সম্পদ, মেধা, সাহস, ঐতিহ্য যে দিকেই চিন্তা করি না কেন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই চট্টগ্রামের আছে উপচে পড়া সম্ভার। এর বাইরেও আছে সাগর ও পাহাড়সহ অনবদ্য ভৌগোলিক অবস্থান। এত কিছু সত্ত্বেও ‘গ্লোবাল সিটি’র মর্যাদার প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রামের অবস্থান নিতান্তই করুণ— এ সত্য মেনে নেয়ার কোনো উপায়ন্তর নেই।

গত এক দশকে মফস্বলীয় বাস্তবতা থেকে চট্টগ্রামের এক ধরনের রূপান্তর ঠিকই ঘটেছে। কিন্তু এ রূপান্তর কলেবর বৃদ্ধির, শ্রী বৃদ্ধির নয়। এ অবস্থা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। এখানে প্রথম ও প্রধান প্রয়োজন মানসিকতার উত্তরণ— কর্ণফুলী তৃতীয় সেতুর মতো বিশ্বমানের অবকাঠামো তৈরি হলো কিন্তু সে অবকাঠামো ব্যবহারে আমরা পাড়ার মোড়ে চলাফেরার যে ধরন, তা-ই বজায় রাখলাম— তা তো হলো না। ৩০ বছর আগে বিপণিবিতান বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক শপিং মল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ৩০ বছর পরে বিপণিবিতান ও তার চারপাশের ফুটপাতের দোকানের ভিড়ে সেই আধুনিকতার স্বপ্নমত হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। কারেন্ট বুক সেন্টারের কর্ণধারের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল, কীভাবে আধুনিকতার এ বৃহত্তর স্বপ্ন খণ্ডিত ও ক্ষুদ্র চিন্তার ভিড়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। চট্টগ্রামের উন্নয়নে তাই আজকে প্রথম প্রয়োজন আধুনিকতার তথ্য বিশ্বমানের নগরের এ বৃহত্তর স্বপ্নের পুনর্জাগরণ। বন্দরকে নিয়ে বৃহত্তর স্বপ্ন দেখা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। কিন্তু বিশ্বমানের বন্দর ও মফস্বলীয় নগরের সহাবস্থান নিশ্চয়ই আমাদের স্বপ্ন হতে পারে না। বন্দর নিয়ে যেমন বৃহত্তর স্বপ্ন জরুরি, নগরকে নিয়েও তা সমভাবে জরুরি।

পাঁচটি উপাদান ঘিরে চট্টগ্রামের গ্লোবাল সিটিতে উত্তরণের স্বপ্ন সাজাতে হবে। এ পাঁচটি উপাদান হচ্ছে— অর্থনীতি, শিক্ষা, ঐতিহ্য, অবকাঠামো ও প্রকৃতি। বন্দর তথা আমদানি-রফতানি চট্টগ্রামের অর্থনীতির প্রাণশক্তি বটে। তবে শিল্পায়ন ও স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ নিয়েও সমগুরুত্ব দিয়ে ভাবা জরুরি। উদীয়মান খাত জাহাজ নির্মাণের কেন্দ্রস্থল হিসেবে চট্টগ্রামের সম্ভাবনা অপরিসীম। এটা সত্য, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিরাজমান সমস্যার কারণে চট্টগ্রামের অর্থনীতির বিকাশ বহুলাংশে ব্যাহত। তারপরও স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে পর্যটন, সেবা খাত, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ ইত্যাদি নিয়ে বাড়তি ভাবনার অবকাশ রয়ে গেছে।

অর্থনীতির বিকাশের পূর্বশর্ত অবকাঠামো এদিক থেকে চট্টগ্রামের বাস্তবতা একেবারে মফস্বলীয় পর্যায়ের। যানজটের যাঁতাকলে নাগরিক জীবন স্বল্পতম সময়ের ব্যবধানে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে। জলাবদ্ধতা রুটিন সমস্যায় পর্যবসিত। সমন্বিত চিন্তার এখানে কোনো বিকল্প নেই। অবকাঠামোর চ্যালেঞ্জ যে মাপের, সেখানে শুধু সরকারি অর্থায়নে এর সমাধান সম্ভব হবে না। নগর পিতাদের ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের যৌথ চিন্তা ও উদ্যোগ এখানে জরুরি।

একসময় চট্টগ্রাম শিক্ষা ক্ষেত্রে জাতীয় নেতৃত্বের দাবিদার ছিল। আজকের বাস্তবতা অনেক করুণ। সুযোগের অপর্যাপ্ততা তো আছেই। আরো বড় সমস্যা হচ্ছে শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে সামাজিক উপলব্ধির দুর্বলতা। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করাই এখানে মূল কথা নয়। মানের প্রশ্ন, শিক্ষাকে ঘিরে সামাজিক সংস্কৃতির প্রশ্ন এখানে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মাসখানেক আগে এক মতবিনিময় সভায় কিছু ছাত্রছাত্রীর মুখে নতুন আকুতি শুনলাম। বৃহত্তর চিন্তার ক্ষেত্রের অনুপস্থিতি, আলোকিত কর্মকাণ্ডের সুযোগের অনুপস্থিতি এবং এসব আকুতি শোনার ব্যাপারে আগ্রহী নীতিনির্ধারক মহলের অনুপস্থিতি। বহু উদ্যোগের এখানে অবকাশ রয়ে গেছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে একটি সামাজিক আন্দোলনে শরিক হতে চাই। ইপিজেড ও স্থানীয় শিল্পায়ন ও সেবা খাতের সহায়তায় চট্টগ্রামে একটি বিশ্বমানের ডিজাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম দেয়া প্রয়োজন।

অর্থনীতি, অবকাঠামো ও শিক্ষা— এ তিন উপাদান ছাড়াও আরো দুটি উপাদান চট্টগ্রামের গ্লোবাল সিটি স্বপ্নের জন্য জরুরি— ঐতিহ্য ও প্রকৃতি। পাহাড় ও সমুদ্রের লীলাভূমিতে পৃথিবীর খুব কম শহরই সমৃদ্ধ। ভৌগোলিক অবস্থানের এ অপার ভাগ্যকে শুভ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা জরুরি। একইভাবে ঐতিহ্যের বিষয়টি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের বিশাল ইতিহাস চট্টগ্রামের। এ ইতিহাসকে চট্টগ্রামের জন্য বিশ্বমানের সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করতে হবে।

‘গ্লোবাল সিটি’র স্বপ্ন অলীক নয়। কিন্তু অর্জনের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়া জরুরি। কোনো একক উদ্যোগের জন্য অপেক্ষা করা জরুরি নয়। স্বপ্ন দেখতে চাই, এ সংকল্পের ক্রমাগত বিস্তারই জরুরি।

 

লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা