পাঠকদের হয়তো মনে আছে, বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার সোনাদিয়ায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে অনেক দূর অগ্রগতি সাধন হয়েছিল এবং বেশ কয়েক বছর আগে জাপানের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ ব্যাপারে ফিজিবিলিটি স্টাডিও সম্পন্ন করা হয়েছিল। গভীর সমুদ্রবন্দরটি আঞ্চলিকভাবে প্রধানত বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্সখ্যাত সাত রাজ্য— আসাম, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ, ত্রিপুরা, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম, নেপাল, ভুটান, চীনের ইউয়ান প্রদেশ এবং মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় কিছু প্রদেশ কর্তৃক ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এজন্য বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার মিলে বিসিআইএম করিডোর (যেটিকে কুনমিং ইনিশিয়েটিভ বলা হয়) গঠন করার ব্যাপারেও চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছিল। কুনমিং ইনিশিয়েটিভ আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। জাপানের সেই প্রতিষ্ঠানের ফিজিবিলিটি স্টাডিতে ২৫ বছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি গভীর সমুদ্রবন্দরের পর্যায়ক্রমিক উন্নয়নের একটা প্রাক্কলন করে ফিজিবিলিটি রিপোর্ট প্রণীত হয়েছিল। ২৫ বছরে ধাপে ধাপে ওই বন্দরটি উন্নয়নের কথা ছিল। এর কিছুদিনের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধে সাড়া দিয়ে চীন সোনাদিয়া বন্দরে বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং ২০১২ সালে চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট (তদানীন্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট) শি জিন পিং বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়ার জন্য। তিনি ফিরে যাওয়ার পর এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয় এবং আলাপ-আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে যখন চীন সফরে গেলেন, তখন একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। ওই পর্যায়ে ভারত এ প্রকল্পের ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে এবং বাংলাদেশের ওপর প্রচণ্ড চাপ দিতে থাকে যেন সোনাদিয়া বন্দরের নির্মাণকাজে চীনকে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত করা না হয়। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো, ভারত চীনকে বঙ্গোপসাগরে সহজ প্রবেশাধিকার দিতে নারাজ, এটি তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে। তারা বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে এবং এর ফলে শেখ হাসিনার সফরের সময় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টি শেষ মুহূর্তে ভণ্ডুল হয়ে যায়। এভাবে শেষ মুহূর্তে চীনের বিনিয়োগ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়া বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর থেকে বাংলাদেশের ফিরে আসার বিষয়টি সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরের ভবিষ্যেক একেবারে অনিশ্চিত অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। এর মধ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক অনেকখানি খারাপ হয়ে গেছে এবং মিয়ানমার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের যে একটি দীর্ঘকালীন বিশেষ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল, সেটা থেকে তারা ক্রমে সরে এসেছে। ফলে আমরা দেখতে পেলাম, ওই সমুদ্রবন্দর এবং বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে চীনের যে একটি সড়ক ও রেলপথ যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা অনেকখানি সম্পন্ন হয়েছিল, সেখান থেকেও মিয়ানমার সরে আসে। তারা এখন আঞ্চলিকভাবে ওই সড়ক ও রেলপথ নির্মাণে আর মোটেই আগ্রহী নয়। এদিক থেকে বলতে গেলে, অদূর ভবিষ্যতে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের বিষয়টিও আর বাস্তবায়ন না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
এর মধ্যে আরো যেটি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, চীন যাতে বঙ্গোপসাগরে সহজেই প্রবেশাধিকার না পায়, সেজন্য ভারত উঠে-পড়ে লেগেছে। লক্ষণীয়, শ্রীলংকার হাম্বানটোটায় চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সঙ্গে যখন সম্পর্ক ভালো ছিল তখন সিতওয়েতেও (পূর্বের আকিয়াব) চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে দিয়েছিল এবং পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের গোয়াদারেও একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীন অর্থায়ন করেছে। শ্রীলংকার ভূতপূর্ব রাষ্ট্রপতি মাহিন্দা রাজাপাকসের সঙ্গে তামিল বিদ্রোহ নিয়ে ভারতের সঙ্গে শ্রীলংকার সম্পর্কে টানাপড়েন চলছিল, যেটার সুযোগ নিয়েছিল চীন। কিন্তু সাম্প্রতিককালে গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাহিন্দা রাজাপাকসে হেরে গেছেন এবং পরে সংসদ নির্বাচনে তিনি জিতলেও তার দল হেরে গেছে। সুতরাং প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান শ্রীলংকা সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আবার বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে এবং চীনের সম্পর্ক অনেকখানি শীতল হয়ে পড়েছে। ভারতের সঙ্গে শ্রীলংকার সম্পর্ক আগের চেয়ে অনেক বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার ফলে দেখা যাচ্ছে, মুখে যদিও ভারত চীনকে অন্তর্ভুক্ত করে আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলছে কিন্তু আসলে চীনকে বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরে তার ভূরাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছে। ফলে আঞ্চলিক সহযোগিতার পুরো বিষয় এখন প্রচণ্ডভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে চলেছে, বলতে গেলে হিমঘরে চলে গেছে। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যে, অতিসম্প্রতি লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার যেভাবে গণহত্যার শিকার করে তাদের দেশ থেকে বিতাড়ন করছে, এ ব্যাপারে ভারত ও গণচীন উভয় দেশই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চবাচ্য করছে না। কারণ এই উভয় দেশ কোনোমতেই মিয়ানমারের বিরাগভাজন হতে চাইছে না। এমনকি লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী এ দেশে প্রবেশের ফলে বাংলাদেশ যে মহাবিপদে পড়েছে, তার জন্য কোনো উদ্বেগ প্রকাশ না করে ভারত মিয়ানমারের নিরাপত্তা রক্ষায় পাশে থাকবে বলে ঘোষণা দিতেও পিছপা হয়নি (বাংলাদেশের মতো বন্ধুপ্রতিম নিকট প্রতিবেশীর স্বার্থহানির কথা না ভেবে মিয়ানমারের পক্ষে ভারতের এহেন একতরফা অবস্থান গ্রহণ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বাংলাদেশের ভারতবিরোধী মহল কর্তৃক এ ইস্যু অপব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না)।
পাঠকদের গভীর সমুদ্রবন্দর বিতর্ক সম্পর্কে মনে করিয়ে দিতে চাই। ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা দ্য ডেইলি স্টার ২০১৬ সালের ২৫ মে প্রথম পৃষ্ঠার অন্যতম প্রধান হেডলাইনে খবর প্রকাশ করেছিল যে, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রথম কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার পায়রা নদের ৩৫ নটিক্যাল মাইল দীর্ঘ বামনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ড্রেজিং ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং পরিচালনার দায়িত্ব পালনের জন্য নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সদ্য প্রতিষ্ঠিত সংস্থা পায়রা পোর্ট অথরিটি বেলজিয়ামের একটি ফার্মের সঙ্গে ২ বিলিয়ন ডলারের (মানে ১৬ হাজার কোটি টাকার) একটি চুক্তি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপিটাল ড্রেজিং সম্পন্ন হওয়ার পর ২০১৮ সালের শেষে নাকি পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরে ১৪ মিটার (মানে প্রায় ৪৩ ফুট) ড্রাফটের ও ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজ প্রবেশ করতে সক্ষম হবে। এটি নাকি হবে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রথম ধাপ। ২০১৯ সালে দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু হবে এবং ২০২৪ সালে নাকি তৃতীয় ধাপের কাজ শুরু হবে। মোট ১৯টি কম্পোনেন্টে বিভক্ত পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ সমাপ্ত করতে নাকি ১১ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার (মানে ৮৮,০০০ থেকে ১,২০,০০০ কোটি টাকা) খরচ হবে। উপরে প্রদত্ত খরচের হিসাব আমার কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। কারণ ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় প্রস্তাবিত যে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পটি বাংলাদেশ পরিত্যাগ করেছে, সেটার তুলনায় উল্লিখিত প্রাক্কলিত ব্যয়ের হিসাব স্রেফ ‘গরিবের ঘোড়া রোগ’ হিসেবে অভিহিত করাই সমীচীন মনে করি।
নিচের তথ্যগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে মিলিয়ে দেখুন। ওয়াকিবহাল মহল জানে, সোনাদিয়ার প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ থেকে ভারতের চাপে যে পিছিয়ে আসা হয়েছে, সেটাকে সরকার জনগণের কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। অথচ এই প্রস্তাবিত প্রকল্পটি পরিত্যাগের কারণ হিসেবে অতিরিক্ত ব্যয়ের অজুহাত দেখানো হয়েছিল (আবার অনেকে পরিবেশগতভাবে সোনাদিয়া নাজুক বলেও খোঁড়া যুক্তি তুলেছেন আসল কারণটি ধামাচাপা দেয়ার জন্য)। নিবন্ধের শুরুতেই আমরা জেনেছি যে, সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে বেশ কয়েক বছর আগে জাপানের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করা হয়েছিল। সে ফিজিবিলিটি স্টাডিতে ২৫ বছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি গভীর সমুদ্রবন্দরের পর্যায়ক্রমিক উন্নয়নের প্রাক্কলন করা হয়েছিল। ধাপে ধাপে বন্দরটি উন্নয়নের কথা ছিল। গভীর সমুদ্রবন্দরটি আঞ্চলিকভাবে প্রধানত বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্স (আসাম, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা ও মিজোরাম), নেপাল, ভুটান, চীনের ইউনান ও সিচুয়ান প্রদেশ এবং মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় কিছু প্রদেশ কর্তৃক ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এজন্য বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার মিলে বিসিআইএম ইকোনমিক করিডোর (যেটিকে কুনমিং ইনিশিয়েটিভ বলা হয়) গঠন করার ব্যাপারেও চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। এজন্য বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত সড়ক ও রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার প্রকল্পও প্রস্তুত করা হচ্ছিল।
আমি মনে করি, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত একটি দেশকে ভারত এভাবে হাত মোচড়ানোর সাহস পেয়েছে বর্তমান সরকারের নৈতিক দুর্বলতার কারণে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটির মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বর্তমান মহাজোট সরকার যেহেতু জনগণের অংশগ্রহণমূলক একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য গণরায় নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়নি, তাই মোদি সরকারের এই অন্যায় আবদারের কাছে হয়তো নতি স্বীকার করতে হয়েছে শেখ হাসিনার সরকারকে। এটা বন্ধু দেশ ভারতের অনুরোধ নয়, এটা আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী ভারতের নির্ভেজাল ‘দাদাগিরি’ ফলানো ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যে, শুধু জন্মশত্রু পাকিস্তান নয়, ভারত তার সব প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে নগ্নভাবে দাদাগিরি ফলাচ্ছে এবং এমনতর আধিপত্যবাদী আচরণ ভারতের বর্তমান মোদি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বেড়েই চলেছে। প্রতিবেশী নেপালকে ২০১৫-১৬ সালে যেভাবে ‘অঘোষিত অবরোধ’ আরোপের মাধ্যমে সাজা দেয়া হলো, সেটা ভারতের এহেন শক্তিমদমত্ত দাদাগিরির ন্যক্কারজনক নজির হিসেবে সারা বিশ্বে নিন্দিত হয়েছে। বিশেষত ২০১৫ সালে প্রাণঘাতী ভূমিকম্প যেভাবে নেপালের জনগণকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে, তার ধাক্কা সামলানোর আগেই ভারতের ওই অবরোধ নেপালের অর্থনীতিকে প্রায় ধসিয়ে দিয়েছিল বলা চলে। শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন ওই অবরোধ তুলে নেয়ার জন্য ভারতকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। প্রায় চার মাস পর অবরোধ শিথিল হলেও নেপালকে ব্ল্যাকমেইল করার অবস্থান থেকে ভারত সরে এসেছে বলা যাচ্ছে না। হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের এই নির্দয় আচরণ মদেশী জাতিগোষ্ঠী ছাড়া অন্য নেপালিদের কাছে চরম অবমাননাকর মনে হওয়াই স্বাভাবিক। তাই নেপালের জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও নেপালের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় চলে এসেছে। এমনকি শ্রীলংকার বর্তমান সরকার ভারতের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে অনেক ইস্যুতে ভারত ও শ্রীলংকা সরকারের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে দুই দেশের সরকার সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ বলে অহরহ প্রচার করে চললেও সোনাদিয়া বন্দর নিয়ে ভারতের দাদাগিরি এ দেশের ব্যাপারেও ভারতের নগ্ন হস্তক্ষেপমূলক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। এ দৃষ্টিভঙ্গির সর্বশেষ নজির সৃষ্টি হয়েছে গণচীন থেকে বাংলাদেশ কী কী অস্ত্রশস্ত্র কিনছে, তার ব্যাপারে ভারতের নাক গলানোর ঘটনায়। এ পরিপ্রেক্ষিতেই আমার আহ্বান, ভারতের কাছে অত নতজানু হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই; কোমর সোজা করে দাঁড়ান। সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ভারতের চাপে বাতিল করাটা বাংলাদেশের জন্য বড্ড অপমানজনক এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হয়ে যাচ্ছে। চীন এ বন্দর ব্যবহার করতে সক্ষম হোক বা না হোক, বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্যই এটা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। আর বাংলাদেশের আগামী দিনের বন্দর সুবিধার চাহিদার বিবেচনায় পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণ একটি ভালো উদ্যোগ হলেও একে জোর করে ‘গভীর সমুদ্রবন্দর’ বানাতে যাওয়া অন্যায় জবরদস্তিরই নামান্তর হবে। একটা গভীর সমুদ্রবন্দরকে ব্যবহারোপযোগী করার জন্য যদি ৩৫ নটিক্যাল মাইল নৌপথকে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় নিয়ে আসতে হয়, তাহলে ওই বন্দরকে ‘ডিপ সি পোর্ট’ বলাটাই জবরদস্তি বিবেচিত হবে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, সোনাদিয়ার ক্ষেত্রে যেখানে সমুদ্রের খাঁড়িতেই ১৫ মিটার মানে ৪৭ ফুট গভীরতা পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে পায়রাকে সোনাদিয়ার বিকল্প হিসেবে খাড়া করার অপপ্রয়াস নেহাতই হাস্যকর। উপরন্তু, পায়রা বন্দরকে পরবর্তীতেও ব্যবহারোপযোগী রাখার জন্য ঘন ঘন মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং প্রয়োজন হবে, যা খুবই ব্যয়সাধ্য প্রমাণিত হবে। এ খরচটা সোনাদিয়ার ক্ষেত্রে একেবারেই নগণ্য হওয়ার কথা।
অবশ্য এটাও অস্বীকার করার জো নেই যে, এরই মধ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক অনেক খারাপ হয়ে গেছে এবং মিয়ানমার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ফলে আঞ্চলিক বন্দর হিসেবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে আর উজ্জ্বল মনে না-ও হতে পারে। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে চীনের যে একটা সড়ক ও রেলপথ যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছিল, সেখান থেকেও মিয়ানমার সরে এসেছে। এর মধ্যে আরো যেটি গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো, চীন যাতে বঙ্গোসাগরে সহজে প্রবেশাধিকার না পায়, সেজন্য ভারত উঠে-পড়ে লেগেছে। প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান শ্রীলংকা সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও শ্রীলংকা ও চীনের সম্পর্ক নিয়ে ভারতের নাক গলানো শ্রীলংকা খুব একটা পছন্দ করছে না। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সঙ্গে যখন সম্পর্ক ভালো ছিল, তখন চীন সিতওয়েতেও (পূর্বের আকিয়াব) যে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে দিয়েছিল, এখন চীন ওই বন্দরটিও সহজে ব্যবহারের সুযোগ পাবে না। অন্যদিকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের গোয়াদারেও যে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীন অর্থায়ন করেছে, সেটাও ভারতের অপছন্দনীয়। কারণ এর মাধ্যমে চীন আরব সাগরে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছে। অতএব সত্যের খাতিরে বলতে হবে, আঞ্চলিক সহযোগিতার পুরো বিষয়টিই এখন প্রচণ্ডভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে গেছে। আমরা হয়তো ঠিকমতো খেয়াল করিনি যে, ভারত এখন বিসিআইএম (মানে বাংলাদেশ-চায়না-ইন্ডিয়া-মিয়ানমার) ইকোনমিক করিডোরের কথা আর উচ্চারণও করছে না, এখন তারা বিবিআইএন (বাংলাদেশ-ভুটান-ইন্ডিয়া-নেপাল) ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে মাতামাতি শুরু করেছে। এটা খুবই দুঃখজনক যে, ভারত বাংলাদেশকে তাদের ভূরাজনৈতিক খেলায় দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশকে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রয়োজনেই আমাদের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ অতিসত্বর সম্পন্ন করতেই হবে। যদি আঞ্চলিক অন্য দেশগুলো এ বন্দর ব্যবহার না করে, তাহলে সীমিত পর্যায়ের প্রাথমিক সুবিধা গড়ে তুলে দেশের প্রয়োজনে সোনাদিয়া বন্দর ব্যবহারের সিদ্ধান্তই সময়োপযোগী হবে। এভাবে চিন্তা করলে সোনাদিয়া বন্দর পায়রা বন্দরের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়সাশ্রয়ী ও ‘কস্ট ইফেক্টিভ’ হবে— এটা আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে চাই।
আমি আবারো বলছি, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার যেহেতু নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতাসীন হয়নি, সেহেতু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা হয়তো আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। ফলে সম্প্রতি বাংলাদেশের ওপর ভারতের চাপ প্রদানের ক্ষমতাও হয়তো বৃদ্ধি পেয়েছে। এর অভিঘাত হয়তো আমরা দেখতে পাচ্ছি সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দরের ক্ষেত্রে। প্রকৃত বাস্তবতা হলো, কয়লা ও এলএনজি আমদানির জন্য মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে জাপানের অর্থায়নে একটি বন্দর সুবিধা গড়ে তোলা হচ্ছে, যে বন্দরটি গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রয়োজন হয়তো কিছুটা মেটাবে। এরই মধ্যে সেখানে প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং কাজ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে পায়রা বন্দর নির্মাণের প্রাথমিক কাজের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব ফান্ড থেকে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুতরাং পায়রা বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সেভেন সিস্টার্সের সমুদ্রের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের বন্দর সুবিধা ব্যবহারের প্রয়োজন মিটবে। আর বাকিটার জন্য ভারত একটা বিকল্প ব্যবস্থা করেছে কালাদান রিভার প্রজেক্টের মাধ্যমে। এ প্রজেক্টের মাধ্যমে সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলো মিজোরাম হয়ে মিয়ানমারের সিতওয়ে বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হবে। এ প্রজেক্টের কাজ অতিদ্রুত এগিয়ে চলেছে এবং কিছুদিনের মধ্যেই তা সম্পন্ন হলে সেভেন সিস্টার্সের জন্য একটি বিকল্প জলপথ ভারতের দিক থেকে খুলে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জনপ্রিয়তা অর্জনে পায়রা বন্দর গড়ে তুলছেন, এ বন্দরের অর্থায়নও করা হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের টাকায়। কিছুদিন আগে চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামবাসীর সঙ্গে সরকারের যে প্রতারণার অভিযোগটি তুলেছিলেন, তা উড়িয়ে দেয়া যাবে না। চট্টগ্রামের জনগণের স্বার্থে আঘাত এলে সবার আগে গর্জে ওঠেন মহিউদ্দিন চৌধুরী, এটা নব্বইয়ের দশকের স্টিভিডোরিং সার্ভিসেস অব আমেরিকা (এসএসএ) সংকটেও প্রমাণিত। চট্টগ্রাম তার উন্নয়নের ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়াতেই তিনি এবারো প্রতিবাদে নেমেছেন। প্রকৃতপক্ষে চট্টগ্রাম বন্দর এখন বড়সড় জাহাজের জন্য আর সমুদ্রবন্দর নেই, প্রধানত লাইটারেজ পোর্টে পরিণত হয়েছে। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরে নয় মিটারের বেশি ড্রাফটের (গভীরতার) জাহাজ ঢুকতে পারে না। জাহাজগুলো আউটার অ্যাংকরেজে নোঙর করে অথবা একেবারে কুতুবদিয়ার কাছাকাছি অবস্থান করে। আউটার অ্যাংকরেজ বা কুতুবদিয়া থেকে লাইটারেজ ভেসেলের মাধ্যমে মালপত্রগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে আসা হয় অথবা সরাসরি সিঙ্গাপুরে বা কলম্বোতে মাদার ভেসেলগুলো মালপত্র নামিয়ে দেয়; তারপর কনটেইনার ভেসেলের মাধ্যমে সেগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে আসা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের এই সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য খুব যত্নবান প্রয়াস আমরা দেখতে পাচ্ছি না। কারণ কয়েক বছর আগে কর্ণফুলী নদীতে মাত্র আড়াইশ কোটি টাকার যে ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রজেক্ট নেয়া হয়েছিল, সেটা অসমাপ্ত অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। প্রজেক্টের প্রায় অর্ধেক অর্থ লোপাট করে দিয়ে ঠিকাদার ভেগে পড়েছে, ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের তেমন কিছুই হয়নি। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়েনি। একই সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর খাঁড়ির গভীরতা বাড়ার পরিবর্তে গত দু-তিন বছরে আরো কমেছে। পতেঙ্গায় সমুদ্র উপকূলে বে টার্মিনাল নির্মাণের কথাবার্তা শোনা গেলেও এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়ে গেছে বলা চলে। বে টার্মিনাল নির্মাণ সম্পন্ন হলে ওখানে প্রায় ১৩ মিটার ড্রাফটের জাহাজ নোঙর করতে পারবে। উপরন্তু, এখন যে বেশি লম্বা জাহাজ কর্ণফুলী নদীর খাঁড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারে না, সে সীমাবদ্ধতাও দূর হয়ে যাবে। কিন্তু বে টার্মিনালের জমি অধিগ্রহণের ফরমালিটি সম্পন্ন করতে যেভাবে অহেতুক বিলম্ব করা হচ্ছে, তাতে সন্দেহ করার কারণ রয়েছে যে, সরকার বে টার্মিনাল নির্মাণকে এখনো অগ্রাধিকার দেয়নি। কর্ণফুলী নদীর টানেল নির্মাণের কাজও গত এক বছরে মোটেও এগোয়নি।
সুতরাং এই যে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতি এক ধরনের বিমাতাসুলভ অবহেলার দৃষ্টিভঙ্গি, সেটা আসলে দেশের জন্য খুব একটা স্বাস্থ্যকর নয়। এটা সংকীর্ণ আঞ্চলিকতা দোষে দুষ্ট। আমি মনে করি, গভীর সমুদ্রবন্দরের বিষয়টি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং কৌশলগত গুরুত্বের দাবিদার একটা প্রকল্প। পায়রা বন্দর নির্মাণকেও আমরা স্বাগত জানাই। অদূরভবিষ্যতের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এ বন্দর নিঃসন্দেহে অবদান রাখবে, আঞ্চলিক প্রয়োজনও কিছুটা মিটবে এর মাধ্যমে। কারণ মংলা বন্দরের চেয়ে অনেক ভালো বন্দর হবে পায়রা বন্দর। সবাইকে আবারো মনে করিয়ে দিতে চাই, একটু সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা থেকে পুরো বাংলাদেশের যে সমুদ্র উপকূল, এর একটা বিরাট সম্ভাবনা আছে আঞ্চলিক ব্যবহারের জন্য। কেবল বাংলাদেশ নয়, ভারতের সেভেন সিস্টার্স, নেপাল, ভুটান, চীন, মিয়ানমার, এমনকি থাইল্যান্ডের কিছু এলাকাকেও বাংলাদেশের এ সমুদ্র উপকূলের অর্থনৈতিক পশ্চাত্ভূমি হিসেবে বিবেচনার সুযোগ আছে। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার না করে আমরা যে ভারতের চাপে নতিস্বীকার করে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজটি পরিত্যাগ করেছি, সেটা দেশের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। ভারত যদি চীনকে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ থেকে বিরত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে বাধ্য করে, তাহলে বাংলাদেশ সরকারের ওই বন্দর নির্মাণের বিকল্প অর্থায়নের জন্য ভারতকে চাপ প্রদান করাই সমীচীন হবে। এমনকি আরো অনেক দেশ সোনাদিয়া বন্দর নির্মাণে আগ্রহী। অতএব, এ ব্যাপারে ভারতের চাপে নতিস্বীকার এবং ভারতকে একতরফা সুবিধে প্রদান বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী মনে করি।
লেখক: ইউজিসি প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়






