চাক্তাই খালে শত শত সাম্পান, নৌকা। আকিয়াব থেকে শুরু করে মুর্শিদাবাদ, নদীমাতৃক বাংলার হরেক গঞ্জ পেরিয়ে অথবা তারও দূরের পণ্য নিয়ে এসেছে এসব নৌযান। চাল, ডাল, আটা, ময়দা, তেল, নুন, সুপারি, নারকেল, সরিষা আরো কত কি! শত রকম মানুষের হাজার রকম চল। আরাকানি মগ যেমন আছে, তেমনি আছে মাড়োয়ারি মহাজন। দূরত্ব আর পণ্যের ব্যবধান তো আছেই, কোনো কোনো গলিতে নির্দিষ্ট ভাষা ও কেতার চল, কেউ কেউ বংশপরম্পরায় একই পণ্য নিয়ে দিন নিপাত করে চলেছে সকাল থেকে রাত। রামজয় মহাজন লেনে হিন্দু ব্যবসায়ী-বেপারিরা, আছাদগঞ্জে মুসলিম ব্যবসায়ীরা, গলিতে গলিতে মিশ্র ভাষায় চলছে কথাবার্তা, পণ্যের বিকিকিনি, লেনদেন কর্ণফুলীতে জোয়ার-ভাটার সময়-তিথি গণনার মাধ্যমে। 

উপরের চিত্রটি শত বছরেরও আগের খাতুনগঞ্জের। এরই মধ্যে মানচিত্র পাল্টেছে। পুরনো অনেক মহাজন প্রয়াত হয়েছেন। তাদের জায়গায় নতুন প্রজন্ম এসেছে। কিন্তু খাতুনগঞ্জে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ের ধরন পাল্টায়নি। পাল্টেছে শুধু পণ্যের উত্স। আকিয়াব, রেঙ্গুনের সাম্পান হয়তো বিদায় নিয়েছে, এসেছে বন্দর ঘুরে ভিনদেশী পণ্য।

খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের কোনো এক সময়ে মধ্য চট্টগ্রামে (কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদের মধ্যবর্তী ভূভাগ) হরিকেল নামে একটি স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব হয়েছিল। কালক্রমে অবিভক্ত চট্টগ্রামের ১৬৬ মাইল জুড়ে এ রাজ্যের প্রসার ঘটে। প্রাচীন বাংলার বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ রাজ্যটির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের মধ্যে ছিল রাজধানী বর্ধমানপুর, প্রধান বন্দর দেবগ্রাম এবং প্রধান বিদ্যাচর্চা কেন্দ্র পণ্ডিত বিহার। শিক্ষা, শিল্প, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জ্ঞানচর্চায় প্রাচীন বাংলার একটি অগ্রগামী রাজ্য হিসেবে ঐতিহাসিকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে; যা ভিনদেশী বণিকদের ভারতীয় নৌ-কেন্দ্রিক বাণিজ্যাগমনেরও আগ্রহের কেন্দ্র ছিল। প্রায় পাঁচশত বছর স্থায়ী সমৃদ্ধ রাজ্যটিতে প্রধানত চৈনিক পরিব্রাজক ও বণিকদের আগমন প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তীতে আরাকান রাজবংশের ক্ষমতাশালী রাজা এবং ইতিহাসের স্বাভাবিকতায় রাজ্যটির পতন হয়। তবে পাঁচশত বছরের ইতিহাসে রাজ্যটির অধিবাসীরা বাণিজ্যপরায়ণ জাতি হিসেবে গড়ে উঠেছিল; যা পরবর্তীতে আসা বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর বণিকদের বাণিজ্য সম্প্রসারণকে ত্বরান্বিত করে। হরিকেল রাজ্যের সমৃদ্ধ মুদ্রা ব্যবস্থা, বাণিজ্যনীতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এ অঞ্চলে একটি বাণিজ্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে পরিব্রাজক বণিকদের সামনে। পরবর্তীতে ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে গৌড় সুলতান, ত্রিপুরা রাজ এবং আরাকানি রাজার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পারস্পরিক ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে সুলতান হোসেন শাহ্ কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয় হয়। যদিও ষোড়শ শতকের শেষদিকে আরাকানি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে পর্তুগিজ জলদস্যুদের মাধ্যমে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রিত করার প্রয়াস চালান তৎকালীন শাসকরা।

চট্টগ্রামের জুবিলি রোড। সড়কটির দুধারের পথ ধরে এগোতে থাকলেই চোখে পড়বে সারি সারি হার্ডওয়্যার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। পুরনো হোন্ডা কিংবা আধুনিক স্কুটিতে চড়ে ভিন্ন পোশাক আর চলনে আরেক শ্রেণীর মানুষের নিত্য চলাচল। বোম্বাইওয়ালা নামধারী জনপ্রিয় সব খাবারের দোকান চট্টগ্রাম শহরের আনাচে-কানাচে। দেখতে ভিন্ন, এক ধরনের বিশেষ টুপি পরিহিত কিংবা নারীদের বিশেষ পোশাক আর ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির কারণে মানুষের কাছে বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখেন এ ব্যবসায়ীরা। ফিরিঙ্গিবাজারে পর্তুগিজ দস্যুদের এ দেশীয় বংশধরদের এখনো ম্রিয়মাণ চলাচল কিংবা আকবর শাহ্ এলাকার বিহারি জনগোষ্ঠীর বুটিকসের বাণিজ্য আর কারুকার্য, আনোয়ারা উপজেলায় প্রাচীন দেয়াঙ পরগনায়  খোট্টা জাতিগোষ্ঠীর মিশ্র ও অস্পষ্ট ভাষালাপ, চট্টগ্রামের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস সহজেই মনে করিয়ে  দেয়  কোনো ঐতিহাসিককে।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করে আসছে ভারতীয়, পাকিস্তানি, পর্তুগিজ, আরব, ইরানসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তের জাতিগোষ্ঠী। ভাগ্যের অন্বেষণ কিংবা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসা এদের একটি অংশ এদেশেই স্থানীয় নিবাস গড়ে  তোলেন। যার ধারাবাহিকতায় এখনো চট্টগ্রামের বাণিজ্য অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বন্দরশহর চট্টগ্রামের বাণিজ্য সম্ভাবনার কালে নানা সময়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বসবাস, কালের পরিক্রমায় এ দেশের মায়া ছাড়তে না পারার যাতনা বাণিজ্যে প্রতিষ্ঠিত করে  দেয় তাদের। মধ্যযুগের পরপরই পর্তুগিজদের আগমনেরও অনেক পূর্বে এয়মন ও ব্যাবিলনীয় অঞ্চলের অমুসলমান আরব নাবিকরা যখন পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের সাথে ব্যবসাসূত্রে জড়িত হয়, তখন থেকেই চট্টগ্রাম ছিল প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। 

আকবর শাহ এলাকায় এখনো কয়েক হাজার বিহারি বংশপরম্পরায় বাস করে আসছে। বাংলাদেশে পাকিস্তানি বুটিক শিল্পের কাজ তারাই করছে দীর্ঘদিন ধরে। যদিও নানান কারণে আদি পেশা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে বিহারিরা। এ দেশের মসলা বাণিজ্যের সিংহভাগই নিয়ন্ত্রণ করে মেমন বা বোম্বাইওয়ালারা। ভারত ও পাকিস্তানে নিজ ধর্মীয় আত্মীয়দের বসবাস থাকায় সহজেই মসলাপণ্য আমদানির মাধ্যমে নিশ্চিত মুনাফার সুযোগ রয়েছে তাদের।

অষ্টম শতকে ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের আরব বণিকদের নৌবাণিজ্যের চট্টগ্রাম বন্দরেও বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়। পাহাড়পুরের বৌদ্ধ ধ্বংসস্তূপে বাগদাদের খলিফা হারুন অর রশিদের একটি মুদ্রা পাওয়া যায়; ওই মুদ্রাটি ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের মুহাম্মদীয়া টাকশালে তৈরি হয়। অনুরূপ মুদ্রা পাওয়া গেছে ১৯৫৫-৫৬ সালে কুমিল্লার ময়নামতী অঞ্চলের লালমাই এলাকার শালবন বিহারের ধ্বংসস্তূপ উত্খননের ফলে। শালবন বিহারের ধ্বংসস্তূপের সর্বনিম্ন স্তরে দুটি আরব দেশীয় মুদ্রা পাওয়া যায়। এর একটি দিরহাম বা রৌপ্যমুদ্রা আর অন্যটি নিদার বা স্বর্ণমুদ্রা। দিরহামটি ভগ্নপ্রায় ও জীর্ণ অবস্থায় পাওয়া গেছে বিধায় আর্কিওলজি বিভাগের রিপোর্টে সেটির পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি। দিরহামটি ভগ্ন হওয়া সত্ত্বেও এর কুফি অক্ষর প্রমাণ করে যে, এটি খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর পরবর্তীকালের মুদ্রা নয়। সম্ভবত খলিফা হারুন অর রশিদের (৭৮৬-৮০৪ খ্রি.) মুদ্রা এটি। দিনারটি অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে বিধায় মুদ্রাটি শেষ আব্বাসীয় খলিফা মুস্তাকিম বিল্লাহর (১২৪২-১২৫৪ খ্রি.) আমলের বলে অনুমিত হয়। অষ্টম শতক থেকে আরব বণিকরা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে নদীপথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ব্যবসা করার সময় মুদ্রাগুলো পাহাড়পুর কিংবা কুমিল্লায় পতিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় ঐতিহাসিকদের কাছে।

ভাষা ও ইতিহাসবিদদের তথ্যানুসারে, বোহরা শব্দের অর্থ ব্যবসায়ী। ঐতিহ্য ও পারিবারিকভাবেই ব্যবসার সাথে যুক্ত বোহরা জনগোষ্ঠীর মানুষ। চট্টগ্রামে বোহরারা বেশি করেন হার্ডওয়্যারের ব্যবসা। সেনেটারি ব্যবসায়ও তাদের বড় আধিপত্য রয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি এলাকায় বোহরারা বসবাস করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। নিজেদের সংস্কৃতি ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অন্যদের সাথে আলোচনা কিংবা আলাপচারিতা করতে চায় না তারা। বিশ্বব্যাপী দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ হলেও ভারতে সম্প্রদায়টির আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। তাদের সংস্কৃতি ইয়েমেনি, মিসর, আফ্রিকা, পাকিস্তান ও ভারতের মিশেল আছে। তাদের নিজস্ব ভাষার নাম লিসান-আল-দাওয়াত বা দাওয়াতের ভাষা। এটি মূলত গুজরাটি ভাষার একটি কথ্যরূপ। তবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বাংলা ভাষার ব্যবহার করলেও কয়েক প্রজন্মের পরও তাদের ভাষার স্বকীয়তা লক্ষ করা যায়।

বোহরা

ভাষা ও ইতিহাসবিদদের তথ্যানুসারে, বোহরা শব্দের অর্থ ব্যবসায়ী। ঐতিহ্য ও পারিবারিকভাবেই ব্যবসার সাথে যুক্ত বোহরা জনগোষ্ঠীর মানুষ। চট্টগ্রামের বোহরারা বেশি করেন হার্ডওয়্যারের ব্যবসা। সেনেটারি ব্যবসায়ও তাদের বড় আধিপত্য রয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি এলাকায় বোহরারা বসবাস করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। নিজেদের সংস্কৃতি ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অন্যদের সাথে আলোচনা কিংবা আলাপচারিতা করতে চান না তারা। বিশ্বব্যাপী দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ হলেও ভারতে সম্প্রদায়টির আধিপত্য বেশি। তাদের সংস্কৃতিতে ইয়েমেনি, মিসর, আফ্রিকা, পাকিস্তান ও ভারতের মিশেল আছে। তাদের নিজস্ব ভাষার নাম লিসান-আল-দাওয়াত বা দাওয়াতের ভাষা। এটি মূলত গুজরাটি ভাষার একটি কথ্যরূপ। তবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বাংলা ভাষার ব্যবহার করলেও কয়েক প্রজন্মের পরও তাদের ভাষার স্বকীয়তা লক্ষ করা যায়।

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে ঘর-বাড়ি নির্মাণের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। কুঁড়েঘর কিংবা মাটির দালানের মাধ্যমে এখানকার মানুষ বসবাস করত। ব্রিটিশ ভারতের এখানকার জমিদার বা অবস্থাসম্পন্ন পরিবারগুলো ইটের দালান তৈরি করলেও বাঁশ ও টিনের ব্যবহারই ছিল প্রধান। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে আধুনিক বাড়ি নির্মাণের প্রচলন শুরু হলেও দেশীয় পদ্ধতির ব্যবহারই ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার পর পাকিস্তান আমলে এ অঞ্চলে শিয়া মুসলমানদের একটি  সম্প্রদায় বোহরাদের প্রবেশ ঘটে। এ অঞ্চলে আধুনিক হার্ডওয়্যার সামগ্রী ও সেনেটারি যুগের সূচনা মূলত তাদের হাত ধরেই।

চট্টগ্রামে সর্বসাকল্যে ৬০০ জনের কিছু বেশি বোহরা জনগোষ্ঠীর বসবাস। তাদের আদি নিবাস ছিল ইয়েমেনে। ভারতের সুরাট আর মুম্বাইয়ে তাদের বড় গোষ্ঠী আছে। পাকিস্তানের করাচিতেও বোহরাদের বসবাস রয়েছে। দাউদি  বোহরা সম্প্রদায় ইসমাইলি শিয়াদের একটি শাখা। বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসের জটিলতায় তাদের অনেকেই বিদেশেও  থাকেন। পরে ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে বোহরা জনগোষ্ঠীর মানুষরা। এই জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী হিসেবে সমধিক পরিচিত বিএসআরএম গ্রুপের মালিক আলীহোসাইন আকবরআলী। দেশের ইস্পাত শিল্পের পুরোধা হিসাবে পরিচিত আলীহোসাইন আকবরআলীর কল্যাণে বোহরা গোষ্ঠীর কিছু সদস্য ইস্পাত পণ্য বিপণনের সাথেও যুক্ত। চট্টগ্রামের সদরঘাট, খাতুনগঞ্জসহ বেশকিছু এলাকায় মেশিনারিজ ও ইস্পাত শিল্পের সাথে জড়িত তারা।

চট্টগ্রামের এনায়েত বাজার ও জুবিলী রোড এলাকায় বোহরা সম্প্রদায়ের বসবাস সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশে বোহরাদের কত সালে অনুপ্রবেশ তার নির্দিষ্ট কোনো ধারণা না থাকলেও শতবর্ষেরও আগে থেকে এ অঞ্চলে বসবাস বোহরাদের। তবে ঢাকার নবাবপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে কিছু বোহরার বসবাস রয়েছে। কৃষি মেশিনারিজ, সেনেটারি খাতেও বোহরা সম্প্রদায় ব্যবসা করছে দাপটের সঙ্গে। ভারত ও পাকিস্তান থেকে নিত্যনতুন হার্ডওয়্যার ও  সেনেটারি পণ্য আমদানির মাধ্যমে দেশীয় ব্যবসায়ীদের কাছে পাইকারিও বিক্রি করে তারা। অন্য ধর্ম কিংবা ভিন্নগোষ্ঠীর সাথে বোহরাদের মেলামেশা না থাকলেও শুধুমাত্র ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বাংলাদেশের মানুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। তবে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সততার পরীক্ষায় উত্তীর্ণরাই বোহরাদের সবচেয়ে কাছে যাওয়ার সুযোগ পায় বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের একাধিক ব্যবসায়ী।

বোহরা সম্প্রদায় রীতিনীতির ক্ষেত্রে নিজেদের স্বকীয়তা ধরে রাখতে খুবই সচেতন। পুরুষরা সাধারণত পায়জামা-পাঞ্জাবি পরেন। সব সময় একটি বিশেষ ধরনের টুপি রাখেন মাথায়। মহিলারা  বোরকা পরেন। তাদের খাওয়া-দাওয়াসহ প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডের সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে মিল  নেই। বিশেষায়িত খাদ্যপণ্য প্রস্তুত ও বিপণনকারী হিসেবেও বোহরা সম্প্রদায় সমাদৃত। পাকিস্তান কিংবা ভারতের নানান খাদ্যদ্রব্য বাংলাদেশে শুধুমাত্র বোহরা গোষ্ঠীই সঠিকভাবে প্রস্তুত করে বলে বোহরাদের পরিচালিত খাদ্যপণ্যের ব্যবসা খুবই জমজমাট।

চট্টগ্রামের হার্ডওয়্যার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ হার্ডওয়্যার, কোরাইশ হার্ডওয়্যার, গিয়াস ট্রেডিং, আফসার ট্রেডার্স, জামরি ট্রেডার্স, চাঙ্গী করপোরেশন, বাদরী মিলস, কুতুবী ট্রেডার্সসহ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বোহরাদের হার্ডওয়্যার ব্যবসা চট্টগ্রামের প্রথম সারিতে রয়েছে। আমদানি করে নিজেদের সম্প্রদায়ের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই বিপণনে আগ্রহী বোহরা সম্প্রদায়ের বড় ব্যবসায়ীরা। 

মেমন বা গুজরাটি সম্প্রদায়গুলোর মতোই বোহরা সম্প্রদায়ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে বাংলাদেশে বসবাস করে। বর্তমানে বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে বাস করলেও এখানকার অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সাথে তাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই বললেই চলে। নতুন প্রজন্ম পড়াশোনা করলেও শেষ পর্যন্ত নিজেদের ব্যবসায় তাদের শেষ গন্তব্য। বোহরাদের কেউ কেউ হার্ডওয়্যার ব্যবসায় প্রথম সারিতে থাকলেও নিজ গোষ্ঠীর পিছিয়ে পড়াদের সহযোগিতা করতে নিজেদের ব্যবসায় সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে চায় তারা।  

বোহরা সম্প্রদায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের কনের পিতারা সর্বাপেক্ষা সুখী। কারণ তাদের বিয়েতে কোনো পণ দিতে হয় না। তাদের আধ্যাত্মিক নেতার উপস্থিতিতে ভারতে অনেক গণবিবাহও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভারতে বড় শিল্পপতিদের উল্লেখযোগ্য অংশ বোহরা সম্প্রদায়ের। বিয়েতে পণ প্রদানের রীতি না থাকলেও কাবিন হিসেবে মাত্র ৭৮৬ টাকা প্রদান করে থাকে যা বরকতের আমানত হিসেবে দেয়া হয়। কেউ  কেউ এর  বেশিও দিতে পারে, তবে সেটা কোনোভাবেই ৫ হাজার টাকার বেশি হয় না। অর্থাৎ ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে মিতব্যয়ী বোহরা জনগোষ্ঠী নিজেদের কাজে একনিষ্ঠ থাকে। ভারতের বড় শিল্প গ্রুপগুলোর একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা রয়েছে বোহরা সম্প্রদায়ের।

মেমন

মেমন বা গুজরাটি বোম্বাইওয়ালা নামেই বেশি পরিচিত। জনসংখ্যার হিসাবে তিন হাজারেরও কম। তার পরও দেশের ভোগ্যপণ্য বিশেষ করে মসলা ব্যবসার বড় অংশই তাদের নিয়ন্ত্রণে। হলুদ, মরিচ, জিরাসহ ভারত-পাকিস্তানে উৎপাদিত পণ্যের আমদানিকারক মূলত তারাই। ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে রয়েছে বোম্বাইওয়ালাদের শক্তিশালী উপস্থিতি। চাক্তাই, আসাদগঞ্জ, জুবিলি রোডের টাইলস ও মেশিনারি মার্কেটজুড়েও রয়েছে তাদের ব্যবসার সুপরিসর জগৎ। বেকারি ব্যবসায় মেমনদের রয়েছে দীর্ঘদিনের সুনাম। চট্টগ্রামের বাইরে রাজধানীর মৌলভীবাজারের ভোগ্যপণ্যের ব্যবসাও অনেকটা তাদের হাতেই। সব মিলিয়ে সংখ্যায় ছোট হলেও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব সৃষ্টিকারীর নাম মেমন সম্প্রদায়।

উপমহাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে মেমনদের আধিপত্য দীর্ঘদিনের। ১৯৫৯ সালে পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, সে সময় পাকিস্তানে মুসলিম মালিকানাধীন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাড়ে ২৬ শতাংশ ছিল মেমনদের নিয়ন্ত্রণে। তখনো পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার তারা ছিলেন মাত্র দশমিক ১৬ শতাংশ। স্বাধীনতার পর আদমজি, দাউদ, বাওয়ানীদের ব্যবসা এ ভূখণ্ডে বন্ধ হয়ে গেলেও দেশের ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা এখনো নিয়ন্ত্রণ করছেন নূর মোহাম্মদ, মো. রাজ্জাকদের মতো মেমনরা। ওয়ার্ল্ড মেমন অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে এ সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা ১০ লাখের মতো। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাড়ে পাঁচ লাখের বসবাস ভারতে। পাকিস্তানে বাস করে সোয়া চার লাখের মতো। আর বাংলাদেশে এ সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। চট্টগ্রামে প্রায় হাজার খানেক বোম্বাইওয়ালা রয়েছেন। ভারত ও পাকিস্তানে আত্মীয়স্বজন থাকায় সেসব দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন তারা। আমদানির ক্ষেত্রেও বেশ কৌশলী বোম্বাইওয়ালারা। পণ্যের বর্তমান দাম ও ফিউচার মার্কেটে লেনদেনের ওঠানামা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের পরই পণ্য আমদানি করেন তারা। আমদানির পাশাপাশি পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্ক থাকায় লোকসান তেমন হয় না বললেই চলেই। ব্যাংকের লেনদেনও সুনামের সঙ্গে করে আসছেন এসব ব্যবসায়ী।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে মগ, আরাকানি, গুজরাটি, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ,  মেমন বা গুজরাটি জনগোষ্ঠীর বসবাস দীর্ঘদিনের। দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে মেমন জনগোষ্ঠীর বাসিন্দারা মসলার কারবারি হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। বোম্বাইওয়ালা হিসেবে অধিক পরিচিত দেশে মসলাসহ কেমিক্যাল আমদানি ও বিপণনে একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি সফল। ভারত ও পাকিস্তানে উৎপাদিত হলুদ, মরিচ, জিরা, এলাচ, লবঙ্গ, গোলমরিচসহ বিভিন্ন ধরনের মসলা আমদানির মাধ্যমে দেশীয় পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে তারা। মেমন সম্প্রদায়ের সবচেয়ে সফল ব্যবসায়ী খান জাহান আলী ট্রেডার্সের মালিক মা. নূর মোহাম্মদ কিংবা বিএসআরএম গ্রুপের আলীহোসাইন আকবরআলীর ব্যবসায়িক সাফল্য চট্টগ্রাম তথা সারা বাংলাদেশের বাণিজ্যে অভিবাসী হয়ে আসা বণিক জাতিদের যে স্বাক্ষর চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে, তা ইতিহাসের নানা অধ্যায়ে সংঘাত ও রক্তপাত সত্ত্বেও এ অঞ্চলের ভৌগোলিক অর্থনীতিকে করেছে সমৃদ্ধ, যার সূত্র ধরেই এখনো বিশ্ব কিংবা সারা দেশের বিনিয়োগ আর্কষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চট্টগ্রাম।

 

লেখক: সাংবাদিক