সাধারণভাবে প্রবাস হলো বিদেশে বসবাস। আরেক অর্থে নির্বাসন। মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) তার ‘জন্মভূমি’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘জন্মভূমি কাহার না আদরের? উপমা রহিত কাহার না ভালবাসার স্থান? জন্মভূমির জন্য কে না লালায়িত? বহুদিন পরে প্রবাসী দেশে আসিলে তাহার মনে কতই সুখ! কতই আনন্দ!’ ফলে প্রবাস মানে কেবল বিদেশ যাত্রা নয়, মর্মার্থে তা নির্বাসনের-ই নামান্তর। এই প্রবাসীদের কখনো প্রবাসী, কখনো অভিবাসী, আবার কখনো অবাদি— এ রকম বহু নামে অভিহিত করা হয়। ইতিহাসের নানা গতিপথে/পর্যায়ে মানুষ কখনো বৈরাগী হয়ে, কখনো ভাগ্যের উন্নয়নে, কখনো যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে প্রাণ বাঁচাতে, কখনো পরমজনের টানে, কখনোবা ধর্মীয় বা রাজনৈতিকসহ বহুবিধ কারণেই স্বদেশের ভিটে-মাটি ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি দিয়েছে বা দিতে বাধ্য হয়েছে। উন্নত জীবনপ্রত্যাশী ও ভাগ্যের অন্বেষণে স্বদেশভূমিচ্যুত এ জনগণকেই সাধারণত ‘অভিবাসী’ নামে চিহ্নিত করা হয়। আর এ অভিবাসীদেরই তাদের স্বদেশে বা উত্সভূমিতে ‘প্রবাসী’ নামে ডাকা হয়।
বাংলাদেশের মানুষের কাছে সাধারণভাবে প্রবাসী মানেই হলো সিলেটের জনগণ। আর আমজনতার ধারণা সিলেটের মানুষের প্রবাসকেন্দ্র হলো লন্ডন। তাই সিলেট বাংলাদেশের লন্ডন হিসেবেই পরিচিত। তার কারণ, সরকারি হিসাবমতে, আমাদের দেশের বর্তমান প্রবাসীর সংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ। প্রকৃতপক্ষে আমাদের প্রবাসীর সংখ্যা প্রায় সোয়া এক কোটি। কারণ সরকারি হিসাবে বিদেশে অবৈধভাবে বসবাসকারী প্রবাসীর সংখ্যা যেমন ধরা হয়নি, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী প্রবাসীদের সেসব দেশে জন্মগ্রহণকারী পরবর্তী প্রজন্মের প্রবাসীদের সংখ্যাও ধরা হয়নি। আর যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাঙালির শতকরা পঁচানব্বই জনই বৃহত্তর সিলেটের অধিবাসী। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইতালি, সুইডেন, জার্মানি, স্পেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ প্রবাসী বাঙালিরও অধিকাংশ সিলেটি। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে কুয়েত-ইরাক যুদ্ধের শিকার হয়ে আগত প্রত্যাগত প্রবাসীর অর্ধেকই ছিলেন সিলেটি, যাদের অনেকেই যুদ্ধ শেষে কুয়েত ফিরে যান এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত কুয়েত গড়ার জন্য অধিক লোকের প্রয়োজন সৃষ্টি হওয়ায় সিলেট থেকে আরো অনেক নতুন লোক কুয়েত যান। এদের মধ্যে ডায়াস্পোরা ও মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার দুই শ্রেণীরই প্রবাসী আছে। কারো কারো প্রপিতামহ, পিতামহের আমল থেকে প্রবাসী হওয়ার ইতিহাস আছে, আবার কেউ কেউ অস্থায়ী ভিত্তিতে প্রবাসে কর্মরত। স্থানীয়ভাবে প্রবাসীদের লন্ডনি, মিরিকিনি, সৌদি, কুয়েতি, সিঙ্গাপুরি ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। তবে তাদের সবার সাধারণ পরিচয় প্রবাসী। সিলেটে প্রবাসী বাঙালিরা তাদের কর্ম, সংস্কৃতি, যাপিত জীবন আদর্শের কারণেই সর্বত্র জননন্দিত ও সম্মানিত। বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী সিলেটের প্রবাসীরা এখানকার সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের সুখ-দুখ, আনন্দ-বেদনার প্রভাব পড়ে সিলেটেও। তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। বাংলাদেশের উন্নয়ন রাষ্ট্রে উন্নীত হতে অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স।
কিন্তু সিলেটের এ প্রবাসযাত্রার ইতিহাস দীর্ঘ। দাবি করা হয় যে, ভারতীয়দের মধ্যে রাজা রামমোহন রায় প্রথম বিলাত গিয়েছিলেন। কিন্তু সিলেটের প্রথম কালেক্টর রবার্ট লিন্ডসের আত্মজীবনী থেকে জানা যায় সিলেটের সৈদ উল্লা প্রথম বিলাত গিয়েছিলেন তার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে। যা-ই হোক, রাজা রামমোহন রায় কিংবা সৈদ উল্লা কেউই প্রবাসী নন। প্রখ্যাত লেখক-গবেষক নূরুল ইসলাম তাঁর প্রবাসীর কথা (অখণ্ড) বইয়ে সিলেটিদের প্রবাসী হওয়ায় ইতিবৃত্ত অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সিলেটের জাহাজিরাই আমাদের প্রথম প্রবাসী বা প্রবাসী-বাঙালিদের পথিকৃৎ। ব্রিটিশ গবেষক ও লেখক ক্যারোলিন এডামস, যিনি বিলাতপ্রবাসী সিলেটি কমিউনিটির উন্নয়নের জন্য দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি তাঁর Accross the seven seas & thirteen rivers গ্রন্থে বলেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই সিলেটের জাহাজিরা বিলাতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সিলেটের মানুষের এই এত ব্যাপক প্রবাসী হওয়ার উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো— সিলেটের মানুষের প্রবাসযাত্রা শুরু উনিশ শতকের শেষ থেকে ব্রিটিশ মার্চেন্ট নেভি বা ব্রিটিশ বাণিজ্য-জাহাজে চাকরির সুবাদে। ‘ডিপসি’তে চলাচলকারী জাহাজে চাকরির মাধ্যমেই সিলেটের বিপুল সংখ্যক জাহাজি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসী হয়েছেন।
সিলেটের মানুষ কেন এত ব্যাপক হারে ওই সময় জাহাজের চাকরিতে গিয়েছিলেন। তার কারণ হলো, ব্রিটিশ ভারতে সিলেট ছিল আসামের অন্তর্ভুক্ত। ঔপনিবেশিক শাসকরা তৎকালীন বাংলাদেশে ভূমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করলে আসাম তথা সিলেট এর আওতায় ছিল না। তাই সিলেটে আদিকাল থেকে পাওয়া ভূমির মালিকানা সাধারণ মানুষ তথা কৃষকদের হাতেই রয়ে যায়। ফলে সিলেটে কৃষকদের মধ্য থেকে এক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান ঘটে। সময়ের ব্যবধানে পরিবার বড় হওয়া ও ভাগ হওয়ার কারণে এসব পরিবারের জমির পরিমাণ কমে আসতে থাকলে উঠতি কর্মক্ষম যুবকরা বেকার হতে থাকেন। ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে দেশে কলকারখানা গড়ে ওঠেনি বিধায় সিলেটে মধ্যবিত্ত বেকারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ মার্চেন্ট নেভির বাণিজ্য-জাহাজ সিলেটের এ মধ্যবিত্তের সামনে কর্মসংস্থানের এক নবদিগন্তের দ্বার উন্মোচন করে দেয় এবং সিলেটের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এসব বেকার যুবক দলে দলে জাহাজের চাকরিতে যোগ দেন। দ্বিতীয়ত. সিলেটের মানুষের জাহাজি বা প্রবাসী হওয়ার কারণ, সিলেটের প্রবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে বংশানুক্রমে আরবীয় রক্ত প্রবাহিত। আরবরা সমুদ্রপথেই এ দেশে এসেছিলেন। তাই ঐতিহ্যগতভাবেই সিলেটিরা সমুদ্রযাত্রায় ভীত ছিলেন না। এ অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটে হজরত শাহজালালের (র.) ৩৬০ সহচরের প্রচারণার ফলে। তারা সিলেটের বর্তমান সময়ের প্রবাসী-অধ্যুষিত এলাকায়ই বেশির ভাগ বসতি গড়ে তুলেছিলেন; পরে এ হার বেড়ে যায়। এ অবস্থায় এটা ধারণা করা যায় যে, অভিবাসন যেমন সিলেটিদের ঐতিহ্যগত, তেমনি ব্রিটিশ শাসনের পূর্বেই সিলেটের সঙ্গে আরবের জাহাজ-যোগাযোগ স্থাপিত হয়ে যায়। তৃতীয়ত. প্রবাসীদের সংসার জীবনযাপন, যা চক্রবৃদ্ধি হারে প্রবাসী হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে।
তাছাড়া, বিলাতে সিলেটিদের মালিকানাধীন প্রায় ১৫ হাজার (ইন্ডিয়ান) রেস্টুরেন্ট আছে। এ হোটেল ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ থেকে রেস্টুরেন্টের শেফ, কুক, ওয়েটার ইত্যাদি কর্মচারী নেয়ার জন্য দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি ওয়ার্কপারমিট চালু করে। যার প্রায় অধিকাংশ সিলেটি এবং একুশ শতকের শুরুতে ওয়ার্কিং হলিডে মেকার ভিসায় বাংলাদেশ থেকে কিছু তরুণ বিলাতে যান।
বিলাতপ্রবাসী সিলেটিদের এক বিরাট অংশ যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে বসবাস করেন। লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস বড়ো কাউন্সিল এলাকায় বিলাতপ্রবাসী সিলেটিদের বড় ঘাঁটি। লন্ডন ছাড়া যেসব নগরীতে সিলেটি প্রবাসীরা অধিক সংখ্যায় বসবাস করেন; সেগুলো হচ্ছে বার্মিংহাম, ওল্ডহাম, ম্যানচেস্টার, নর্থাম্পটন, শেফিল্ড, ব্রাইটন, লুটন, অক্সফোর্ড, ক্যামব্র্রিজ, নিউক্যাসেল, সান্দারল্যান্ড, কার্ডিফ, চেস্টার, রচডেল, ইয়র্ক, ব্রিস্টল ইত্যাদি।
বিশ শতকের ষাটের দশকের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের জন্য ভিসা নিয়ে বাইরে থেকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় পূর্বে জাহাজ থেকে পালিয়ে যাওয়া সিলেটিরা ছাড়া আর কোনো বাংলাদেশী যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেননি। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষ দিকে এসে বাংলাদেশ থেকে ভিসা চালু হলে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারের সংজ্ঞার উদারতার ফলে যেকোনো বয়সের ভাইবোনসহ অন্যান্য আত্মীয় ও বউ-ছেলেমেয়ে নেয়ার সুযোগ থাকায় সে দেশে বসবাসকারী জাহাজি সিলেটিদের সুবাদে সিলেটের বিপুল সংখ্যক মানুষ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী হতে পেরেছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায়ও সিলেটের মানুষ জাহাজ থেকে পালিয়ে গেছেন। বস্তুত সিলেটের জাহাজিরাই আমাদের আজকের প্রায় এক কোটি প্রবাসী বাঙালির পথপ্রদর্শক বা পূর্বসূরি। সমগ্র পৃথিবীতে সিলেটি যে প্রবাসী আছে, তার মধ্যে বেশির ভাগই হচ্ছেন সিলেটের বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর; সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক, জগন্নাথপুর; হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ; মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর, কুলাউড়া, বড়লেখা, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাসিন্দা।
প্রবাসীরা যেসব দেশে কর্মরত, সে দেশ থেকে তাদের উত্সস্থল বা পূর্বপুরুষের দেশে রেমিট্যান্স প্রেরণ প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় অবদান। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় প্রেরিত এ রেমিট্যান্স এসব দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক উত্স। বাংলাদেশেও প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক প্রবাহ। প্রবাসীরা রেমিট্যান্স বাবদ বাংলাদেশে প্রতি বছর অফিশিয়াল পন্থায় গড়ে ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠান। অফিশিয়াল মাধ্যম ছাড়াও আরো সমপরিমাণ ‘রেমিট্যান্স’ তারা হুন্ডির মারফতে দেশে পাঠান। স্বাধীনতার পর থেকেই প্রবাসীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। স্বাধীনতার পর প্রায় শূন্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফান্ডকে আকস্মিক দেউলিয়াত্বের হাত থেকে রক্ষার জন্য তখন আমাদের যুক্তরাজ্য প্রবাসীরা এগিয়ে আসেন। তারা তড়িঘড়ি করে দেশে আত্মীয়স্বজনের কাছে আরো কয়েকশ হাজার পাউন্ড রেমিট্যান্স পাঠান। তাই বলা যায়, প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের মাধ্যমেই আমাদের স্বাধীন দেশের যাত্রা শুরু হয়। International Organization for Migration (IOM)-এর এক গবেষণা থেকে জানা যায়, ১৯৭৬ থেকে ২০০২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রবাসী বাঙালিরা ৩০ হাজার ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ‘রেমিট্যান্স’ অফিশিয়াল পন্থায় বাংলাদেশে প্রেরণ করেছেন এবং পরবর্তী বছরগুলোতে তা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে বার্ষিক ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ‘রেমিট্যান্স’ আমদানি হচ্ছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২৮৫ কোটি। কিন্তু বর্তমানে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স আগমন অনেক কমে গেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রবাসী আয় হয়েছে সর্বনিম্ন। তার একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাণিজ্য থেকে যুক্তরাজ্যে আলাদা হয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমায় দেশগুলোতে প্রবাসীদের মজুরি কমে গেছে। সিলেটের প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের আলাদা কোনো হিসাব নেই বটে, কিন্তু রেমিট্যান্স বেশি আসে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত ও যুক্তরাজ্য থেকে। আর এসব দেশে বাঙালির মধ্যে সিলেটিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা। তাই এটা অনস্বীকার্য যে, রেমিট্যান্স প্রেরণে সিলেটের প্রবাসীদের অবদান সবার চেয়ে বেশি।
কিন্তু সিলেটের ব্যাংকগুলোয় রেমিট্যান্স বাবদ প্রেরিত প্রবাসীদের বিপুল অংকের টাকা অলস পড়ে আছে। এ অর্থের কোনো পরিকল্পিত বিনিয়োগ হচ্ছে না। এসব বিনিয়োগের বেশির ভাগ ঘরবাড়ি নির্মাণ তথা অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়। প্রচুর অর্থ ব্যয়ে তারা লন্ডনের ডিজাইনে বাড়ি নির্মাণ করেন, কিন্তু সেসব বাড়িতে থাকার কোনো লোকজন নেই। প্রবাসীরা দেশে এসে দু’হাতে পাউন্ড ব্যয় করেন, বিভিন্ন উত্সবের আয়োজন করেন। দেশে এসে গাড়ি কিনে কিছুদিন ব্যবহার করে ফেলে রেখে যান। বাইরে হোটেলে খাবার খাওয়া তাদের নৈমিত্তিক ব্যাপার থাকে। দেশে বাসকালে প্রবাসীরা ভূমিখেকো ছাড়াও চোর, ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের চুরি, লুটপাট এবং চাঁদাবাজির শিকার হন বলেও সবসময় অভিযোগ পাওয়া যায়।
যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী সিলেটিরা সিলেট ভিন্ন দেশের অন্যত্র বিনিয়োগ করতে ভরসা পান না। অনেক পূর্বসূরির তিক্ত অভিজ্ঞতা বিনিয়োগ-আগ্রহী প্রবাসীদের ভরসা না পাওয়ার কারণ। নানা কারণে সিলেটি প্রবাসীদের দেশের অন্য অঞ্চল সম্পর্কে ভীতি আছে। সিলেটে বিনিয়োগ সুবিধার জন্য একটা ইপিজেড স্থাপন প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি। প্রবাসীদের জন্য সিলেট নগরীতে সরকারি আবাসন প্রকল্প করারও দাবি প্রবাসীদের। এসব উদ্যোগ নেয়া হলে ব্যাপক প্রবাসী বিনিয়োগ হতে পারেন।
রাষ্ট্রীয় বা ব্যবসায়ীদের কোনো বিশেষ বিনিয়োগ পরিকল্পনা না থাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে হলেও এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দেশের অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত করছে এবং এর ফলে বিপুল কর্মসংস্থান হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাচ্ছে। সিলেটে প্রবাসীদের মালিকানাধীন একাধিক চা বাগান আছে, অর্থাৎ চা শিল্পেও প্রবাসী বিনিয়োগ হয়েছে। সম্প্রতি প্রবাসী বিনিয়োগে কয়েকটি ব্যাংকও দেশে গড়ে উঠেছে। প্রবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট ইত্যাদি নির্মাণে সাহায্য-সহায়তা প্রদান করে প্রবাসীরা জনকল্যাণমূলক কাজেও বিরাট ভূমিকা রাখছেন। প্রবাসীদের অর্থানুকূল্যে উপর্যুক্ত জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড বেশির ভাগ বৃহত্তর সিলেট তথা সিলেট বিভাগেই পরিলক্ষিত হয়। এ নগরীর সুযোগ-সুবিধা সিলেট অঞ্চলের অন্যান্য জেলা শহর থেকে অনেক অনেক বেশি। তাই প্রবাসীরা এখানে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের মতোই কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছেন। সিলেট শহরে ‘লন্ডন ম্যানসন’ নামে মার্কেটের নামকরণ এবং ‘লন্ডনি রোড’ নামে রাস্তার নামকরণ সিলেট নগরীতে বিপুল সংখ্যক প্রবাসীর বসবাসের প্রমাণ। তারা সবসময় সিলেটে থাকেন না বটে, তাদের আত্মীয়স্বজন তাদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করেন। গ্রামাঞ্চলে নিরাপত্তার অভাবও প্রবাসীদের সিলেট নগরীতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণ। বাংলাদেশের শিক্ষার উন্নয়নে বিলাতপ্রবাসী সিলেটিরা খুবই সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন। দেশের শিক্ষার উন্নয়নকল্পে বিভিন্ন উপজেলার প্রবাসীরা শিক্ষা উন্নয়ন ট্রাস্ট গঠন করেছেন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আমাদের প্রবাসীরা কেবল দেশে নয়, বিদেশেও উল্লেযোগ্য ভূমিকা রেখে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন। তৈরি পোশাক শিল্প থেকেও বিলাতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আমাদের প্রবাসীরা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘হাউজ অব কমন্সে’ এবং ব্রিটিশ লর্ড সভায়ও ‘ব্যারোনেস’ নির্বাচিত হয়েছেন। এ দুজনই বৃহত্তর সিলেটের অধিবাসী। ব্রিটেনের পার্লামেন্টের নিম্ন কক্ষ হাউজ অব কমন্সের সদস্য ব্রিটিশ-বাঙালি রুশনারা আলী এমপির বাড়ি সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলায়। এছাড়া স্থানীয় সরকারে বিভিন্ন কাউন্সিলে আমাদের বাঙালি মেয়র, কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্বারা প্রবাসে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন। লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস বড়ো কাউন্সিলের প্রথম এক্সিকিউটিভ মেয়র সিলেট জেলার বালাগঞ্জ ওসমানী নগরের অধিবাসী। তিনি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত। এ রকম এক্সিকিউটিভ মেয়র সারা বিলাতেই মাত্র কয়েকটি বড়ো কাউন্সিলে আছেন। আমেরিকার সিনেটে নির্বাচিত প্রথম বাঙালি সিনেটর হ্যানসেন ক্লার্কের বাড়ি সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলায়।
কিন্তু ব্যথার কথা হলো, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও বিশ্ব অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান সত্ত্বেও উন্নত ও ধনী দেশগুলোয় প্রবাসীরা খুব ভালো নেই। যে দেশের বোমা হামলা, জঙ্গিবাদসহ নানা ঘটনার পরিপেক্ষিতে প্রতিনিয়ত তাদের পড়তে হয় কোনো বিপাকে। এসব দেশে অভিবাসীরা সবসময়ই বর্ণবাদের শিকার। নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারের জঙ্গি বোমা হামলা তথা নাইন ইলেভেনের পর থেকে ইউরোপ-আমেরিকায় প্রবাসীদের ওপর বর্ণবাদী নির্যাতনের হার আরো বেড়ে গেছে। এখন এসব দেশে কালো বা বাদামি বর্ণের সব অভিবাসীই মৌলবাদী জঙ্গি অজুহাতে বর্ণবাদী নির্যাতনের শিকার হন। উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি ইউরোপে দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। তারা অভিবাসীদের তাড়ানোর জন্য ফ্যাসিস্ট কায়দায় অপতৎপরতা চালাচ্ছে।
প্রবাসীরা দিনে-রাতে শরীরের ঘাম পায়ে ফেলে রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। অথচ তাদের পাঠানো অর্থের নেই কোনো বিনিয়োগ পরিকল্পনা, নেই বিনিয়োগের যথার্থ পরিবেশ। প্রবাসীদের জন্য বিশেষত সিলেটি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের যথাযথ বিনিযোগ পরিকল্পনা ও উদ্যোগের মাধ্যমেই সিলেট হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগবান্ধব নগরীতে। সিলেটকে উন্নত ও আদর্শ নগরীরূপে তৈরি তথা উন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে স্থান করে নিতে প্রবাসীদের নিয়ে গভীর ভাবনার বিকল্প নেই।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট






