বিশ্বে চেম্বারের আবির্ভাব ও চিটাগং চেম্বার

দেশের শীর্ষস্থানীয় ট্রেড বডি দ্য চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ৩০ জানুয়ারি ২০১৬ সালে শতবর্ষ পালন ও দেশের প্রথম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার উদ্বোধন করতে যাচ্ছে। এটি চট্টগ্রামসহ দেশের ব্যবসায়ী সমাজ তথা বাংলাদেশের জন্য একটি স্বর্ণখচিত অধ্যায়। এটি আমাদের জন্য ঐশ্বর্য, সম্মান ও গৌরবের বিষয়। পুঁজিবাদী সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পবিপ্লব-পরবর্তীতে বিশ্বে চেম্বার প্রতিষ্ঠার সূচনা ঘটে। ১৫৯৯ সালে ফ্রান্সের বন্দরনগরী মার্সাইয়ে প্রথম ‘চেম্বার ডি কমার্স’ স্থাপিত হয়। ১৭৬৮ সালে ব্রিটেনে জার্সি শহরে, একই সময় মার্কিন মুলুকে চেম্বার স্থাপিত হয়। ভারতে ১৮৩৪ সালে ক্যালকাটা চেম্বার, ১৮৫৩ সালে বেঙ্গল চেম্বার প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্ববঙ্গে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স (যা পরবর্তীতে মেট্রোপলিটন চেম্বার) প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ভিনদেশী বণিকদের আনাগোনা, ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী বা রাজার শাসন, বহিরাগত ব্যবসায়ীদের স্থায়ী আবাস স্থাপন এবং স্থানীয় সওদাগরদের চিন্তা ও সংস্কৃতি একটি অর্থনৈতিক বাণিজ্যপিঠে রূপান্তরিত করে চট্টগ্রামকে। এসব কারণে শতবছর আগে থেকে ব্যবসায়ীরা সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে যূথবদ্ধ ব্যবসায়িক পরিমণ্ডল গঠনের নিমিত্তে ব্যবসায়ী সংগঠন গড়ে তোলেন, যা একটি অঞ্চলের বাণিজ্য সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করে।

সবার সম্মিলিত সহযোগ

ভারত বিভাগের পরে পাকিস্তান আমলে ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রামের বণিক সমিতিগুলোকে একত্রিত করে পুনর্গঠনের জন্য সরকার এক আদেশ জারি করে। ১৯৬১ সালে একটি অর্ডিন্যান্স জারির মাধ্যমে বিভিন্ন বণিক সমিতিকে একটি চেম্বার অব কমার্সে পরিণত হওয়ার পথ সুগম করে দেয়া হয়। এরই মধ্যে ১৯৫৯ সালের ১২ আগস্ট চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির জন্ম হয়। এর কাজ চালিয়ে নেয়ার জন্য একটি এডহক কমিটি গঠন করা হয়। মি. কেএমএস, আলম চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রথম প্রেসিডেন্ট। তার সভাপতিত্বে ১৯৬০-এর ২ জানুয়ারি পাথরঘাটা সেন্ট প্লাসিড স্কুলে এর প্রথম বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। বণিক সমিতিগুলো একীভূত করার আগে চট্টগ্রামে সরকার কর্তৃক স্বীকৃত নিম্নলিখিত সমিতিগুলো ছিল— ১. চিটাগং চেম্বার অব কমার্স, চেম্বার অব কমার্স বিল্ডিং, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম ২. দ্য মুসলিম চেম্বার অব কমার্স, রফিক মঞ্জিল, স্টেশন রোড, চট্টগ্রাম ৩. সিটি চেম্বার অব কমার্স, চিটাগং ফিরিঙ্গি বাজার রোড, চট্টগ্রাম ৪. পাকিস্তান চেম্বার অব কমার্স, খাতুনগঞ্জ, চট্টগ্রাম’ (তথ্যসূত্র: চট্টগ্রামের শিল্প ও বাণিজ্য: সৈয়দ আহমদুল হক)। একীভূত হওয়ায় বাইরে থেকে যায় আগ্রাবাদ চেম্বার অব কমার্স (১৯৬০), বর্তমানে তা ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার নামে ঢাকায় কার্যক্রম চালাচ্ছে।

চিটাগং চেম্বার টু দ্য ফোর

এ রকম কিংবদন্তি রয়েছে যে, পাকিস্তানের বাজেট প্রণয়নের সময় ‘ইসলামাবাদ’ চিটাগং চেম্বারের সুপারিশগুলোর জন্য অপেক্ষা করত। এদিকে সূত্রমতে জানা যায়, এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে চিটাগং চেম্বারের ভূমিকা রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান-পশ্চিম পাকিস্তান যে অর্থনৈতিক বৈষম্য রয়েছে, তার পরিসংখ্যান সরবরাহ করেছে এ চেম্বার। কমার্স কলেজে অনুষ্ঠিত অর্থনীতি সমিতির কনফারেন্সে এ.কে. খান এ তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেন। (তথ্যসূত্র: একে খান স্মারকগ্রন্থ), যা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সংগ্রহ করে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে চিটাগং চেম্বারের সহাসী ভূমিকা ছিল। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অর্থনৈতিকভাবে দেশ পুনর্গঠনে চিটাগং চেম্বার ভূমিকা রাখে।

চেম্বারের কার্যক্রম

এ চেম্বারের ভাষ্য অনুযায়ী অর্ডিনারি, অ্যাসোসিয়েট, গ্রুপ (পণ্যভিত্তিক), টাউন অ্যাসোসিয়েশন (থানাভিত্তিক) প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আনুমানিক সাত হাজার সদস্য রয়েছে। এর একজন প্রেসিডেন্ট, একজন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়ে মোট ২৪ জনের বোর্ড অব ডিরেক্টরস ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পালন করে। ২০১৭ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী, যেকোনো ডিরেক্টর রিটায়ারমেন্ট ছাড়া আনলিমিটেড পিরিয়ডের জন্য নির্বাচন করতে পারবেন। দেশের তথা চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়নের জন্য এ চেম্বারের ১৪টি মুখ্য উদ্দেশ্য রয়েছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক আরবিট্রেশন, ব্যবসায়ীদের স্বার্থ প্রমোট ও প্রটেক্ট, চট্টগ্রামের উন্নয়ন ইত্যাদি রয়েছে।

চেম্বার কমপক্ষে ৪০টি আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ের কমিটির সদস্য, সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক লিয়াজোঁ রাখে। এশিয়া ও ইউরোপের কমপক্ষে ১২টি দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক চুক্তি রয়েছে। ভারতের সেভেন সিস্টারের সঙ্গে বাণিজ্যের সূচনা করে চিটাগং চেম্বার। সর্বশেষ ২০১৭ সালে চিটাগং চেম্বার তাইওয়ানে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে CACCI অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

২০০১-১০ দশকে চিটাগং চেম্বারের জন্য দ্বিতীয় বিপ্লব ঘটে। এ দশকেই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নির্মাণকাজ শুরু হয়। এ দশকে সেভেন সিস্টারের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নবদিগন্ত রচিত হয়। জাপান, ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাণিজ্য প্রতিনিধি দল আদান-প্রদানের মাধ্যমে চিটাগং চেম্বার বৈশ্বিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করে। জাপানের টোকিওতে চেম্বারের উদ্যোগে ট্রেড সেন্টার স্থাপন করা হয়, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে কাস্টম অটোমেশন চালু, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রজেক্ট এসইডিএফ স্থাপন, জার্মান প্রজেক্ট জিটিজেড সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমান সরকারের বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চলের কনসেপ্ট এ চেম্বারই প্রথম দেয়। চিটাগং চেম্বার কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সফল হয়। বিশেষ করে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য সরবরাহ করে তৃণমূল জনগণের কাছে পৌঁছে যায়। ২০১৩ সালে পুরনো চেম্বার হাউজ থেকে বর্তমান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে চেম্বারের অফিস স্থানান্তর করা হয়।

২. এলিট চেম্বার: চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ

২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯ সালে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে চেম্বারটি প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়। এই চেম্বারের সূত্রমতে, বর্তমান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসিও এর উদ্যোক্তা ছিলেন। পরবর্তীতে সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলামকে কমিটিতে কোঅপ করে সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু চিটাগং চেম্বার ও ফেডারেশন চেম্বার আপত্তি ও মামলার কারণে এ চেম্বার গঠন বিলম্বিত হয়। পরবর্তীতে সিডিএর চেয়ারম্যান আবদুচ সালাম সভাপতি হিসেবে ১/১১-এর শেষ দিন সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান কর্তৃক এর লাইসেন্স দেয়া হয়। ২২ জানুয়ারি ২০১০ বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান এ চেম্বারের উদ্বোধন করেন। এ চেম্বার দেশের শিপিং ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং ব্যবসায় নানা অনিয়ম-দুর্নীতি দূরীকরণ মেলার আয়োজন করাসহ ইত্যাদি কার্যক্রম করে যাচ্ছে। এর ৪২টি সাব-কমিটি ও ৭০০ সদস্য রয়েছে। এ চেম্বার বন্দর ও কাস্টমসে সমস্যা সমাধানে বেশ ভূমিকা রাখছে। তারা ঢাকা চট্টগ্রামে একটি করে পৃথক বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার জন্য আবেদন জানিয়েছে। এর বর্তমান কমিটি হচ্ছে: প্রেসিডেন্ট খলিলুর রহমান, প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট শওকত আলী চৌধুরী, ভাইস প্রেসিডেন্টরা হচ্ছেন— মো. সাইফুল আলম, এএম মাহবুব চৌধুরী, এমএ মালেক, মো. আবদুচ সালাম, ট্রেজারার মো. নূরুল আবছার; পরিচালকরা হচ্ছেন— মো. শাহাবুদ্দীন আলম, আবুল বাশার চৌধুরী, মো. আবদুল আওয়াল, আমিনুজ্জামান ভূঁইয়া, সফিক উদ্দীন, আবুল কালাম, ডা. মহসীন জিল্লুর করিম, সেলিম রহমান, ইকবাল হোসেন চৌধুরী, আবদুস সামাদ লাবু, ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন, প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ, মোহাম্মদ নাসিরুদ্দীন, এসএম শামীম ইকবাল, নাদের খান, প্রফেসর জাহাঙ্গীর চৌধুরী, সৈয়দ নূরুল ইসলাম, লিয়াকত আলী চৌধুরী, এনামুল হক, হাজী এ এ মালেক, চৌধুরী মহীবুল হাসান নোফেল, এ এম আবদুল হাই, হাজী মোহাম্মদ ইউনুস, সৈয়দ মোহাম্মদ আবু তাহের, আলহাজ মোহাম্মদ শফি, আবু সাঈদ চৌধুরী সম্রাট, মোহাম্মদ লোকমান হাকীম, ডব্লিউআরআই মাহমুদ রাসেল, মুহাম্মদ মহসীন, সুলতানা শিরীন আকতার, দিদারুল আলম, জসিম উদ্দীন চৌধুরী, আমের আলী হোসাইন, হাজী ইউনুস  আহমেদ ও সাজির আহমেদ। চেম্বারটির তথ্যমতে, পরিচালকরা বৃহত্তর চট্টগ্রামের ২০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানসহ দেশের সিংহভাগ কর, ভ্যাট, রাজস্ব ও শুল্ক প্রদানকারী।

৩. জাগো নারী বহ্নিশিখা: চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি

আমাদের জানামতে, ২০০২ সালে চিটাগং চেম্বার সংঘবিধি সংশোধন করে উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিউর স্ট্যান্ডিং কমিটি নামে একটি নতুন কমিটি গঠন করেন। এতে উইমেন চেম্বারের সাবেক প্রেসিডেন্ট মনোয়ারা হাকিম আলীকে কনভেনার করা হয়। এর পরে তারা চিটাগং চেম্বার আয়োজিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ শুরু করে। সেখানে রাঙ্গামাটি উপজাতীয় বস্ত্রসহ বিভিন্ন সেক্টরে নারীদের অংশগ্রহণ শুরু হয়। পরবর্তীতে এ উপজাতীয় উদ্যোক্তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান হন।

পরবর্তী প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের নারী শিল্পোদ্যোক্তারা উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিউর গঠন করেন। এ এন্ট্রাপ্রেনিউরের উদ্যোগে বাওয়া স্কুল মাঠে বেশক’টি শিল্পের পণ্যমেলা আয়োজন করে। পরবর্তীতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের এসএমই সেল ২০০৬ সালের ৮ আগস্ট ঢাকায় আয়োজন করে প্রথম জাতীয় এসএমই মহিলা উদ্যোক্তা সম্মেলন। এটি ছিল মূলত ক্ষুদ্র মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের সমস্যা, ভাবের আদান-প্রদান, নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করা। এ সম্মেলন থেকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত হয় চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তারা। তারা চিন্তাভাবনা করে কীভাবে পণ্য বিপণন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও বিদেশী ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাকে সম্পৃক্ত করা যায়। তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে শিল্প মন্ত্রণালয়ের এসএমই ফাউন্ডেশন।

সার্বিকভাবে আমরা বলতে পারি, কিছু ঘাটতি ছাড়া চট্টগ্রামের এ তিন চেম্বার চট্টগ্রাম তথা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিশ্বায়নের এ প্রেক্ষাপটে একবিংশ শতাব্দীর একটি সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম গড়ে তোলার জন্য সম্মিলিতভাবে অবদান রেখে যাচ্ছে। থ্রি চিয়ার্স ফর থ্রি চেম্বার।

 

লেখক: সাবেক সচিব ও প্রধান নির্বাহী, সিসিসিআই