কর্ণফুলী বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রবহমান চঞ্চল, খরস্রোতা পাহাড়ি নদী। এটি একটি আন্তর্জাতিক নদী। আসামের লুসাই পাহাড় থেকে এর উৎপত্তি। বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরের লোনা জলে বিসর্জন দিতে এটি অতিক্রান্ত করেছে ১৮৭ কিলোমিটার পথ। পাহাড়ি বন্ধুর পথে এর নিরন্তর এঁকেবেঁকে চলা। এ দেশের পাহাড় ও সমতলের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বহুমাত্রিক জাতিসত্তার সামাজিকতাকে একত্র করে এক সাম্য-সুতায় গেঁথেছে এ নদী। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান— বহুজাতিক সম্প্রদায় ও নৃগোষ্ঠীর বহুমাত্রিক জাতিসত্তাকে এর ঘাটে ঘাটে বেঁধেছে মায়ার বন্ধনে; গড়েছে সম্প্রীতি ও ভালোবাসার উপাখ্যান।
দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নদীটির দুই তীরে বিভিন্ন বর্ণ ও গোষ্ঠীর শতাধিক উপাসনালয়— মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডা শোভা পায়। এ নদীর জলে অবগাহন করে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেকে পবিত্র করে।
এভাবেই জাতিতে জাতিতে, বর্ণে বর্ণে সামাজিক ঐক্যের সদৃঢ় সম্প্রীতির ভিত তৈরি করে দিয়েছে নদীটি। এভাবে এটি আর শুধু নদী থাকেনি, হয়ে গেছে একটি শান্তিপ্রবাহ; মিলনক্ষেত্র— সামাজিকতার, সংস্কৃতির। সামাজিক কর্ণফুলী, সাংস্কৃতিক কর্ণফুলী, ধর্মবোধের অন্যতম মাধ্যম কর্ণফুলী তাই শুধুই একটি নদী নয়। এটি সামাজিকতার প্রতীক। সামাজিক মূল্যবোধের প্রতীক। সামাজিক অর্থনীতির সোপান।
হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতা সংরক্ষণ, লালন ও বিস্তারের প্রতীক কর্ণফুলী। পূজাপার্বণে মানত-আমানতে, ফসলাদির ফলন বৃদ্ধি ও কল্যাণকর্মে মানুষ কর্ণফুলীর প্রবহমান জলকে সমুদ্রদূত বা ভগবানের আশীর্বাদ মনে করে শ্রদ্ধা করে। কর্ণফুলীর জলপ্রবাহকে ভাগ্যপ্রবাহের অংশ মনে করে। মানুষ বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে এর কাছে মানতও করে। এভাবেই সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান ধর্ম-বর্ণ ছাড়িয়ে মানবতার কাতারে এসে নোঙর করে। মানুষ তার ভেতরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থ-দেয়ালকে ভুলে যায়। তুলে ফেলে। কেউ মনে করে গঙ্গা মাতার প্রবাহ, কেউ মনে করে সমুদ্র বিশালতার অংশ। এ বোধগুলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের সংস্কৃতিকে জাগিয়ে রাখে। পারস্পরিক বোধ ও বিবেককে শানিত করে। মানুষের পরিচয় আর ধর্মভিত্তিক থাকে না, হয়ে যায় তারা সামাজিক মানুষ। এভাবে এই নদী এ জনপদের মানুষগুলোকে সাংস্কৃতিক-সামাজিক দৃঢ় বন্ধনে আটকে রেখেছে হাজার বছর। নদী আমাদের সাংস্কৃতিক বন্ধনকে ধারাবাহিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে নিয়ে যায়। আমরা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নির্যাসকে খুঁজে পাই নদীপ্রবাহে। নদীর জল, নদীর প্রবাহ এভাবেই আমাদের দেহ ও মনকে পবিত্র করে দেয়; পবিত্র করে দেয় মননকে। কর্ণফুলীর সাংস্কৃতিক মূল্য তাই অপরিসীম, অপরিমেয়।
কাপ্তাই বাঁধের ওপর পাঁচটি উপজেলা এবং বাঁধের নিচে পাঁচটি উপজেলার কয়েক লাখ নদীনির্ভর মানুষকে এভাবেই ঐতিহ্যগত ও ঐতিহাসিকভাবে এ নদী পরিচর্যা করে। সাংস্কৃতিক পরিচর্যা, সামাজিক পরিচর্যা।
এ নদীতীরের অগণিত হাটবাজার, মেলা, পার্বণ কর্ণফুলীকে অন্য রকম মাত্রা দেয়। মানুষ উল্লাস করে, আনন্দ করে, উপভোগ করে, উচ্ছ্বসিত হয়। সপ্তাহের বিশেষ বিশেষ দিনে হাটবাজারে যে মধুর মিলন, আড্ডায় চায়ের দোকান মাতিয়ে তোলা, তা এ নদীতীরের হাটবাজার ও দোকানগুলোয় দৃশ্যমান। মধুর, অন্তরঙ্গ এ দৃশ্য মানুষের সামাজিক বন্ধনের গভীরতাকে অনেক দৃঢ় করে তোলে। এ-ঘাট থেকে ও-ঘাটে, এপার থেকে ওপারে যে গমনাগমন, তা ঐতিহ্যকে ধারণ করে; তা আত্মীয়তাকে সুদৃঢ় করে। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পার্বণে মেলা বসে এ নদীর তীরে, খোলা মাঠে। হাজার হাজার লোকসমাগম হয়। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এসব মেলা মানুষের মানবিক বোধ ও বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। এভাবেই বিস্তৃত অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত। নদী কুলকুল রবে বয়ে যায়। সময় বাহিত হয় সময়ের চাকায়। বর্তমান অতীত হয়ে যায়। ভবিষ্যৎ বর্তমান হয়। অতীতকালের গহ্বরে জায়গা করে নেয়।
মানুষ বদলে যায়। সংস্কৃতি, সামাজিকতা বিবর্তিত হয়। নদীতীরের পরিবর্তন হয়। অবকাঠামো নদীকে বদলাতে চায়। নদী বহমান। সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনশীলতার অগ্রদূত নদী। নদীর উদার দু’কূল সামাজিক-প্রাকৃতিকভাবে পরিবর্তনে পিষ্ট হয়। এই যে সাংস্কৃতিকতা, এই যে সামাজিকতা— এর সামাজিক মূল্য, সাংস্কৃতিক মূল্য কোন মুদ্রায় আমরা হিসাব করব?
কর্ণফুলী নদীকে কেন্দ্র করে আদিকাল থেকে যে জারি, সারি, পালা, আঞ্চলিক গান রচিত হয়েছে, দ্বিধাহীনভাবে তা অপরিমেয়, অগণিত। পৃথিবীর আর আর অঞ্চল ও নদীর হিসাবকে তা ছাড়িয়ে গেছে। এই কর্ণফুলী, এই পাহাড়ি লজ্জাবতী মেয়েকে নিয়ে এত গান, এত অভিব্যক্তি, যা আঞ্চলিকতা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিকতাকে ভেদ করেছে। রাজকন্যার কানের দুল হারানো, প্রেমিক রাজকুমারের প্রেম বিসর্জনের যে কর্ণফুলী, অতীতের স্মৃতিসম্ভারে, অশ্রু-বেদনার অশ্রুত সব কাহিনী কাব্যসম্ভারে বয়ে চলেছে নিরন্তর; দুকূল ছাপিয়ে, বেদনা-বিসংবাদের সব স্মৃতি ও ক্ষত বুকে নিয়ে বয়ে চলেছে আমাদের কর্ণফুলী, আমাদের প্রাণের নদী। আমাদের আত্মার আত্মীয়, ক্লান্ত, শান্ত, বিষণ্ন, বিপদাপন্ন প্রকৃতির নদী। পাহাড়ের নদী।
ষাটের দশকে নদীটির বুকে আমরা দেয়াল তুলে দেই। জলবিদ্যুৎ আমাদের আধুনিকতার স্বাচ্ছন্দ্য এনে দেয়। নদীকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, হাটবাজার, যোগাযোগ, সিনেমা আমাদের অর্থ উপার্জনের পথ করে দেয়। ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রাখে। পণ্য পরিবহন সহজতর করে দেয় গ্রামগঞ্জে। সওদাগরি নৌকা, পণ্যবাহী নৌকা, যান আমাদের সমৃদ্ধি এনে দেয়। এভাবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক, বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রাখে। আমরা উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনানেয়ায় এ নদীকে দিবস-রজনী কাজে লাগাই। নদীটি এভাবেই আমাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। কর্ণফুলীকে অস্বীকার করলে আমাদের জীবনযাত্রা-সংসার ধর্মই অস্বীকার করা হয়। নদীটির ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা বহুমাত্রিক হয়ে যায়।
গত শতকের পঞ্চাশের দশকের আগেও নদীটির প্রাকৃতিকতা অক্ষত, অক্ষুণ্ন ছিল। দু’কূলে সবুজ বৃক্ষরাজি, পাহাড়, হাটবাজার, গ্রাম, জনবসতি ছিল। পাখির হাঁকডাক, গবাদিপশুর বিচরণ, কলকাকলিতে মুখরিত ও শ্রবণশোভিত থাকত নদীর দু’কূল। নদীটি ছিল প্রাকৃতিক তখনো। মানুষ ছিল মননশীল তখনো। মানুষ ও প্রাণীর হূদয়ের উষ্ণ অনুভূতিগুলো তখনো নদীর জলে, নদীর ঢেউয়ে দোলা দিত। নদী ও মানুষের মনের ভেতর অলিখিত এমন বোঝাপড়া ছিল অদৃশ্য বর্তমান। তাই আজকের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, নদীটি ছিল প্রাকৃতিক, দূষণমুক্ত, প্রাণবন্ত, জীবিত, নির্ভার আর নির্ভরতায় পূর্ণ। নদীতে মত্স্যসম্পদ ছিল। নদীর বাস্তুতন্ত্র ছিল জীবন্ত, প্রাণবন্ত। দেহ ও প্রাণের স্পন্দন ছিল। স্পন্দনের আবেগ ও উষ্ণতা ছিল। কিন্তু আজ তা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। অনুভূতিগুলো ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে জাগতিক ও প্রাকৃতিক কারণে।
তখনকার দিনে প্রাকৃতিক নদীকে প্রাকৃতিকভাবেই পরিচর্যা ও ব্যবহার করা হতো। নদীতীর দখল হতো না। স্থাপনা নির্মাণ বিড়ম্বনায় নদীকে উত্ত্যক্ত করা হতো না। মানুষ, ব্যবহারকারীর সঙ্গে নদীর বোধের একটি যৌক্তিক সুসম্পর্ক ছিল। বিবেকের লেনদেন ছিল। বাস্তবতার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। নদীর নাব্যতা অক্ষুণ্ন ছিল। প্রাণচঞ্চলতা ছিল। দুই পাড়ে মানুষের বসতি যৌক্তিক ছিল। জনসংখ্যার ঘনত্ব কম ছিল। চট্টগ্রাম শহরের বিস্তৃতি কম ছিল। মানুষের ঘনত্ব তিন লাখের কম ছিল। মানুষ প্রকৃতিনির্ভর ছিল। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নিবিড়তা ছিল।
কর্ণফুলীর দুই তীরব্যাপী গাছগাছালি, বনবাদাড়, পাহাড়-টিলা ছিল। চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়গুলোয় সুউচ্চ বৃক্ষ ছিল, পাহাড়ে মাটি ছিল। সবুজ গাছগাছালি ছিল। বনে বাঘ, ভালুক, শিয়াল, শকুন, হরিণ বাস করত। মানুষ প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে নিয়ে বাস করত। পাহাড়খেকো, বনখেকো, গাছখেকো মানুষের সংখ্যা নিত্যান্ত কম ছিল। মানুষের পরশ্রীকাতরতা ছিল না।
কর্ণফুলীর দুই তীর ধরে গড়ে উঠেছে শিল্পের বহুমাত্রিক স্থাপনা। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৭টি শিল্প জোনে প্রায় ৮০০ ছোট-বড় শিল্প চর্চিত হচ্ছে বিচ্ছিন্নভাবে। শহরের চল্লিশোর্ধ্ব নান্দনিক পাহাড় সমতলে রূপান্তর হয়েছে। পাহাড় বৃক্ষ হারিয়েছে।
হারিয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-সম্ভ্রম। কাটাকাটি, ছাঁটাছাঁটি, বসতি গড়ে ওঠা পাহাড়কে আর পাহাড় থাকতে দেয়নি। ভূমিদস্যু বলে নব্য শোষকগোষ্ঠীর লোভাতুর প্রক্রিয়ায় প্রকৃতি রূপ ও অঙ্গ হারিয়েছে। ছোট বড় প্রায় ৭০টি খালের অস্তিত্ব বিপর্যস্ত ও বিলুপ্ত। যে ৩৭টি খালের অবশেষ আরএস খতিয়ান মোতাবেক পাওয়া যায়, তাও সংখ্যা সংকোচন তত্ত্বে ঝুঁকিতে, দখলে নাব্যহীনতায়, দূষণে আক্রান্ত। খালের ধারাবাহিক পরিচর্যা কোনো দিনই হয়নি। স্বাভাবিক বা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া কোনোটিই খালের নাব্যতা অথবা দখলকে আগলায়নি।
সাম্প্রতিক অপ্রতিরোধ্য জলাবদ্ধতা, জলমগ্নতা মানুষকে জাহান্নামের কষ্টে নিপতিত করেছে। টনক নড়েছে, প্রকল্প গড়েছে, সমাধান অদৃশ্যই থেকে গেছে। খাল ও জলাবদ্ধতার দূষিত জল ও বহুমাত্রিক তরল দূষণ কর্ণফুলীকে মুমূর্ষু করে তুলেছে। খালগুলোকে কখনই শহরের শিরা-উপশিরা মনে করা হয়নি। দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড কর্ণফুলী কখনই প্রশাসক, গবেষক, ব্যবসায়ী, স্টেকহোল্ডারের কাছ থেকে সুবিচার পায়নি। কর্ণফুলীর পানি ভারী হয়েছে। নাব্যতা সংকুচিত হয়েছে।
কালুরঘাট থেকে মোহনামুখ পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার অঞ্চল বেশি দূষিত হয়েছে। নদীর পানির বিওডি ও সিওডি যথাক্রমে কমেছে ও বেড়েছে। পানির ইলেকট্রিক্যাল কনডাক্টিভির মান (মুক্ত আয়নের পরিমাণ) অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন ভারী ধাতুর কণার পরিমাণ বাড়ছে। লবণাক্ততা প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। দূষণ ও লবণাক্ততা এবং মিঠা পানির অপ্রাচুর্য হালদার কার্পজাতীয় মাছের ডিম প্রদানে বাধাগ্রস্ত করছে। মিঠা ও মিশ্র পানির মাছের প্রজাতির সংখ্যা কর্ণফুলীতে পঞ্চাশের নিচে নেমে এসেছে। জেলেরা পেশা বদল করছেন। নদীকে মেরে ফেলা ও দূষণের দায় আমাদের নিতে হবে। আমরা কপোতাক্ষকে মারতে বসেছি। আমরা করতোয়া, ইছামতি, গোমতীকে মারছি। এ দেশে মৃত নদীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। আমাদের কোনো তাড়না নেই। কোনো মর্মবেদনা নেই। চট্টগ্রামের হালদাও দূষণের ঝুঁকিতে আছে। এ নদীর লবণাক্ততা বাড়ছে। কর্ণফুলীকে এ নদী জল দেয়। এর প্রবাহের সঙ্গে কর্ণফুলীর প্রবাহের নিবিড় সম্পর্ক আছে। আমরা উপলব্ধি করতে পারি বা না পারি, এর একটি অসুস্থ হলে অন্যটি সুস্থ থাকবে না।
আমলার মামলায় আমরা কোর্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কর্ণফুলীর বিশাল অঞ্চলকে দখলমুক্ত করতে পারছি না। প্রশাসকদের কৌশল ও চাতুরীতে কর্ণফুলীর অঙ্গহানি ঘটেছে। অতীতে ড্রেজিংয়ের নামে আমরা কর্ণফুলীর দখল ও দূষণ উসকে দিয়েছি। মূল্য প্রকল্প গ্রহণকারী বা দায়িত্বশীলদের দিতে হয়নি। কর্ণফুলীর প্রতি অনীহা বা অনান্তরিকতাই আমাদের পাপ। এ পাপবোধের জাগরণ আমাদের মনন ও চিন্তায় অনুপস্থিত।
কর্ণফুলীর পরিচর্যা দরকার আমাদের অর্থনীতির সমৃদ্ধির স্বার্থে। কর্ণফুলী বাঁচলে দেশ বাঁচবে— এটি আর কথার কথা নয়। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া বা ২০৩০ সালে এসডিজি অর্জন করতে হলে আমাদের প্রাকৃতিক মূলধন কর্ণফুলীকে সুস্থ ও আপদমুক্ত রাখতে হবে।
যে বন্দর বছরে প্রায় তিন হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ নোঙরের মাধ্যমে আমাদের আমদানি-রফতানির ৯২ শতাংশকে জাগিয়ে রেখেছে, যে বন্দর আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের সাফল্যকে তুলে ধরছে, যে বন্দরের গ্রহণযোগ্যতা ক্রমেই বাড়ছে, সেই বন্দর ধারণ করা কর্ণফুলী আমাদের অবহেলা, আমাদের অমনোযোগিতায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে। কর্ণফুলী নিয়ে আমাদের প্রকল্পের শেষ নেই। কিন্তু কর্ণফুলীর কিসে মঙ্গল, কিসে অমঙ্গল, তা আমরা যৌক্তিকভাবে কমই ভাবছি।
ড্রেজিংয়ের নামে আমরা একে দারুণভাবে সংকুচিত করেছি। ড্রেজিংসহ এর পরিচর্যা বা স্বাস্থ্যচর্চা আমরা কোর্ট ও আমলাদের মর্জির ওপর ছেড়ে দিয়েছি। নদীটির প্রতি অনীহা আমাদের আত্মহননের সমতুল্য। অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার যে চাবিকাঠি, সামাজিকতা ও সংস্কৃতিতে জাগিয়ে রাখার যে কেন্দ্রবিন্দু, প্রাকৃতিক চট্টগ্রামকে প্রাণবন্ত রাখার যে মাধ্যম, হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রজন্ম থেকে জন্মান্তরে বাহিত করার যে জীবনপ্রবাহ, তার প্রতি আমাদের নির্লিপ্ত দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সভ্যতা ও মননশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। একটি জীবন্ত প্রবাহের প্রতি অবহেলা আমাদের সত্তার প্রতি অবহেলা।
এগিয়ে যাওয়া বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লড়াকু বাঙালির বাংলাদেশকে প্রতিযোগী বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রাণপ্রবাহ কর্ণফুলীর যত্ন নিতে হবে। সুস্থ রাখতে হবে। বৈশ্বিক আপদ মোকাবেলা করে উন্নত দেশের সারিতে উন্নীতকরণে কর্ণফুলীর মতো দেশের প্রাকৃতিক মূলধনগুলোর পরিচর্যা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা






