গ্যাস, তেল, ইউরেনিয়াম, পিট কয়লা, লিগনাইট কয়লা, সিলিকন বালি, চুনাপাথরের বিপুল মজুদ; বিছনাকান্দি, জাফলং, মাধবকুণ্ড ও হামহাম জলপ্রপাত, মাধবপুর লেক, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, হাকালুকি হাওড়, টাঙ্গুয়ার হাওড়, বাইক্কা বিলের অপরূপ সৌন্দর্য; চা, মাছ, আগর, রাবারের পর্যাপ্ত উৎপাদনের হিসাব কষতে গেলে মনে হবে যেন সিলেট বিভাগকে প্রকৃতি একটু বেশিই দিয়ে দিয়েছে। সিলেট বিভাগের প্রতি প্রকৃতির সেই বদান্যতার কিছু বর্ণনা না দিলেই নয়।
সিলেট বিভাগের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে মূল্যবান খনিজ সম্পদ। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল ভাণ্ডার, যা সারা দেশের সব গ্যাসক্ষেত্রের ক্রমপুঞ্জিত উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি (৫৬.২৪)। সিলেটে গাসের পরিমাণ এত বেশি যে, অনেক জায়গায় মাটি খুঁড়লেই গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ পাওয়া যায় নলকূপ খননের পর নলকূপ থেকে পানির জায়গায় যখন গ্যাস বের হয়। অনেক পুকুরের মধ্যেও বুদ্বুদ আকারে গ্যাস বের হতে দেখা যায়।
সারা দেশের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, কলকারখানা ও ঘরবাড়িতে সিলেটের গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে, যা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু ১৯৯৭ সালে মৌলভীবাজারের মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও ২০০৫ সালে ছাতকের টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড বিস্ফোরণে গ্যাস, প্রকৃতি ও পরিবেশের অনেক ক্ষতি করেছে। মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় ২৫০ বিলিয়ন ঘনফুট ও টেংরাটিলায় ৩০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে গেছে।
গ্যাস ছাড়াও রয়েছে হরিপুর তেলক্ষেত্রের অপরিশোধিত তেল, যা প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে গ্যাসকূপ থেকে আহরণ করা হয়। তেলসম্পদের মধ্যে আছে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন। হরিপুর তেলক্ষেত্রে উত্তোলনযোগ্য মজুদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ মিলিয়ন ব্যারেল, যদিও এ তেলক্ষেত্রে তেলের মোট মজুদের পরিমাণ প্রায় মিলিয়ন ব্যারেল। কৈলাসটিলা ও ফেঞ্চুগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রে আরো দুটি তেলবাহী শিলাস্তরের সন্ধান পাওয়া গেছে। অর্থনৈতিকভাবে এ দুটি ক্ষেত্র থেকে তেল উৎপাদন লাভজনক হওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে জরিপকাজ পরিচালনা করতে হবে।
বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সিলেট ও মৌলভীবাজারের বেশ কয়েকটি স্থান থেকে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়াসম্পন্ন পাথরে মূল্যবান পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কিছু কিছু পাথরে উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামও রয়েছে, যার ঘনত্ব ৫০০ পিপিএমেরও (পার্টস পার মিলিয়ন) বেশি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী যেসব খনি থেকে বর্তমানে ইউরেনিয়াম উত্তোলন করা হচ্ছে, সেগুলোর অধিকাংশেই এর ঘনত্ব ৩০০ থেকে ১ হাজার পিপিএম। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল উপাদান ইউরেনিয়াম। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে এ মহামূল্যবান ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে হাত দেয়া যেতে পারে।
১০১৬ সালের শুরুর দিকে জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ (জিএসবি) প্রথম হাকালুকি হাওড়ে লিগনাইট কয়লা খনির সন্ধান পায়, যা সাধারণ কয়লার তুলনায় অধিক গুণগত মানের। বাংলাদেশ কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (বিসিএসআরআই) কর্তৃক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গবেষকদের দাবি, ওই কয়লায় শতকরা ১ ভাগেরও নিচে সালফার (সালফার যত কম হবে, পরিবেশের ক্ষতি কম) ও ৩৫ ভাগ পর্যন্ত কার্বন পাওয়া গেছে (কাবর্ন বেশি হলে কয়লা জ্বলে বেশি)। জিএসবির তথ্য অনুযায়ী এ খনিজ সম্পদ মজুদের পরিমাণ প্রায় ২৮২ মিলিয়ন টন (আর্দ্র), যা শুকনা অবস্থায় হবে ১১২ মিলিয়ন টন। এ কয়লার পুরুত্ব ১ থেকে ১১ মিটার। খনির গভীরতা কম হওয়ায় কয়লা উত্তোলনের পর জমিগুলো পুনরায় মত্স্য চাষ বা অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যাবে। সারা বিশ্বে গৃহস্থালি কাজ, তাপ উৎপাদন, ইটভাটায় জ্বালানি এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্যভাবে লিগনাইট কয়লা ব্যবহার প্রচলিত রয়েছে। তাছাড়া মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের হাওড় এলাকায় সম্প্রতি খোঁজ মিলেছে পিট কয়লার। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের পরিবর্তে জ্বালানি হিসেবে এ পিট কয়লা ব্যবহার করা সম্ভব।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি পাথর পাওয়া যায় সিলেটের ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি থেকে। জাফলংয়েও প্রচুর পাথর পাওয়া যায়। কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া পাথর কোয়ারিও পাথর উত্তোলনের জন্য প্রসিদ্ধ। সারা দেশে এসব জায়গা থেকে পাথর সরবরাহ করা হয়, যা দেশের অবকাঠামো নির্মাণে ভূমিকা রাখছে।
সুনামগঞ্জের চুনাপাথর ও খনিজ সম্পদের ওপর ভর করে ব্রিটিশ আমল থেকে সুনামগঞ্জের ছাতকে গড়ে উঠেছে একাধিক সিমেন্ট কারখানাসহ ভারী ও মাঝারি শিল্প-কারখানা। টেকেরঘাটের চুনাপাথরের খনি তো এমনিতেই প্রসিদ্ধ। এখানে রয়েছে উন্নত মানের বালি, নুড়ি পাথর, কলিচুনা, কয়লাসহ বহু খনিজ সম্পদ, অর্থনৈতিক গুরুত্ত্বে যার ভূমিকা অপরিসীম।
সিলেট বিভাগের সব জেলায়ই কমবেশি প্রতি বছর বর্ষার সময় উজান থেকে যখন পানি নেমে আসে, তার সঙ্গে থাকে প্রচুর পরিমাণ পলি, বালি ও পাথর। এজন্য এখানে রয়েছে অসংখ্য জলমহাল, পাথরমহাল ও বালুমহাল। হবিগঞ্জ জেলা সদর ও মাধবপুর উপজেলায় এবং বাহুবলের মধুপুর চা বাগানের আশপাশে বিভিন্ন ছড়াসহ করাঙ্গী নদীতে প্রচুর পরিমাণ খুবই উন্নত মানের বালি পাওয়া গেছে। মৌলভীবাজারে প্রচুর সিলিকন বালি পাওয়া যায়। এ অঞ্চলের স্বচ্ছ বালি কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে জেলায় গড়ে উঠতে পারে কাচ শিল্প।
সিলেট ও মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওড় বাংলাদেশের একটি অন্যতম বৃহৎ মিঠা পানির জলাভূমি। হাকালুকি হাওড় বর্ষাকালে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর এলাকায় পরিণত হয়। বর্ষাকালে হাকালুকি হাওড়ের ২৩৮টি বিল ও ১০টি নদী একীভূত হয়ে রূপ ধারণ করে সাগরের মতো এক বিশাল জলাশয়ের। এ সময় হাকালুকি হাওড়ের বিলের পাড় ও কান্দায় বিদ্যমান জলাভূমিবন পানির নিচে ডুবে গিয়ে সৃষ্টি করে ডুবন্ত বন, যা ব্যবহার হয় মাছের আশ্রয়স্থল হিসেবে। মৌলভীবাজার জেলায় হাকালুকি হাওড়সহ রয়েছে কাউয়াদীঘি, হাইলসহ ছোটবড় ৩০-৩৫টি হাওড়। মিঠা পানির ১৪১ প্রজাতির প্রজাতির ছোটবড় সুস্বাদু মাছ, ১১২ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি, ৩০৫ প্রজাতির দেশী পাখি, নানা প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, গুল্মলতা, নলখাগড়া ইত্যাদিতে ভরপুর হাকালুকি হাওড়।
সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর, মধ্যনগর ও ধর্মপাশা উপজেলার আংশিক নিয়ে গঠিত প্রায় ৯ হাজার ৭২৭ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ২৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ৫২টি বিলের সমন্বয়ের জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওড় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি, যা গাছ, মাছ, পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে খ্যাত। ২০০০ সালে এ হাওড়কে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ রামসার সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। টাঙ্গুয়ার হাওড়ের জীববৈচিত্র্যের মধ্যে অন্যতম হলো প্রায় ৪৭ প্রজাতির জলচর পাখি। এর মধ্যে প্রধান ছিল মরিচা পিয়ংহাঁস; ভুঁতিহাঁস, সাধারণ ভুঁতিহাঁস, কুট, পান্তামুখী, লালচে মাথা ভুঁতিহাঁস, লালশির, নীলশির, বালিহাঁস, পাতিহাঁস, ডুবুরি, লেনজা, পানকৌড়ি প্রভৃতি।
এছাড়া পাকনার হাওড়, হালির হাওড়, নলুয়ার হাওড়, শনির হাওড়, মাটিয়ান হাওড়সহ চার শতাধিক হাওড় রয়েছে। হাওড়গুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে জীবপরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখা, ফসল রক্ষা করা ও মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সিলেটের হাওরবেষ্টিত ভাটি অঞ্চলগুলোয় প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষিকাজে জড়িত। এজন্য এখানকার উদ্বৃত্ত ধান দেশের খাদ্যচাহিদা মেটাতে অবদান রাখে।
শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী হাইল হাওড় প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও জীবন-জীবিকার বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। শ্রীমঙ্গল উপজেলার বৃহদংশ নিয়ে বিস্তৃত হাইল হাওড় পাখি, মত্স্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের অফুরন্ত ভাণ্ডার হিসেবে সুপরিচিত। হাওড়টি বর্ষায় ১৪ হাজার হেক্টর এলাকায় বিস্তৃত হয়ে পড়ে এবং শুকনো মৌসুমে চার হাজার হেক্টর জলাভূমিতে সংকুচিত হয়ে যায়। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলগুলোর অন্যতম হাওড়টি ৯৮ প্রজাতির মাছের আবাসস্থল ও ১৬০ প্রজাতির পাখির বিচরণক্ষেত্র। জীববৈচিত্র্য ও মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর হাইল হাওড়ের বাইক্কা বিল এখন জলজ সম্পদের অমূল্য ভাণ্ডার।
সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার হাওড়গুলো দেশের মত্স্য সম্পদের একটি বড় উত্স। প্রাকৃতিক পরিবেশে দেশী জাতের মাছ উৎপাদনের কারণে এখানকার মাছের চাহিদা সর্বত্র। দেশের পুষ্টিচাহিদা মেটাতে এসব মাছ বিশাল অবদান রাখছে। কিন্তু বিলগুলো শুকিয়ে যাওয়া, পাহাড়ি ঢলে পলি ও বালি এসে নদী ও বিল ভরাট এবং মাছের অভয়ারণ্যগুলো সুরক্ষিত করতে না পারায় মাছ শিকারের ঘটনা বেড়েই চলেছে, বাদ পড়ছে না ডিমওয়ালা মাছও। এজন্য দেশী জাতের মাছ দিন দিন কমে যাচ্ছে। বিলুপ্ত মাছের মধ্যে রয়েছে চিতল, রিটা, বামোস, টাটকিনি, ঘারুয়া, রানী, একথুটি, নাফতানি, বাঘাইড়, চাকা, ঢেলা, বাচা, নাপতেকৈ, বাঁশপাতা, ফলি, রায়েক, ছেপচেলা, কুঁচে, টেংরা, গুজি ও আইড় মাছ। এখানে উন্নত প্রযুক্তিতে মত্স্য প্রক্রিয়াজাত করে রফতানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ মাছের ওপর নির্ভরশীল। জলমহাল ইজারা নিয়ে অনেক ব্যক্তি মত্স্য চাষের সঙ্গে জড়িত আছেন। আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে দেশের বৃহৎ ফিশ ইন্ডাস্ট্রিজ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক পাহাড়ি বনাঞ্চল রেমা-কালেঙ্গা। সুন্দরবনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক এ বন হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত। রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রমে আছে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, সাত প্রজাতির উভচর, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও ১৬৭ প্রজাতির পাখি। এছাড়া ৬৩৮ প্রজাতির গাছপালা ও লতাগুল্মও আছে।
মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়ার জাতীয় উদ্যান ও হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে শাল, সেগুন, আগর, গর্জন, চাপালিশ, শিলকড়ই, জাম, নাগেশ্বর, গামার ইত্যাদি জাতের গাছের সমাহার। অতীতে হবিগঞ্জের কিছু অঞ্চলে চিত্রাহরিণ, বনছাগল, হাতি, ডোরাকাটা বাঘ দেখা যেত। বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় বর্তমানে বনজঙ্গলের পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
প্রকৃতির ব্যতিক্রমী সৃষ্টি রাতারগুল সোয়ামা ফরেস্ট, যেখানে রয়েছে পানিতে অর্ধনিমজ্জিত হিজল, করচ, বরুণা, বেত আর মুর্তার ঘন ঝোপ। রাতারগুলই উপমহাদেশের একমাত্র মিঠা পানির সোয়ামা ফরেস্ট। ‘সিলেটের অ্যামাজন’খ্যাত প্রায় ৩৩১ একর আয়তনের রাতারগুলে বর্ষাকালে পর্যটকদের ভিড় ব্যাপকভাবে লক্ষ করা যায়।
মৌলভীবাজার জেলায় পর্যটকদের জন্য দুটি আকর্ষণীয় জলপ্রপাত রয়েছে। বড়লেখা উপজেলায় মাধবকুণ্ড ও কমলগঞ্জ উপজেলায় হামহাম জলপ্রপাত দেশ-বিদেশের পর্যটক ও দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে হামহাম জলপ্রপাতে যোগাযোগের উন্নত ব্যবস্থা না থাকায় অনেক পর্যটক ও দর্শনার্থী সেখানে যেতে পারছে না। জলপ্রপাতটি পাহাড়ের খুবই দুর্গম এলাকায় অবস্থিত।
বিছনাকান্দি ও জাফলংয়ের চকচকে শীতল পানি, রাতারগুল সোয়ামা ফরেস্ট, মাধবপুর লেক, লাউয়াছড়া ও সাতছড়ির জাতীয় উদ্যান, হাকালুকি হাওড়, টাঙ্গুয়ার হাওড়, বাইক্কা বিল, সুরমা ও জাদুকাটার মতো মায়াবী নদী সিলেট বিভাগের সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পর্যটকরা যেন এসব সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে, সেজন্য গড়ে উঠছে অনেক রিসোর্ট, যেখান থেকে পর্যটকরা প্রকৃতিকে আরো কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায়।
সিলেট বিভাগের পাহাড়, মাটি ও জলবায়ুও সিলেটের সম্পদ, যার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে বিশাল চা শিল্প, আগর ও রাবার বাগান। বাংলাদেশের ১৬২টি চা বাগানের মধ্যে মৌলভীবাজারে ৯০টি, হবিগঞ্জে ২৩টি ও সিলেটে ১৮টি অর্থাৎ মোট ১৩১টি চা বাগানই সিলেট বিভাগে অবস্থিত। ২০১৬ সালে চা উৎপাদনে বাংলাদেশ রেকর্ড গড়ে। সে বছর ৮৫ দশমিক শূন্য ৫ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হয়, যার মধ্যে ৮১ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন কেজি (৯৬ শথাংশ) চা অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি হয় ও বাকি অংশ রফতানি করা হয় (সূত্র: বাংলাদেশ চা বোর্ড)। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে দেশে একটি বড় অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি হয়েছে। ফলে রফতানির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমছে।
সিলেটের চা বাগানের মধ্যেই রয়েছে রাবার বাগান। এখান থেকে উৎপাদিত রাবার একটি মূল্যবান সম্পদ। দেশের প্রায় বেশির ভাগ রাবার বৃহত্তর সিলেট বিভাগে উৎপাদন হয়। সিলেট বিভাগের বেশির ভাগ জায়গা উঁচু-নিচু পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় রাবার বাগানগুলো এখানেই জন্ম নিয়েছে।
মৌলভীবাজারের সংরক্ষিত বন ও পাহাড়ি অঞ্চলে আগর গাছ পাওয়া যায়। লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় এখন বনাঞ্চলে আগর চাষও করা হচ্ছে। পরিপূর্ণ একটি আগর গাছ দুই-আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। কাঠ থেকে যে আগর সংগ্রহ করা হয়, তার প্রতি তোলার দাম মানভেদে ১ হাজার ২৫০ থেকে শুরু করে ৬ হাজার ২৫০ টাকা। রফতানির জন্য প্রতি কেজি বিক্রি হয় মানভেদে ১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকায়। আগরকাঠ থেকে এক ধরনের তেল তৈরি হয়, যাকে আমাদের স্থানীয় ভাষায় বলে ‘আতর’। এটি ব্যবহার হয় সুগন্ধি হিসেবে। প্রস্তুতকৃত আতরও খুবই মূল্যবান। প্রতি তোলা ৬-৮ হাজার টাকা। রফতানির জন্য প্রতি লিটার বিক্রি হয় মানভেদে ২-৪ লাখ টাকায়। এ উচ্চমূল্যের কারণে একে বলা হয় ‘তরল স্বর্ণ’। আগর থেকে তৈরি আতর মূলত মধ্যপ্রাচ্যে রফতানি করা হয়। সরকারি প্রণোদনা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে শিল্প সুবিধা পেলে বছরে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। এ সম্ভাবনাময় শিল্পের প্রসারে গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন জরুরি।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল ও পর্যাপ্ত জ্বালানি থাকার পরও নানা সমস্যার কারণে সিলেট বিভাগে হচ্ছে না শিল্পায়ন। বিনিয়োগের আগ্রহ থাকার পরও সরকারি কর্মকর্তাদের সৃষ্ট আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অনৈতিক দাবিদাওয়া প্রবাসীদের মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করছে। রেমিট্যান্সের বড় অংশ বিলাসবহুল বাড়ি, দামি গাড়ি ইত্যাদি অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হচ্ছে। তাদের বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে হবে। প্রবাসীরা তখনই আকৃষ্ট হবেন, যখন তারা দেশে বিনিয়োগ করার মতো অনুকূল পরিবেশ সম্পর্কে নিশ্চিত হবেন। তবে জ্বালানি নিশ্চয়তা ও সস্তা মূল্যে শ্রমিক পাওয়ায় হবিগঞ্জ জেলায় শিল্পায়নের কিছুটা ছোঁয়া লাগায় পুরো সিলেট বিভাগে তা ছড়িয়ে পড়বে বলে আশার সঞ্চার হচ্ছে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
শাবিপ্রবি, সিলেট






