বর্তমানের আমতলার অদূরে) এক প্রতিবাদ সভায় মিলিত হয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এটাই প্রথম ছাত্রসভা।

সভার পর প্রতিবাদ মিছিল করে ছাত্ররা সেক্রেটারিয়েটে যান। সেখানে কৃষিমন্ত্রী তাদের দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দেন। তারপর ছাত্ররা নুরুল আমীন ও হামিদুল হক চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। নুরুল আমীন ছাত্রদের কাছে ওয়াদা করেন যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে ব্যর্থ হলে তিনি আর মন্ত্রী থাকবেন না। অবশেষে মিছিলটি খাজা নাজিমুদ্দিনের বাসভবনে যায় এবং ফরিদ আহমদসহ তিনজনের একটি প্রতিনিধি দল নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি উত্থাপন করেন। কিছু বিতর্কের পর নাজিমুদ্দিন লিখিতভাবে আশ্বাস দেন যে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য তিনি চেষ্টা করবেন।

প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ এবং শুধু উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে গণআন্দোলন সৃষ্টির জন্য তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ‘প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। এ সম্পর্কে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম বলেন, “ফজলুল হক হলে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সভার পর ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। পোস্টকার্ড, মনিঅর্ডার ফরম, রেলের টিকিট ও টাকায় বাংলা ব্যবহার না করে ইংরেজি ও উর্দু ব্যবহার, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সিলেবাস হতে বাংলাকে বাদ দেয়া, শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের উর্দুর পক্ষে ওকালতি আমাদের শঙ্কিত করে তোলে। অথচ ছাত্র, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী সমাজের কেউ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি নিয়ে তত্পর নন। এ উদাসীনতার সুযোগে শুধু উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হবে—এই আশঙ্কায় আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। সুতরাং এই একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে গণআন্দোলন সৃষ্টির জন্য তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। তমদ্দুন মজলিসের বিশিষ্ট কর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা সাংস্কৃতিক সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর নুরুল হক ভূঁইয়াকে এ সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হয়।” প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন ও এর আহ্বায়ক নিযুক্তি প্রসঙ্গে ডক্টর নুরুল হক ভূঁইয়া বলেন, “পহেলা অক্টোবর ’৪৭ বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে রেল ক্রসিংয়ের উত্তর প্রান্তে তদানীন্তন পুরাতন ‘সুরুজ-জামাল’ মেসের (পরবর্তী সময়ে রশীদ বিল্ডিং) দোতলার একটি জরাজীর্ণ কোঠায় তমদ্দুন মজলিসের এক ঘরোয়া সভায় ‘প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয় এবং আমাকে আহ্বায়ক ও অধ্যাপক আবুল কাসেমকে ট্রেজারার নিযুক্ত করা হয়।” ‘পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাসেমের মতো মাটির মানুষের নেতৃত্বে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অবাঙালি সমাজসেবী অধ্যাপক রিয়াযত খাঁ ও আমার মতো নিরস রসায়নের অধ্যাপক ও স্বল্পসংখ্যক তমদ্দুন মজলিসকর্মী দিয়ে যে কোনো ইতিহাস সৃষ্টিকারী আন্দোলনের সূচনা হতে পারে তা তখনকার অনেক পণ্ডিতপ্রবর বিশ্বাস করতে পারেননি।’ ‘তমদ্দুন মজলিসের এ ভাষা আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল আপ্রাণ চেষ্টায় এ আন্দোলনের প্রতি দেশের বুদ্ধিজীবী, ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে একে একটি গণআন্দোলনের পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া। কাজেই পরবর্তীকালে যখন আমাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য সফল হলো, তখন মূল কাজের ভার অন্যদের হাতে স্বেচ্ছায় তুলে দিতে আমরা দ্বিধাবোধ করিনি।’

ঐতিহাসিক ১১ মার্চ

‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ’৪৮ সালের ১১ মার্চের আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। সত্যি বলতে কি, ১১ মার্চের আন্দোলন না হলে ’৫২-এর আন্দোলন হতো না। বস্তুত, ’৪৮-এর ১১ মার্চই ছিল আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম সংঘটিত গণবিক্ষোভ।’ ‘এ আন্দোলন তত্কালীন সরকারকে রাষ্ট্রভাষার স্বপক্ষে চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেছিল। অথচ রক্ত দিয়েও ’৫২ সালে সরকারকে টলানো যায়নি। ভাষার দাবি ওঠানোর নৈতিক বল যতটুকু এসেছিল, তা ১১ মার্চের চুক্তির ফলে সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ চুক্তি লঙ্ঘন হয়েছিল বলেই ’৫২ সালের আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। ১১ মার্চ চুক্তি সম্পাদিত না হলে এটি লঙ্ঘনের প্রশ্ন আসত না। ’৫২ সালের আন্দোলন মূলত ২১, ২২, ২৩ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উত্তপ্ত ছিল। এরপর পুলিশ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার এটাকে তছনছ করে দেয়। আজও ভাবার বিষয়, ভাষার দাবি কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’ ১৫ মার্চ আলোচনা বৈঠকে অনেক বিতর্কের পর নাজিমুদ্দিন সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আট দফা ঐতিহাসিক ভাষা চুক্তি সম্পাদিত হয়। বস্তুত ’৪৭ সাল থেকে ভাষা আন্দোলনের প্রায় প্রতিটি ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। তার অনমনীয় প্রতিবাদী ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

মোস্তফা কামাল: ভাষা আন্দোলন বিষয়ক গবেষক