‘বর্ষায় নাও শুকনায় পাও’— এ হচ্ছে হাওড়াঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে প্রচলিত প্রবাদ। বর্ষাকালে যে হাওড়ে বিরাজ করে থইথই পানি, শুকনো মৌসুমে সেখানে ধু-ধু মাঠ। বর্ষায় এখানে দিকে দিকে ছুটে চলে বড় বড় মহাজনি নাও, ছোট ছোট নাইওরি নৌকা আর মাছ ধরায় ব্যস্ত মাঝিদের হৈ-হুল্লোডের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে যায় কচুরিপানার বিশাল মিছিল। শুকনোয় এখানে বাতাস বয়ে চলে খোলা মাঠের ওপর দিয়ে, দোলা দেয় দিগন্তজোড়া জমির ফসলে। সবুজ ধানক্ষেতের মাঝে ইতিউতি উড়ে চলে দুধ-সাদা বকের দল, পথে পথে চলে দুপুরের আলস্যে আয়েশি পথিক। বর্ষাকালে এখানে সূর্যোদয় তার আগমনী বার্তা জানায় জলের বুকে চুমু খেয়ে, মধ্য দুপুরের রুপালি রোদে চকমক করতে থাকে পুরো হাওড়, শেষ বিকালে সূর্যাস্তের সোনালি আভার রঙে মিলে মিশে একাকার হয়ে ছন্দবন্ধ ঢেউ। শম্বুকগতিতে স্রোতের টানে বয়ে চলে বাঁশের চাইল, দুরন্ত কিশোররা কলাগাছের ভেলা নিয়ে উদ্দাম হাওড়ের বুকে চালায় নৌকা গাড়ি। কখনো কখনো হাওড়ের বুকে নেমে আসে নীরব নিস্তব্ধতা, কখনোবা ঘুম ভেঙে রুদ্র রোষে জেগে ওঠে ‘আফাল’ তার প্রলয়ঙ্করী তাণ্ডবে আর বিরামহীন হুঙ্কারে তটস্থ করে রাখে হাওড়বাসীকে। বর্ষায় যে হাওড়ের পাগল করা ঢেউয়ের দোলায় প্রান্তরগুলো উত্তাল হয়ে ওঠে, শুকনো মৌসুমে সেখানে পানি থাকে না এক ফোঁটাও। যত দূর চোখ যায়, শুধু বোরো ধানের সবুজ শীষ বা সোনারঙা ধানের সুউচ্চ শস্যময় ডগা প্রাণকে করে উদ্বেলিত। নদীমাতৃক এ দেশের বিশাল একটা অংশজুড়ে রয়েছে এ হাওড়, প্রায় ৯০ ভাগ অবস্থিত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে।
শুকনো মৌসুমের বালুচরে বর্ষার জলধারায় পাওয়া যায় সাগরের সুষমা। হাওড় শব্দটির বুৎপত্তিও ‘সাগর’ থেকেই। সাগর>সায়র>আওর>হাওর। হাওড়াঞ্চল নির্দিষ্ট কোনো জেলা নয়, এটি একটি বৃহৎ অঞ্চল। এ অঞ্চল থেকে দেশের পাঁচ ভাগের এক ভাগ ধান উৎপাদন হওয়ার পাশাপাশি বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার মিঠা পানির মাছ উৎপাদন হয়। রয়েছে খনিজ সম্পদ, পর্যটন শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি এ হাওড়াঞ্চল দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গারো পাহাড় থেকে শুরু করে ভৈরব পর্যন্ত সাতটি জেলার (সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, সিলেট, ব্রাক্ষণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ) ৫২টি উপজেলার প্রায় ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। যদিও ৫২টি উপজেলার পুরোটাই হাওড় এলাকা নয়। হাওড়ের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি প্রতি বছরই মৌসুমি বর্ষা বা স্বাভাবিক বন্যায় প্লাবিত হয়; বর্ষা শেষ হওয়ার পর পানি থাকে কেবল হাওড়ের গভীরের কিছু বিলে। বছরে ছয় মাসেরও অধিক সময় পানিতে ডুবে থাকা এ নিম্নাঞ্চলের কোনো কোনো অংশ সমুদ্র স্তর থেকেও অনেক নিচে।
ভৌগোলিক অবস্থান বা এলাকার বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে বাংলাদেশের হাওড়কে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা চলে— পাহাড়ের পাদদেশ বা কাছাকাছি অবস্থিত হাওড়, প্লাবিত এলাকার হাওড় এবং গভীর পানিতে প্লাবিত হাওড়। সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার হাওড়গুলো পাহাড়ের পাদদেশ বা কাছাকাছি অবস্থিত হাওড়; কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাক্ষণবাড়িয়ার হাওড় প্লাবিত এলাকার হাওড়; সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার হাওড় গভীর পানিতে প্লাবিত হাওড়। বিশাল এ অঞ্চলে আদিবাসী হাজং, গারো, খাসিয়া, মণিপুরি, কুচ জনগোষ্ঠীসহ বসবাস প্রায় ৩০ লাখ মানুষের। হাওড়বাসী ছাড়াও আশপাশের বিপুল জনগোষ্ঠী এ অঞ্চলের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কে আবদ্ধ। ধরে নেয়া যায়, প্রায় অর্ধকোটি মানুষের সঙ্গে হাওড়ের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। এ অঞ্চলে মোট হাওড়ের সংখ্যা ৪২১টি, যার মধ্যে হবিগঞ্জে ৩৯টি, মৌলভীবাজারে ৩টি, সিলেটে ৪৫টি, নেত্রকোনায় ৭০টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৬টি, কিশোরগঞ্জে ১২১টি ও সুনামগঞ্জে ১৩৭টি অবস্থিত।
হাওড়াঞ্চলের ৯০ ভাগ মানুষ নির্ভরশীল কৃষির ওপর। আর এখানকার প্রধান কৃষিপণ্য ধান। মূলত বোরো ধান চাষ হলেও কিছু ইরি ধানও হাওড়ে চাষ হয়। পূর্ব বাংলার গভর্নর মোনায়েম খান ফিলিপাইন থেকে ইরি ধানের বীজ এনে প্রথম হাওড়ে রোপণ করেন। হাওড়ের পলি বিধৌত মাটি কৃষির জন্য খুবই উপযোগী হওয়ায় রাসায়নিক সারের ব্যবহার এখানে খুব একটা করতে হয় না; সেচের প্রয়োজনীয়তাও তুলনামূলক কম। বর্ষা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অধিকাংশ জমিতে বিনা চাষেই কাদামাটিতে কৃষকরা বোরো চারা রোপণ করেন। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে শুধু সুনামগঞ্জ জেলাতেই সাড়ে তিন লাখ একর জমিতে উৎপাদিত এবং উদ্বৃত্ত ফসলের পরিমাণ যথাক্রমে ৫৩ লাখ ও ২ লাখ টন। কৃষিক্ষেত্রে প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও এখানকার কৃষি উন্নয়নের জন্য তেমন কোনো ফলপ্রসূ উদ্যোগ এখন পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি। এ অঞ্চলের ফসলকে আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষার জন্য নেই কোনো স্থায়ী উদ্যোগ। প্রত্যন্ত অঞ্চলে চাষাবাদের কোনো আধুনিক পদ্ধতি গৃহীত না হওয়ায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় থেকে বছরের পর বছর বঞ্চিত হচ্ছে। গত ১৫ বছরে শুধু সুনামগঞ্জ জেলায় প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার বোরো ফসল বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লাখো কৃষক।
বন্যা ছাড়াও আবাদের অন্য প্রতিবন্ধকতা দিন দিন হাওড় এলাকায় বাড়ছে। জলাবদ্ধতা, নদীর তলদেশে বালি ভরাট, পলি ভরাট, শিলাবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন এ অঞ্চলে আবাদের অন্তরায়। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ অবশ্য শুধু ফসলের ওপরই নয়, প্রভাব ফেলে হাওড়ের সার্বিক জীবনযাত্রার ওপর। বর্ষার ঝড়ো হাওয়া, হাওড়ের পানির দুর্বার ঢেউ ভেঙে দেয় মানুষের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, গ্রামগঞ্জ; অকালে কেড়ে নেয় মানুষের জীবন। যে বছর দুর্যোগে কৃষকের ফসল নষ্ট হয়, সে বছর হাওড়ের কৃষক পরিবার দিনযাপন করে অনাহারে। এদের পরনে কাপড় থাকে না, অসুখে ওষুধ পায় না, শিক্ষার অধিকার থেকে এরা সর্বদাই বঞ্চিত। এখানকার মানুষের নিশ্চয়তা নেই স্থায়ী ভিটামাটির; রাতে যারা ঘরে ঘুমিয়েছে, সকালে তাদের ঘরবাড়ি পাহাড়ি ঢলে নিয়ে যাবে না— এমন নিশ্চয়তা কেউ তাদের দিতে পারে না। অথচ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এসব মানুষই আমাদের সমাজের চালিকাশক্তি। নদীভাঙনের কবলে গত ১০০ বছরে এ অঞ্চলের ৭২টি গ্রাম, ২২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২৩টি মসজিদ, ৬টি মন্দির, ১০টি বাজার ও অসংখ্য স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অকালবন্যা, পোকার আক্রমণ, নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধক বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিরোধ করে বোরো ও অন্যান্য উচ্চফলনশীল জাতের ধান শতভাগ ওঠানো সম্ভব হলে এ অঞ্চলের ধান দেশের ছয় মাসের চাহিদা মেটাতে সক্ষম বললেও অত্যুক্তি হবে না।
হাওড়ের ধান চাষ অন্যান্য এলাকার লোকজনের জন্যও সৃষ্টি করে অস্থায়ী কর্মসংস্থান। বোরো ধান যেহেতু এ অঞ্চলের উদ্বৃত্ত ফসল এবং প্রকৃতির ছোবল থেকে রক্ষা করতে তাড়াহুড়ো করে তুলে আনতে হয়, তাই ফসল কাটার সময়ে প্রয়োজন হয় ব্যাপক জনশক্তির। এজন্য দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজন আসে ভাগের বিনিময়ে ধান কাটার জন্য, এদেরকে বলা হয় ‘ভাগালু’।
হাওড়ের কৃষকদের তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করার জন্য শুধু প্রাকৃতিক নয়, কৃত্রিম প্রতিবন্ধকও দায়ী। সরকারিভাবে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করার নিয়ম থাকলেও এ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয় মূলত রাজনৈতিক সিন্ডিকেট নেতাদের মাধ্যমে। এসব নেতা কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে আর্থিক মুনাফা নিয়ে শুধু তাদের ধান গুদামজাত করেন। মূলত তদারকি ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবেই সরকারের এ পদক্ষেপ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না এবং কৃষকরা পাচ্ছেন না ফসলের যথাযথ মূল্য। এছাড়া এখানকার এক ফসলি কৃষকদের কৃষি ব্যাংক বা অন্যান্য ব্যাংক থেকে ঋণের বিপরীতে ৮ শতাংশ হারে সুদ দিতে হয়, অথচ উজানের তিন ফসলি কৃষকরাও একই হারে সুদ দিয়ে থাকেন। যদিও উজানের ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা শুধু শিলাবৃষ্টিতে, অন্যদিকে হাওড়ের ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে বিভিন্ন কারণে। একইভাবে উজান এলাকার জমির মালিক কেয়ারপ্রতি (৩০ শতাংশ) যে পরিমাণ খাজনা দেন, হাওড় এলাকার জমির মালিকেরও একই পরিমাণ খাজনা দিতে হয়; যেখানে হাওড় ও উজানের কৃষিজমির দামে রয়েছে বিস্তর ফারাক। অন্যদিকে হাওড়ের কৃষকরা জিম্মি দাদন ব্যবসায়ীদের হাতে। একসময় আফগানিস্তানের কাবুল থেকে কাবুলিওয়ালারা এসে গরিব কৃষকদের ধানবীজ রোপণের সময় সুদের ওপর টাকা দিত। তার ধরন ছিল— কৃষক পৌষ মাসে টাকা নেবেন আর বৈশাখ মাসে ধান কাটার পর সুদসহ টাকা ফেরত দেবেন। ১৯৫৪ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ‘ঋণ সালিসি বোর্ড’ গঠন করলে এ অঞ্চলের কৃষকরা কাবুলিওয়ালাদের হাত থেকে রক্ষা পেলেও পরবর্তীতে এ দেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। গ্রামাঞ্চলে কৃষিঋণ সংগ্রহে জটিলতা ও হয়রানির কারণে ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে কৃষকরা উচ্চসুদে ঋণ নিচ্ছেন দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। কোনো বছর দুর্যোগের কারণে ঋণের টাকা শোধ করতে না পারলে বছর বছর চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের টাকা বাড়তে থাকে আর কৃষক তার ভিটামাটি, হালের বলদসহ সবকিছু তুলে দিতে বাধ্য হন দাদন ব্যবসায়ীর হাতে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও হাওড়াঞ্চল রয়েছে অনেক পিছিয়ে। হাওড়াঞ্চলের অধিকাংশ উপজেলার বেশির ভাগ নিম্নাঞ্চলে কাঁচা রাস্তা, বর্ষায় যা নিমজ্জিত থাকে পানিতে। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এ অঞ্চলে সঠিক মূল্যে কৃষিপণ্যের বাজারজাত, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, শিল্পের বিকাশ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়ন বিশেষভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শুকনো মৌসুমে দীর্ঘ মেঠো পথ পায়ে হেঁটে যেতে হয় আর বর্ষায় নৌকাই এখানকার একমাত্র বাহন। সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি উৎপাদিত পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন উপযুক্ত লভ্যাংশ থেকে। একইভাবে উন্নয়নমূলক কর্মসূচির আওতায় গৃহীত কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও নির্মাণসামগ্রী দ্রুত সরবরাহ করতে না পারায় সব কার্যক্রমের গতি অত্যন্ত মন্থর।
এ অঞ্চলের জলমহালগুলো সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত— উন্মুক্ত ও বদ্ধ জলমহাল। উন্মুক্ত জলমহালগুলো হলো নদী, খাল ও নালাজাতীয় জলমহাল। বদ্ধ জলমহালগুলোকে ‘পাইল’ জলমহাল বলা হয়। বদ্ধ জলমহালের নিয়ম হলো, প্রথম বছর মাছ চাষ করা হয়, দ্বিতীয় বছর মাছ সংরক্ষণ করা হয় এবং তৃতীয় বছর মাছ ধরা হয়। তিন বছরে এক পাইল হয়ে থাকে।
হাওড় অঞ্চলে মত্স্য চাষের ক্ষেত্রেও রয়েছে কিছু প্রতিবন্ধক। একসময় জমিদাররা এ অঞ্চলের ভূমির মালিক ছিলেন এবং জলমহালগুলো ছিল তাদের মালিকানাধীন। বিক্রমপুরের জমিদার হেমচন্দ্র, ঢাকার নবাব আব্দুল গণি, করটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খান, মুক্তাগাছার জমিদার রানী ভবানী ছাড়াও নাম না জানা আরো বহু জমিদারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল এই বিস্তৃত অঞ্চল। জমিদার প্রথার উচ্ছেদ এবং স্বাধীনতার পর ইজারা প্রথার বিকাশ ক্রমে উন্মুক্ত হলে মত্স্যজীবী নন, এমন সব ধনী লোক এ সুযোগ গ্রহণ করেন এবং এতে সাধারণ জেলেদের মাছ ধরার সুযোগ দারুণভাবে ব্যাহত হয়।
আরেকটি প্রতিবন্ধক হচ্ছে— রেণু-পোনার অকালমৃত্যু। রেণু-পোনা মরে যাওয়ার প্রধান কারণ, বোরো জমিতে কৃষকদের হিনসটন, ডায়ালটিন, ইনটিনের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিষের ব্যবহার। এছাড়া ভরাটের কারণে নদী ও বিলের গভীরতা কমে যাওয়াও মাছ চাষের অন্তরায়। পরিকল্পিত সমবায়ভিত্তিক মত্স্য চাষ সম্ভব হলে হাওড়ের বিশাল এই জলরাশি এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নে নিশ্চিতভাবেই বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে। নিম্নাঞ্চলের হাওড় এলাকার আরেকটি সম্ভাবনাময় খাত হচ্ছে হাঁসের খামার করা।
সংস্কৃতির দিক থেকেও কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই এ অঞ্চল। নৌকা বাইচ, কুস্তি, লাঠিখেলা, বর্ষায় নাইওরি আনা এ এলাকার সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। হাওড়বাসীর নিত্যদিনের আলাপচারিতার একটা অংশ জুড়ে থাকে চুটকি, প্রবাদ প্রবচন, লোককাহিনী, উপাখ্যান ও আফালের সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে আসার গল্প। তবে হাওড়ের সংস্কৃতিকে সবচেয়ে সমৃদ্ধ করেছে তাদের গান। সমৃদ্ধ এ তালিকায় রয়েছে— পালাগান, ওঝার পাঁচালি, গাজীর গান, নিমাই সন্ন্যাসীর গান, নৌকা বাইচের গান, বেঙ্গরিয়ার গান, বাঘাই পীরের গান, বারোমাসি, কবিগান, জারিগান, ঘাটুগান, বাউলগান, দরবারি কিচ্ছা, মেয়েলি গীত, পুঁথি পাঠ, ভাটিয়ালি, শিলুক ইত্যাদি। এ গানের হাত ধরেই এই অঞ্চল থেকে উঠে এসেছেন অনেক বিখ্যাত বাউল শিল্পী। নিজেদের গান আর কথা দিয়ে হাওড়াঞ্চলসহ সারা বাংলাদেশকে মোহিত করেছেন শাহ আব্দুল করিম, হাছন রাজা, উকিল মুন্সী, শীতালং শাহ, দুরবিন শাহ, রশিদ উদ্দিন, জালাল খাঁ, উমেদ আলী, আবদুল মজিদ, আবদুল হাকিম, রাধারমণের মতো বিখ্যাত সাধক ও বাউল শিল্পীরা।
হাওড়াঞ্চলের ধান, মাছ, পর্যটন, কুটির শিল্প ও সংস্কৃতির যথাযথ উন্নয়ন হলে তা সুদূরপ্রসারী সুফল বয়ে নিয়ে আসবে সারা দেশের জন্য। যেকোনো উন্নয়নকে স্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী করার প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে মানুষকে কেন্দ্রে রেখে পরিবেশকে সংরক্ষণ করে সামাজিকভাবে গৃহীত অর্থনৈতিক উন্নয়ন। আর্থসামাজিক উন্নয়ন খুব সহজেই ভেঙে পড়বে, যদি না সে উন্নয়নে পরিবেশ-প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করা হয়। প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এ হাওড়াঞ্চলে সম্মিলন ঘটেছে বাংলাদেশের সামগ্রিক রূপের। পাহাড়, নদী, বন, মাঠের সব বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা এ হাওড় আয়তনের দিক থেকেও বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ। এত সব ভৌগোলিক এবং পরিবেশগত বৈচিত্র্য নিয়ে এ হাওড়াঞ্চল তার আয়তনের বিশালত্ব এবং প্রাণপ্রাচুর্যে হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের প্রতিনিধি আর হাওড়াঞ্চলের যথাযথ উন্নয়ন হলে তার সুফল ভোগ করবে সারা বাংলাদেশ। হাওড়াঞ্চলের উন্নয়ন মানে পর্যটন, খনিজ ও কুটির শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের নিশ্চয়তা; এর উন্নয়ন মানে হাওড়াঞ্চলের সংস্কৃতিকে পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষণ করে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আরো সমৃদ্ধ করা; এ অঞ্চলের উন্নয়ন মানে মাছে-ভাতে বাঙালির মাছ ও ভাতের সিংহভাগ জোগানের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
লেখক: গবেষক






