লবণ হলো একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য, যা খাদ্যে ব্যবহূত এক প্রকার দানাদার পদার্থ; যার প্রধান উপাদান সোডিয়াম ক্লোরাইড (Nacl)। সমুদ্রের পানি কাজে লাগিয়ে অথবা খনি থেকে লবণ আহরণ করা হয়। খ্রিস্টের জন্মের ছয় হাজার বছর আগেও মানুষ খনি থেকে লবণ উত্তোলন করত বলে ইতিহাস থেকে ধারণা পাওয়া যায়। লবণের ইতিহাস শুধু খাওয়ার লবণের ব্যবহার বা লবণ নিয়ে বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রাচীন রোমের সৈন্যদের বেতন দেয়া হতো লবণ দিয়ে। ইংরেজিতে Shoulder শব্দের মানে হলো সৈন্য। আর Salary মানে বেতন। এ শব্দ দুটি থেকে সল্ট শব্দের উৎপত্তি। মিসরীয়রা লবণ মাখিয়ে প্রথম খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি আবিষ্কার করে। এছাড়া লবণ নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আন্দোলন হয়েছিল, যাকে সল্ট মার্চ নামে অভিহিত করা হয়। আর এ আন্দোলনের আহ্বায়ক ছিলেন স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী। লবণের ওপর ব্রিটিশ সরকার করারোপ করে। তারই প্রতিবাদে এ যাত্রার আয়োজন করা হয়। প্রাচীনকাল থেকে সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে লবণের চাষ শুরু হয়। মুলঞ্চী নামে খ্যাত চট্টগ্রামের একশ্রেণীর লোক অতীতকাল থেকে সমুদ্রের পানি সিদ্ধ করে লবণ উৎপাদন করত। পরবর্তীতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি কাজে  লাগিয়ে লবণ উৎপাদন শুরু হয় মাঠপর্যায়ে। এক্ষেত্রে জোয়ারের সময় জমিতে পানি জমা করে রেখে তা সূর্যের আলো ও বাতাসের উপস্থিতিতে বাষ্প হয়ে গেলে জমিতে লবণের আস্তরণ পড়ে, তা-ই লবণ। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় সুদীর্ঘকাল থেকে অপরিকল্পিতভাবে সৌরপদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন হলেও সর্বপ্রথম পরিকল্পিত লবণ উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করে শিল্প মন্ত্রণালয়। লবণ শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৯৬০ সালে মাত্র ৬ হাজার ৭৪৭ একর জমিতে চাষ শুরু করে শিল্প মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণাধীন বিসিক এবং বিসিক ২০০০-০১ সালে সৌরপদ্ধতিতে কাদাযুক্ত লবণ উৎপাদনের কাঠামো পরিবর্তন করে।

লবণচাষীদের পলিথিন পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে সাদা লবণ উৎপাদনে উৎসাহিত করে। সনাতন পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন একরপ্রতি ১৭-২০ টন। পলিথিন পদ্ধতিতে একরপ্রতি  উৎপাদন হয় ২০-২৫ টন। অনুকূল আবহাওয়া লবণ শিল্পের জন্য উপযোগী। বৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে লবণ উৎপাদন ব্যাহত হয়। এছাড়া লবণ চাষের জন্য লবণাক্ত পানির প্রয়োজন হয়। পানিতে লবণাক্ততার PPT যেখানে বেশি, সেখানে উৎপাদনের পরিমাণও বেশি হয়। এ কারণে বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী এলাকার কক্সবাজার জেলার চকরিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার সদর, টেকনাফ ও বাঁশখালীর কিছু অংশ লবণ চাষের জন্য উপযোগী বলে চিহ্নিত। বর্তমানে বিসিকের হিসাবমতে ৭৪  হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হয়ে। এ শিল্পে নিয়োজিত রয়েছেন ৫৫ হাজার চাষী। এছাড়া লবণ উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে লক্ষ্যে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বড়ঘোনা, পটুয়াখালী উপকূলীয় এলাকায়ও পরীক্ষামূলকভাবে সমীক্ষা চালানো হচ্ছে লবণ চাষের আওতায় আনার জন্য। এবং এটাকে আরো বেগবান করলে লবণে স্বয়ংসম্পূর্ণতা  অর্জন করা সম্ভব। বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি লবণ উৎপাদন হয় চীনে, ৫৮ মিলিয়ন টন। যুক্তরাষ্ট্রে হয় ৪২ মিলিয়ন ও ভারতে ১৯ মিলিয়ন টন। দেশে গুরুত্বপূর্ণ যে কয়টি শিল্প রয়েছে, তার মধ্যে লবণ শিল্প অন্যতম। বাংলাদেশে জাতীয় অর্থনীতিতে লবণ শিল্পের অবদান ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা। এ বছর লবণের চাহিদা ছিল ১৭ দশমিক ৭৬ লাখ টন। দেশে লবণ উৎপাদন হয়েছে ১৩ দশমিক ৬৪ লাখ টন। উৎপাদনের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে অনুকূল আবহাওয়া ও চাষীদের আগ্রহের ওপর। এখানে লবণের ন্যায্যমূল্যও একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। লবণ শিল্পের উন্নয়নে দরকার লবণনীতির সুষ্ঠু প্রয়োগ ও তা ব্যবহারের মাধ্যমে লবণ উৎপাদন বাড়ানো এবং চাষীদের ন্যায্যমূল্য রক্ষা ও বাজার ব্যবস্থাপনার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা। অন্যদিকে প্রান্তিক চাষীদের জন্য আলাদা রক্ষণাবেক্ষণ ও অধিকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

স্থিতিশীল বাজার রক্ষার জন্য মজুদ ব্যবস্থাকে স্পর্শকাতর হিসেবে গণ্য করা। লবণনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে এ শিল্পের পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত প্রভাবের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সনাতন পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনের ফলে পরিবেশের ওপর প্রধান প্রভাব হচ্ছে লবণের সঙ্গে প্রচুর কাদা থাকে। সেই লবণ যখন স্থানীয় মিলগুলোয় ওয়াশ করা হয়, তখন সেই কাদাযুক্ত পানি নিকটবর্তী নদী বা চ্যানেলের মধ্যে ছেড়ে দেয়া হয়। এতে পলি জমে নদীর নাব্যতা হারিয়ে যায় এবং নদীর সঙ্গে সম্পূর্কযুক্ত বস্তু বা স্থান ভেঙে যায় প্রর্যায়ক্রমে। অন্যদিকে বর্তমানে পলিথিন পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনের ফলে প্রতি বছর প্রায় ৭৪ হাজার একর চাষযোগ্য জমিতে  পলিথিন ব্যবহূত হয়। সেই পলিথিন পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। পলিথিন ব্যবহারে  মাটি, পানি, বায়ু— এ তিন স্তরে ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। পলিথিন অপচনশীল বলে মাটির উর্বরাশক্তি মারাত্মকভাবে বিনষ্ট করে। সুতরাং পলিথিন ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরাশক্তিতে উৎপাদনের তারতম্য ঘটে কিনা তা পরীক্ষা করতে হবে। সনাতন পদ্ধতিতে উৎপাদিত লবণ বর্তমানে পলিথিন পদ্ধতিতে উৎপাদিন লবণে সোডিয়াম ক্লোরাইডের কোনো পরিবর্তন ঘটে কিনা তা পরীক্ষা করা দরকার। উৎপাদিত লবণের সঙ্গে আয়োডিন মিশিয়ে তৈরি করা হয় আয়োডিনযুক্ত লবণ। স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে আয়োডিন মানবদেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এ আয়োডিনের অভাবে মানবদেহের থাইরক্সিন হরমোন তৈরি হয় না। ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। যেমন গলগণ্ড, বুদ্ধিমত্তা, মেধাহীনতা ইত্যাদি। ইউনিসেফের এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, সল্ট ল’ অনুযায়ী প্রতি কেজি লবণে ৫০ পিপিএম আয়োডিন যুক্ত করা নির্দেশিত এবং তা গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছে ২০-২৫ পিপিএম মাত্রায়। বাংলাদেশে তা প্রতিনিয়ত অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। এর কারণে সর্বজনীন আয়োডিন প্রোগ্রাম ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লবণের সঙ্গে আয়োডিন, আয়রন ও বিভিন্ন মিনারেল যুক্ত করা হচ্ছে। উৎপাদন পদ্ধতিতে আধুনিকায়নের ফলে এ শিল্পকে উন্নত করে অর্থনৈতিক বিশ্বায়নে রফতানিযোগ্য শিল্প হিসেবে গড়ে তুলছে।

সেদিক দিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে লবণ আমদানি করা হয় এক লাখ টন ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ দশমিক ৫০ লাখ টন। আমাদের আমদানি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এ হার অব্যাহত থাকলে এ শিল্প অদূরভবিষ্যতে মারাত্মক হুমকিতে পড়বে এবং দেশে দিন দিন আমদানিনির্ভরতা বাড়বে। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব চাষ পদ্ধতি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বিজ্ঞানসম্মত চাষ পদ্ধতির মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারলে আমরা কেন পারব না। প্রান্তিক চাষীদের উন্নত চাষ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লবণ উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনা সম্ভব এবং আমদানিতে মুনাফালোভীদের কারসাজি আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সাধারণত লবণাক্ত অঞ্চলে মাটির নিচের স্তরের PPTর পরিমাণ বেশি থাকে। নিচের স্তরের পানি ব্যবহার করে লবণ উৎপাদন বাড়ানো যায় কিনা, শিল্প মন্ত্রণালয় বা বিসিক পরীক্ষা করে দেখতে পারে। অন্যদিকে বর্তমানে আমাদের দেশে যেখানে লবণ চাষ হচ্ছে, সেখানে বর্ষা মৌসুমে চিংড়ি বা মত্স্য চাষ হয়। এ দুই চাষ পদ্ধতির কারণে কোনো শিল্পই ভালো ফলন উৎপাদন করতে পাচ্ছে না। তাই এক চাষ পদ্ধতির মাধ্যমে লবণ শিল্পকে একটি উন্নত পদ্ধতিতে দাঁড় করানো যায় কিনা ভাবা দরকার। কারণ উন্নত মানের লবণ উৎপাদন পদ্ধতিতে বিশ্বের কোথাও দুই চাষ পদ্ধতি নেই। যতটুকু সম্ভব পলিথিন ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। কারণ চাষ পদ্ধতিতে ভালোভাবে মাটিকে শক্ত করলে পলিথিন অনেকাংশে কম ব্যবহার করা যায়, যা দিয়ে অর্থনৈতিক  ও পরিবেশগত সফলতা অর্জন করা সম্ভব।

 

 

লেখক: সভাপতি

কক্সবাজার লবণ মিল মালিক সমিতি