আয়তনে ছোট হলেও বাংলাদেশ প্রাণপ্রাচুর্যে বৈচিত্র্যময়। নদীনির্ভর এ দেশের নদী অববাহিকাই সব। কখনো এ অববাহিকা সমতল, কখনো গড়, কখনো টিলা, কখনো জঙ্গল, কখনো চর, কখনো বরেন্দ্র আবার কখনোবা পাহাড়। এই ছোট্ট দেশেও কত যে বিচিত্র বাস্তুসংস্থান, প্রাণ ও প্রকৃতির কত যে জটিল সম্পর্ক! এই ভিন্ন বাস্তুসংস্থান আর প্রতিবেশগত ভিন্নতাই গড়ে তুলেছে দেশের জীবনযাত্রা, উৎপাদন সম্পর্ক, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি। তবে একেক অভিন্ন ভূগোলে বসবাস করেও জাতিগত ভিন্নতায় বদলেছে উৎপাদন সম্পর্ক ও অর্থনীতির ধরন। বাংলাদেশ বহুজাতি, বহুলিঙ্গ, বহুবর্গ, বহুভাষা, বহুপ্রতিবেশ ও বহুসংস্কৃতির এক বৈচিত্র্যময় দেশ। এ জনপদ ঐতিহাসিকভাবেই নিম্নবর্গের যাপিত জীবনের অর্থনীতির ভেতর দিয়ে মেলে ধরেছে এ ভূগোলের ঐতিহাসিকতা। একক আয়তনে দুনিয়ার বৃহত্তম বাদাবন সুন্দরবনের প্রান্তসীমায় বসবাসকারী বাওয়ালি, জেলে, চুনারি, মৌয়ালদের প্রায় অনেকেই ‘বননির্ভর বনজীবী’। কিন্তু বাঙালি মৌয়াল আর আদিবাসী মুন্ডার সঙ্গে সুন্দরবনের উৎপাদন সম্পর্ক এক নয়। আবার মুন্ডা কি বাঙালি বনজীবী সবাই মিলেই বাদাবনের অর্থনীতি। সুন্দরবনের ভৌগোলিক পরিবেশ যেমন বননির্ভর এক ধরনের জীবিকার উজান উন্মুক্ত করেছে, তেমনি জাতিগত ভিন্নতাও স্থানীয় বননির্ভর অর্থনীতি বিকাশে তৈরি করেছে ভিন্ন গতি। কিন্তু অধিপতি উন্নয়ন অর্থনীতিতে বরাবরই ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। দেশের সব অঞ্চল ও সব মানুষের জন্য প্রায় একই রকম উন্নয়ন পরিকল্পনা চাপিয়ে দেয়া হয়। একটি দেশের সামগ্রিক জীবিকা, উৎপাদন ও অর্থনীতিকে বুঝতে হলে অবশ্যই দেশের ভৌগোলিক ভিন্নতা ও বাস্তুসংস্থানকে বোঝা জরুরি। আবার এ বাস্তুসংস্থানের সঙ্গে জড়িত জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও উৎপাদন ইতিহাসকেও সমান কায়দায় গুরুত্বে রাখা দরকার। চলতি আলাপে আমরা দেশের বৃহত্তম পাহাড়ি অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দক্ষিণের সমুদ্র উপকূলের অর্থনীতিকে দেখার চেষ্টা করব স্থানীয় আদিবাসী জনগণের ঐতিহাসিক উৎপাদন সম্পর্ক বিকাশের ধারা থেকে। পাহাড় ও সমুদ্র উপকূলের বাস্তুসংস্থান কীভাবে আদিবাসী জীবনে প্রতিবেশীয় অর্থনীতির একটা সম্পর্ক তৈরি করেছে, চলতি আলাপের তলটা মূলত এটুকু নিয়েই।

অনুচ্চারিত ‘আদিবাসী অর্থনীতি’
১৬ কোটির মানুষের দেশে ৩০ লাখের জাতিগত পরিচয় বাঙালি নয়। কোচ, হাজং, ডালু, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি, মৈতেই, লালেং, চাকমা, ত্রিপুরা, রাখাইন, মারমা, খাসি, মান্দি, বানাই, খাড়িয়া, মাহালি, লুসাই, বাঙালি, বেদে-মাঙতা, কডা, ঢের, রাজোয়ার, ভীল, ম্রো, পাংখো, বম, মুন্ডা, লেঙাম, সাঁওতাল, ওঁরাও, ভূমিজ, দেশোয়ালি, কর্মকার, হদি, রাজবংশী, ক্ষত্রিয় বর্মণ, চাক, পাহাড়িয়া, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমি, খিয়াং, কন্দ, কোল, কুর্মি, জৈন্তিয়া, মালো, কড়া, মুসহর, রবিদাস, লোহার, মাহাতো, মালপাহাড়িয়া, বড়াইক এ রকম প্রান্তিক জাতির আবাস দেশজুড়ে। এর ভেতর পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খিয়াং, খুমি, চাক, পাংখো, লুসাই, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, আসামি, সাঁওতাল জাতির বাস। কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনার সমুদ্র উপকূলে বাস করছে রাখাইন ও তঞ্চঙ্গ্যা জনগণ। বাংলাদেশে আদিবাসী জনগণের সাংবিধানিক পরিচয় ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ এবং নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী’। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০-এর ২(১) এবং ধারা ১৯-এ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, পাংখোয়া, চাক, খিয়াং, খুমি, লুসাই, কোচ, সাঁওতাল, ডালু, উসাই (উসুই), রাখাইন, মণিপুরি, গারো, হাজং, খাসিয়া, মং, ওঁরাও, পাহাড়ি, মালপাহাড়ি, কোল ও বর্মণসহ মোট ২৭ জনগোষ্ঠীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগের ২৭ জাতির পাশাপাশি কুর্মি মাহাতো, কন্দ, গঞ্জু, গড়াইত, মালো, তুরি, তেলী, পাত্র, বানাই, বাগদী, বেদিয়া, বড়াইক, ভূমিজ, মুসহর, মাহালি, রাজোয়ার, লোহার, শবর, হদি, হো এবং কড়া— এ ২১ জনগোষ্ঠীর নাম তফসিলভুক্ত করার প্রস্তাব দেয়া হয় ২০১৩ সালে। সাংবিধানিক অস্বীকৃতি, ভূমি সংকট ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়গুলো আদিবাসী জীবনে প্রশ্নহীনভাবে একাকার হয়ে অমীমাংসিত থেকে গেছে আজো। কিন্তু তার পরও দেশের নানা প্রান্তে আদিবাসী জনগণ স্থানীয় প্রতিবেশ ও বাস্তুসংস্থানকে আগলে জিইয়ে রেখেছে জীবনের ধারা এবং বিকশিত করে চলেছে জাতীয় অর্থনীতির ময়দান। আদিবাসী সমাজ এখনো মূলত কৃষি ও জুমনির্ভর উৎপাদন অর্থনীতিকে আগলে আছে। স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাথমিক ব্যবহারকারী হিসেবেই আদিবাসীদের জীবিকা। আর এই জীবিকায়নে ভিন্নতা তৈরি হয় ভৌগোলিক ভিন্নতায়। পাহাড়ে বসবাসকারী তঞ্চঙ্গ্যা আর সমুদ্র উপকূলে বসবাসকারী তঞ্চঙ্গ্যাদের উৎপাদন রীতি ও অর্থনীতির প্রকৃতি এক রকম নয়। তবে এখানে মৌলিক দার্শনিক মিলটি হলো, তঞ্চঙ্গ্যারা যেখানেই বসবাস করছে, সেখানকার ভূগোলের সঙ্গেই সম্পর্ক তৈরি করে বিকশিত করে চলেছে জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির খাত।

কোথায় সেই কার্পাস মহল
পাহাড়ের ভূগোল ও জনজীবন গড়ে তুলেছিল ঐতিহ্যবাহী জুম চাষ। আর মিশ্র ফসলের এ চাষের এক প্রধান ফসল ছিল তুলা। পার্বত্য চট্টগ্রাম একসময় দক্ষিণ এশিয়ার তুলার বড় জোগানটাই সরবরাহ করত। আর তাই এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল দুনিয়ার এক বিশাল কার্পাস তুলামহল। এককালে পাহাড়ি জনগণ শস্য বিনিময় করত এবং ১৭১৩ সালে মোগল সাম্রাজ্যের সময় কর হিসেবে চাকমা জনগণ তুলা দিয়ে অন্যান্য পণ্য সংগ্রহের রাষ্ট্রীয় অধিকার পায়। পাহাড়ের এ তুলামহলের প্রথম করপোরেট দখল শুরু হয় ব্রিটিশ উপনিবেশকালে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সারা বাংলার রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা ছিনতাই করার আগ্রাসন পাহাড় অবধি আসে। ব্রিটিশ বেনিয়ারা পাহাড়ের এই লাভজনক তুলামহল দখল করতে চায়। বেশি টাকার বিনিময়ে পাহাড়ের তুলামহলগুলো ব্রিটিশ শাসকরা বাইরের লোকদের কাছে ইজারা দিয়ে দেয়। ইজারাদাররা রাজস্ব আদায়ের নামে শর্ত ভেঙে অনেক বেশি পরিমাণে তুলা কেড়ে নেয় চাকমাদের কাছ থেকে। রাজস্ব আদায়ের নামে ব্রিটিশ বেনিয়াদের এ তুলা সংগ্রহ অনেকটাই লুটতরাজে রূপ নেয়। কষ্ট করে তুলা চাষ করেও চাকমারা ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। চাকমাদের জীবনে শুরু হয় অর্থনৈতিক সংকট। তুলামহল ঘিরে ব্রিটিশ বেনিয়াদের লুটতরাজের বিরুদ্ধে চাকমারা বিদ্রোহ করে। দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এ কার্পাস মহলকে কালে কালে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। অথচ বাংলাদেশেই গড়ে উঠেছে তুলানির্ভর গার্মেন্ট শিল্প। চীন ও ভারতের তুলার বাজার এভাবেই চাঙ্গা থাকছে। এমনকি পাহাড়ি নারীরা পাহাড়ি তুলা থেকে সুতা তৈরি করে নিজেদের গৃহস্থালি যে বয়ন শিল্প চর্চা করতেন, তাও আজ হুমকির মুখে। বিদেশী কৃত্রিম সুতার ওপর আজ চলছে পাহাড়ি আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী বয়ন শিল্প।

দেশের আদিবাসী জনগণের মূল সংখ্যাঘনত্ব পার্বত্য চট্টগ্রাম। পার্বত্য চট্টগ্রাম একসময় দুনিয়ার অন্যতম তুলামহল হিসেবে পরিচিত ছিল। এ অঞ্চলই দুনিয়ার বস্ত্র খাতকে বিকশিত করেছে, যার চলতি বিকাশমান রূপ হিসেবে করপোরেট গার্মেন্ট বাণিজ্য হাজির হয়েছে। কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়, ভাওয়াল ও মধুপুর গড়ও তুলা উৎপাদন অঞ্চল। টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের চুনিয়া গ্রামের মিধন চিরান ছিলেন একজন সফল মান্দি খিল (জুম তুলা) উৎপাদক। ১৩৪০ বাংলায় প্রতি সের জুমতুলা বিক্রি হতো ১২ আনায়। ১৯৫০ সালে শালবনে রাষ্ট্রীয়ভাবে জুম চাষ নিষিদ্ধকরণের ফলে মধুপুর ও ভাওয়াল অঞ্চলে তুলা উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে তুলা উৎপাদন বন্ধ করে আবার সেই ভাওয়াল অঞ্চলেই গাজীপুরে গড়ে তুলা হয় তুলা গবেষণা কেন্দ্র।

পাহাড়ে পয়সা নয়, প্রাণ থাকে
আদিবাসী পাহাড়ি জনগণের কাছে পাহাড় মানে প্রাণের উত্স, কিন্তু বহিরাগত বাঙালিদের কাছে বাণিজ্যিক পণ্য। আদিবাসীরা একেকটা পাহাড়ের কেমন নাম দিচ্ছে, তা থেকেও পাহাড়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটি বোঝা যায়। আর এ সম্পর্ক ঘিরেই গড়ে উঠেছে পাহাড়ের উৎপাদন ও অর্থনীতি। বান্দরবানের রুমা উপজেলার রেমেক্রী-প্রাংসা ইউনিয়নেই বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়গুলোর অবস্থান। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়টির যে নামটি সর্বাধিক পরিচিতি পেয়েছে তাজিংডং নামে, তা মারমা ভাষার শব্দ। মারমা ভাষায় ত-জিং-টং মানে সবুজ পাহাড়, বম এবং মিজো আদিবাসীদের ভাষায় এর নাম চিং চির ময় ক্লাং, বাঙালিরা একবার এর নাম দিয়েছিল ‘বিজয়’। ক্যাক-ক্রো-টং (কেওক্রাডং) পাহাড়টির নামও মারমা ভাষার, মানে হলো পাহাড়ের শীর্ষদেশ। বম ও মিজো ভাষায় এর নাম ক্রেওক্রক্লাং। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর যে তালিকা তৈরি করে, তাতে দেখা যায়— পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি রেঞ্জের ২৯টি পাহাড়ের ভেতর পাঁচটি রেঞ্জের নয়টি পাহাড়ের নামই পাংখোয়া ভাষার। রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার একটি পাহাড়ের নাম থাংনাং। থাংনাং নামের এক পাহাড়ি পোকার নামে পাংখোয়ারা এ পাহাড়ের নাম রেখেছে। রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক উপত্যকার বড় পাহাড়ের নাম সাজেক থলাং, পাংখোয়া ভাষায় এর অর্থ— অপূর্ব সুন্দর পাহাড়। সোয়ান-লু, দুমলুং, লুংজিয়াক, বোয়ারলুই, রালআউ, রাইনখ্যাং, লুলেই, সাইচাল, চিপুই, চাংপাল— এমন নানা নামে স্থানীয় পাহাড়কে পাংখোয়ারা চিহ্নিত করে।

পাহাড়ের ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য দেখেই স্থানীয় আদিবাসীরা পাহাড়ে উৎপাদন করে। এ নিয়ে প্রায় প্রতিটি সমাজেই আছে সামাজিক নানা বিধিনিষেধ। যেমন— চাকমারা ‘নামাচুলগাত’ বৈশিষ্ট্যের পাহাড়ে জুম আবাদ করে না। মানে যে পাহাড়ে গর্ত থাকে এবং বৃষ্টির পানি তলদেশ পর্যন্ত গড়িয়ে পড়ে। দুই পাহাড়ের ভেতর, মানুষের মতো দেখতে বা যে পাহাড়ে বানর ও গুইসাপের মৃতদেহ পাওয়া যায়, সেখানে তারা জুম আবাদ করে না। চাকমা, ত্রিপুরা কি ম্রো সমাজে জুম আবাদের আগে কোনো একটি পাহাড়ে এলাকা নির্বাচন করে সেখানে জুম আবাদ করলে মানুষ ও প্রাণ-প্রকৃতির কোনো ক্ষয়ক্ষতি হবে কিনা, এটি জানতে স্বপ্নে আদেশ চাওয়া হয়। প্রতিটি সমাজই উৎপাদনে যাওয়ার আগে এ রকম সামাজিক পরিবেশগত যাচাইগুলো করে নেয়।

জুম চাষ শব্দটি চাকমা ভাষার, ত্রিপুরারা একে বলে হইক, ম্রোদের ভাষায় ওয়াহ ল্যুপ, মিজোদের ভাষায় লউতুয়া এবং বম ভাষায় ল্যওত্যুয়া। ঐতিহবাহী পদ্ধতিগত জুম-আবাদ মানুষের পুষ্টি ও খাদ্যচাহিদা যেমন মেটায়, তেমনি এটি পাহাড়ের প্রতিবেশ ও পানির উত্সধারা সচল রাখে। কিন্তু বর্তমানে জুমের চাষের জমি, জুমচক্র এবং জুমের চাষ পদ্ধতির ধরন ও ফসলের বৈচিত্র্য কমে গেছে। পাহাড়জুড়ে পাহাড়ি বনভূমির পরিমাণ কমেছে। ছড়া, ঝরনা, ঝিরি, প্রপাতসহ পাহাড়ের পানির উত্স উধাও হয়ে যাচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে পাহাড় দখল ও ব্যবহার হচ্ছে। এলোপাতাড়ি পাহাড় কাটা বন্ধ হচ্ছে না। পাহাড়ি জুমেও এখন উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড নানা বীজ ব্যবহার হচ্ছে। রাসায়নিক পদ্ধতির করপোরেট কৃষির প্রচলন শুরু হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের সমতল উর্বর জমির প্রায় সবটাই যেহেতু কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ফলে ডুবে গেছে, বদলে গেছে পাহাড়ের কৃষি অর্থনীতির ধারা। এখন পাহাড়ের সমতল ও উপত্যকার জমির প্রায়টাই বাঙালিদের দখলে এবং তা প্রতিবেশগত উৎপাদনচর্চার বাইরে। এছাড়া পাহাড়ি অঞ্চলে এককভাবে সেগুন, একাশিয়ার মতো আগ্রাসী গাছের বাগানের ফলে পাহাড়ি ভূমির বৈশিষ্ট্য বদলাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের একটা বড় অংশ জুড়ে বাণিজ্যিক তামাক চাষও এখানকার ভূগোল উপযোগী নয়। এভাবে দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ে কেবল মানুষের অভিবাসন কি উচ্ছেদই ঘটছে না, বরং সামগ্রিকভাবে পাহাড় সবার জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিদারুণভাবে পাহাড় ধসে পড়ছে। এ অবস্থা কোনোভাবেই পাহাড়ের ভৌগোলিক অর্থনীতি বিকাশে সহায়ক নয়।

উপকূলের আদিবাসী অর্থনীতি
কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর রাখাইন আদিবাসীরা সামুদ্রিক শুঁটকি ও নাপ্পি নামের এক ধরনের প্রক্রিয়াজাত শুঁটকি উৎপাদন করে। লবণ উৎপাদনেও জড়িত আছে রাখাইন ও কিছু তঞ্চঙ্গ্যা পরিবার। নাপ্পি ও সামুদ্রিক শুঁটকি জোগান দিয়ে চলেছে উপকূলীয় অঞ্চলের আদিবাসী জনগণ, যার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ দেশের বাইরে মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যে রফতানিও হয়। একক আয়তনে দুনিয়ার সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন থেকে মৌয়াল ও বাওয়ালিদের পাশাপাশি সুন্দরবন অঞ্চলের মুন্ডা ও মাহাতোরাও মধু-মোম-গোলপাতা-গরান সংগ্রহ করেন। সমুদ্র উপকূলের আদিবাসীরা দেশের পর্যটন উন্নয়ন খাতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে কক্সবাজার, পটুয়াখালী অঞ্চলের আদিবাসীরা নিজেদের কুটির শিল্পজাত সামগ্রী উৎপাদনের ভেতর দিয়ে দেশের পর্যটন খাতে এনেছে যুগান্তকারী সাফল্য। কারণ প্রতিটি পর্যটন অঞ্চলেই আদিবাসী হস্তশিল্প এক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়। পাশাপাশি পাহাড় ও উপকূলের আদিবাসী জনগণ দেশকে উপহার দিয়েছে অবিস্মরণীয় তাঁত শিল্প।

পাহাড় কি উপকূল থেকে দেশজুড়ে
আজ পাহাড় কি উপকূলের আদিবাসী জনগণের উৎপাদিত এবং সংগৃহীত নানা কিছু ছড়িয়ে গেছে দেশের নানা প্রান্তে। জাতীয় জীবনে এসবের গুরুত্ব ও চাহিদা সীমাহীন। এসব ফসল, উৎপাদন, তৈজস কি পাহাড়ি বস্তু আজ দেশজুড়ে একটা প্রাকৃতিক পণ্য গ্রহণের নাগরিক অভ্যাসও তৈরি করছে। সুন্দরবনের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকেই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক মধু আহরণ ও সংগ্রহ করা হয়। আর এ মধুর এক ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে, তৈরি হয়েছে অকাঠামোগত বাজার। আবার এমন কিছু বস্তু আছে, যা একেবারেই ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য; যা শুধু পাহাড় নয়, বাংলাদেশের পরিচয় মেলে ধরে। যেমন— বান্দরবানের পাহাড়ি ছড়ার পাথর থেকে ক্র্যকঅ নামের এক বুনো শ্যাওলা সংগৃহীত হয়, যা স্থানীয় আদিবাসীদের চাহিদা মিটিয়ে মসলা হিসেবে মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও বিক্রি করা হয়।

কুঁচিয়া (স্থানীয় ভাষায় কুইচ্যা) প্রায় সব আদিবাসী সমাজেরই এক অন্যতম প্রিয় খাদ্য। আদিবাসীরাই দেশের নানা প্রান্ত থেকে কুঁচিয়া শিকার করে। কেবল আদিবাসী খাদ্যচাহিদা মেটানোই নয়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্যিক চিংড়ি ও কাঁকড়াঘেরেও আজ কুঁচিয়া ব্যবহার হচ্ছে ব্যাপকভাবে। পাশাপাশি দেশ থেকে কুঁচিয়া রফতানিও হচ্ছে বিদেশে। আদিবাসী সমাজে শূকর পালনের পাশাপাশি অনেক আদিবাসী সমাজে বিশেষ জাতের মুরগি, হাঁস, কবুতর, গয়াল, কুকুর লালনপালন করতে দেখা যায়। দেশের প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ও বিকাশে আদিবাসী সমাজের শূকর পালন নীরবে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। আদিবাসী সমাজের মাধ্যমে মাশরুম, বনজ ফল ও সবজি, খরগোশ, কোয়েল চাষ আজ আদিবাসী সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বেকার যুবসমাজের কর্মসংস্থানের নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। প্রায় আদিবাসী সমাজই প্রাকৃতিক ভেষজ চর্চার ধারাকে টিকিয়ে রেখেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অনেক আদিবাসী বৈদ্য ও কবিরাজ আজ নিজ জাতির পাশাপাশি বাঙালিসহ অপরাপর সব জাতির  চিকিৎসাসেবা দিয়ে চলেছেন। আদিবাসী চিকিৎসায় ব্যবহূত ভেষজের মূল জোগানটা আসে স্থানীয় বনভূমি ও পাহাড় থেকে, যা করপোরেট উন্নয়নের মাতবরিতে আজ ক্রমেই বিলীন হতে চলেছে। কুইচ্যার পাশাপাশি কোনো কোনো আদিবাসী অঞ্চলে কাঁকড়া, শামুক, কচ্ছপ, ব্যাঙও অর্থনৈতিক গতিকে চাঙ্গা রেখেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং এ অঞ্চলের আদিবাসী জনগণ আজ দেশের হলুদ, আদা, লেবু, কমলা, বিন্নি ধান, দেশী ভুট্টা, বাঁশ উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখছে। দেশের গুঁড়ো হলুদের একটা গুরুত্বপূর্ণ উত্সস্থল পাহাড়। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগণ এবং এখানকার ভৌগোলিক অর্থনীতিকে বিকশিত করতে হলে প্রথমেই এ অঞ্চল ও আদিবাসী জনগণের জীবনদর্শন বুঝতে হবে। স্থানীয় প্রতিবেশের সঙ্গে আদিবাসী জনগণের সম্পর্ক ও সীমানাকে বুঝতে হবে। তা না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব উন্নয়নই ‘কাপ্তাই বাঁধ’ হয়ে যাবে।

লেখক: গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ