পরিবেশ বিনাশকারী হিসেবে প্লাস্টিক অনেক আগে থেকেই চিহ্নিত। সিএনএন ২০১৬ সালের নভেম্বরে একটি ভিডিও রিপোর্ট প্রকাশ করে, সেখানে দেখা যায়, আমেরিকানদের ছুড়ে ফেলা প্লাস্টিকের কারণে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্যারাডাইজ বলে খ্যাত মিডওয়ে এটল দ্বীপ ‘প্লাস্টিক ট্রাশ’-এর কবরস্থানে রূপান্তরিত হয়েছে এবং বিভিন্ন বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ ও পাখির জীবন অসম্ভব হয়ে উঠেছে। নিত্যদিনের কাজকর্মে প্লাস্টিক ব্যবহারের ভয়াবহতাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে এর বিকল্প দ্রব্যের ব্যবহারের গুরুত্ব প্রচারের ক্ষেত্রে অনেকেই সিএনএনের এই ডকুফিল্মটিকে ইদানীং সূত্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। পরিবেশবান্ধব নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহারে উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সমগ্র বাংলায় তথা সিলেট অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ বেত-বাঁশ-মুর্তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এটি শুধু ঐতিহ্য হিসেবেই থাকেনি, বরং কারিগরদের মুন্সিয়ানা ও নান্দনিকতা এ খাতকে করে তুলেছিল এ অঞ্চলের এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মক্ষেত্র। বেত-বাঁশের বিকল্প হিসেবে আধুনিকতার আশীর্বাদ হয়ে আসা স্টিল-প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার প্রাকৃতিক পরিবেশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার পাশাপাশি তৈরি করেছে বেত-বাঁশ শিল্পের কাঁচামাল সংকট। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’-এর বহুল চর্চা, নব্যউদারনৈতিক বাজার ব্যবস্থা ও ভোগ্যপণ্যে ঐতিহ্যকে লালনের ট্রেন্ড নতুন করে যখন সবুজ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে, তখন বেত-বাঁশ শিল্প আবার আলোচনার টেবিলে; লক্ষণীয় বিষয় হলো, বেত-বাঁশ শিল্প বলতে ঐতিহাসিকভাবে সিলেটকে চিহ্নিত করলে ও স্থানীয় কর্তাব্যক্তিদের উদাসীনতা ও সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষণের অভাব, অপার সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক এ খাতটির আজ বেহাল দশা এবং একই সঙ্গে তা এখন ‘সিলেটিদের’ কাছ থেকে বেহাত হওয়ার পর্যায়ে পর্যবসিত।
বেত-বাঁশ শিল্প সিলেটি ঐতিহ্যের এক গৌরবময় অধ্যায়
স্থানীয়ভাবে প্রাত্যহিক প্রয়োজন মেটানোর জন্যে প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই পাহাড়ি থেকে শুরু করে সমতলের মানুষ বিশেষ করে, ট্রপিক্যাল ফরেস্ট এলাকার জনগণ বেত-বাঁশ ব্যবহার করে আসছে, এ বিষয়ে বিতর্কের কোনো স্থান নেই। তবে স্থানিক চাহিদা মিটিয়ে ‘বাইরে’ সরবরাহ করে এটিকে একটি অর্থনৈতিক শিল্পের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব সিলেটের বাইরের কারো দাবি করাটা যে কতটা অর্বাচীন, তা ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলেই পরিলক্ষিত হয়। যদিও ইদানীং অনেক লেখালেখিতে হস্ত বা কুটির শিল্প তথা বেত-বাঁশ নিয়ে আলোচনায় রংপুর থেকে শুরু করে নোয়াখালী অঞ্চলের ঐতিহ্য বলে দাবি করা হয় (রশিদ, ২০১৬; জাহাংগীর, ২০১৪; আপা-জাতীয় মহিলা সংস্থা, ২০১৬)। কেউ কেউ এমনও লিখেন, ভারত থেকে এর প্রচলন শুরু হয়ে আমাদের দেশের সিলেটে আসে। আসাম, ত্রিপুরা, কলকাতা থেকে বাঙালিরা প্রশিক্ষণ নিয়ে বেতশিল্পের সূচনা ঘটায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে (রিক্তা, ২০১৫)। তাছাড়া ভারত সরকারও এ শিল্পকে ‘নর্থ-ইস্ট-ইন্ডিয়ান’ একটা আঞ্চলিক শিল্প বলে তাদের ডকুমেন্টগুলোয় উল্লেখ করে থাকে (ইউডিও, ২০১৪)।
বাংলাদেশের বেত-বাঁশের তৈরি আসবাবের সিংহভাগই জোগান দেয় সিলেটের বেত-বাঁশ শিল্প। সিলেটে ১৮৮৫ সালে বেতের তৈরি ফার্নিচার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে বলে অনেকে মনে করলেও (রূপময় বাংলাদেশ, ২০১২; সিলেটের ডাক সম্পাদকীয়, ২০১৬) এর যাত্রা মধ্যযুগ থেকে বলে ঐতিহাসিক দলিলপত্রে প্রমাণিত হয় (ইস্ট পাকিস্তান ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার, ১৯৭০; শিরু, ১৯৯৯)। চা, পাথরের পরে সিলেট যে জন্য ব্যবসায়িকভাবে পরিচিতি পায়, সেটি হচ্ছে বেত-বাঁশ শিল্প। বেত-বাঁশের পাশাপাশি মুর্তা দিয়ে বানানো বিভিন্ন আসবাব বিশেষ করে শীতল পাটি জারবাফ ও গঙ্গাজলী মশারি— এই দুটি পণ্য এমন বিখ্যাত ছিল যে বাদশাহ আওরঙ্গজেবের কাছে স্বয়ং মুর্শিদ কুলি খাঁ নিজে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাছাড়া রানী ভিক্টোরিয়া ও তৎকালীন মুদ্রায় ৪০০ টাকা দিয়ে একটি শীতল পাটি কিনেছিলেন বলে জানা যায়। ১৯০৬ সালের কলকাতা কৃষি মেলায় সিলেটের একজন পাটিশিল্পী স্বর্ণপদক অর্জন করেছিলেন। এমনকি, ১৯৯০ সালের রোম এক্সিভিশনেও সিলেটের শীতল পাটি আলাদা মর্যাদার আসন দখল করে নিয়েছিল। এলেন (১৯০৫) রচিত আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে বেত-বাঁশ শিল্পকে সিলেটের অন্যতম রফতানি খাত হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি ওই শিল্পে সিলেট অঞ্চলের বিশিষ্টতাকে বিশেষভাবে চিত্রায়িত করা হয়। তাই বাংলাদেশের বেত-বাঁশভিত্তিক কটেজ শিল্পের ইতিহাস অনেকটা সিলেটি ঐতিহ্যের এক গৌরবময় অধ্যায়, তা অনায়াসেই দাবি করা যায়।
পরিবেশবান্ধব শিল্প হিসেবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতা ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলের মানুষকে প্রচুর অবসর দিত, তারা সেই সময়কে তাদের নান্দনিক সেন্স দিয়ে কারুশিল্পের এক ভাণ্ডার তৈরি করেছিল, যা এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। বাঁশ ও বেতকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ কারুশিল্পী শ্রেণী/বর্ণের (হিন্দুদের মধ্যে যেমন পাটিয়ারা দাস) উদ্ভব ঘটেছিল। তাদের মননশীল-নান্দনিক কারুকাজ সিলেটকে সেই মধ্যযুগ থেকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়, যার চাহিদা আজকের নব্য বাজার ব্যবস্থায় আরো বিশেষভাবে উপস্থিত। ‘গরিবের কাঠ’ বলে খ্যাত বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ সিলেটের প্রাকৃতিক সম্পদের অন্যতম। সিলেটের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই বাঁশ পাওয়া যায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাথারিয়া, রাজনন্দন, রাজকান্দি বনে রয়েছে বাঁশের বিশাল রিজার্ভ। সিলেটের ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ সংরক্ষিত বনে রয়েছে বাঁশ মহাল (ফরেস্ট ওয়ার্কিং প্লান, ১৯৬৭)। জালি, সুন্দি জালি, গল্লা রঙ্গিজাল্লি, চাকাই ইত্যাদি ধরনের বেত সিলেটে পাওয়া যায়। সিলেটের প্রায় সব নিম্নাঞ্চলে বেত জন্মায়। তবে খাস বনগুলোয় ছিল এগুলোর প্রাধান্য। মুর্তা সাধারণত বন বা বাড়ির ভেজা সাইটগুলোয় জন্মায়। তাছাড়া গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জে রয়েছে মুর্তা মহাল (শিরু, ১৯৯৯)।
অন্যান্য হস্ত শিল্পের তুলনায় একমাত্র বাঁশ, বেত ও পাটি শিল্পই আজো তার প্রভাব মোটামুটি বজায় রাখতে পেরেছে। দৈনন্দিন জীবনে বাঁশ এবং বেতের তৈরি আসবাবের উপকারিতা বলে শেষ করা যাবে না। দোলনা থেকে শুরু করে কবর পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাঁশসামগ্রীর প্রয়োজন যেমন, তেমনি রয়েছে বেতের তৈরি সামগ্রীর গুরুত্ব। একসময় এ শিল্প সাধারণ নিম্ন স্তরের মানুষ, বিশেষ করে ‘ডোম ও চাঁড়ালদের’ মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ক্রমেই নানা বর্ণের মানুষ পেশাটিকে তাদের বৃত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। কিছুদিন আগেও সাধারণ গৃহস্থ ঘরের বেত-বাঁশ-পাটির তৈরি সামগ্রীতে দেখা যেত পশুপাখি, ফুল, লতাপাতার বিচিত্র চিত্রায়ণ আর শিল্পীর মনের কথা বিশেষ করে, আসমান তারা, নয়ন তারা-মসজিদ-তাজমহল-সিলভার লাইন দিয়ে বুনন করা সামগ্রী ছিল খুবই বিখ্যাত। কিছুদিন আগেও মুসল্লা আর বিছানা চাদরের জায়গায় পাটির আধিপত্য ছিল। সিলেটে বিয়ের উপঢৌকন/যৌতুকে নামাজের পাটি, ঘুমানোর পাটি, বসার পাটি অত্যাবশ্যকীয় উপহার ছিল। শৈল্পিক পাটি বুননের দক্ষতা যেকোনো বিবাহযোগ্য মেয়ের বাড়তি গুণ হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু বনের বিনাশ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাস বন দখল/নয়া-আবাস/প্লাস্টিকের দৌরাত্ম্য বেত-বাঁশ-পাটিকেন্দ্রিক শিল্পের কাঁচামালের সরবরাহকে সংকুচিত করার পাশাপাশি এই শিল্পকে করে তুলেছে বিপন্ন। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা আর বন সংরক্ষণ একই সূত্রে গাঁথা। সেজন্যই এসএ মুকুলের (২০০৮) সিলেট শহরের বেত-বাঁশ শিল্পের বাজার ট্রেন্ড নিয়ে গবেষণায় যখন তিনি বলেন, বন সংরক্ষণের সঙ্গে বেত-বাঁশ-পাটি শিল্পের যুক্ততা এই শিল্পকে বিশ্বব্যাপী নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে, তাতে অবাক হই না। ২০১৩ সালে এসএ মুকুল বাঁশকেন্দ্রিক শিল্পের ব্যবসায়িক-আর্থসামাজিক গুরুত্ব দেখাতে গিয়ে বলেন, এটি শুধু লাভজনক ব্যবসাই নয় বরং তা গ্রামীণ কর্মসংস্থানে বিরাট ভূমিকা রেখে চলেছে। বেত-বাঁশ-পাটি শিল্পের বদৌলতে সিলেটের কটেজ শিল্পের ইতিহাস খুবই গৌরবোজ্জ্বল ও ঐতিহ্যময়। সিলেটিদের বেত-বাঁশ-পাটিকেন্দ্রিক ব্যবসার উদাহরণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সেই ১৫ শতক থেকেই পাওয়া যায়। ১৫ শতকে চাইনিজরা সিল্কের বিনিময়ে মসলার পাশাপাশি বেতের মাদুর নিয়ে যেত এমনকি মোগল কোর্টে রেভিনিউয়ের পরিবর্তে মুর্তার তৈরি বিশেষ পাটি পাঠিয়ে দেয়া হতো (শিরু, ১৯৯৯)। ইস্ট পাকিস্তান ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার সূত্রে দেখা যায়, সিলেট শহরেই বেত-বাঁশকেন্দ্রিক ৩৭টি ফ্যাক্টরি রেজিস্টার্ড ছিল, যেখানে ২৬৩ জন কারুশিল্পী কাজ করত। ১৯৮১ সালের জরিপে দেখা যায়, বৃহত্তর সিলেটে পেশাগতভাবে ৭৯৫টি পরিবার বেত শিল্পে ও ১ হাজার ৮৭টি পরিবার বাঁশ শিল্পে জড়িত ছিল। সিলেটের শহরতলি ঘাষুটুলা, শেখঘাট ছাড়া ও ভানুঘাছ, বাহুবল ও চুনারুঘাটেও বেতকেন্দ্রিক কটেজ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছিল। ১৮৮৩ সালে শেখঘাটের বেত কারুশিল্পীরা ইংল্যান্ডের এক প্রদর্শনীতে বাঁশের তৈরি একটি বাড়ি পাঠিয়েছিল, যা অনেক প্রশংসিত হয় (আলম, ১৯৯৯)। রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা লাভ করার ঐতিহাসিক রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেই ১৮৭৬-৭৭ অর্থবছরে ৩ হাজার ৯২৭ টাকা রফতানি আয় হয়েছিল। ১৯০২-০৩ অর্থবছরে ১ লাখ ৪০ হাজার মণ পাটি রফতানি হয়েছিল (আলম, ১৯৯৯)। রফতানি আয়ের ঐতিহাসিক রেকর্ড বর্তমানে এসে যে মলিন হয়ে পড়েছে তা নয়, বিসিকের বিভিন্ন ডকুমেন্টগুলো তা-ই সাক্ষ্য দেয়। বিসিকের মতে এই খাতটি কারুশিল্পের সবচেয়ে বড় উপখাত। ২০১৪-১৫তে সব খাত থেকে ২৪ হাজার ৯৫০.৮৭ কোটি টাকা আয়, যেখানে বেত-বাঁশ-পাটি শিল্প অনেক বড় অংশীদার (বিসিক, ২০১৭)। মুকুল (২০১৩) অবশ্য তার গবেষণায় দেখান যে, বড় আকারের এন্টারপ্রাইজগুলোই লাভজনক ভূমিকায় আর ছোট আকারেরগুলো কোনোমতে টিকে আছে।
দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি সাধনে বেত-বাঁশ-পাটি শিল্পের গুরুত্ব নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এই খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে, কৃষিতে জনসংখ্যার চাপ হ্রাস করতে, জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষা নিশ্চিতকরণে, শহরকেন্দ্রিক মাইগ্রেশন ঠেকাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে। এই শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন মাত্রা সম্প্রসারিত হলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমতে পারে। গ্রামীণ অর্থনীতি যত সচল হবে, আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে বিরাজমান অসমতা ততটাই কমে আসবে। আর এজন্যই অনেকেই দাবি করেন বেত-বাঁশ-পাটি শিল্প তথা কুটির শিল্পই পারে আর্থিক সচ্ছলতা আনয়নে মাইলফলক ভূমিকা রাখতে পারে (সামি, ২০১৭)।
নব্য উদারনৈতিক বাজার ব্যবস্থা ও বেত-বাঁশ শিল্পের বাজারজাতকরণ
স্বাধীনতা-পরবর্তীতে সিলেটে সে রকম বেত-বাঁশ-পাটি শিল্পকেন্দ্রিক কটেজ গড়ে ওঠেনি (মুকুল, ২০১৩)। এমনকি প্রায় ২০ বছর আগে সিলেট মহানগরীর ঘাষুটুলা এলাকায় বিসিকের উদ্যোগে একটি বেতশিল্প গড়ে তোলা হয়, কিন্তু কিছুদিন পরই সেটি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকেই এ শিল্প চলমান রাখতে ভূমিকা রাখছেন (চৌধুরী, ২০১৭)। অথচ বিসিকের ২০১৪ সালের রিপোর্টে রফতানি আয়ের বড় অংশীদার হিসেবে বেত-বাঁশ-পাটি শিল্পকে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বভাবতই প্রশ্ন দেখা দেয়, কারা কীভাবে এই শিল্প পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করছে? এর উত্তর সম্ভবত কিছুটা লুকিয়ে আছে বর্তমান বৈশ্বিক নব্য উদারনৈতিক বাজার ব্যবস্থার মধ্যে আর বাকিটা হয়তো নিহিত আছে স্থানীয় ব্যবস্থাগত উদাসীনতায়।
নব্য উদারনৈতিক বাজার ব্যবস্থায় ট্র্যাডিশনাল বাজারজাতকরণের খুব একটা গুরুত্ব নেই। বর্তমান বাজারে মান-নিয়ন্ত্রণ, ব্র্যান্ডিং, বড় কোম্পানি, বেসরকারি রেজিস্টার্ড সংস্থার মোড়ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সিলেটের ঐতিহ্যগত হাট-বাজারকেন্দ্রিক বেত-বাঁশ-পাটির বেচা-কেনা গণনার বাইরের বিষয়। বেত-বাঁশ-পাটি সিলেটের ঐতিহ্যগত ব্যবসা হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় খাপ খাইয়ে নেয়ার পক্ষে একেবারেই অপ্রস্তুত। সেই সুযোগে দেশীয়-বহুজাতিক সংস্থাগুলোর দৌরাত্ম্য খুব সহজেই চোখে পড়ে। কেয়ার বাংলাদেশের আড়ংকেন্দ্রিক বিপণন ও কারিগর নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্য। কেয়ার শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তাদের রিসার্চ উইংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত নিজেরা করি নিজেদের জন্য (নিজেরা) একটি প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে, সেখানে এমন নিয়ন্ত্রণের পেছনের জ্ঞানকাণ্ডিক যৌক্তিকতা তুলে ধরেছে। ২০০৬ সালের দিকে একটি অ্যাসেসমেন্ট করে দেখায় যে, এনলাইটেনমেন্টের যুগে বাংলার কারুশিল্প তার পিক অবস্থায় ছিল পরে বিগ শিল্পায়ন, নতুন প্রযুক্তি আর বিগ ইনভেস্টমেন্টের ফলে এর সঙ্গে জড়িতরা প্রান্তিক হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় তাদের গবেষণায় এমন চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয় যে, নারীদের অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে সস্তা শ্রমের বিনিময়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের হটিয়ে শহুরে বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন আর তার সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান দিয়ে আরো ইনোভেটিভ করে দিলে শিল্পীরা আর প্রান্তিক থাকবে না এবং তা সম্ভব বিভিন্ন কো-অপারেটিভ সংগঠনের পক্ষে। যেমন— আড়ং, কুমুদিনী, আরণ্য, ফক ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের মতো সংস্থাগুলো। এই সংস্থাগুলোই পারে গরিব চারুশিল্পীদের সংগঠিত করে নতুন বাজার তৈরি করে দিতে (কুমার, ২০০৬)। সেখানে আড়ং বা অন্যান্য সংস্থা যেভাবে (ঘণ্টাপ্রতি ৬-৮ টাকা) এসব কারিগরকে জিম্মি করে তাদের সস্তা শ্রমকে শোষণ করে চলেছে, তা খুব চতুরতার সঙ্গে এড়িয়ে যাওয়া হয়। আড়ংসহ, কারু শিল্প-ফক শিল্প এর বাজারজাত করা যেসব জাতীয়/আন্তর্জাতিক (বে)সরকারি উদ্যোগ (ব্র্যান্ডিং) রয়েছে, সেগুলো নিয়ে ২০০৬ সালে প্রোফাইল তৈরি করে একতা ফেয়ার ট্রেইড ফোরাম। সেখানে দেখা যায়, ২৯টি সংস্থা, যাদের প্রতিটির রফতানি আইটেমের মধ্যে বেত-বাঁশ-পাটিকেন্দ্রিক প্রডাক্ট রয়েছে, তবে এর মধ্যে হিড বাংলাদেশ ও জাহানারা কটেজের মূল পণ্যই বেত-বাঁশ সামগ্রী। আড়ং, হিড বাংলাদেশ ও জাহানারা কটেজ যথাক্রমে ৩ হাজার ৬০০ কারুশিল্পী (৭ শতাংশ রফতানি), ১১ হাজার কারুশিল্পী (৯০ শতাংশ রফতানি) ও ৫৩০ জন কারুশিল্পী (৭৫ শতাংশ রফতানি) নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এগুলোর কোনটিরই মালিকানা সিলেটের কারুশিল্পীদের নয়।
সিলেটে আসা পর্যটকদের আকাশচুম্বী চাহিদা রয়েছে বেত-বাঁশ-পাটিকেন্দ্রিক শিল্পজাত সামগ্রীর। বিশেষ করে বেত ও বাঁশের মোড়া ও শীতল পাটি অন্যতম আকর্ষণ। পরিবেশবান্ধবতা, নান্দনিকতা, সহজ মেইনটেনেন্স ও ঐতিহ্যের ধারণাকে কেন্দ্র করে ঠিকমতো প্রচার বাড়ালে এই পণ্যের প্রতি সব শ্রেণীর গ্রাহকদের আগ্রহ বাড়বে। ১৭ সেপ্টেম্বর জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন, নিউইয়র্কের উদ্যোগে নিউইয়র্ক, আমেরিকায় হয়ে গেল ‘বিশ্ব সিলেট সম্মেলন’ (প্রথম আলো, ২০১৭)। সিলেটের ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করা হলেও সেখানে ছিল না বেত-বাঁশ-পাটি-সংক্রান্ত কোনো বক্তব্য। তবে ‘সিলেটের গৌরব ও অহংকারকে ধারণ করে বিশ্বময় সিলেটের ঐতিহ্যকে ছড়িয়ে দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি’ এই সম্মেলনে উচ্চারিত হয়েছে, তাতে করে ভবিষ্যৎ বিশ্ব সিলেট সম্মেলনগুলোয় বেত-বাঁশ-পাটি-বিষয়ক আলোচনা ও প্রদর্শনী যে সংযুক্ত হবে, তাতে সন্দেহ নেই। আর এমনটি ঘটলে এই শিল্পের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য দরকার পড়বে না কোনো বহুজাতিক সংস্থা বা কোম্পানির প্রয়োজন পুঁজি, উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা। সর্বোপরি সিলেট তথা বাঙালি কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ঐতিহ্যবাহী বেত-বাঁশ-পাটি শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। প্রথমেই উচিত এই শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা, সেজন্য মুর্তা, জালি ও বাঁশের হেবিটেটকে সংরক্ষণের জন্য বন বিভাগের পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উচিত বিশেষ বিশেষ এলাকায় বাঁশ-বেত চাষ শুরু করা। দ্বিতীয়ত. এই শিল্পের কপিরাইট যাতে সিলেটের হাতে থাকে, সেলক্ষ্যে ডব্লিউটিওর গাইডলাইন অনুসরণ করে এই শিল্পকে সিলেটের ‘জিওগ্রাফিক্যাল মারকার’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে নিবন্ধনের বিষয়টি নিশ্চিত করা।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট






