দুই হাজার বছর আগের বন্দর শহর চট্টগ্রামের বিবরণ রোমান, গ্রিক, আরব নাবিক ও ভূগোলবিদ এবং পাশ্চাত্যের পর্যটক ও ঐতিহাসিকদের লেখা বিভিন্ন গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। বাংলার প্রাচীন বন্দরগুলোর যে বিবরণ ইউরোপীয় পর্যটকরা লিপিবদ্ধ করেছেন তাতে জানা যায়, সেকালে নদীতীরে যেখানে বিদেশী পণ্যবাহী তরী ভিড়ত, সেখানে সাময়িককালের জন্য বাজার বসত। ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে সেসব স্থানে বাঁশ-খড়ের কাঁচা ঘর নির্মিত হতো। বণিকেরা জিনিসপত্র বেচাকেনার পর জাহাজ নিয়ে অন্যত্র পাড়ি জমালে স্থানীয় লোকজন সে বাঁশ-খড়ের ঘর ভেঙে নিয়ে যেত অথবা নিজেরা দখল করে নিত, স্থায়ী বাজার বা শহরের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হতো না। প্রাচীন তমলুক ও সাতগাঁও বন্দরের মতো কর্ণফুলী নদীতীরে যেখানে যখন যে বিদেশীর বাণিজ্যতরী ভিড়ত, তখন সেখানকার তীরভূমিতে সাময়িককালের জন্য বাজার বসত। অর্থাত্ তখন প্রথাগতভাবে পাকা ভবন পরিশোভিত শহর স্থাপিত হয়নি বা গড়ে ওঠেনি। ঐতিহাসিকদের সর্বসম্মত মত এই যে, খ্রিস্টপূর্ব দুই শতক থেকে ইয়েমন ও ব্যাবিলনীয় অঞ্চলের অমুসলমান আরব নাবিকরা যখন পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের সাথে ব্যবসা সূত্রে জড়িত হয়, তখন থেকেই চট্টগ্রাম ছিল তাদের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। ৬৪ খ্রিস্টাব্দে রোমান ঐতিহাসিক প্লিনির রচিত ‘পেরিপ্লাস অব দি ইরিত্রিয়ান সি’ গ্রন্থের লিখিত বিবরণীতে চট্টগ্রাম ন্দর সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা যায়। অষ্টম শতকে ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের আরব বণিকদের নৌবাণিজ্যকালে চট্টগ্রাম বন্দরেও বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়।
পাহাড়পুরের বৌদ্ধ ধ্বংসস্তূপে বাগদাদের খলিফা হারুন অর রশীদের একটি মুদ্রা পাওয়া গেছে। মুদ্রাটি ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের মোহাম্মদীয়া টাঁকশালে তৈরি হয়। অনুরূপ মুদ্রা পাওয়া গেছে কুমিল্লার ময়নামতি অঞ্চলের লালমাই এলাকার শালবন বিহারের ধ্বংসস্তূপ উত্খননকালে। শালবন বিহারের ধ্বংসস্তূূপের সর্বনিম্নস্তরে দুটি আরব দেশীয় মুদ্রা পাওয়া যায়। এর একটি দিরহাম বা রৌপ্যমুদ্রা আর অন্যটি দিনার বা স্বর্ণমুদ্রা। দিরহামটি ভগ্নপ্রায় ও জীর্ণ অবস্থায় পাওয়া যায়। আর্কিওলজি বিভাগের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এর পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ড. মুহাম্মদ এনামূল হক বলেন, দিরহামটি ভগ্ন হওয়া সত্ত্বেও এর কুফী অক্ষর প্রমাণ করেছে, এটি খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর পরবর্তীকালের মুদ্রা নয়। সম্ভবত এটি খলিফা হারুন অর রশীদের (৭৮৬-৮০৪ খ্রি.) মুদ্রা। দিনারটি অক্ষত অবস্থায় আছে, এটি তোগরা হরফে উৎকীর্ণ। মুদ্রাটি শেষ আব্বাসীয় খলিফা মুস্তাকিম বিল্লাহর (১২৪২-৫৪ খ্রি.) আমলের বলে অনুমিত হয়। অষ্টম শতক থেকে আরব বণিকরা চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে নদীপথে বাংলার অভ্যন্তরে ব্যবসা করার সময় মুদ্রাগুলো পাহাড়পুরে ও কুমিল্লায় নীত হয়েছিল। পাহাড়পুরে প্রাপ্ত মুদ্রাটি ধ্বংস্তূপের ভেতর থেকে আবিষ্কার হওয়ায় ডক্টর আবদুল করিম মনে করেন, বৌদ্ধকীর্তি ধ্বংসের পরই (দশম শতকের পর) মুদ্রাটি পাহাড়পুরে নেয়া হয়েছিল। গুপ্তধন সন্ধানকারীরা সেখানকার মাটি খনন করলে সেটি পাওয়া সম্ভব হয়।
ঐতিহাসিকদের অভিমত এই যে, কর্ণফুলীর দক্ষিণ-পূর্ব তীরে সুপ্রাচীনকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর বা শহর প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং এ বন্দরের কাছেই আরাকানিদের অত্যন্ত শক্তিশালী চাটিগাঁ দুর্গ এবং পরবর্তীতে পর্তুগিজ গির্জা, পর্তুগিজ পল্লী ও পোর্টোগ্রান্ডো নামক পৃথিবীখ্যাত বন্দর প্রতিষ্ঠিত হয়।
নবম-দশম শতকের দেয়াঙ এলাকায় দেব বংশীয় রাজাদের রাজধানী বা শাসনকেন্দ্র ছিল। তার ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় আবিষৃ্কত বিভিন্ন শিলালিপি ও স্মারক নিদর্শনে। দেয়াঙে দেব বংশীয় রাজাদের রাজধানী স্থাপিত হলেও রাজবংশের পতনের পর তা ধ্বংস হয়ে যায়। হরিকেলরাজ কান্তিদেবের রাজধানী বর্ধমানপুরে উৎকীর্ণ তাম্রশাসন আবিষ্কার হয়েছিল বন্দর শহরের স্মারক নিদর্শন এই দেয়াঙ পাহাড়ের ‘বড়-উটান’ গ্রাম থেকে। এ বড়-উটান নামটি রাজা কান্তিদেবের তাম্রশাসনে বর্ণিত বর্ধমানপুরের বিবর্তিত রূপ। ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলেন, এ তাম্রশাসন রাজা কান্তিদেব ৮৫০ থেকে ৯৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী কোনো এক সময় হরিকেলের রাজধানী বর্ধমানপুরে উৎকীর্ণ করেছিলেন। বিভিন্ন তথ্যের আলোকে ঐতিহাসিকরা হরিকেল রাজ্যের অবস্থান সম্পর্কে বিভিন্নভাবে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। এ প্রসঙ্গে ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলেন, হরিকেল রাজ্যের রাজধানী বর্ধমানপুর ও পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান অভিন্ন। ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী ও ড. রাধাগোবিন্দ বসাকও উপরোক্ত মতো সমর্থন করেন। ড. হেমেন্দ্রচন্দ্র রায় চৌধুরী বলেন, পশ্চিমবঙ্গ ও বর্ধমানের সঙ্গে প্রাচীন হরিকেল রাজ্যের রাজধানী বর্ধমানপুরের সম্পর্ক থাকতে পারে না। ড. সুনীতি ভূষণ কানুনগো হরিকেল রাজ্যের অবস্থান ও তার রাজধানী বর্ধমানপুর সম্পর্কে বলেন, চৈনিক পরিব্রাজক ইউ-হে তার বিবরণীতে লিখেছেন, হরিকেল রাজ্য সিংহল থেকে সমুদ্রপথে ৩০ দিনের পথ এবং নালন্দা থেকে ১০০ যোজন (৮০০ মাইল) দূরে অবস্থিত।
সুতরাং ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার প্রমুখ ঐতিহাসিকদের সিদ্ধান্ত অনুসারে নালন্দার অদূরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান হরিকেল রাজ্যের রাজধানী হতে পারে না। মেঘনা নদীর পূর্ব অববাহিকায় হরিকেল রাজ্য অবস্থিত ছিল। চীনা পরিব্রাজক ইউ-হে বর্ণিত নালন্দা থেকে ১০০ যোজন বা ৮০০ মাইল দূরে হরিকেলের অবস্থিতির দূরত্বের সঙ্গে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ত্রিপুরার সামগ্রিক ভূখণ্ডের দূরত্ব এক। সুতরাং মেঘনা নদীর পূর্ব অববাহিকায় হরিকেল রাজ্য অবস্থিত ছিল। সেকালে সিংহল থেকে সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম ৩০ দিনের পথ ছিল। উইলিয়াম হান্টারের গ্রন্থে চট্টগ্রাম অংশের বড়-উটান গ্রামের নাম বর্ধমানপুররূপে লিপিবদ্ধ দেখা যায়।
চট্টগ্রাম বন্দরে আরব্য বণিক
আধুনিক ঐতিহাসিকদের সর্বসম্মত মত এই যে, চট্টগ্রাম বন্দর পৃথিবীর প্রাচীনতম বন্দরগুলোর অন্যতম। খ্রিস্টপূর্ব দুই শতক থেকে ইয়েমেন ও ব্যাবিলনের অমুসলমান আরব বণিকরা পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যকালে চট্টগ্রাম বন্দর ছিল তাদের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। রোমান ঐতিহাসিক প্লিনির ৬৪ খ্রিস্টাব্দে রচিত ‘পেরিপ্লাস অব দি ইরিত্রিয়ান সি’ গ্রন্থের বিবরণেও চট্টগ্রাম বন্দর সম্পর্কে জানা যায়। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে মুসলমান আরব্য বণিকরা ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে নৌবাণিজ্যকালে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়। পাহাড়পুরের বৌদ্ধ ধ্বংসস্তূপ বাগদাদের খলিফা হারুনর রশিদের একটি মুদ্রা আবিষ্কার হয়। মুদ্রাটি ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের মুহাম্মদীয় টাঁকশালে তৈরি। তা থেকে প্রমাণিত হয়, তখন থেকে আরব বণিকেরা চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে নদীপথে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ নৌবাণিজ্য করত। তৎকালে সে সূত্রে মুদ্রাটি পাহাড়পুরে নীত হয়েছিল। ড. আবদুল করিম কেএন দীক্ষিতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, মুদ্রাটি পাহাড়পুরের ধ্বংসস্তূপে উপরিভাগে আবিষ্কৃত হওয়ায় প্রমাণ হয় যে, পাহাড়পুর ধ্বংস হওয়ার পর অর্থাত্ দশম শতাব্দীর পর মুসলমান আমলে মুদ্রাটি সেখানে নীত হয়েছিল। আমাদের ধারণা, মুদ্রাটি পাহাড়পুরের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই ছিল। গুপ্তধন সন্ধানকারী দস্যুরা গুপ্তধনের ধ্বংসস্তূপ এলোপাতাড়ি খননকালে নিম্নস্তর থেকে মাটির সঙ্গে মুদ্রাটি ধ্বংসস্তূপের ওপরে উঠে আসা সম্ভব। অনুরূপ মুদ্রা পাওয়া গেছে ১৯৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লার ময়নামতি অঞ্চলের লালমাই এলাকার শালবন বিহারের ধ্বংসস্তূপের সর্বনিম্নস্তরে। তন্মধ্যে একটি দিরহাম বা রৌপ্যমুদ্রা, অন্যটি দিনার বা স্বর্ণমুদ্রা। দিরহামটি ভগ্নপ্রায় জীর্ণ অবস্থা। আর্কিওলজি বিভাগের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এটির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ড. মুহাম্মদ এনামুল হক বলেন, দিরহামটি ভগ্ন হওয়া সত্ত্বেও এর কুফী অক্ষর প্রমাণ করে যে, এটি খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর পরবর্তীকালের মুদ্রা নয়। সম্ভবত খলিফা হারুনর রশিদের (৭৮৬-৮০৪ খ্রি.) মুদ্রা এটি। দিনারটি অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। এটি তোগরা হরফে উৎকীর্ণ। মুদ্রাটি শেষ আব্বাসীয় খলিফা মূস্তাকিম বিল্লার (১২৪২-১২৫৪ খ্রি.)। অষ্টম শতক থেকে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ আরব নৌবাণিজ্যকালে ওই মুদ্রাগুলো লালমাই শালবন বিহারে নীত হয়েছিল।
সোনারগাঁর শাসনকর্তা ফখর উদ্দিন মোবারক শাহ ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম প্রথম মুসলমান শাসনভুক্ত করেন। তারই সেনাপতি কদল খাঁ গাজী বা কদল খাঁ চট্টগ্রাম অধিকার করে এ দেশ সোনারগাঁর রাজ্যভুক্ত করেন। চট্টগ্রাম বন্দরে তার শক্তিশালী নৌঘাঁটি ছিল। ১৩৪০-১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ অবধি বাংলার সুলতানি আমলের প্রায় ২০০ বছর বন্দর শহর চট্টগ্রাম একটি ঐশ্বর্যশালী সর্বাপেক্ষা বৃহত্ বন্দররূপে প্রতিষ্ঠিত ছিল। গৌড়ের সুলতানদের দূত ১৪০৫, ১৪০৮, ১৪০৯, ১৪১২, ১৪১৪, ১৪৩৮ ও ১৪৩৯ খ্রিস্টাব্দে সাতবার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজে অশ্ব, জিরাফ, রেশমি কাপড় প্রভৃতি উপহারসামগ্রী নিয়ে চীনা সম্রাটের দরবারে গিয়েছিলেন এবং ১৪১৫, ১৪২০ খ্রিস্টাব্দে দুবার উপহারসামগ্রীসহ চীন সম্রাটের দূত পালের জাহাজে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে নদীপথে গৌড়ের সুলতানের দরবারে এসেছিলেন। সুলতানি আমলে বাংলা তথা পূর্ব ভারতের হজযাত্রীরা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজে হজ উপলক্ষে মক্কা গমন করতেন।
মরক্কোর পরিব্রাজক ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনী সূত্রে জানা যায়, তিনি ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ ভ্রমণের উদ্দেশে সমুদ্রপথে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহর অধিকৃত উপকূলবর্তী শহর সোদকাওয়ান বা চট্টগ্রামে আসেন। ইবনে বতুতা চট্টগ্রাম বন্দরে অসংখ্য জাহাজ দেখেছিলেন। তিনি বলেন, এ জাহাজগুলোর সাহায্যে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ লখনৌতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন। ফখরুদ্দিন মুবারক শাহর মৃত্যুর পর তার পুত্র ইখতিয়ার উদ্দিন গাজী শাহ ১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁর সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার আমলেও চট্টগ্রাম সোনারগাঁ রাজ্যভুক্ত ছিল। ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে লখনৌতির সুলতান সামশুদ্দিন ইলিয়াস শাহ ইখতিয়ার উদ্দিন গাজী শাহকে হত্যা করে চট্টগ্রামসহ সমগ্র পূর্ববঙ্গ অধিকার করেন।
সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার শাসনামলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ১৪০৫, ১৪০৮, ১৪০৯ খ্রিস্টাব্দে চীন সম্রাটের দরবারে জাহাজে উপহারসামগ্রীসহ দূত পাঠিয়েছিলেন। গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহর আমলেই ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ বণিকরা সর্বপ্রথম বাণিজ্যার্থে চট্টগ্রাম বন্দরে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। সে সময় হোসেন শাহ অন্যত্র যুদ্ধে ব্যস্ত থাকলে সে সুযোগে আরাকানরাজ চট্টগ্রাম অধিকার করেন।
যুবরাজ নশরত শাহ পুনরায় চট্টগ্রাম জয় করেন। গোয়ার পর্তুগিজ শাসনকর্তার চিঠি নিয়ে ‘জোঁয়াও কোয়েলা’ দূত ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহর দরবারে যান। তার কিছুকাল পর জোঁয়াও ডি সিল ভেইরোর নেতৃত্বে চারখানি পর্তুগিজ জাহাজ চট্টগ্রামে এসে স্থানীয় শাসনকর্তার কাছে বাণিজ্য অধিকার লাভের অনুমতি প্রার্থনা করে। কিন্তু স্থানীয় শাসনকর্তার অনুমতি না পেয়ে ডি সিল ভেইরো ক্ষুব্ধ হয়ে চলে যাওয়ার পথে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী গোলাম আলীর দুখানা জাহাজ লুণ্ঠন করে নিয়ে যায় এবং পর্তুগিজরা খাদ্যশস্যবাহী আরেক জাহাজেও লুণ্ঠন চালায়। তখন থেকে ১৫২৫ সাল অবধি প্রতি বছর একখানি পর্তুগিজ জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে চক্কর দিয়ে যেত। ১৫২৬ সালে গোয়ার পর্তুগিজ শাসনকর্তার নির্দেশে নাবিক রুইভাজ পেরেরা জাহাজ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর আসে এবং ইরানি বণিক খাজা শিহাবুদ্দিনের দুখানা মালবোঝাই জাহাজ লুণ্ঠন করে নিয়ে যায়। এভাবে হোসেন শাহর আমলে চট্টগ্রামে প্রথম পর্তুগিজ অনুপ্রবেশের ব্যর্থ প্রচেষ্টা চলে।
১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে মার্টিন আলফান্সো ডিমেলা জুসাটের নেতৃত্বে তিনখানা পর্তুগিজ জাহাজ চট্টগ্রাম আসার পথে ঝড়ের কবলে পড়ে দুখানা জাহাজ নিখোঁজ ও একখানা পেগুর কাছে বিধ্বস্ত হয়। বিধ্বস্ত জাহাজের নাবিক জুসাটে ও তার সঙ্গীরা আত্মরক্ষার্থে পেগুর সমুদ্রসৈকতে মাছ ধরারত দক্ষিণ চট্টগ্রামের চকরিয়ার জেলেদের সাহায্যপ্রার্থী হয়। জেলেরা তাদের স্বদেশে নিয়ে এসে দক্ষিণ চট্টগ্রামের শাসনকর্তা খোদা বখশ খানের কাছে হস্তান্তর করে। তিনি পর্তুগিজদের তার ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী উত্তর চট্টগ্রামের সামন্ত শাসক আমিরজা খাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিয়োজিত করেন এই শর্তে যে, তিনি যুদ্ধে জয়ী হলে তাদের মুক্তি দেবেন। কিন্তু খোদাবক্স খান যুদ্ধে জয়ী হয়েও পর্তুগিজদের ছেড়ে না দিয়ে বন্দি করে রাখেন। এ সময় পর্তুগিজ ক্যাপটেন জুসাট দুটি জাহাজ নিয়ে চকরিয়া এসে উপস্থিত হয়। জাহাজ দুটির নাবিকরা সমস্ত পণ্যের বিনিময়ে বন্দি পর্তুগিজদের মুক্তি চাইলে খোদাবক্স খান তাদের মুক্তি দিলেন না। তখন পর্তুগিজরা পালানোর চেষ্টা করে ধরা পড়ে। তাতে খোদাবক্স খান আরো ক্রুদ্ধ হন। সে সময় স্থানীয় হিন্দু তান্ত্রিক সন্ন্যাসীরা নরবলির জন্য একজন সুদর্শন যুবক খুঁজছিল। খোদাবক্স খানের আদেশে জুসাটের সঙ্গী বন্দি ভাগ্নে বা ভাইপো গেঞ্জেলা ভাজ ডি মেলোকে তাদের কাছে বিক্রি করে দেয়। তান্ত্রিকরা তাকে দেবীর পূজায় বলি দেয়।
এদিকে ইরানি বণিক খাজা শিহাব উদ্দিন গোয়ার পর্তুগিজ গভর্নরের কাছে গিয়ে বলেন, মালপত্রসহ তার জাহাজ দুটি ফেরত দিলে তিনি তিন হাজার ক্রুজেডার (পর্তুগিজ মুদ্রা) বিনিময়ে নাবিকসহ কাপ্তান ডি মেলোকে মুক্ত করিয়ে দেবেন। পর্তুগিজ গভর্নর মালপত্রসহ তার জাহাজ ফেরত দেন। খাজা শিহাব উদ্দিন ১৫২৯ খ্রিস্টাব্দে সঙ্গী নাবিকসহ ক্যাপ্টেন আলফান্সো ডিমেলোকে মুক্ত করে তার ভাই খাজা শকর উল্লাহর সঙ্গে গোয়ায় পৌঁছে দেন। তখন থেকে খাজা শিহাব উদ্দিন পর্তুগিজদের বন্ধু হয়ে যান। তিনি গোয়ার পর্তুগিজ গভর্নরকে প্রস্তাব দিলেন যে, তিনি গৌড়ের সুলতানকে সম্মত করাবেন যাতে পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে বাণিজ্য করার অধিকার পায়। কিন্তু তার আগে ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে সুলতান নশরত শাহ পরলোকগমন করেন। ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে গোয়ার পর্তুগিজ গভর্নর নুনো-দ্য-কুরহা বাংলায় বাণিজ্য আরম্ভ করার জন্য মারতিন আলফান্সো-দ্য-মেলোকে পাঁচটি জাহাজ ও ২০০ লোক সঙ্গে দিয়ে চট্টগ্রামে পাঠান। চট্টগ্রামে পৌঁছে দ্য-মেলো তার দূত দুয়ার্তে-দ্য-আজেবে দোকে ১২ জন লোক সঙ্গে দিয়ে বাংলার রাজা গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহর জন্য অনেক ঘোড়া অলঙ্কারসমেত প্রায় ১ হাজার ২০০ পাউন্ড মূল্যের উপহার গৌড়ে পাঠান। তখন গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহ সদ্য ভ্রাতুষ্পুত্রকে হত্যা করে গৌড়ের সিংহাসন অধিকার করেন। তার মন খুব খারাপ। তারপর পর্তুগিজদের পাঠানো উপঢৌকনের মধ্যে কয়েক বাক্স গোলাপজল ছিল, এগুলি খুব দামি। আঁও বার্ণালদেস নামে একজন পর্তুগিজ জলদস্যু একটি মুসলমান জাহাজ থেকে এগুলো লুট করেছিল। মাহমুদ উপহারগুলোকে লুটের মাল বলে চিহ্নিত করেন। রেগে গিয়ে তিনি মনস্থ করলেন শুধু পর্তুগিজ দূতদের নয়, বাংলায় আসা সমস্ত পর্তুগিজকেই তিনি হত্যা করবেন। কিন্তু আলফা খান নামে একজন মুসলমান এবং জনৈক শতবর্ষী মুসলিম সন্ন্যাসী তাকে বুঝিয়েসুঝিয়ে এ কাজ করা থেকে বিরত করলেন। সুলতান তখন পর্তুগিজ দূতদের বন্দি করলেন এবং অন্যান্য পর্তুগিজদের বন্দি করার জন্য গুয়াজিল বা কাজী নামক উচ্চপদস্থ এক রাজকর্মচারীকে চট্টগ্রামে পাঠান। তিনি চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পর্তুগিজদের একসঙ্গে পাওয়ার জন্য এক ভোজসভার আয়োজন করেন। ৪০ জন মাত্র ভোজসভায় উপস্থিত হয়। ভোজ আরম্ভ হলে গৌড় সৈন্যরা আক্রমণ করে অনেক পর্তুগিজকে হত্যা করে। মাত্র ৩০ জন আহত বন্দিকে গৌড়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়, তাদের প্রথমে বিনাচিকিৎসায় একটা অন্ধ ঘরে আটকে রাখা হয়। এবং পর্তুগিজদের ১ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
এ খবর গোয়ায় পৌঁছলে গোয়ার পর্তুগিজ শাসনকর্তা দূত মারফত গৌড় সুলতানকে জানিয়ে দিলেন যে, এক মাসের মধ্যে বন্দি মুক্তি না পেলে পর্তুগিজরা চট্টগ্রাম বন্দর আক্রমণ করবে। এক মাসের সময়সীমা পেরিয়ে গেলে গোয়ার শাসনকর্তা এন্টনিও ডি সিলভার নেতৃত্বে নয়খানা জাহাজে সাড়ে ৩০০ পর্তুগিজ সৈন্য চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠান। তারা বন্দর শহর চট্টগ্রামে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। শহরের বহু অধিবাসীকে হত্যা ও বন্দি করা হয়। সুলতান মাহমুদ শাহ যখন বন্দর শহর চট্টগ্রামে অবস্থানকারী পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন শের শাহ গৌড় আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এ খবর পেয়ে সুলতান মাহমুদ শাহ শত্রু পর্তুগিজদের ওপর প্রতিশোধ না নিয়ে মিত্রতা স্থাপন করতে বাধ্য হলেন। সুলতান মাহমুদ শাহ এক চুক্তিমূলে তাকে সামরিক সাহায্য দেয়ার বিনিময়ে পর্তুগিজদের চট্টগ্রামে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন ও চট্টগ্রাম বন্দরের শুল্ক সংগ্রহের অধিকার প্রদান করেন।
১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহ গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার আমলে গর্তুগিজরা চট্টগ্রাম বন্দরে অনধিকার চর্চা শুরু করে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আগেই আফগান নেতা শের শাহ গৌড় আক্রমণ করেন। শের শাহর ভয়ে সুলতান মাহমুদ শাহ তাকে সামরিক সাহায্য দানের বিনিময়ে গর্তুগিজদের বর্তমান আনোয়ারা থানার দেয়াঙে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন, গির্জা নির্মাণ ও চট্টগ্রাম বন্দরের শুল্ক আদায়ের অধিকার প্রদান করেন। এ অধিকারবলে ১৫৩৭ সালে নুনো ফার্নান্দেজের নেতৃত্বে পর্তুগিজরা দেয়াঙে বাণিজ্য কুঠির, দুর্গ ও গির্জা নির্মাণ করে এবং বাণিজ্যকুঠির অদূরে শুল্ক সংগ্রহ কেন্দ্র ও তাদের পণ্যদ্রব্যের আড়ত স্থাপন করে।
পর্তুগিজ সাহায্য পৌঁছার আগেই ১৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে শের শাহ বাংলাদেশ অধিকার করেন। কিন্তু তখন চট্টগ্রাম বন্দর তথা দেয়াঙ বন্দরের পূর্ণ কর্তৃত্ব পর্তুগিজদের হাতে। শের শাহের ভাই নিজাম শাহ চট্টগ্রাম দখল করতে এলে তিনি পর্তুগিজদের হাতে বন্দি হয়ে পড়েন এবং পরে মুক্তি লাভ করেন। চট্টগ্রামে আফগান প্রভুত্ব কায়েম হওয়ার পর চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো পর্তুগিজ বাণিজ্য করতে পারবে না, করলে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে বলে চট্টগ্রাম বন্দরে এক অঘোষিত অবরোধ সৃষ্টি করে। কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। তখন পর্তুগিজরা আরাকানের সঙ্গে আতাত করে আফগান শক্তির বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
১৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে আফগান শক্তির পতন ঘটলেও ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দ অবধি জামাল খান পন্নীর নেতৃত্বে আফগান শাসন চট্টগ্রামে বলবত্ ছিল। ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে আরাকানরাজ মেংখ ফলিঙ্গ চট্টগ্রামের আফগান শাসক জামাল খান পন্নীকে পরাজিত করে চট্টগ্রাম অধিকার করেন।
আরাকানরাজ মেংখ ফলিঙ্গর অধিকৃত বন্দর শহর চট্টগ্রামে পর্তুগিজ দৌরাত্ম্য শুরু হয়। ১৫৯০ খ্রিস্টাব্দে এন্টনিও ডি সুজা গভিনহো বন্দর শহর লুট করে এবং সন্দ্বীপের আরাকানি শাসনকর্তাকে কর দিতে বাধ্য করে। মেংখ ফলিঙের মৃত্যুর পর তার পুত্র মেংখ রাজ্যাগী আরাকানের রাজা হন। তার আমলে পর্তুগিজরা দেয়াঙ, সন্দ্বীপ ও আরাকানের সিরিয়ামে উপনিবেশ স্থাপনের অধিকার লাভ করে। তা সত্ত্বেও পর্তুগিজরা দস্যুতা বন্ধ করেনি। শেষ পর্যন্ত তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আরাকানরাজ চট্টগ্রাম থেকে পর্তুগিজদের উত্খাত করার জন্য চাকলারাজের সঙ্গে এক চুক্তি করেন। ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে আরাকানরাজ দেয়াঙের পর্তুগিজদের উপনিবেশ আক্রমণ করে সেখানকার পর্তুগিজদের হত্যা ও বন্দি করেন এবং পর্তুগিজ বাণিজ্যকুঠি, দুর্গ ও গির্জা ধ্বংস করে দেন। এ সংবাদ পেয়ে সন্দ্বীপের পর্তুগিজ নৌঘাঁটির অধিনায়ক কার্ভালহো এক দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের ১৪৯টি আরাকানি রণতরী ধ্বংস করে দেয়।
সেই সঙ্গে পর্তুগিজদের দখলে এল অসংখ্য গোলাবারুদ, বন্দুক আর যুদ্ধের সরঞ্জাম। এ চোরাগোপ্তা হামলায় বহু আরাকানিকে প্রাণ দিতে হলো, আরাকানরাজের কাকা সিনেবাদীও নিহত হলেন। পর্তুগিজদের আক্রমণের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহর দখল হয়ে যেতে পারে, এ ভয়ে সহায়-সম্পদ ফেলে শহরবাসী পাহাড়ি জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যায়। এমনকি দেয়াঙের নিহত সামন্তরাজা সিনেবাদীর স্ত্রী রাজরানীও হাতির পিঠে চেপে শহর ছেড়ে পালালেন। পর্তুগিজরা কিন্তু নৌযান ছেড়ে তীরে ওঠেনি। অথচ পরিস্থিতি এমন ছিল যে, অরক্ষিত দেয়াঙ কেল্লা দখল করাও পর্তুগিজদের পক্ষে কঠিন হতো না। অতর্কিতে শহর আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আরাকানরাজ উপকূলীয় পর্তুগিজ পল্লীতে নিষ্ঠুর নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালান। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে আপস হয়।
১৬১২ খ্রিস্টাব্দে মেংখ রাজ্যাগীর মৃত্যুর পর পুত্র মেংখা মৌঙ আরাকানের রাজা হন। কিন্তু তখন চট্টগ্রাম সীমান্তে মোগল বাহিনীর উপস্থিতিতে আরাকান রাজ্যের পর্তুগিজ বন্ধুত্ব একান্ত কাম্য হয়ে দাঁড়ায়। তখন থেকে আরাকানি মগ ও পর্তুগজ দস্যুরা যৌথভাবে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর মোহনার নিকটবর্তী অঞ্চলে ব্যাপক হারে ডাকাতি-রাহাজানি শুরু করে। নোয়াখালী, বাকেরগঞ্জ, খুলনা, বিক্রমপুর, সোনারগাঁ, ঢাকা পর্যন্ত মগ ও পর্তুগিজ দস্যুরা অভিযান চালিয়ে সেখানকার মানুষ বন্দি করে এনে দাস ব্যবসা চালাত। তারা বন্দিদের একাংশ বিক্রি করে দিত ওলন্দাজ, ইংরেজ ও ফরাসি বণিকদের কাছে। অবশিষ্ট অংশ আরাকানে কৃষিকাজে নিযুক্ত করত, নারীদের উপপত্নীরূপে ব্যবহার করত। ১৬২২ খ্রিস্টাব্দে থিরি থুধম্মা আরাকানের রাজা হন। তার মৃত্যুর পর ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে নর পিন্যাগ্যা আরাকানের রাজ সিংহাসনে আরোহণ করেন। ইতালীয় পর্যটক ভারথেমা ও বারবোসার ভ্রমণকাহিনীতে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত সিটি অব বেঙ্গল বা পোর্টোগ্রান্ডো শহরের উল্লেখ দেখা যায়। চট্টগ্রামের খ্যাতিমান গবেষক ডক্টর সুনীতি ভূষণ কানুনগো বলেন, ১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে সুলতান গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহর প্রদত্ত অধিকারবলে দেয়াঙে স্থাপিত পর্তুগিজ বাণিজ্যকুঠিকে কেন্দ্র করে যে শহরের পত্তন হয়েছিল, তা-ই হলো সিটি অব বেঙ্গল বা পোর্টোগ্রান্ডো।
পর্যটক দ্য বারোস ১৫৪০, ব্রাভ ১৬৫০, ব্রুক ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে এবং প্রাচীন মানচিত্রে পর্তুগিজ লেখকদের বর্ণিত প্রাচীন চট্টগ্রাম বন্দরকে কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে প্রায় মোহনার মুখোমুখি দেয়াঙ অঞ্চলকেই দেখিয়েছেন। ১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভ্যান পর্যটক লিনশোটেন বলে গেছেন, দেয়াঙ হলো কর্ণফুলীর মোহনার পূর্ব দিকে এবং দেয়াঙই হলো তার শহর ও বন্দর। ১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে নুনোফার্নান্দেজ দেয়াঙে প্রথম যে পর্তুগিজ ঘাঁটি বা শহরের পত্তন দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন, তা ছিল দ্য বারোসের মানচিত্রে বর্ণিত প্রাচীন চট্টগ্রাম শহর। ষোড়শ আর সপ্তদশ শতকের সাহিত্যে, বিশেষ করে পর্তুগিজ লেখকদের গ্রন্থ ‘সিঙ্গানে দ্য বেঙ্গলায়’ বঙ্গ নগরীর যে উল্লেখ পাওয়া যায়, তাতে চট্টগ্রাম বন্দরকে দেয়াঙ বন্দর বলেই উল্লেখ করেছেন। ইয়াত দ্য বারবোসি আফ্রিকা আর ভারত উপকূলের ভৌগোলিক বিবরণের মধ্যে আদি পর্তুগিজদের অন্যতম। তিনি বলেছেন, এ সমুদ্র (বঙ্গোপসাগর) একটি খাঁড়িবিশেষ। উত্তর দিকে যাওয়ার পর এ খাঁড়ির তীরে মুর (মগ) অধ্যুষিত একটি বড় শহর আছে, যার নাম ‘বেঙ্গলা’। এটি একটি নামকরা বন্দর। ওভিংটন তার ‘এ ভয়েজ টু সুরাট’ এ লিখেছেন, পর্তুগিজ লেখকরা দেয়াঙকে বেঙ্গলার একটি শহর বলে উল্লেখ করেছেন। এ থেকেই ফাদার হস্টেন এ সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, সিটি অব বেঙ্গলার নামই ডায়েঙ্গা (দেয়াঙ)।
গৌড়ের সম্রাট গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ নিহত হওয়ার পর তত্পুত্র সাইফুদ্দিন হামজা শাহ ১৪০৯ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের সুলতান হন। তিনি ১৪১২ খ্রিস্টাব্দে পিতার মৃত্যু সংবাদ জানিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজে চীনা সম্রাটের কাছে দূত পাঠিয়েছিলেন। সে বছর চীনা সম্রাটের দূতও গৌড়ে আগমন করেন। তারা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নদীপথে নৌকায় গৌড়ে যান। গিয়াস সাইফুদ্দিন হামজা শাহ তিন বছর ধরে রাজত্ব করার পর প্রধানমন্ত্রী রাজা গণেশের ষড়যন্ত্রে ১৪১২ খ্রিস্টাব্দে ক্রীতদাস শিহাব উদ্দিন বায়েজিদের হাতে নিহত হন।
সুলতান সাইফুদ্দিন হামজা শাহকে হত্যা করে ক্রীতদাস শিহাব উদ্দিন বায়েজিদ শাহ উপাধি গ্রহণ করে ১৪১২ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুলতান হন। তার সময়ে ১৪১৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে চীনা সম্রাটের দূত গৌড়ে আগমন করেন। তিনি ১৪১৪ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজে জিরাফ ও অন্যান্য উপহারসামগ্রী দূত মাধ্যমে চীনা সম্রাটের দরবারে পাঠিয়ে ছিলেন।
চট্টগ্রাম বন্দরে ফরাসি বাণিজ্যকুঠি
ঢাকার ফরাসি কুঠির অধ্যক্ষ এম রেনো ১৭৪৭ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রার বন্দরের কাছে এক বাণিজ্যকুঠি নির্মাণের আদেশ করেন এবং ১৭৫০ সালে চন্দননগরের ফরাসি মন্ত্রণালয় সভার সদস্য এম এলবাট চন্দননগর থেকে চট্টগ্রামে প্রেরিত হন। চট্টগ্রামে অবস্থানকালে তিনি দেয়াঙে পর্তুগিজদের সমাধিক্ষেত্রের সন্নিকটে কর্ণফুলী নদীতীরবর্তী এলাকায় কুঠি নির্মাণ করেন। এলবাটের পরে এম টিচার তৎপদে নিযুক্ত হয়ে এ অঞ্চলে আগমন করেন। এ সময়ে ইউরোপে ফ্রান্সের সঙ্গে ইংরেজদের যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এ যুদ্ধ বাংলার উপনিবেশগুলো পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়ায় ১৭৫৭ সালে দেয়াঙের ফরাসি কুঠিয়ালদের চন্দননগরে প্রত্যাহার করা হয়।
তথ্যসূত্র
১. আবুল মনসুর আহামদ, বাংলাদেশের কালচার, ২. ডবলু এইচ স্কুপ, দ্য পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিত্রিয়ান সি, ৩. ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, প্রবন্ধ ৪. ড. আবদুল করিম, বাংলার ইতিহাস, সুলতানী আমল, ৫. ড. সুনীতি ভূষণ কানুনগো, প্রাচীন হরিকেল রাজ্যের অবস্থান, ৬. মডার্ন রিভিউ, নভেম্বর, ১৯২২, ৭. ইন্ডিয়ান হিস্ট্রিক্যাল কোয়ার্টারলি, ৮. আবদুল হক চৌধুরী, চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা, ৯. জে, ডবলু স্কপ— দ্য পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিত্রিয়ান সি, ১০. কে. এন. দীক্ষিত, মেমোয়ার্স অব দ্য আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া, ১১. ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনী, ফরাসি সংস্করণ ৪র্থ ভাগ. ১২. বিশ্বভারতী এনালস ভলিউম-১, ১৩. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস পত্রিকা, দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যা, ১৪. পূর্ণচন্দ্র চৗধুরী, চট্টগ্রামের ইতিহাস, ১৫. ড. আহমদ শরীফ, চট্টগ্রামের ইতিকথা, আদিযুগ, ১৬. জে জে এ কেমপস: হিস্টোরি অব দ্য পর্তুগিজ ইন বেঙ্গল, কলিকাতা, ১৭. Travels of the Sebastien Manrique. vol, ১৮. জামাল উদ্দিন, দেয়াঙ পরগনার ইতিহাস, আদিকাল, ১৯. প্রফেসর আবদুল করিম, বাঁশখালীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য, ২০. হাদি হাসান, A History of Persian Novigation, ২১. G E harvey, History od Burma
লেখক: গবেষক ও প্রকাশক






