প্রাচীন অনেক জনপদ যখন বঙ্গোপসাগরের অতল জলে নিমজ্জিত, তখনো চট্টগ্রামের অস্তিত্ব ছিল। গিরি গরবিনী সমুদ্র বেষ্টিত চট্টগ্রাম চিরকাল ভ্রমণপিপাসু পর্যটক, পীর-সন্ন্যাসী ও রাজ-রাজড়াদের নানাভাবে আকর্ষণ করেছিল। প্রকৃতির লীলাভূমি চট্টগ্রাম নিয়ে শাসকদের মধ্যে যুগে যুগে লড়াই-সংঘর্ষ লেগেই ছিল। এটি কখনো আরাকানি মগ, কখনো  ত্রিপুরারাজ, কখনো পর্তুগিজ হার্মাদ কিংবা বর্মিরাজ, কখনো বা পাঠান, মোগল, ইংরেজ শাসনের অধীনে ছিল। ইতিহাসের কালপর্বে নানা দেশের নানা জাতিগোষ্ঠীর আগমনে নানা ভাষা, কৃষ্টি-সভ্যতা ও জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে রূপে ও প্রাণে চট্টগ্রাম বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। বিভিন্ন জাতির লোকজন নিজ নিজ ভাষায় মনের মাধুরী মিশিয়ে চট্টগ্রামকে নানা নামে অভিহিত করেছিল। তাই ‘চট্টগ্রাম’ শব্দের উৎপত্তি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়।

অতি প্রাচীনকালে আর্যরা কামরূপ ও আরাকানের মধ্যবর্তী অঞ্চল চট্টগ্রামকে ‘সুক্ষ্মদেশ’ নামে অভিহিত করেছিলেন। পালিগ্রন্থে এর নাম রম্ভূ বা রম্যভূমি, তন্ত্র ও পুরাণে এর নাম ‘চট্টল’। বৌদ্ধ চৈত্যের প্রাচুর্যের কারণে একে ‘চৈত্যগ্রাম’ বলা হতো, যা থেকে চট্টগ্রাম শব্দের উৎপত্তি বলে কেউ কেউ দাবি করেন। সপ্তম শতকের চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং একে ‘শ্রীচটলো’ বলে উল্লেখ করেছেন যা কামরূপ ও সমতটের নিকটবর্তী পূর্বদিকে অবস্থিত বহু সংখ্যক বৌদ্ধচৈত্যবিশিষ্ট সমুদ্রতীরবর্তী স্থানবিশেষ। পুরনো সপ্তগ্রাম বা সাতগাঁও থেকে বহু লোক এখানে বসতি করে এর নাম সপ্তগ্রাম বা সাতগাঁও রেখেছিল বলে অনেকে ধারণা করে থাকেন। বর্মি ভাষায় এর নাম ‘চিতাগাঁও’ বা ’চিত্গাঁও’ যা ‘চিত্ তোত্ গাং’ শব্দজাত; যার অর্থ ‘আর যুদ্ধ নয়’। ‘লক্ষ্মণদিগ্বিজয়’ নামক আদি গ্রন্থে চট্টগ্রামকে ‘চক্রশালা’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। হিন্দু সাধু-সন্ন্যাসীরা একে ‘চন্দ্রনাথ’ বলে চিনতেন। আদিকালে সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথে যাতায়াতকারী ব্রাহ্মণগণ একে সীতার গাঙ্গ বা ‘সীতাগাঙ্গ’ বলতেন। আরব ভৌগোলিক ইদ্রিসী চট্টগ্রামকে ‘কর্ণবুল’ বলে উল্লেখ করেছেন। ত্রয়োদশ শতকের পর্যটক ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনীতে এ দেশ ‘সতের কাউন’ নামে উল্লেখ রয়েছে। তখনকার দিনে সমুদ্রে নৌযান চলাচলের সুবিধার জন্য সমুদ্রতীরবর্তী পরীর পাহাড় বা নিকটবর্তী উচ্চভূমিতে চাটি (Light House) সারিবদ্ধভাবে জ্বালিয়ে দেয়া হতো। ইতিহাসবিদ হামিদুল্লাহ খাঁ তাঁর ‘তারিখে হামিদী’ গ্রন্থে বদর পীরের চাটি জ্বালিয়ে দেয়ার প্রভাবে চট্টগ্রাম থেকে দৈত্য-জিন-পরীর পলায়নের কিংবদন্তি মানুষের মাঝে চালু ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। সেই চাটি থেকে ‘চাটগাঁ’ শব্দের উৎপত্তি বলে কেউ কেউ মনে করেন। প্রাচীন আরাকানের গুরুত্বপূর্ণ নগর হিসেবে একে ‘রোসাঙ্গ পুরীও’ বলা হতো। পর্তুগিজরা এর নাম দিয়েছিল পোর্তোগ্রান্ডো (Porto Grando> Grand Port), চট্টগ্রাম বন্দরকে তারা প্রধান বন্দর বলে উল্লেখ করত; সাতগাঁওয়ে তাদের দখলে আরেকটি পোর্ট ছিল। নসরত শাহ এর নাম দিয়েছিলেন ‘ফতেয়াবাদ’। আওরঙ্গজেবের সময় এটি ‘ইসলামাবাদ’ নামে পরিচিত ছিল। কেউ কেউ একে ‘মগরাজ্য’ও বলে থাকেন। ইংরেজের উচ্চারণে চট্টগ্রাম হয়ে যায় ‘চিটাগাং’। মুসলিম ভক্তিবাদীরা একে ‘বারো আওলিয়ার দেশ’ বলে থাকেন। ভৌগোলিকভাবেও চট্টগ্রাম অনন্য বৈশিষ্ট্য ধারণ করে আছে। এর উত্তরে ফেনী নদী, দক্ষিণে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর, পূর্বে আরাকান পর্বতমালা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। পুরাকালে চট্টগ্রামের অধিকাংশ ভূমি বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলীর জলে নিমজ্জিত ছিল। নদী ও সমুদ্রের ঢেউ সীতাকুণ্ড পর্বতমালা, টাইগারপাস বাটালী হিলের পাদদেশে, পরীর পাহাড় হয়ে বদর মোকামের উচ্চভূমির নিচ দিয়ে বয়ে যেত। এর মধ্যে আন্দরকিল্লাকে কেন্দ্র করে বহদ্দারহাট থেকে পাথরঘাটা পর্যন্ত লম্বালম্বিভাবে উচ্চভূমি ও আশপাশের বিক্ষিপ্ত কিছু উচ্চভূমি নিয়ে চট্টগ্রাম নগর গড়ে উঠেছিল। কালের বিবর্তনে কর্ণফুলী পূর্বদিকে এবং বঙ্গোপসাগর আরো পশ্চিমে সরে গেলে চট্টগ্রাম শহর বাকলিয়া, মোহরা, ঢাকা হাইওয়ের পশ্চিমে অনেক ভূমি জেগে উঠে এ শহরের বহুল বিস্তৃতি ঘটে।

বিখ্যাত অনেক নগরীর মতো চট্টগ্রামেরও লিখিত কোনো একক প্রাচীন ইতিহাস নেই। ইতিহাসের কালপর্বে যারা চট্টগ্রামে শাসন করেছিল তাদের ইতিহাসে, পর্যটকদের বিবরণীতে, প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ও কবির লেখনীতে আদি চট্টগ্রামকে খোঁজার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ নগর যেহেতু দীর্ঘ সময় আরাকান, ত্রিপুরা, মোগল ও পর্তুগিজ-ইংরেজের অধীনে ছিল, তাই চট্টগ্রামের ইতিহাস বিনির্মাণে সেসব দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইতিহাসের উপাদানগুলো বের করা জরুরি। আরাকানের ইতিহাস গ্রন্থ ‘রাজোয়াং’ অনুসারে মহাভারত যুগের শেষে কপিলাবস্তুর কানরাজগজি রাজ্যহারা হয়ে আরাকানের পর্বতে রাজধানী স্থাপন করেন। এ বংশ ধারাবাহিকভাবে ১৪৬ বছর রাজত্ব করে। এদের রাজ্য মেঘনার পার থেকে দক্ষিণে পেগু রাজ্যের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাদের রাজত্বকালে গৌতম বুদ্ধ শিষ্যসহ চট্টগ্রাম হয়ে আরাকান পরিভ্রমণে এসেছিলেন। এর পর চন্দ্রসূর্য বংশীয় রাজাগণ ১৬৯ বছর রাজত্ব করেন। এ বংশের রাজা ষোল সিংহ ৯৫২ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের রাজা হয়ে চট্টগ্রাম দখল করে কুমিরার পাহাড়ে বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করেন। এর পর মৌরীয় বংশ কিছুকাল রাজত্ব করার পর শানগণ আরাকান দখল করে ১০১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। ১৪০৬ সালে ব্রহ্মরাজ কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে আরাকানরাজ শোয়ামাংজি গৌড়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। গৌড়ের সেনাপতি ওয়ালী খাঁর নেতৃত্বে আরাকান দখল করে শোয়ামাংজিকে আরাকানে অধিষ্ঠিত করে নিজে চট্টগ্রাম অধিকার করে নেন।  তার মৃত্যু হলে মিনখারী অলিখাঁ নাম ধারণ করে আরাকানের রাজা হন। সে সময় থেকে আরাকানের অধিবাসীরা আরাকানি নামের সাথে সাথে একটা মুসলিম নাম ধারণ করতেন। ১৪৫৯ থেকে ১৬৬৫ সন পর্যন্ত প্রায় ২০০ বছর চট্টগ্রামে মগ রাজত্ব দেখা যায়। সে সময় আরাকান শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ ছিল যা তখনকার রাজকবি আলাউলের লেখায় নানাভাবে উল্লিখিত হয়েছে। আশপাশের রাজ্য থেকে ভাগ্যান্বেষণে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে নানা জাতের লোক এখানে বসত গড়ে তুলে। তাদের অনেকে রাজদরবারেও সমাদৃত হয়েছিল।

১৫০০ থেকে ১৫৩২ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের দখলে ত্রিপুরারাজ, পর্তুগিজ, মুসলিম সেনাপতি ও বাদশাহদের উপর্যুপরি আক্রমণ, লুণ্ঠন, রক্তারক্তি চলে আসছিল, কিন্তু কেউ স্থিত হতে পারেননি। ‘রাজমালা’ অনুসারে ১৫১২ খ্রিস্টাব্দে হুসেন শাহ চট্টগ্রাম আক্রমণ করেন। এ সময় সুযোগ বুঝে ত্রিপুরার প্রধান সেনাপতি চয়চাগ চট্টগ্রাম আক্রমণ করেন। হুসেন শাহের সৈন্যরা পরাজিত হয়ে পলায়ন করলে চয়চাগ মগদের পরাজিত করে চট্টগ্রাম অধিকার করে নেন। এদিকে হুসেন শাহ বহু সৈন্য জোগাড় করে ত্রিপুরা রাজ্য আক্রমণ করেন, ত্রিপুরা সেনাপতি চয়চাগ সে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকার সুযোগে মগরা পুনরায় চট্টগ্রাম দখল করে নেন। ১৫২২-২৪ খ্রিস্টাব্দে হুসেন শাহের পুত্র নসরত শাহ রাঢ়ীয় হিন্দু সেনাপতি রুদ্রবংশীয় পরাগল খাঁর বাহুবলে ত্রিপুরারাজ দেব মানিক্যকে পরাজিত করে চট্টগ্রামের উত্তরাংশ অধিকার করে চট্টগ্রামকে ‘ফতেয়াবাদ’ নামে অভিহিত করেন। এখনো চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ফতেয়াবাদ এবং নসরত শাহের মসজিদ, দিঘি ইত্যাদি পরিদৃষ্ট হয়। ১৫২৬ সালে ত্রিপুরা রাজা বিজয় মাণিক্য মুসলমান ও মগদের পরাজিত করে চট্টগ্রাম দখল করে নেন। ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে মগরাজা মেঙবেঙ চট্টগ্রাম অধিকার করে নেন, যা মোগলদের বিজয়লাভ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ১৬৫২ সালে আরাকান রাজ সন্দসুধর্মের সময়ে শাহ সুজা বাংলাদেশ থেকে আরাকানে পালিয়ে আসেন এবং ১৬৬৪ সালে মগ রাজা কর্তৃক নিহত হন।

১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে মোগলরা দীর্ঘ সময় ভারত শাসন করলেও চট্টগ্রাম ছিল তাদের আয়ত্তের বাইরে। পর্তুগিজ জলদস্যুদের নৌবলে মগরা শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। তাই কেউ আরাকানে অভিযান চালাতে সাহস পায়নি। এদিকে আরাকান রাজের অধীনে পর্তুগিজ জলদস্যুরা মোগল সুবেহ বাংলার মেঘনা নদীতে দস্যুবৃত্তি চালাতে লাগল। তারা মেঘনা নদীতে নৌযান লুট করে মুসলমানদের ধরে নিয়ে এসে আরাকানে দাস হিসেবে বিক্রি করত। কবি আলাউলকেও এভাবে ধরে এনে ফিরিঙ্গিরা রোসাংঙ্গে বিক্রি করে দেয়। মগ-ফিরিঙ্গি উত্পাতমুক্ত অবাধে নৌযান চলাচলে চট্টগ্রাম দখল মোগলদের জন্য জরুরি

হয়ে পড়ে। ১৬৬৪ সালে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সুবেদার শায়েস্তা খাঁ চট্টগ্রাম দখল করার মানসে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তিনি সুকৌশলে পর্তুগিজ নাবিক সর্দার ক্যাপ্টেন মুরকে ২০০০ টাকা নগদ দিয়ে, পর্তুগিজদের উচ্চহারে মাসিক বেতন ও জমির প্রলোভন দেখিয়ে মগদের থেকে ভাগিয়ে নিয়ে আসেন। মোগল যোদ্ধা ফরহাদ খাঁ, নৌ-সেনাপতি ইবনে হোসেনের নেতৃত্বে ২৮৮টি নৌযান নিয়ে ১৬৬৬ সালের ১১ নভেম্বর মোগল বাহিনী সন্দ্বীপ দখল করে নেয়, যা চট্টগ্রাম দখলের জন্য অতীব জরুরি ছিল। ২৪ ডিসেম্বর ১৬৬৬ সালে শায়েস্তা খাঁর পুত্র বুজুর্গ উমেদ খাঁর নেতৃত্বে ৪০০০ অশ্বারোহী সৈন্য চাটগাঁ অভিযানে ঢাকা থেকে রওনা হয়। নোয়াখালীতে পৌঁছালে পর্তুগিজ ক্যাপ্টেন মুর, ইবনে হোসেন, ফরহাদ খাঁ প্রমুখ তার বাহিনীর সাথে যুক্ত হন। তারা সেখান থেকে জলে ও স্থলপথে চাটগাঁর দিকে রওনা হন। ২৩ জানুয়ারি কাট্টলীর কাছে বঙ্গোপসাগরে ক্যাপ্টেন মুর ও ইবনে হোসেনের নৌ-সেনাদের সাথে মগ সেনাদের তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। মগ সেনারা টিকতে না পেরে সাগর থেকে কর্ণফুলীর দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। তাদের ধাওয়া করে মোগল বাহিনী কর্ণফুলীর মোহনার তীরে খণ্ড খণ্ড স্থলযুদ্ধে পরাজিত করে স্থানটি ফতেহ গাঁ > পতেঙ্গা নামকরণ করেন। স্থলপথে উমেদ খাঁর বাহিনী মগ বাহিনীর রক্ষণব্যূহ ভেঙে আন্দরকিল্লা দুর্গের কাছাকাছি এসে পৌঁছায়। অবশিষ্ট মগ নৌযানগুলো কর্ণফুলীতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।  ইবনে হোসেন বাহিনী নৌযানে কর্ণফুলী তীরের কাছে ফিরিঙ্গি বাজারে মগদের তিনটি বাঁশের কেল্লা ও ১৩৫টি জলপোত দখল করে নিয়ে সদরঘাটস্থিত নৌযান থেকে আন্দরকিল্লা দুর্গে তোপ দাগাতে লাগল। স্থল ও জলপথের মোগল বাহিনী মিলিত হয়ে সহজেই মগদের পরাজিত করে ২৫ জানুয়ারি ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে আন্দরকিল্লা দুর্গ দখলে নেয়।

চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মারক হিসেবে উমেদ খাঁ নিজ নামে ১৬৬৬ সালে আন্দরকিল্লা জামে মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু করেন। তিনি এ জেলাকে ইসলামাবাদ নাম দিয়ে সাতটি চাকলায় বিভক্ত করে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫৮ টাকা ২ আনা ৬ পাই রাজস্ব ধার্য করেন। এ সময় টাকায় ৮ মণ চাল পাওয়া যেত। ১৭২২ সালে মুর্শিদকুলি খাঁ চট্টগ্রামকে ১৩ চাকলায় বিভক্ত করে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৭৯৫ টাকা জমা নির্ধারণ করেন। ১৬৬৬ থেকে ১৭৬১ পর্যন্ত ৩০ জন মুসলিম শাসক চট্টগ্রাম শাসন করেন। চট্টগ্রামের শেষ মোগল শাসক মোহাম্মদ রেজা খাঁ থেকে ১৭৬১ সালের ৫ জানুয়ারি ইংরেজ চিফ হ্যারি ভারলেস্ট শাসনভার বুঝে নেন। ভারলেস্ট চট্টগ্রামকে নয়টি চাকলায় বিভক্ত করে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ১৪৪ টাকা খাজনা ধার্য করে নয়জন চাকলাদার নিযুক্ত করেন।  

চট্টগ্রাম বন্দরের খ্যাতি আদিকাল থেকে। আলেকজান্ডারের সময়ের পূর্ব থেকেই গ্রিক, আরব, চীনা বণিকরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ নিয়ে আসত। চট্টগ্রামের গুরুত্ব যে অত্যধিক তা বোঝা যায় ব্রিটিশদের মীর কাসিম থেকে ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে ভারতের অন্য দুটি জেলার সাথে চট্টগ্রামের দেওয়ানি নেয়া। পলাশী জয়ের পরও সারা ভারতের দখল নিতে ব্রিটিশের প্রায় ১০০ বছর লেগেছিল। কিন্তু পলাশী জয়ের চার বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম ব্রিটিশ শাসনে চলে আসে। মূলত মোগল ও ব্রিটিশ শাসনে চট্টগ্রাম বাণিজ্যের সাথে সাথে অর্থনৈতিক গুরুত্ব লাভে সক্ষম হয়ে উঠতে শুরু করে।

জাহাজ নির্মাণ শিল্প
চট্টগ্রাম শিল্পের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ চালানো চট্টগ্রামবাসীর আদি পেশা। চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক জাহাজ দূরদূরান্তে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন করত। হালিশহরে অনেক ‘মালুম’ বংশের পরিচয় পাওয়া যায়। বার্মটিক কাঠ দিয়ে চট্টগ্রামের কারিগরদের তৈরি জাহাজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ছিল। সুদূর ইউরোপ ও এশিয়া মাইনর থেকে এসে বণিকেরা চট্টগ্রামের জাহাজ কিনে নিয়ে যেত। কর্ণফুলীর তীরবর্তী গোসাইলডাঙ্গা, হালিশহর ও পতেঙ্গায় জাহাজ নির্মাণের অনেক ডক ছিল। হালিশহরের ইশান চন্দ্র মিস্ত্রি, আগ্রাবাদ মিস্ত্রিপাড়ার ইমাম মিস্ত্রির নাম জাহাজ নির্মাণের ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে থাকবে। হান্টার বলেন, চট্টগ্রামের জাহাজ নির্মাণের কারখানা ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত নিজ মাহাত্ম্য অক্ষুন্ন রেখেছিল। তত্কালে রোমান সম্রাটেরা চট্টগ্রাম থেকে জাহাজ তৈরি করিয়ে নিতেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জনৈক হিন্দু সওদাগর ‘বকল্যান্ড’ নামক জাহাজ এদেশের নাবিক দ্বারা পরিচালনা করে স্কটল্যান্ড পাড়ি দিয়ে ফিরে এসেছেন। এ সময় চট্টগ্রামের রেঙ্গুন প্রবাসী দুই ভ্রাতা রেঙ্গুনে ‘বেঙ্গল স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি’ খুলে দুখানি প্রকাণ্ড স্টিমারে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন শুরু করেন। এ জাহাজে রেঙ্গুন যেতে সে সময়ে জনপ্রতি ৫ টাকা ভাড়া লাগত। খান সাহেব আবদুর রহমান দু’কন্যা ‘আমেনা খাতুন’ ও জামেনা খাতুন’ নামে দুটি জাহাজ নির্মাণ করান। ‘আমেনা খাতুন’ জাহাজটি নির্মাণে হালিশহরের ৪০ জন শূদ্র মিস্ত্রির ১ বছর সময় লাগে। ১৯১৪ সালের ১৫ মার্চ সাড়ম্বরে আমেনা খাতুনকে কর্ণফুলীতে ভাসানো হয়। এর দৈর্ঘ্য ৮০ ফুট, প্রস্থ ৪০ ফুট, এটি ছয় হাজার টন পণ্য পরিবহনে সক্ষম ছিল। এর নির্মাণ ব্যয় সে সময়ে ৩০ হাজার টাকা পড়েছিল।

সে সময়ে চট্টগ্রাম শহরে বসতবাটি তেমন ছিল না। মানুষ গ্রাম থেকে এসে দিনে দিনে কাজ সেরে গ্রামে ফিরে যেত। হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজান, আনোয়ারা, বাঁশখালী থেকে লোকজন এসে এখানকার জাহাজ নির্মাণের কাজ করত। পরবর্তীতে তারাই শহরে বসতভিটি করে স্থায়ী হয়ে যায়। এখানকার ইশান মিস্ত্রির হাট, বালামীপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, মালুমঘাট, সুয়ানীরহাট, গুদীপাড়া, খালাসীপাড়া, সারাংবাড়ি ইত্যাদি জাহাজ শিল্পের সাথে লোকজনের আবাসভূমিকে নির্দেশ করে। ১৫৭০ সালে রুমের সুলতান চট্টগ্রামের জাহাজে চড়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। নেদারল্যান্ডসের নৌ-জাদুঘরে চট্টগ্রামে মধ্যযুগে নির্মিত জাহাজের রেপ্লিকা রয়েছে।

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশের অন্যতম দ্বার হিসেবে চট্টগ্রাম প্রাচীনকাল থেকেই পরিচিত হয়ে আসছিল। ফাহিয়ান, ডিওন, ক্লিমেন্স, জোহানস, টলেমি, স্ট্রাবো, প্লিনির ভ্রমণবৃত্তান্তে জানা যায়, আদিতে চট্টগ্রামের সাথে আরব, চীন, গ্রিকের সাথে বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। ইবনে বতুতা, ইরান বুধ, ইদ্রিসীর ভ্রমণকাহিনীতেও চাটগাঁর সুবিস্তৃত বাণিজ্যের কথা উল্লেখ আছে। চাটগাঁর নৌযান নিয়ে চট্টগ্রামের নাবিকরা নক্ষত্রের সাহায্যে ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন দ্বীপ, পারস্য, সিংহল, সুমাত্রা, জাভা, মিসর দেশ পর্যন্ত গমন করত। তখনকার সময়ে খাল, নদী, নালা দিয়ে চট্টগ্রামের সব অঞ্চলে নৌযান চলাচলের সুবন্দোবস্ত ছিল। এখানকার পাট, শুঁটকি, ডিম, কার্পাস তুলা, আগর ইত্যাদি নৌযানে করে রফতানি হতো। পার্বত্যাঞ্চলের যে ঘাটে কার্পাস তুলা নৌযানে তোলার জন্য গোলায় রাখা হতো, সে স্থানের নাম কার্পাসগোলা। গণ্ডারের শিং যেখানে জমিয়ে রাখা হতো, সেটাই আলকরণ আর আগর চাষ যেখানে হতো সেটাই আগারবাদ বা আগ্রাবাদ। এটি অনুমান করা যায় যে, সে সময় কর্ণফুলী বহদ্দারহাট দিয়ে সুলুপবহর হয়ে কার্পাসগোলা-ঘাট ফরহাদ বেগ হয়ে পাথরঘাটায় এসে ডানদিকে বাঁক নিয়েছিল। পরবর্তীতে নদী দূরে সরে গিয়ে শহরের স্থলভাগের বিস্তৃতি বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার ইতিহাস থেকে চট্টগ্রামের ইতিহাস বৈচিত্র্যপূর্ণ ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। পাহাড়, সমুদ্রবেষ্টিত চট্টগ্রামের অপরূপ ভূপ্রকৃতি, খরস্রোতা কর্ণফুলীর মোহনায় গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক বন্দর চট্টগ্রামকে অনন্য রূপ-মাধুর্য দান করেছে, যার কারণে প্রাচীনকাল থেকে একে প্রাচ্যের রানী বলা হয়।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়