সেই পাকিস্তান আমল, মানুষের মধ্যে ভাঙা ভাঙা স্বপ্ন। দেশভাগের যন্ত্রণা মুছে ফেলে চাঙ্গা হওয়ার সময়। মানুষের স্রোতে কেউ কেউ দেশী, অনেকে অন্য দেশ থেকে আসলেন। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে কয়েকজন ব্যবসায়ীর উদ্যোগ সফল হতে লাগল। পাকিস্তানের সেই বিখ্যাত ২২ পরিবার ও তার বহিরাঙ্গে বাণিজ্যের স্বপ্নটা বিস্তার করতে লাগল। গড়ে উঠতে লাগল একে একে কল-কারখানা। মানুষের মধ্যে জাগরণ দেখা দিল। কিন্তু রাজনৈতিক ধারা ও পটপরিবর্তন, শ্রেণী ও বর্ণবৈষম্য, জাতিগত হিংসা ব্যবসা-বাণিজ্যকে স্থবির করে তুলল। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী এ দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে লাগল। তাদের স্বার্থে ভাগ-বাটোয়ারাটাও বৈষম্যপূর্ণ হয়ে উঠল।

সেই সময় থেকে স্বাধিকার এবং তার পরবর্তী বাণিজ্যশৃঙ্খলে গতিশীল ছিলেন যারা, তাদের মধ্যে অন্যতম এ কে খান, ইস্পাহানি ও বিএসআরএম। ভিন দেশ থেকে এসে তারা বাংলাদেশের ভেতরে এ এক অন্য তরঙ্গ তৈরি করে। যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনাকেও প্রভাবিত করে। বর্তমানে তাদের ব্যবসা পরিধি দেশের বাণিজ্যসীমা ছাড়িয়ে বিদেশেও সুনামের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের বিস্তার ও পথচলা সুদূরপ্রসারী।

এ কে খান গ্রুপ
গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে এ কে খান ওরফে আবুল কাশেম খান সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি আইন পেশা ছেড়ে দিলেন। ব্রিটিশ আমল। উপমহাদেশ তখন সংকাটপন্ন। এই তরুণ নিজেকে বদলে নিলেন। স্বাধীনভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করতে মনস্থ করলেন। একজন শিক্ষিত তরুণ দেশকে শিল্পায়নের জন্য কাজ করবেন, তখন তা ভাবাও আশ্চর্যের। ইংরেজ শাসকরা এই অঞ্চলে শিল্পায়ন হোক তা চাইত না। বাংলাদেশের সব অঞ্চল কলকাতাকেন্দ্রিক নির্ভরতাও কাটিয়ে উঠতে চাইছে। তাঁত শিল্প, চা শিল্প, জাহাজ ও লবণ শিল্পের প্রসার ও উন্নতি বিলেতনির্ভর হয়ে পড়ল। তবু সাতচল্লিশ সাল ও তার কিছু আগে বাংলার কোনো কোনো স্থানে বস্ত্র, চটকল ও কিছু রাসায়নিক শিল্প স্থাপিত হয়েছিল বটে, কিন্তু এটা খুব উল্লেখ্য ছিল না। প্রায় কাঁচামাল কলকাতা ও বিদেশ থেকে আনতে হতো।&dquote;&dquote;

ব্রিটিশ-পাকিস্তান-বাংলাদেশ এ ত্রিকালদর্শী শিল্প, ব্যবসা, রাজনীতি, মানবসেবার কিংবদন্তি পুরুষ এ কে খান। এ কে খান ব্লু-ব্লাড তথা রাজকীয় সম্ভ্রান্ত বংশের উত্তরাধিকারী। এ কে খান ১৯০৫ সালের ৫ এপ্রিল মোহরার বিখ্যাত জান আলী খান চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দক্ষিণ চট্টগ্রাম রেলপথে জান আলীর নামে একটি রেলস্টেশনের নাম রয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীতে গৌড়েশ্বরের মন্ত্রী সাইয়েদ শমশির খানের তৃতীয় পুত্র শেরবাজ খানের চতুর্থ অধস্তন পুরুষ জান আলী চৌধুরী এ কে খানের পিতামহ। কিন্তু বংশের এ আভিজাত্য, গৌরব ও ঐতিহ্যকে ছাপিয়ে গেছে এ কে খানের নিজের কর্মের ঐশ্বর্য। লক্ষ্মী ও সরস্বতী যুগ্ম বলে এ কে খানের এক জীবনের আধারে অনেক জীবনের সাফল্য কানায় কানায় উপচে পড়েছে। বংশমর্যাদার সোনার তরীকে তিনি অপরিমেয় ফসলে পূর্ণ করে এত উচ্চতায় উপনীত করেন যে, তাতে তার পূর্বপুরুষরা ম্লান হয়ে যান। তার খ্যাতি, অর্থ-প্রতিপত্তির ছটায় উদ্ভাসিত করে রেখেছিলেন বঙ্গের জনপদকে। তার সময়ের বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে শীর্ষ ভূমিপুত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। পিতা আলহাজ আবদুল লতিফ খান মাতা ওয়াহাবুন্নিসা চৌধুরানী। তার পিতা টানা ১৬ বছর সুখ্যাতির সঙ্গে ফতেয়াবাদে সাবরেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করেন।

এ কে খান যে দেশমাতৃকার সুযোগ্য সূর্যসন্তান হিসেবে পরিগণিত হবেন, তা তার ছাত্রজীবন থেকে ইঙ্গিতবহ হয়ে উঠছিল। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং ছাত্রজীবনের প্রতিটি ধাপে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ফতেয়াবাদ হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন ও চট্টগ্রাম কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএ পাস করেন। ১৯২৭ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে বিএ (অনার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ব্যাচেলর অব ’ল (বিএল) ডিগ্রি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী অর্জন করেন।

তার পিতা চাইতেন তিনি চাকরিক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করুক। এ কে খান কর্মজীবন শুরু করেন— অবশ্যই তার শ্বশুরকুলের বেঙ্গল-বার্মা স্টিম নেভিগেশন কোম্পানিখ্যাত ব্যবসায়ী ও স্বদেশী আন্দোলনের সংগঠক আবদুল বারী চৌধুরীর সহায়তায়। শিল্পায়নে ইনডিভিজুয়াল এন্টারপ্রাইজ বা ব্যস্টিক প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে আজকাল আন্তর্জাতিক সহযোগিতার যে সুলভতা আমরা লক্ষ করছি, চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে তা তত সহজ ছিল না। কিন্তু সেই সময়ে এ কে খান এর গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন যে, দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে যদি সমাজকে পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে পুঁজির সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তিরও একটা ফলপ্রসূ মিলনের প্রয়োজন এবং তার জন্য দরকার বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। এ কে খানের সব সফল শিল্প স্থাপনার পেছনে এ ভাবনার পরিচয় রয়েছে।

উল্লেখ্য, পাকিস্তান আমলে এ কে খানের মন্ত্রিত্বকালে চা, জুট, তামাক, কটন, ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পগুলোর প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। তার সময় পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনকে কার্যকর ভূমিকা রাখবার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গঠন করা হয়। এ প্রতিষ্ঠানটি তার সময় খুলনায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে (১৯৫৯) নিউজপ্রিন্ট ও ডিডিটি ফ্যাক্টরি স্থাপনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তার সময় বেশকিছু বাঙালি অফিসারকে শিল্পে প্রশিক্ষণ লাভের জন্য বিদেশ পাঠানো হয় এবং পূর্ব পাকিস্তানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্থাপিত হয়। তার সময় দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শিল্পের উন্নতির জন্য পূর্ব পাকিস্তানের অংশ কেন্দ্রীয় সরকার থেকে প্রায় ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য তা ছিল ৩৫.৪ কোটি টাকা। তার সময় ১৯৫৯ সালে ফরেস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন স্থাপিত হয়। চট্টগ্রাম কালুরঘাট উড ট্রিটিং প্লান্টটি তার সময়ে ১৯৬০ সালে এফআইডিসিকে হস্তান্তর করা হয়। তারই প্রচেষ্টায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব পাকিস্তান ৩১ নং অর্ডিন্যান্সের অধীনে ১৯৬১ সালে স্থাপিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পায়নের ব্যাপারে এ ব্যাংক বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে। এ ব্যাংক ১৯৬২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ কে খানের সময় পূর্ব পাকিস্তানে বস্ত্র, চামড়া ও রাবার, খাদ্যসামগ্রী, ইঞ্জিনিয়ারিং, রাসায়নিক, কাগজের মিল, নন-মেটালিক, মিনারেল প্রডাক্ট, পাওয়ার খাতে প্রচুর ঋণ মঞ্জুর করে। তারই প্রচেষ্টায় ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের ভেড়ামারা ও গোয়ালপাড়ায় ৮ হাজার ৫০০ কেডব্লিউ, ১৬ হাজার কেডব্লিউ ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি পাওয়ার স্টেশন স্থাপিত হয়। কর্ণফুলী হাইড্রো ইলেকট্রিক প্রজেক্ট বহুদিন ধরে ধীরগতিতে অগ্রসর হচ্ছিল। তিনি তাতে গতিসঞ্চার করেন। তারই সময়ে ১৯৬২ সালের মার্চ মাসে তা বিদ্যুত্ উত্পাদন আরম্ভ করে। ইস্ট পাকিস্তানে পাওয়ার অ্যান্ড ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট অথরিটি তারই প্রচেষ্টায় একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ফসল, যার হেডকোয়ার্টার চট্টগ্রামে ছিল— সেই ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের (বর্তমানে পূবালী ব্যাংক) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এ কে খান।

এ কে খান মনে করতেন, কয়েকজন বৃহত্ পুঁজিপতি শিল্পকে কেন্দ্রীভূত করলে সমস্যার সমাধান হবে না। শিল্পকে প্রসারিত করে সাধারণ মানুষকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটে বহু ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সমাবেশ করা যাবে। এখানে শিল্পের মালিকদের জমি, বাড়িঘর, কারখানা, বিজলি, ব্যাংক, কাঁচামালের সরবরাহ, উৎপন্ন পণ্যদ্রব্যের বিক্রি ব্যবস্থা— সব কিছুর সুবিধা দেয়া হবে। বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল, স্কুল সবকিছু মিলে এস্টেটগুলো হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এলাকা। মুখ্যত বিদেশী বিনিয়োগ নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের দেশে শিল্পায়ন করতে হবে।

মুসলিম লীগার ও পাকিস্তানের মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও এ কে খান নিরন্তর পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে সংগ্রাম করে গেছেন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এম এন হুদা জানাচ্ছেন, পাকিস্তান অর্থনীতি সমিতির কার্যক্রমে পূর্ব পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদদের প্রাধান্য ছিল বেশি। এর জন্য পাকিস্তানিরা ঢাকা গ্রুপ অব ইকোনমিস্ট নামে প্রশংসা ও বিদ্রূপ দুটোই করতেন। হুদার তথ্যমতে, মন্ত্রী হিসেবে এ কে খান পূর্ব পাকিস্তানে ট্যাক্স হলিডে দীর্ঘতর করেছিলেন। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান অর্থনীতি সমিতির সম্মেলন হয়। চিটাগং চেম্বার সচিবালয় তথ্যমতে, এ কে খান কমার্স কলেজে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের তথ্য ও পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ এ তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যবহার করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গতির সঞ্চার করে। এভাবেই এ কে খান একাত্তরের স্বাধীনতার আন্দোলনের বীজ বপন করেছিলেন। ৩১ মার্চ ১৯৯১ সালে এ মহাজন প্রয়াত হন। এর একদিন পূর্বে তিনি উইলের মাধ্যমে এই এ কে খান শিল্পগোষ্ঠীর মোট লভ্যাংশের ৩০ শতাংশ জনশিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্কলারশিপ খাতে ব্যয়ের নিমিত্তে দান করেন। সমাজসেবার ব্রত আজো চালু রয়েছে।

ইস্পাহানি গ্রুপ
ইস্পাহানি পুরনো ব্যবসায়ীদের মধ্যে অন্যতম। ইস্পাহানিদের বিস্তৃতি ভারতবর্ষ, পাকিস্তান, বাংলাদেশে রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রচুর বিনিয়োগ রয়েছে। ১৯০ বছরের পুরনো এই কোম্পানি এই উপমহাদেশে পণ্য ও সেবা প্রদানে অগ্রগামী। গোড়াপত্তনটা ১৮২০ সালে হাজি মোহাম্মদ হাসেম (১৭৮৯-১৮৫০) ইস্পাহানি পারস্যের ইস্পাহান নগর থেকে বোম্বে আসেন। প্রথম ব্যবসা শুরু করেন। তিনিই ইস্পাহানি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। উনিশ শতকের তিরিশের দশকে তিনি তার ব্যবসা কলকাতায় প্রসারিত করেন। তখন তিনি কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত আসাম টি কোম্পানির একমাত্র মুসলিম সদস্য ছিলেন। এরপর ইস্পাহানিদের ব্যবসার পরিধি ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন পশ্চিমে বোম্বে, দক্ষিণে মাদ্রাজ এবং পূর্বে বার্মা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে।

হাজি হাসেমের দৌহিত্র মির্জা মেহেদী ইস্পাহানি (১৮৪১-১৯১৩) ব্যবসায়িক সদর দপ্তর মাদ্রাজে স্থানান্তর করেন। তিনি দীর্ঘ ১২ বছর মিসরের কায়রোতে অবস্থান করে চামড়া, চা, মসলা এবং অন্যান্য ভারতীয় পণ্যের বিশাল ব্যবসা গড়ে তোলেন। ১৮৮৮ সালে মির্জা মেহেদী ইস্পাহানি ঢাকায় কোম্পানির একটি শাখা অফিস স্থাপন করেন। তাঁর পুত্র মির্জা মোহাম্মেদ ইস্পাহানি (১৮৭১-১৯২৫) ১৯০০ সালে কলকাতায় এমএম ইস্পাহানি অ্যান্ড সন্স-এর একটি অফিস স্থাপন করেন। একই বছর তিনি লন্ডনেও একটি শাখা অফিস খোলেন। তার তিন পুত্র মির্জা আহমেদ ইস্পাহানি, মির্জা আবুল হাসান ইস্পাহানি ও মির্জা মাহমুদ ইস্পাহানি ১৯৩৪ সালে এম এম ইস্পাহানি নামে একটি লিমিটেড কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ শতকের ত্রিশের দশকে মির্জা আবুল হাসান ইস্পাহানি পারিবারিক ব্যবসা পরিত্যাগ করে রাজনীতিতে যোগ দেন।

১৯৪৭ সালের মধ্যে এমএম ইস্পাহানি লিমিটেড শাল্যাক (বার্নিশ/গালার পাত) কেইপক (জাজিম, লাইফবেল্ট), হোসিয়ান (চটের সুতা ও কাপড়), পাটের ব্যাগ, চা ও রাসায়নিক দ্রব্যের অন্যতম প্রধান রফতানিকারক কোম্পানি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। এরপর ইস্পাহানি পরিবারের করপোরেট হেড অফিস পূর্ব বাংলার বন্দরনগরী চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। তখন থেকে মির্জা আহমেদ ইস্পাহানির পুত্র মির্জা মেহেদী ইস্পাহানি (এ কে এ সদরী ইস্পাহানি) ইস্পাহানি কোম্পানির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪৯ সালে এম এ ইস্পাহানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ২০০৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কোম্পানির প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মেহেদী ইস্পাহানির নেতৃত্বে কোম্পানির মালিকানাধীন সিলেটের চা বাগানগুলোতে প্রচুর বিনিয়োগ হয় এবং চা শিল্পে ইস্পাহানি গ্রুপ ব্যাপক সফলতা অর্জন করে। পাকিস্তান আমলেই ইস্পাহানি গ্রুপ ছিল চা শিল্পে একটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকার সিলেটে চা বাগানের মালিকানার উপর একটি জরিপ চালায়। এতে দেখা যায়, ১৭০টি বাগানের মধ্যে ৭৪টির মালিকানা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি উদ্যোক্তাদের হাতে, যার অন্যতম ছিল আদমজী এবং আমিন গ্রুপ। তবে শীর্ষে অবস্থানকারী কোম্পানিটি ছিল ইস্পাহানি লিমিটেড। ভারত বিভক্তির পর মুসলিম উদ্যোক্তাদের সবাই পশ্চিম পাকিস্তানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। একমাত্র ইস্পাহানি পরিবার বসবাসের জন্য পূর্ববঙ্গ বেছে নেয়। ১৯৪৭ সালের পর থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও শিল্পায়নে ইস্পাহানি পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও খুলনা অফিসের মাধ্যমে ইস্পাহানি কোম্পানি চা, টেক্সটাইল, পাট, শিপিং প্রভৃতির ব্যবসা অব্যাহত রেখেছে। বর্তমানে কোম্পানিটি বাংলাদেশে ব্যক্তিখাতে অন্যতম বৃহত্ চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশের চা শিল্পে ইস্পাহানি গ্রুপের অবস্থান শীর্ষে। বৃহত্তর সিলেটে তাদের রয়েছে তিনটি বৃহত্ বাগান মির্জাপুর, গাজীপুর ও জেরিন বাগান এবং চট্টগ্রামে রয়েছে নেপচুন বাগান। এসব বাগানে প্রতি বছর আনুমানিক ২৫ লাখ কেজি চা উত্পাদিত হয়।

ইস্পাহানি গ্রুপ দীর্ঘকাল পাট, টেক্সটাইল ও শিপিং ব্যবসায় জড়িত। দেশভাগ-পূর্ব অবস্থায় কলকাতায় ভিক্টরি জুট প্রডাক্টস লিমিটেড নামে একটি জুট মিল প্রতিষ্ঠা করে। পাকিস্তান হওয়ার পর তা স্থানান্তর করে চট্টগ্রামে স্থাপন করা হয়। চিটাগং জুট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিজেএমসিএল) নামে ব্যক্তিখাতে সর্ববৃহত্ পাটকল প্রতিষ্ঠা যুগান্তকারী। ইস্পাহানি গ্রুপের মালিকানাধীন ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত পাহাড়তলী হোসিয়ারি মিলস (পিটিএইচএম) পূর্ব বাংলায় টেক্সটাইল শিল্পের পথিকৃত্ হিসেবে ভূমিকা রাখে। এছাড়া গত ৬০-৭০ বছর ধরে ইস্পাহানি গ্রুপ বিশ্বখ্যাত শিপিং কোম্পানিগুলোর পক্ষে এবং নন-ভেসেল অপারেটিং কমন ক্যারিয়ার্সের স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে।

ইস্পাহানি ফুডস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৯৯ সালে। সর্বাধুনিক মেশিনারিজ, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নিবেদিতপ্রাণ একদল বিশেষজ্ঞ কর্তৃক কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সঠিক ওজন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ফলে ইস্পাহানি ফুডস লিমিটেড আজ দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ফুড কোম্পানি। ২০০৭ সাল থেকে ইস্পাহানি এগ্রো লিমিটেড কৃষকদের মানসম্মত বীজ প্রদানের মাধ্যমে দেশের সমৃদ্ধি অর্জনে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। ২০০৯ সাল থেকে ইস্পাহানি এগ্রো লিমিটেড বীজের পাশাপাশি নিয়ে আসে বায়োটেক (জৈব প্রযুক্তি), যার মাধ্যমে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করেই কীটপতঙ্গ ও পোকা থেকে ফসলকে রক্ষা করা সম্ভব। ২০১০ থেকে সুগন্ধি চাল দিয়ে ইস্পাহানি এগ্রো লিমিটেড এগ্রো প্রোসেসিং সেক্টর-এ প্রবেশ করে এবং পরবর্তী সময়ে বাগানের তাজা আম, চালসহ বিভিন্ন কৃষিজ পণ্য উত্পাদন ও বাজারজাত করা শুরু করে। বৃহত্ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ইস্পাহানি শিল্প পরিবার। বিশাল লোকবল নিয়ে নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে।

২০০ বছরের পুরনো এই শিল্প পরিবারটি দেশে ও বিদেশে নতুন নতুন ব্যবসায়িক ক্ষেত্র ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে এক শিল্প বিপ্লব ঘটিয়েছে। ব্যবসা, পারিবারিক বন্ধন, সমাজ সেবার অঙ্গীকার প্রধান ও একমাত্র ব্রত রূপে নিয়েছেন সবাই। কর্মচারী-কর্মকর্তা, ভোক্তার অধিকার নিয়ে সচেতন এই শিল্প পরিবার। সৃজনশীলতায় গুরুত্ব দেয়া এই পরিবারের অনন্য বৈশিষ্ট্য শিক্ষা, জ্ঞান ও মনন চর্চার প্রতি আগ্রহ। এই পরিবারের সব সদস্য চৌকস, উচ্চশিক্ষিত ও দূরদর্শী। এশিয়ার বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নতমানের পণ্যসেবা নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে ইস্পাহানি গ্রুপ।

বিএসআরএম গ্রুপ
শিল্পায়ন চলছে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থাও সহায়ক করে নিতে চাইলেন ভারতের গুজরাটের আহমদাবাদের আলী হোসাইন আকবর আলী। তিনি বোহরা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। এই দেশ, এই আলো-হাওয়া তার কাছে নতুন মনে হলেও ব্যবসার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। তিনি ১৯৫২ সালে এই সমুদ্রবর্তী শহর চট্টগ্রামের নাছিরাবাদ এলাকায় প্রতিষ্ঠা করনে বিএসআরএম স্টিল মিল। ফৌজদারহাট ও নাছিরাবাদ এলাকা থেকে পরিচালিত হতে থাকে। উত্তাল পাকিস্তানে ব্যবসা বাণিজ্যের মধ্যে নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখলেন। স্বাধীনতার পর এর নাম দেয়া হয় বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড (বিএসআরএম)। এরপর সবাই এ দেশকে ভালোবেসে ব্যবসাকে প্রসারিত করতে থাকলেন।

বিএসআরএম দেশের ইস্পাত শিল্পের বিকাশে পথপ্রদর্শক। পণ্যের গুণগত মান এবং পেশাদারিত্বের মাধ্যমে গড়ে ওঠা টিম ওয়ার্ক বিএসআরএমকে শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। স্টিল উত্পাদনে উদ্ভাবনী মনোভাব নিয়ে নিজেদের কার্যক্রমকে সর্বোত্কৃষ্ট পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় বিএসআরএম, যা এই প্রতিষ্ঠানের ‘মান নীতিমালা’র একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি।&dquote;&dquote;

ইস্পাত শিল্পের রড (লং স্টিল), রড উত্পাদনের কাঁচামাল বিলেট, এম এস অ্যাঙ্গেল, ডিফর্মড বার, এমএস চ্যানেল, সাফ্ট, আই বিম, এইচ বিম ও স্প্রিং স্টিল উত্পাদনের মাধ্যমে দেশের বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে বিএসআরএম। এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আলী হোসাইন আকবর আলী ভারী শিল্প ক্যাটাগরিতে পাঁচবার বাংলাদেশের বাণিজ্যিক মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্ব সিআইপি’র মর্যাদা পেয়েছেন।

চট্টগ্রামের তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুর রড সরবরাহ ছাড়াও দেশের প্রায় সব ধরনের বৃহত্ নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত হয় বিএসআরএমের রড।

২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটি রড উত্পাদন এবং বিপণনে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। বিএসআরএমের প্রধান পণ্য এক্সট্রিম-৫০০ গ্রেডের রড যা অধিকতর নিরাপদ নির্মাণের জন্য আবাসন নির্মাতাদের প্রথম পছন্দ বলে কর্তৃপক্ষ মনে করে।

মূলত লং রড নির্মাণের জন্য বাইরের দেশ থেকে বিলেট আমদানি করতে হয়। এরই প্রেক্ষিতে বিএসআরএম আন্তর্জাতিক মানের রড তৈরির প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বিলেট তৈরি করছে। বিএসআরএম বাংলাদেশ আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি (বিসকো) সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রড তৈরির বার উত্পাদন করছে। এতে বিশ্ববাজার থেকে বিলেট আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমেছে এই প্রতিষ্ঠানের। যার বার্ষিক বিলেট উত্পাদন ক্ষমতা ১ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ টন। বিলেট উত্পাদনে আইএসও ৯০০১:২০০৮ কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (কিউএমএস) এবং আইএসও ১৪০০০১:২০০৪ এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ইএমএস) বজায় রাখায় সম্প্রতি বিসকো এ দুটি সনদ অর্জন করে যথাক্রমে ইউকেএএস এবং ইউনাইটেড রেজিস্ট্রার অব সিস্টেম (ইউআরএস)-এর কাছ থেকে। প্রসঙ্গত, বিএসআরএম বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্পের আইএসও সনদপ্রাপ্ত প্রথম প্রতিষ্ঠান।

বিএসআরএম শুধু ব্যবসা নয়, দেশ ও জাতির কল্যাণে সেবা দিতে চায়। সে লক্ষ্যে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কেননা পণ্য সেবায় জনসম্পৃক্ততা থাকতে হয়, আর জনসম্পৃক্ততায় জনকল্যাণও। তাই বিএসআরএম একটি শুদ্ধতম প্রতিষ্ঠান। মানুষের স্বপ্ন পূরণ ও জনকল্যাণেই ব্যবসায়ের মূল মোটো।

ইমেজ ও ইজমের ব্যবসা
ভালোবাসা নির্মাণের আঙ্গিকটাই মুখ্য। বিরোধ-বিচ্ছিন্নতাকে মুছে দিয়ে নিয়ত আচারবাদ চর্চা করা। সেখানে পারিবারিক ইমেজ বা সুনামকে রক্ষা করে যাওয়া। মানুষে মানুষে সম্পর্ক সৃষ্টি করা। বেঁচে থাকার অমোঘ ও নিয়তি নির্মাণ করা। মানুষ তো বেঁচে থাকার নিরাপত্তা চায়, সেখানে এই বনেদি ব্যবসায়ীরা সমাজের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তাদের কাছে সামাজিক দায়বদ্ধতা ছাড়া আর কিছু থাকে না। তাই এই বাণিজ্য পরিবারের কাছে একটাই চাওয়া থাকে দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি, কল্যাণ। আমরাও চাই তাদের মাধ্যমে মাথা উঁচু করে এ দেশ বিশ্বে সেরা হয়ে উঠুক। নৈতিকতাই প্রকৃত দর্শন ও মানবিক ইতিহাস তৈরি করুক।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক