পর্যটনকে দীর্ঘকাল নিতান্তই বিলাসিতা ভাবা হতো। আগের যুগে শুধু বিত্তশালীরা বিভিন্ন উপলক্ষে দেশ-বিদেশ ঘুরে দেখতেন। শিল্প বিপ্লবের পর এ ধারা বদলাতে শুরু করে। মেশিনের সাহায্যে স্বল্পসময়ে বেশি উৎপাদন করার ক্ষমতা মানুষকে দেয় বেশি ছুটি কাটানোর সুযোগ, ফলে বিস্তৃত হয় ভ্রমণের গতি-প্রকৃতি। গত শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে শিল্প খাতটি। গোটা বিশ্বে বছরে দেড় বিলিয়নের মতো পর্যটক ভ্রমণ করছে। বাংলাদেশেও প্রতি বছর ৮০ লাখের মতো মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন পর্যটন এলাকায়। ঈদের ছুটিতে মোটামুটি ১০ লাখ পর্যটক দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণ করে, যাতে কমপক্ষে আড়াই হাজার কোটি টাকার হাতবদল হয়। এ শিল্পের জন্য যেটা অত্যন্ত আশার দিক। তাছাড়া পর্যটনই একমাত্র শিল্প খাত, যার মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলো ক্রমাগতভাবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সফলতা পাচ্ছে। ফলে সত্যিকারভাবে মনোযোগী হলে এ খাতে বিনিয়োগের তুলনায় রিটার্নটা অনেক বেশিই পাওয়া সম্ভব। কারণ তৈরি পোশাক রফতানি করে ১০০ ডলার পাওয়া আর পর্যটকের কাছে সমপরিমাণ অর্থ আয় করার মধ্যে নিট আয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য।

চলতি দশকে বিশ্বব্যাপী যে ১২টি দেশ পর্যটন খাতে ভালো প্রবৃদ্ধি করবে বলে ধারণা করা হয়েছে, সেই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশের জিডিপিতে ট্রাভেল ও ট্যুরিজম খাতের প্রত্যক্ষ অবদান ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং কর্মসংস্থান হয়েছিল প্রায় সাড়ে ১১ লাখ মানুষের। ২০২০ সাল নাগাদ প্রায় ১৬০ কোটি পর্যটকের বিশাল মার্কেটে এশিয়া অঞ্চলকে খুব সম্ভাবনাময় হিসেবে গণ্য করছেন বিশেষজ্ঞরা। সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশা, নিকট ভবিষ্যতে পর্যটন শিল্প দেশের সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক খাতকেও ছাড়িয়ে যাবে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঠিক কতটা সুবিধা আদায় করতে পারবে, তা মূলত নির্ভর করছে নিজেদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রতিযোগীদের সক্ষমতার ওপর। দুঃখজনক হলেও সত্যি, মালয়েশিয়া, ভারত, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা যখন পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে সর্বোচ্চ তৎপর, তখনো আমরা ক্ষেত্রবিশেষে প্রকৃতিপ্রদত্ত সম্পদগুলোকেও ঠিকমতো সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি।

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ক্ষুদ্র আয়তনের দেশ হলেও এর যেমন রয়েছে পাহাড়, নদী, বন, সমুদ্রের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ, তেমনি রয়েছে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উপকরণ; যা দেশ-বিদেশের পর্যটকদের অনায়াসে মুগ্ধ করতে সক্ষম। পর্যটনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেশের প্রতিটি অঞ্চল নিঃসন্দেহে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এক্ষেত্রে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের পরেই সিলেট অঞ্চল রয়েছে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায়। প্রতি বছর দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক পর্যটক এ অঞ্চল ভ্রমণ করেন। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল প্রাকৃতিক উপাদানে সমৃদ্ধ এক অঞ্চল। পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এর রয়েছে সুদীর্ঘ ঐতিহ্য।

পাহাড়, নদী, ঝরনা, বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, হাওড়, খাল-বিল, চা বাগান, লেবু-আনারস-পান-কাঁঠাল-রাবার বাগান যেমন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য উজাড় করে দেয় তার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, ঠিক তেমনিভাবে হাছন রাজা, বাউল করিম, দুরবিন শাহ, আরকুম শাহ, রাধারমণসহ অসংখ্য আধ্যাত্মিক গুরুর দর্শন ও সুরের ইন্দ্রজাল গণমানুষকে করে আপ্লুত। একটিবারের জন্য হলেও শাহজালাল (র) ও শাহপরানের (র) মাজার জিয়ারত যেমন অনেকের জীবনেই আরাধ্য, ঠিক তেমনিভাবে প্রতি বছর শ্রী চৈতন্যদেবের সমাধিতে হাজির হন দেশ-বিদেশের অগণিত পুণ্যার্থী। কোনো একটি অঞ্চলের পর্যটন খাতের বিকাশে প্রাথমিকভাবে যে বিষয়গুলো (দর্শনীয় স্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবাসন সুবিধা, সার্বিক নিরাপত্তা) গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয়, সিলেট অঞ্চলে তার অধিকাংশই খুব ভালোভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে শীতকাল এবং বিভিন্ন উত্সবকালীন ছুটিতে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ছে। তবে একটি বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা একমত যে, এ অঞ্চলের পর্যটন খাত যতটা সম্ভাবনাময় বলে অনুমিত হয়, ঠিক সেভাবে বিকশিত হচ্ছে না। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে— কেন হচ্ছে না? আসলে কোনো অঞ্চলের পর্যটন খাতের উন্নয়নে শুধু সম্পদ থাকাই যথেষ্ট নয়; বরং সেগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং অভীষ্ট ক্রেতাদের কাছে দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপন করাটা অত্যন্ত জরুরি। সিলেটের পর্যটন খাতের প্রত্যাশিত মাত্রায় উন্নতি না হওয়ার পেছনে এ-সংক্রান্ত দুর্বলতাগুলোকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়।

সিলেট অঞ্চলের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা 

সিলেট অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্পট হলো দুই ওলির ‘দরগাহ’। সময়ের অভাবে শিডিউলে যতই কাটছাঁট হোক না কেন, পর্যটকরা কখনো দরগাহ জিয়ারত মিস করতে রাজি নন। অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও এ বিষয়ে একই রকম আগ্রহী। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোয় সিলেট শহরের হোটেলে সিট পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে; অথচ পর্যটনের দৃষ্টিকোণ থেকে যথাযথভাবে এ বিষয়গুলোকে মূল্যায়ন করা হয় না। অধিকাংশ আয়োজনকে আমরা সাদামাটাভাবে দেখি এবং স্থানীয় লোকজনের মাথায় যে আইডিয়া আসে, সেগুলোর বাস্তবায়ন থেকে যৎসামান্য সুবিধা লাভ হয়। দূরদূরান্ত থেকে যারা সিলেট ঘুরতে আসেন, সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে স্বভাবতই হাতে গোনা কয়েকটি স্পট বাছাই করতে হয়। এক্ষেত্রে পর্যটকদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে থাকে: হযরত শাহজালাল ও শাহপরানের দরগাহ, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, জাফলং ও পিয়াইন নদী, বিছনাকান্দি, পর্যটন মোটেল এলাকা, লাওয়াছড়া ন্যাশনাল পার্ক, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, শ্রীপুর পার্ক, জৈন্তাপুর রাজবাড়ী, হাকালুকি হাওড়, টাঙ্গুয়ার হাওড়, মালনীছড়া ও লাক্কাতুরা চা বাগান, মাধবপুর লেক, শ্রীমঙ্গলের বিস্তৃত চা বাগান, সারিঘাট থেকে ডাউকি সীমান্ত, ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি, চা গবেষণা কেন্দ্র, এক্সেলসিওর (জাকারিয়া সিটি), অ্যাডভেঞ্চার ওয়ার্ল্ড ও ড্রিমল্যান্ড পার্ক।

এখনো দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ভ্রমণকারীরা সিলেট শহরকে কেন্দ্র করেই ট্যুর পরিকল্পনা করেন। অথচ রাজধানী থেকে প্রতিটি জেলা সদরে সরাসরি বাস চলাচল করে এবং আবাসিক ব্যবস্থাও (অন্য জেলাগুলোয়) বেশ ভালো। তাই চারটি জেলার যদি স্বতন্ত্র পর্যটন ইমেজ গড়ে তোলা যায়, তবে পর্যটকরা একেকটি জেলার দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার জন্য যথেষ্ট সময় পাবেন এবং নিবিড়ভাবে সেই এলাকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে— উপরে যে স্পটগুলোর নাম লেখা হয়েছে, এর বাইরে আবার দেখার কী আছে? আসলে সিলেট অঞ্চলে অনেক দর্শনীয় স্থান আছে, যা যথাযথভাবে উপস্থাপন হয়নি। ফলে দর্শনার্থীদের মধ্যে ওই বিষয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জিন্দাবাজারের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে রাজা’স মিউজিয়াম। সেখানে অনেক নিদর্শন আছে, যা ইতিহাস ও সুফিবাদের ভক্তদের জন্য বিপুল রসদ ধারণ করছে। এমনিভাবে ওসমানী জাদুঘরসহ অসংখ্য সম্পদ আছে, যার যথাযথ উপস্থাপন সিলেটের পর্যটন খাতকে করতে পারে আরো সমৃদ্ধ।

সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে বাধা

দেশের পর্যটন খাত নানা কারণেই যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি এবং বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ খাত থেকে উল্লেখযোগ্য অর্জন খুব কম; সিলেট অঞ্চলও তার ব্যতিক্রম নয়। জাতীয় প্রেক্ষাপটে কিছু সীমাবদ্ধতা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং বিদ্যমান সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের ব্যর্থতাই প্রধান প্রতিবন্ধক বলে চিহ্নিত করা যায়। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী ভ্রমণপিপাসুরা ভাবেন, কোনোমতে সিলেটে পৌঁছতে পারলেই মজা করে দর্শনীয় সব স্থান ঘুরে দেখা যাবে। ব্যাপারটি তেমনই হওয়ার কথা ছিল। খুলনা, রাজশাহী বা দিনাজপুর থেকে যারা কয়েকশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সিলেটে পৌঁছেন, তাদের কাছে শহর থেকে ৫০-৬০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করা তেমন কঠিন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু একা বা ছোট পরিবার নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া যারা সিলেটে ঘুরতে আসেন, তারাই বুঝতে পারেন মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত ঠিক কতটা দুর্গম (!) এলাকায় অবস্থিত।

পর্যটন খাতের জন্য কার্যকর কিছু করা অন্য যেকোনো শিল্পের তুলনায় কঠিন। কারণ এটি একক কোনো শিল্প খাত নয়। পরিবহন, আবাসন, বিনোদন, প্রাকৃতিক সম্পদের বৈচিত্র্য ইত্যাদির মতো বৃহৎ খাতগুলোকে সমন্বিতভাবে একই ধারায় আনতে পারলে তবেই সুফল পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে বড় সমস্যা হলো, এর মালিকানার ধরন। যেমন— সিলেটের পর্যটন খাতের উন্নতি করা দরকার। প্রশ্ন হলো, কে করবে? ব্যক্তিখাতের উদ্যোক্তারা হয়তো হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পার্ক নির্মাণ করবেন কিংবা বাস, উড়োজাহাজ কিনবেন কিন্তু রাস্তাঘাট, নিরাপত্তা, সামগ্রিক প্রমোশন কে করবে? নিশ্চয়ই সরকার বা তার মনোনীত সংস্থাকে সেগুলো করতে হবে। এখন প্রশ্ন, সরকারের কোন মন্ত্রণালয় করবে? যোগাযোগ, স্বরাষ্ট্র, সাংস্কৃতিক, পর্যটন নাকি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়— এ এক বিরাট ধাঁধা। আমাদের মতো দেশে অন্তত ১৬টি মন্ত্রণালয়ের একই লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিতভাবে কাজ করা সহজ ব্যাপার নয়। হয়তো সে কারণেই ভাগের মরা যেমন গঙ্গা পায় না, তেমনি অনুন্নত দেশের পর্যটন খাত সঠিক পথের দিশা খুঁজে পায় না।

দর্শনার্থীদের আরো একটি অভিযোগ হলো, অনেক কষ্ট করে দূরদূরান্ত থেকে একটা স্পটে পৌঁছার কিছুক্ষণ পরেই দেখার মতো আর কিছু থাকে না। যেমন— ঢাকার এক কলেজের শিক্ষার্থীরা ৮ ঘণ্টা বাস জার্নি করে জাফলং পৌঁছে ঘণ্টা দুয়েক কাটানোর পরে হতাশা প্রকাশ করছিল। অথচ সারা বিশ্বে এখন ইনহেরিটেড সম্পদকে সাপোর্ট দিতে ‘ক্রিয়েটেড’ অসংখ্য ট্যুরিজম প্রডাক্ট ডেভেলপ করা হচ্ছে। দুঃখের বিষয়, আমরা ন্যাচারাল রিসোর্সগুলোকেও ঠিকমতো লিংক করতে পারছি না। যেমন— অনেকেই একাধিকবার জাফলং বেড়াতে গেছেন, কিন্তু তার খুব কাছেই যে খাসিয়াপুঞ্জি আছে— যাদের জীবন ও পেশা (সমতলে বসবাসকারী মানুষের জন্য) মজার অভিজ্ঞতা হতে পারে— সেখানে যাননি; হতে পারে না-জানার কারণেই যাওয়া হয়নি। সিলেট অঞ্চলের নানা অনুষ্ঠানের অনুষঙ্গ ‘পান ও সুপারি’র এক বড় অংশ আসে এ পল্লী থেকে। এখনো কলকাতাসহ ভারতের অনেক বিয়ের অনুষ্ঠানে তারা পান সরবরাহ করে! কথিত আছে, অমিতাভ বচ্চন তার ছেলের বিয়েতে অতিথি আপ্যায়নের জন্য এখানকার ‘সাঁচি পান’ নেয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন।

জাফলং, ভোলাগঞ্জ, সারিঘাট বা লালাখালে কমন একটি সমস্যা চোখে পড়ে। মনে হয়, বালি ও পাথর উত্তোলনের প্রতিযোগিতা চলছে। সেখানে পর্যটকরা সবসময়ই অবহেলিত; মালিক, শ্রমিক ও দোকানিদের দাপট লক্ষণীয়। যে স্থানটি ঘুরে দেখার জন্য মানুষ শত শত মাইল ভ্রমণ করে আসে, সেখানে তাদের ন্যূনতম অধিকার সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অধিকতর মনোযোগী হওয়া দরকার। পর্যটকদের জন্য সুবিধাজনক ও নিরাপদ এলাকা সংরক্ষণ করে তবে উত্তোলন কাজের অনুমতি দেয়া দরকার। তদুপরি স্যানিটেশন অবস্থা অনেক স্পটেই খুব খারাপ অথচ এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তাছাড়া সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকলে আশপাশের পরিবেশ ভয়াবহভাবে দূষিত হয়। ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিতে হাজার হাজার শ্রমিক এলাকাটিকে হাঁটাচলার অনুপযোগী করে রাখেন। অন্যদিকে এখন ছোট ছোট অনেক গ্রুপ সারি ঘাট থেকে লালাখাল দিয়ে ডাউকি সীমান্ত পর্যন্ত ঘুরতে যায়। কিন্তু সেখানে টি-প্রসেসিং ফার্মটির টয়লেট ও টিউবওয়েল ছাড়া কোনো বন্দোবস্ত নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কখনো এটি পর্যটন এলাকা হিসেবে নজরে আসবে কিনা কে জানে! আর নজরে পড়লেইবা কী? লাওয়াছড়াকে ‘ন্যাশনাল পার্ক’ ঘোষণা করা হয়েছে (প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশী পর্যটকও আসেন গবেষণার কাজে) অথচ সেখানে টয়লেটের যে সংখ্যা ও মান, তা মোটেই সন্তোষজনক নয়।

পৃথিবীর পর্যটন শিল্পে উন্নত দেশগুলো (নেপাল, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড) সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ট্যুরিস্টদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও নিরাপত্তার দিকগুলোকে সর্বোত্তম করতে। দিন যত যাচ্ছে, এসব দেশে সেবার মানও ক্রমে বাড়ছে; অথচ আমাদের দেশে হয় তার উল্টো। একসময় পর্যটকদের জন্য সিলেট-জাফলং সড়কে বিআরটিসির বিশেষ বাস সার্ভিস ছিল। তখন যৌক্তিক ভাড়ায় জাফলং ভ্রমণটি বেশ উপভোগ্য ছিল। অজানা কারণে সেই সার্ভিস এখন বন্ধ। ফলে প্রাইভেট বাস কোম্পানিগুলোর মর্জিমাফিক যাত্রীদের যাতায়াত করতে ও ভাড়া গুনতে হয়। তবু জাফলং সড়কটি মোটামুটি ভালো হওয়ায় পর্যটকরা শিডিউল অনুযায়ী ভ্রমণ শেষ করতে পারেন। কিন্তু পাবলিক বাসে পরিবার-পরিজন নিয়ে মাধবকুণ্ড, ভোলাগঞ্জ বা লাওয়াছড়ার মতো স্পটগুলোয় যাতায়াত প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। ভোলাগঞ্জের রাস্তা এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে, সেখানে রিজার্ভ যেতেও গাড়িওয়ালারা অনীহা প্রকাশ করে। রাজি হলে ভাড়া গুনতে হয় অনেক বেশি। তাছাড়া কষ্ট করে সে স্থানগুলোয় গিয়ে রাত্রিযাপনের তেমন ব্যবস্থা নেই সন্ধ্যার পর পথে রয়েছে ছিনতাইকারীর উপদ্রব। ফলে রংপুর বা বরিশাল থেকে ভ্রমণপিপাসু মানুষ সিলেটে পৌঁছার পরেও সময়ের সীমাবদ্ধতার কথা ভেবে আর ওইসব দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার সাহস করে না। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং পর্যটন শিল্প বিকাশের পথে বিরাট অন্তরায়।

সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে করণীয়

পর্যটন খাতের উন্নয়ন বিষয়ে ভাবতেই আমাদের মাথায় আসে ‘সরকার’ সবকিছু করবে। যে দেশে বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণেই হিমশিম খেতে হয়, সেখানে সঙ্গত কারণেই পর্যটন খাত অগ্রাধিকার তালিকায় বেশ পেছনে থাকবে। তাছাড়া যেসব দেশ এ খাতে ঈর্ষণীয় সাফল্য পেয়েছে, সেগুলোয় সরকার মূলত রাস্তাঘাট ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছে। তারপর প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানিয়েছে। সরকারকেই সবকিছু করতে হবে সেটা জরুরি নয়, দরকার ‘পলিসি সাপোর্ট’; যা বিনিয়োগকারীদের স্বচ্ছন্দে কাজ করতে উৎসাহী করবে। পাশাপাশি রেফারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ‘ফেয়ার প্লে’র পরিবেশটা নিশ্চিত করবে। বাকিটা দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারীরাই করবেন, অধিকাংশ দেশে সেটাই হয়।

এ শিল্পে নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কারণ একজন পর্যটকের যদি কোথাও ঘুরতে গিয়ে সব খোয়ানোর ভয় থাকে, তাহলে তো আনন্দের চেয়ে উদ্বিগ্নতাই প্রাধান্য পাবে। তাছাড়া হাজার হাজার পর্যটক ভালোভাবে একটা স্পট ঘুরে এলেও সেটা হয়তো মিডিয়ার নজরে আসে না। কিন্তু একটা দুর্ঘটনা হলেই তা ব্যাপকভাবে প্রচার পায়। তাই যতটা সম্ভব নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। ট্যুরিস্ট পুলিশের ধারণাটি বেশ কাজ করছে। তবে স্থানীয় স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে কমিউনিটি পুলিশিং আরো বেশি কার্যকর হতে পারে। তাছাড়া ভ্রমণের সময় পর্যটকরা নিয়মিত ভোগ (এবং যথারীতি বর্জ্য উৎপাদন) থেকে বিরত থাকাটা পছন্দ করেন না। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বেশি বেশি ভোগ করার প্রবণতাও দেখা যায়, যা সেখানকার পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও ইকো সিস্টেমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাছাড়া ভ্রমণকারী স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রকৃতি বা সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে চিন্তা করবেন, সেটা প্রত্যাশা করাও উচিত নয়। তাহলে কে ভাববে? নীতিনির্ধারক ও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নকারীদের এ বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে। শুধু সংরক্ষণ নয়, সম্ভাবনা অনুযায়ী পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও পরিচর্যায় মনোযোগী হওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন ধারণাটি (আমাদের পরিপ্রেক্ষিতে) উচ্চাকাঙ্ক্ষী মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়ার জন্য এর প্রতি সুবিচার করার কোনো বিকল্প নেই।

প্রবাসীদের পাঠানো যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সিলেট অঞ্চলে আসে, তার বড় অংশ ব্যয় হয় অনুৎপাদনশীল খাতে। যদি পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগে তাদের বিশেষ কিছু প্রণোদনা দেয়া যায়, তবে বহুমুখী সুফল পাওয়া সম্ভব। বিভিন্ন দেশে কাজ করার সুবাদে তারা যেমন ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ, ঠিক তেমনিভাবে অসংখ্য বিদেশীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে। ফলে তারা বিনিয়োগ করলে স্থানীয় কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রমোশনের কাজটাও সহজ হবে। তবে উদীয়মান শিল্প হলেও এখন পর্যন্ত দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ খুব সামান্যই নেয়া হয়েছে। পর্যটন-বিষয়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের জন্য এ বিষয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। পর্যটকদের সমন্বিত ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রদানের জন্য সমৃদ্ধ ওয়েবসাইট ডেভেলপ করার পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে একটি এবং প্রতিটি বিভাগীয় শহরে তথ্যকেন্দ্র গড়ে তোলাও খুব দরকার।

তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে প্রতিবেশী দেশগুলোর পর্যটন খাতে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক থাকাটাই স্বাভাবিক। বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু ঘুরে দেখতে ইউরোপ বা আমেরিকার একজন পর্যটক বাংলাদেশে আসবেন, সেটা আশা করা যৌক্তিক হবে না। তারা আশপাশের দেশগুলোয় ভ্রমণে যে এজেন্সির মাধ্যমে আসেন, তারা যদি বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে, তাহলে অতিরিক্ত দু-তিনদিন এখানে ঘুরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন। ফলে ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বোঝাপড়া বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি ট্রাভেল এজেন্সিগুলোকে গড়তে হবে এ দেশগুলোর সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক।

পর্যটন বিষয়ে বহুল প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হলো, বিদেশী পর্যটকরা বেশি বেশি এলে তবেই এ খাতের উন্নয়ন হয়। আসলে কি তা-ই? স্পেন, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলোর সিংহভাগ পর্যটকই নিজ দেশের নাগরিক। আমাদের দেশেও ৮০ শতাংশের বেশি অবদান রাখছেন অভ্যন্তরীণ পর্যটকরা। আমরা শুধু বিদেশীদের জন্য পরিকল্পনা করব অথচ দেশের পর্যটকরদের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ব্যাপারেও উদাসীন থাকব— সেটা কি ঠিক? প্রথমে দেশী পর্যটকদের মানসম্মত ভ্রমণের গ্যারান্টি দিতে পারলে প্রতি বছর যে আট-নয় লাখ মানুষ বিদেশে ঘুরতে যায়, তার সংখ্যা কমে আসবে; অভ্যন্তরীণ পর্যটন হবে গতিশীল। তাছাড়া এ খাতে বিনিয়োগ বাড়বে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে, সাপোর্ট সার্ভিসগুলো হবে মানসম্মত, দেশ-বিদেশে বাড়বে প্রচারণা। তাই দেশে যে মার্কেট এরই মধ্যে তৈরি হয়ে আছে, সেটার প্রতি মনোযোগী হওয়াটা বেশি জরুরি।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় উত্সব রাসলীলা অথবা দোলযাত্রাকে কেন্দ্র করে বার্ষিক বড় মেলার আয়োজন করা যেতে পারে। দুই বা তিন দিনব্যাপী সে মেলায় আঞ্চলিক ঐতিহ্যবাহী পণ্য যেমন— টিপরা, মণিপুরি, খাসিয়া ও গারোদের হাতে তৈরি বাহারি পোশাক, বাঁশ ও বেতের তৈজস (বিশেষ করে শীতলপাটি) ও আসবাব, উৎপাদিত ফলমূল ইত্যাদি ব্যাপকভাবে প্রদর্শন ও বিক্রয় করা যেতে পারে। প্রতি বছর রাজশাহীর পুঠিয়া শিবমন্দিরে ভারত, নেপাল, ভুটান ও তিব্বত থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তীর্থযাত্রী অংশ নেন। এক্ষেত্রেও প্রতিবেশী দেশগুলো (বিশেষত সেভেন সিস্টার্স) থেকে আগ্রহীরা আসতে পারেন। তাছাড়া যে অর্ধশতাধিক দেশের নাগরিকের জন্য অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা চালু আছে, সেসব দেশের নাগরিকদের কাছে বিষয়টি দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরা; পাশাপাশি এ শিল্পের জন্য বিপুলসংখ্যক দক্ষ ও যোগ্য কর্মী গড়ে তোলা খুব জরুরি।

যারা বছরে কয়েকবার সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক আর দুবাই ঘুরতে যান, তাদের মাতৃভূমির স্থাপনাগুলোর ব্যাপারে আগ্রহী করতে হবে। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বিছনাকান্দি কিংবা শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্য উপভোগে যেন আগ্রহী হন, সে বিষয়ে অনুপ্রাণিত করতে হবে। অনেকেরই ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, ব্যাপক প্রমোশন চালালে প্রচুর বিদেশী পর্যটক আসবেন এবং অনেক আয় হবে। কিন্তু তাদের আপ্যায়ন করার মতো প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও সহায়ক শিল্প কি গড়ে তুলতে পেরেছি? তাছাড়া একটি স্থানে হঠাৎ করেই বিদেশী পর্যটক আসেন না। দেশের মানুষ শুরু করলে ধীরে ধীরে রাস্তাঘাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ, আনুষঙ্গিক সুবিধাদি গড়ে ওঠে, তখন দেশের সীমা পেরিয়ে পর্যটন অঞ্চলটি আন্তর্জাতিকতা লাভ করে।

ন্যাচারাল স্পটের পাশাপাশি হ্যান্ডিক্রাফটস শপ, শিশুপার্ক, খেলাধুলার বিভিন্ন আইটেম, শরীরচর্চার উপকরণসহ বিনোদনের অন্যান্য আয়োজন নিয়মিত করা দরকার। অধিকাংশ বিখ্যাত শহরের প্রমোশনে ‘নাইট লাইফ’-কে বিশেষভাবে ফোকাস করা হয়। অর্থাৎ সারাদিন জলে-স্থলে-পাহাড়ে কাটানোর পরে রাত্রিযাপন এলাকায়ও তাদের জন্য থাকে বিশেষ আকর্ষণ। জার্মানিতে এক জরিপে দেখা যায়, চীনা পর্যটকরা ২৪ ঘণ্টার জন্য হোটেলে রুম ভাড়া পরিশোধ করলেও গড়ে ৪ ঘণ্টার বেশি সেখানে থাকেন না। এমনও দেখা গেছে, বারবিকিউ পার্টি শেষে বাঁশি শুনতে শুনতে ভোর হয়ে গেছে— পর্যটকরা খেয়ালই করেননি। থাইল্যান্ডের মতো নয়, বরং আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাইট লাইফ অফার করা অত্যন্ত জরুরি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সিলেট শহরে এমন এলাকা গড়ে উঠতে পারে, যেখানে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী রকমারি খাবার পাওয়া যাবে, বাউল ও লোকগানের আসর বসবে, হস্তশিল্পের বাহারি কালেকশন থেকে ক্রেতারা পছন্দসই জিনিস কিনতে পারবেন (কক্সবাজারে যেমন বার্মিজ মার্কেটের আকর্ষণ রয়েছে)। তাহলে সারা দিন বিভিন্ন স্পটে ঘোরার পাশাপাশি অনেকেই পরিকল্পনা করবেন রাতে সেই অভিজ্ঞতা নেয়ার। আবার অনেকেই ভাবেন, জাফলং ঘুরে সন্ধ্যার মধ্যে মানুষ শহরে চলে আসবে— সেটাই তো স্বাভাবিক। সেখানে রাতে থাকার দরকার কী? এটা ট্যুরিজমের প্রাচীন ধারণা। এখন মানুষ শুধু দেখতে যায় না, বরং শহরের কোলাহলমুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে রাত কাটানো বা ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়া, উন্মুক্ত স্থানে পায়ে হাঁটার আলাদা ভ্যালু আছে, যা অনেক পর্যটকই পছন্দ করেন। তাই সেখানে ভালো সুযোগ থাকলে হয়তো অনেকেই এক রাত জাফলংয়ে কাটিয়ে আসতেন। 

ইউরোপে প্রতিটি রেলস্টেশন ও সিটি সেন্টারের ৫০ গজের মধ্যে ‘ট্যুরিজম ব্যুরো’র ইনফরমেশন সেন্টার আছে। একবার ডেনমার্কের সবচেয়ে প্রাচীন শহর রিবেতে গিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগে কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় নিকটস্থ তথ্যকেন্দ্রে গিয়ে বললাম, ‘২ ঘণ্টা পরে আমার ট্রেন— এ সময়ের মধ্যে কোন স্থানগুলো দেখতে পারি?’ তারা আমার পছন্দ-অপছন্দ শুনে ম্যাপসহ এমন একটা গাইডলাইন দিল যেন সময়টার সর্বোত্তম ব্যবহার হয়। অথচ সিলেট বিভাগে তথ্যসেবার এরূপ ব্যবস্থা আছে বলে আমার জানা নেই। সীমিত পরিসরে হলেও দরগা গেটসংলগ্ন এলাকায় একটা কার্যকর তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করা দরকার, যা সিলেট অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

লন্ডন ও সিলেটকে লিংক করা এ অঞ্চলের পর্যটনের বিকাশে খুবই দরকার। অনেকেই ভাবতে পারেন, লন্ডনে সিলেটি বংশোদ্ভূত বর্তমান প্রজন্ম সিলেট কিংবা দেশে আসতে চায় না। কিন্তু এ ধারণা যে সঠিক নয়, তা ‘অন্তর্যাত্রা’ সিনেমায় দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। আসলে ঝকঝকে তকতকে দালানকোঠায় যাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা, প্রতিনিয়ত শিডিউল চেজ করে, ‘মেকি ফান’ রিপিট করে তারা বড় ক্লান্ত। সত্যিই যদি তারা বাংলার প্রকৃতিকে দেখার সুযোগ পায়, দাদা-নানার বাড়িতে হূদয়ছোঁয়া ভালোবাসা পায়, তাদের সাহেবি মোড়কের অভ্যন্তরে দুরন্ত ও উত্সুক যে মনটি আছে, তা বের হয়ে আসবে। অনেক মা-বাবাই নানা বাস্তব কারণে তাদের দেশে আনতে ভয় পান। যে সিস্টেম ও সুযোগ-সুবিধার মধ্যে তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা, সেখান থেকে দেশের প্রচণ্ড গরম, অসহ্য লোডশেডিং, ভয়াবহ যানজট, গ্রাম্য খাবার, আইন-শৃঙ্খলার দুরবস্থা ইত্যাদিতে তাদের সন্তানরা বিরক্ত হবে— এ ভয়েই তারা হয়তো সাহস করেন না। এ শঙ্কার দেয়াল ভাঙতে হবে।

এক্ষেত্রে মিডিয়া (নাটক ও সিনেমা, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল, সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, সংবাদপত্র) কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। লন্ডনে বাংলা অনুষ্ঠানগুলো দেখার সময় সন্তানদের যদি ওই লোকেশনগুলো ভালো লাগে, তখন তারা আগ্রহী হতে পারে; অভিভাবকরাও গর্ব করে বলবেন— ওটাই আমাদের দেশ! তখন সন্তানদের আগ্রহে মা-বাবা হয়তো সাহস ফিরে পাবেন। আর একবার ভালো লাগলে তারা বাঙালি কমিউনিটির বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়গুলো শেয়ার করবেন। এতে তাদেরও আগ্রহ সৃষ্টি হবে। একবার যদি সেটা শুরু হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পর্যটন শিল্পের সমৃদ্ধি নিঃসন্দেহে সুদৃঢ় হবে। বিনা পরিচর্যাতেই সিলেট দীর্ঘদিন থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পর্যটক পাচ্ছে এবং ক্রমে সে সংখ্যা বাড়ছে। এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সবার বিশেষ মনোযোগ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তাহলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হবে স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড ইমেজ, যা দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক ও জাতীয় উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখবে।

উন্নয়নশীল দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ‘অর্থ’ একটি বড় সমস্যা। কিন্তু সিলেটের পরিপ্রেক্ষিতে সে কথা পুরোপুরি খাটে না। এ অঞ্চলের অনেকেই দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। বিনিয়োগের খাত হিসেবে পর্যটন তাদের খুবই পছন্দের। কারণ তারা উন্নত দেশগুলোয় এ ব্যবসায়ের সফলতা নিয়মিত প্রত্যক্ষ করছেন। কিন্তু দেশে বিনিয়োগ করার ভোগান্তির কথা ভেবে তাদের অনেকেই দ্বিধান্বিত। বাহ্যত সরকারের উদাত্ত আহ্বান থাকলেও দেশে বিনিয়োগ করতে আসা অনেকের অভিজ্ঞতাই সুখকর নয়। তাছাড়া দেশে অবস্থানরত আত্মীয়স্বজনেরা সবসময় নেতিবাচক পরিবেশের কথা বলেন। ফলে অনেক কষ্টে অর্জিত অর্থ এখানে ঢালতে তারা সাহস পান না। এক্ষেত্রে যদি আঞ্চলিক পর্যটন উন্নয়নে স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ থাকে, সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রয়োজনীয় সর্বোচ্চ সাপোর্ট দিতে পারে, তবে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ প্রবাসীদের কাছ থেকে আসা কঠিন হবে না। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার মতো দেশে পর্যটনসংশ্লিষ্ট যেসব কোম্পানির এ খাতে বড় বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদেরও আহ্বান করতে হবে। তারা বিনিয়োগে সম্মত হলে নিজ উদ্যোগে ট্যুরিস্ট স্পটের উন্নয়নের পাশাপাশি দেশে-বিদেশে প্রমোশন চালাবে, যা আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টিতে বিরাট ভূমিকা রাখবে।

ভারত ও চীন ঘুরতে আসা পর্যটকদের একটি বড় অংশ টানতে সক্ষম হচ্ছে নেপাল ও ভুটানের পর্যটন সংস্থাগুলো। কৌশলগত অবস্থান ও কার্যকর চেষ্টার ফলেই সেটা সম্ভব হচ্ছে। আমাদের দেশেরও (বিশেষ করে সিলেটের) একই জাতীয় ভৌগোলিক সুবিধা বিদ্যমান। টার্গেট গ্রুপগুলোকে ঠিকভাবে বোঝাতে পারলে তারা নেপাল, ভারত কিংবা মিয়ানমার ভ্রমণের মাঝে দু-একদিনের জন্য বাংলাদেশে আসতেই পারেন। এক্ষেত্রে শুধু পর্যটক নয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্ট, এম্বাসিগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়ানো দরকার। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে পরিকল্পিত, নিয়মিত, সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগ না থাকায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

গোটা বিশ্ব যখন বিকেন্দ্রীকরণকে উৎসাহিত করছে, তখনো আমাদের সব বিষয়ে পরিকল্পনা, বাজেট প্রণয়ন, এমনকি বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ থাকে কেন্দ্রের! এভাবে সবকিছু কেন্দ্র থেকে করতে গেলে হাজারো এজেন্ডার ভিড়ে ট্যুরিজমের আঞ্চলিক উন্নয়ন অগ্রাধিকার পাবে না, ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হবে সিলেটের মতো সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর পর্যটন সম্পদ ও সম্ভাবনা। তাই পরীক্ষামূলকভাবে হলেও সিলেটকে অতি সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল গণ্য করে একটি ‘ডেসটিনেশন ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন’ গঠন করা হোক। স্থানীয় সরকার প্রশাসন ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান/ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠন করা হোক স্বতন্ত্র সংস্থা। যদি বিষয়গুলোকে এ সংস্থা যথাযথভাবে সমন্বয় করে তাহলে ‘পর্যটন নগরী সিলেট’ একসময় দেশের সীমানা পেরিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরিস্টদের কাছেও হয়ে উঠবে কাঙ্ক্ষিত পর্যটন গন্তব্য।

[কৃতজ্ঞতা: সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গবেষক মোছা. বিলকিস আক্তার প্রয়োজনীয় তথ্য ও মতামত দিয়ে লেখককে সহযোগিতা করেছেন] 

 

লেখক: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের পিএইচডি ফেলো 

 

কৃতজ্ঞতা

বাংলা— পূর্বাঞ্চল বিশেষ সংখ্যা প্রকাশে সহায়তা জুগিয়েছেন বণিক বার্তার চট্টগ্রাম ব্যুরো, সিলেট ব্যুরো ও কক্সবাজার প্রতিনিধি।