রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন স্বাধীন বাংলাদেশের এক গৌরবময় স্বর্ণোজ্জ্বল পদক্ষেপ। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন জাতীয় আন্দোলন। মাতৃভাষাকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে ধর্মভিত্তিক দেশ বিভাগের কথা। প্রাদেশিক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বলবৎ থাকবে, এই আশা-উদ্দীপনা নিয়ে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানবাসী অনেক স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই এ দেশবাসী বুঝতে পারল ব্রিটিশ শাসকের পরিবর্তে এসেছে পাঞ্জাবি শাসক— কেবল শোষণ পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটেছে। ওরা শাসক আর আমরা শোষিত। আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে এক বিরাট ষড়যন্ত্রের শিকার।
কোনো জাতির অস্তিত্বকে বিলীন করতে চাইলে তার মুখের ভাষাকে কেড়ে নিতে হয়। সেই অস্ত্রের আঘাত হানল পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠী। সাড়ে চার কোটি জনগণের ভাষা কেড়ে নিতে ঘোষণা করল ‘একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। এই ঘোষণার প্রতিবাদে জনগণ বিক্ষোভে আন্দোলন করার শপথ নেয়। উল্লেখ্য, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই মাউন্ট ব্যাটন পরিকল্পনা ঘোষণার পর প্রবীণ শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং তরুণ আব্দুল হক, মাহবুব জামাল, জাহেদী বাংলাকে এ দেশের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেন। কাজী মোতাহার হোসেন, মুহম্মদ এনামুল হক, ফররুখ আহম্মেদ ও আবুল মনসুর আহম্মদ এ দাবিকে জোরদার করেন। তমদ্দুন মজলিস সংগঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ১৯৪৭-এর অক্টোবরে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়।
ঐতিহাসিক ১৯৪৮ সাল। ১৯ মার্চ কায়েদে আযমের ঢাকায় আগমনের কথা। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির যথার্থতা তুলে ধরার জন্যই ঐতিহাসিক ১১ মার্চ দেশব্যাপী এক আন্দোলনের পরিকল্পনা নেয়া হয়। ধর্মঘট, সভা ও শোভাযাত্রা করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিকে জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। উল্লেখ্য, ১১ মার্চের পূর্বে রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে কোনো গণবিক্ষোভ সংঘটিত হয়নি। এজন্য এটা তাত্পর্যবহ। কায়েদে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুর স্বপক্ষে রেসকোর্স এবং কার্জন হলে ইংরেজিতে ভাষণ দেন। কার্জন হলে ভাষণদানকালে ‘Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan’ বলার সঙ্গে সঙ্গে ‘No. No.’ বলে প্রতিবাদ উঠল। তিনি ‘It is my view’ বলে বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করেননি। ‘I hope Bengal will not fail me’ বলে সেখানেই বক্তব্য শেষ করে চলে যান। বলা বাহুল্য উর্দু দিল্লি ও লক্ষৌর ভাষা— পাকিস্তানের নয়। বিশেষ করে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের তো নয়ই।
আন্দোলনের ধারা যতই তীব্র হতে লাগল, ততই দমননীতি বেড়ে চলল। ফলে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করে। আন্দোলনের ধারাও স্তিমিত হয়ে আসে। কিন্তু আন্দোলন স্তিমিত হলেও দমে যায়নি। ছাত্রদের সর্বাঙ্গীণ অধিকার অস্বীকারের যে বিরোধী মনোভাব এত দিনে ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে পুঞ্জীভূত হয়েছিল, তা ছাত্র সংগঠনকে অধিকতর সুসংহত করে। ফলে এদের অধিকার বোধকে আরো তীব্রতর করে তুলল। শিক্ষা সংকোচ, বেতন বৃদ্ধি ইত্যাদি দাবি-দাওয়া নিয়ে ছাত্র আন্দোলনের ওপর মারাত্মক বিধিনিষেধের স্বৈরাচারী ব্যবস্থার সক্রিয়তা স্বাভাবিকভাবেই ছাত্র সংহতি এবং সাংগঠনিক শক্তিকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল।
ভাষা আন্দোলন ছিল মাতৃভাষাকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করার জাতীয় আন্দোলন। তাই রাষ্ট্রভাষার দাবি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার মহান প্রেরণা তীব্রভাবে অনুভব করলাম। প্রতিবাদী কণ্ঠ ছাত্র সংগঠন গণতান্ত্রিক প্রগ্রেসিভ ফ্রন্টে যোগ দিলাম। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল এবং ওমেন স্টুডেন্টস রেসিডেন্সের হল ইউনিয়নের ইলেকশন হলো। উভয় হলেই সদস্য হলাম। উল্লেখ্য, ওমেন স্টুডেন্টস রেসিডেন্সের ছাত্রীদের যেকোনো হলে অ্যাটাস্ট থাকতে হতো। আমি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের অ্যাটাস্ট ছাত্রী। হাবিবুর রহমান শেলী ভিপি এবং জিএস জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সেই পরিষদেরই সদস্য ছিলাম। ফলে রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিতে আরো সুযোগ পেলাম। ১৯৫০ সালের এপ্রিলে রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা থেকে বেগম ফৌজিয়া সামাদের প্রযোজনায় ‘মেয়েদের রাজনীতিতে যোগ দেওয়া উচিত’-এর সপক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখি। দৈনিক অবজার্ভারে এপ্রিলেই এসএম আলী আমার যুক্তির প্রশংসা করেন। সরকার বা কর্তৃপক্ষ-বিরোধী আন্দোলনে প্রতিকূল অবস্থাকে পরোয়া না করে একনিষ্ঠ ও সততার সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিতে পশ্চাত্পদ হইনি।
১৯৪৯ সাল। ১১ মার্চ প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট, সভা ও শোভাযাত্রা করে ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হয়। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান কর্তৃক প্রস্তাবিত আরবি হরফে বাংলা, ১৯৪৯ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য অধিবেশনে পাকিস্তান শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ড কর্তৃক চূড়ান্তভাবে গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনায় প্রতিবাদ জানায়। ফলে আরবি হরফে বাংলা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত সরকারকে বাতিল ঘোষণা করতে হয়।
১৯৪৯ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পূর্ব পাকিস্তান সফর করেন। তিনি জিমনেসিয়াম মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসভায় ভাষণ দেন। কার্জন হলে ভাষণ দিতে এলে চাকরি ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানবাসীদের বৈষম্য ও বেকারত্বের চিত্র তুলে ধরার জন্য কার্জন হলের প্রবেশদ্বারে হাবিবুর রহমান শেলী ও আরো দুজন ছাত্র (এমএ ক্লাসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম) পানের দোকান দিয়ে বসেন। বলা বাহুল্য, কার্জন হলে তখন আমিও উপস্থিত ছিলাম। ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য দাবিসংবলিত একটি গুরুত্বপূর্ণ মেমোরেন্ডাম লিয়াকত আলী খানকে প্রদান করেন। বস্তুত সেই মেমোরেন্ডাম ছিল রাষ্ট্রভাষার দাবিসহ পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য দাবিসংবলিত এক ঐতিহাসিক দলিল। উক্ত মেমোরেন্ডামে প্রতিরক্ষা বিভাগে পূর্ব পাকিস্তানের সমঅধিকার, চাকরির ক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, চট্টগ্রামে নৌ-সদর দফতর স্থাপন প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ দাবিসমূহ সন্নিবেশিত ছিল।
১৯৫০ সাল। জনাব আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে ঢাকায় পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র-সম্পর্কিত জাতীয় মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এটাই গ্রান্ড ন্যাশনাল কনভেনশন নামে পরিচিত। এই সম্মেলনে অন্যান্য শাসনতান্ত্রিক প্রস্তাবের সঙ্গে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দেয়ার দাবি জানানো হয়।
১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ঐতিহাসিক ১৯৫২ সাল। ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করলেন ‘একমাত্র উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা।’ বিক্ষুব্ধ জনতা প্রতিবাদ করল। অধিকার সচেতন বাঙালি বুঝতে পারল শাসকবর্গের ষড়যন্ত্র। তাদের বিক্ষুব্ধ সংগ্রামী ও বিদ্রোহী সত্তার অদম্য আক্রোশ স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে রূপ নিল। নাজিমুদ্দিনের ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ করল। প্রতিবাদমুখর ছাত্রছাত্রী ৩০ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে আমতলায় ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই দাবিতে সভা করে এবং শোভাযাত্রা করে ঢাকার প্রধান রাস্তাগুলো প্রদক্ষিণ করে। মিছিলটি নবাবপুরে গিয়ে শেষ হয়। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা কার্জন হল পার হয়ে আরো কিছু দূর এগিয়ে কার্জন হলের ভেতর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসতাম এবং সেখান থেকে হোস্টেলে ফিরতাম।
আন্দোলনকে আরো জোরদার করার জন্য ৪ ফেব্রুয়ারি এই মর্মে হরতাল, সভা ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। প্রদেশব্যাপী সুনির্দিষ্ট কর্মসূচিভিত্তিক আন্দোলন পরিকল্পনার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে গেল। ১১, ১২ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী কালো পতাকা দিবস পালন করা হয়। হরতাল, সভা ও শোভাযাত্রা করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থ সংগৃহীত হয়।
এখানে উল্লেখ্য স্কুল ও কলেজের ছাত্রীদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে সফল করার উদ্দেশ্যে ছাত্রী নিবাসের ছাত্রীরা এলাকা নির্ধারণ করে, বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে কামরুন্নেছা, বাংলা বাজার, ইডেন কলেজ থেকে ছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয় আমতলার সভায় যোগদানের জন্য নিয়ে আসত। স্বাধিকারের প্রশ্নে ভাষার দাবিকে সফল করার জন্য ছাত্রীরা নানা বাধাবিপত্তির মধ্যে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারের মেয়েরাই ছাত্রী নিবাসে থাকত। বিজ্ঞান ও কলা বিভাগ মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ছাত্রী সংখ্যা ৬০-৭০ এর বেশি হবে না। তখনকার সময়ে ছেলেদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল। প্রক্টরের মাধ্যমে কথা বলতে হতো। নতুবা ১০ টাকা জরিমানার ব্যবস্থা ছিল। শিক্ষক ক্লাসে যাওয়ার সময় ছাত্রীদের কমনরুম থেকে ডেকে নিয়ে যেতেন। ছাত্রীরা মাথায় কাপড় দিয়ে, অনেকে বোরখা পরে ক্লাস করত। ক্লাসে মেয়েরা শিক্ষকের সামনের সারিতে বসত।
কিন্তু সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা সামাজিক বাধাবিপত্তি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হোস্টেল থেকে বের করে দেবেন অথবা অভিভাবকরা পড়াশোনা বন্ধ করে দেবেন— এসব কিছুকে আগ্রাহ্য করে সংগ্রামী ভাইদের সঙ্গে সমভাবে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। রাজনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন অল্প সংখ্যক ছাত্রী যথেষ্ট সাবধানতার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কোনো গোপন মিটিংয়ে যোগদান করত। সুফিয়া খান, সুফিয়া আলী, বেবী আপা, আমি, পরবর্তীতে রোকেয়া আপা সেসব মিটিংয়ে যোগদান করে আমাদের মতামত ব্যক্ত করতাম। বেতন বৃদ্ধির প্রতিবাদে No fee campaign-এর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যখন ছাত্রছাত্রীদের নাম কেটে দেয়ার আদেশ জারি করল, তখন সে সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার বিপক্ষে আমি এবং জনাব অলি আহাদ প্রতিবাদ করেছিলাম। গোপন মিটিংগুলো বিশ্ববিদ্যালয় মেইন বিল্ডিং রুম নং ৭৪ অথবা রুম নং ৭৫-এ অনুষ্ঠিত হতো। বেশির ভাগ গোপন মিটিংয়ের প্রস্তাব ও সিদ্ধান্তসমূহ দুই-একটি ছেলের মারফতে মেয়েদের কাছে পৌঁছানো হতো। ছাত্রীদের কাছে পোস্টার লেখার দায়িত্ব দেয়া হতো। সারা রাত জেগে নুরুন্নাহার কবীর পোস্টার লিখতেন। আর আমরা তাকে সাহায্য করতাম।
রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন সরকার আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে হরতাল, সভা ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। ওইদিন রাতেই যখন কানাঘুষা খবর মেয়েদের হোস্টেলে পৌঁছাল যে, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করে সভা শেষে শান্তিপূর্ণভাবে শোভাযাত্রা করা হবে, তখন ছাত্রীদের মধ্যে বিতর্কের ঝড় দেখা দিল। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচির সবই কি নস্যাৎ হয়ে যাবে? প্রশ্ন দেখা দিল তবে কি ৩০ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ ফেব্রুয়ারিকে সফল করার সব প্রস্তুতি বিফলে যাবে? যা হোক নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে সকালেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত এলাকা অনুযায়ী বিভক্ত হয়ে বেরিয়ে গেলাম। উল্লেখ্য, কিছু ছাত্রী হোস্টেলে থেকে গেল।
আমরা হেঁটে দূরদূরান্ত থেকে ছাত্রীদের সংগ্রহ করে সঙ্গে নিয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আমতলায় উপস্থিত হই, তখন পথ শ্রমে ক্লান্ত একে অন্যের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলাম। আমার মনে আছে রোকেয়া আপা একটু মোটা মানুষ, তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘মনে হচ্ছে পায়ের রগ বুঝি ছিঁড়ে গেল।’ সেদিন এসব কিছুর উত্তর দেয়ার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না। বোরখা শামসুন কাছেই ছিল, ওর দিকে তাকিয়ে একটু হেসেছিলাম। তখন বেলা ১০-১১টা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে আমতলায় জমায়েত হয়েছে। মধুদার দোকানে রাজনৈতিক আলোচনা তুমুলভাবে চলছে। আর মধুদা চা নাশতার সেবাদান করছেন নগদে ও বাকিতে।
এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় গেটের উল্টো দিকে সিটি এসপি মাসুদের নেতৃত্বে একটি জিপ ও দুই-তিন ট্রাকবোঝাই পুলিশ নেমে পজিশন নিল। সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মতিন, গাজীউল হক, এসএ বারী, এ টি জুলমত আলী, গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, মো. তোয়াহা, কে.জি. মোস্তফা, মোস্তফা নুরুল ইসলাম, আকতার মুকুল, কামরুদ্দিন শহুদ, সামসুল ইসলাম, সামসুল হক, আফসার উদ্দিন, হাবীবুর রহমান শেলী, ওবায়েদ উল্লা খান সেন্টু, শহীদ খান, আবদুস সামাদ আজাদ, মুহাম্মদ সুলতান, শহীদুল্লাহ কায়সার, গোলাম মওলা, আহমদ রফিক, ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, জয়নুল আবেদিন, ইলিয়াস, মোস্তফা, কিবরিয়া, আবদুল মুহীত, আজমল হোসেন— এরূপ অনেক নাম জানা ও না-জানা, চেনা ও অচেনা মুখ নেতা ও কর্মীর সমাবেশ ঘটেছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীর মধ্যে পরস্পরবিরোধী বাগিবতণ্ডা চলছে। আবার কেউ হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, কেউ বা শুনছে।
এরই মধ্যে ভাইস চ্যান্সেলর সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আসেন ১৪৪ ধারা না ভাঙার অনুরোধ নিয়ে ছাত্রদের কাছে। সঙ্গে ছিলেন প্রক্টর অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, ডিন জুবেরী ও ড. নিউম্যান। উপস্থিত ছাত্ররা বিনয়ের সঙ্গে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
আমতলায় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে প্রায় দুপুর ১২টার দিকে সাধারণ ছাত্রসভা শুরু হয়। তুমুল বিক্ষোভের মধ্যে ১৪৪ ধারা ভঙ্গে তর্ক-বিতর্ক চলে। কিন্তু বিষয়টি তুঙ্গে পৌঁছালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সপক্ষে বিপুল সংখ্যক সংগ্রামী ছাত্রছাত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে মেনে নেয়া হলো। ফলস্বরূপ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি ভেঙে গেল।
শেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১০ জন করে ছাত্রছাত্রীর দল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলে যোগ দেবে বলে স্থির হলো। উল্লেখ্য, আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সরকার আহূত বাজেট অধিবেশন পূর্ব পাকিস্তানের তরফ হতে বাংলাকে অন্যতম রাস্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করুক। বলা বাহুল্য, পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ বর্তমান জগন্নাথ হলকে বলা হতো।
মিছিলের গুরুত্ব বুঝে আমরা যেসব ছাত্রীকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়ে এসেছিলাম, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলাম। কিন্তু আমরা চলে যাওয়ার পর এসব ছাত্রী নিজেরা আমতলায় সভা করে এবং রাষ্ট্রভাষা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার শপথ নেয়। এদের মধ্যে কাজী খালেদা, মন্তু, পুতুল এবং আরো অনেক উল্লেখযোগ্য ছাত্রী আছে, যাদের নাম এখন মনে পড়ছে না।
ছাত্রছাত্রীরা কার আগে কে যাবে, এই প্রতিযোগিতা শুরু করে। পরে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীরা গেটের কাছে চলে গেল, সুযোগমতো গেটের বাইরে ছেলেদের সঙ্গে মিছিলে যোগ দেয়ার জন্য। গেটের পাশে তখন ড. শহীদুল্লাহ, প্রক্টর মুজাফফর আহমেদ, ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর মতিউর রহমান এবং আরো কয়েকজন প্রফেসর ও অসংখ্য ছাত্রছাত্রী জমায়েত হয়েছে। কিছু সংখ্যক পুলিশ লাঠি হাতে কর্ডন করে গেটে দাঁড়িয়ে আছে, আর বাকিরা রাইফেল হাতে পজিশন নিয়ে আছে। ড. শহীদুল্লাহর মুখ চিন্তিত, উদ্বিগ্ন। তিনি বলে উঠলেন, ‘ওরা পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’ পুলিশি তত্পরতার মুখে ঠিক হলো গ্রেফতার এড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীরা প্রতিটি দলের অগ্রভাগে থাকবে। সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মতিন কাগজ-কলম নিয়ে নাম লিস্ট করতে শুরু করলেন। প্রথম দলগুলোর নাম লিস্ট করা হলেও পরে আর সম্ভব হয়নি। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের মতো ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষোভে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’-এই স্লোগানে বেরিয়ে যাচ্ছিল, কেউ বা পুলিশ কর্ডন লাঠির ওপর দিয়ে, কেউ বা লাঠির নিচ দিয়ে। কিছু ছেলে দেয়াল টপকে আবার কিছু ছেলে মধুদার কেন্টিনের পাশ দিয়ে। আপসহীন ইস্পাতকঠিন শপথে উদ্বুদ্ধ সংগ্রামী ছাত্রছাত্রীদের আটকায় কে? উল্লেখ্য, সাফিয়া আপা, হালিমা ও আমি প্রথম দলে গেটের কাছে আসি এবং আমি প্রত্যেকটি ছাত্রী যাতে মিছিলে যোগ দিতে পারে, সেই সুযোগ সৃষ্টির সাহায্য করি এবং তৃতীয় দলের সঙ্গে কর্ডন ভেদ করে মিছিলে যোগ দিই। প্রথম ও দ্বিতীয় দলের ছাত্রদের পুলিশ ট্রাকে তুলে নেয়। আপসহীন বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীর ধাক্কায় পুলিশ কর্ডন ভেঙে যায়। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ। আর কাঁদানে গ্যাসের শেল বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে নিক্ষেপ করে পুলিশ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার করে। কাঁদানে গ্যাসের সঙ্গে আমাদের অনেকেরই পরিচয় ছিল না। স্থানটি
মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে গেল। চোখ জ্বালা করছিল। শেলটি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে গাজীউল হকের ওপর পড়ে। পরে শুনেছিলাম আহত গাজীউল হককে ছাত্ররা ধরাধরি করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। কাঁদানে গ্যাসের প্রভাব থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য রুমাল ভিজিয়ে আনতে অনেকেই ছুটল বেলতলার পুকুরে। কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের মধ্যেই অ্যাসেম্বলি হলের দিকে ছুটে যাচ্ছিলাম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি নিয়ে। নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী কিছু সংখ্যক ছাত্র মিছিলকে ভণ্ডুল করে দেয়ার উদ্দেশ্যে পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে।
বেলা প্রায় ৩টা-সাড়ে ৩টা মিছিল মেডিকেলের মোড়ে পৌঁছালে জেলা প্রশাসক কোরেশীর নির্দেশে পুলিশ অবিরাম গুলি ছুড়তে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ দিল বরকত, সালাউদ্দিনসহ আরো অনেকে। মেডিকেলের উল্টো দিকে এসএম হলের প্রভোস্ট এম গণির বাড়ি। তার বাড়ির সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া, রাস্তার ধারে একটি রেস্টুরেন্ট, দুই-একটি বইয়ের দোকান ও মুদির দোকান ছিল। রেস্টুরেন্টের এক কোণে অনেকগুলো ভাঙা রিকশার স্তূপ পড়েছিল। (বর্তমানে সে স্থানটি শহীদ মিনার)। কাঁদানে গ্যাস আর গুলির মধ্যে বুঝতে পারছিলাম না কোন দিক থেকে গুলি আসছে। তাই দৌড়ে গিয়ে ভাঙা রিকশার অংশের মধ্যে আশ্রয় নিলাম। কিন্তু সেটাও নিরাপদ মনে না হওয়ায় গুলির মধ্যেই কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে যাওয়ার মনস্থ করি। কিন্তু পার হওয়ার সময় কাঁটাতারের মধ্যে আমার শাড়ি আটকে যায়। কেউ আমার শাড়ি কাঁটাতার থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছিল। পেছন ফিরে তাকানোর সময় ছিল না। অবিরাম গুলি চলছে। ভেতরে তখন আহত সারা তৈফুর, সুফিয়া ইব্রাহিম ও বোরখা শামসুন। ওরাও আমার মতো গুলির মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে এসেছে। আহত অবস্থায় একজন অন্যজনের দিকে তাকাচ্ছিলাম। ওরা আমাকে দেখে বিচলিত হয়ে গণি সাহেবের বাড়ি থেকে পানি চেয়ে এনে খাওয়াল। কার কি হয়েছে, সেদিকে হুশ নেই। আমরা সবাই আতঙ্কগ্রস্ত। কারণ পুলিশি জুলুমে আমাদের কতজন হতো, আহত ও গ্রেফতার হয়েছে, তাদের জন্য চিন্তিত ও বিচলিত। হোস্টেলে ফেরার সাহস পাচ্ছিলাম না। পরিবেশ তখন এমন থমথমে। দিনটি ছিল মেঘলা। বাংলার আকাশ, মাটি বেদনাবিধুর। জনমানবহীন পথে পুলিশ ছাড়া আর কোনো প্রাণী নেই। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও আতঙ্কের মধ্যে সংগ্রামী ভাইবোনদের কথাই ভাবছিলাম। জালেম সরকারের নিষেধাজ্ঞা ১৪৪ ধারাকে প্রতিরোধ করা না হলে অনাগত দিনে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার অবশিষ্ট থাকবে না। তাই যেভাবেই হোক ন্যায় ও সত্যের লড়াইয়ে দুর্গম ও বন্ধুর পথে আমাদের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতেই হবে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী যাচ্ছেন। তার সেই মুখখানি আজো আমার মনে উদ্ভাসিত। ‘মুনীর ভাই’ বলে ডাক দিলাম। তিনিই আমাদের হোস্টেলে পৌঁছে দিলেন। উল্লেখ্য, ২১ ফেব্রুয়ারি কেবল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া ঢাকা শহরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত ছিল, কারণ এটা ছিল মূলত ছাত্র আন্দোলন। কিন্তু গুলিবর্ষণের পর স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনে রূপ নেয়। চারদিকে তখন বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে গেল। সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত বন্ধ হয়ে যায়। রেডিওর অনুষ্ঠান থেকে শিল্পীরা বিরত থাকেন। যানবাহন ও দোকানপাট বন্ধ থাকে। রক্তে ভেজা বাংলার আকাশ-মাটি তখন শোকাভিভূত, বেদনাবিধুর। চারদিক থেকে কেবল মানুষ আর মানুষের ঢল নেমেছে। রাজপথে মানুষ বিষণ্ন মনে এগিয়ে চলেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে, যেখানে শহীদরা চিরনিদ্রায় নিমগ্ন। নিষ্ঠুর জালেমের জুলুমের শিকার শহীদদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধার অর্ঘ্য নিবেদন করতে। ইস্পাতকঠিন শপথে স্বৈরাচারী সরকারের জুলুমের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে আর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করতে করতে তারা যান।
দিনাজপুরের মন্ত্রী হাসান আলী পরিষদ ভবনে যাওয়ার পথে বিক্ষুব্ধ ভাষাসৈনিক দ্বারা আক্রান্ত হন এবং মানিকগঞ্জের এমএলএ জনাব আওলাদ হোসেনকে পবিত্র কোরআন শরিফ হাতে মেডিকেলের ৬ নং ব্যারাকের সামনে শপথ করানো হলো যে, তিনি ব্যবস্থাপক সভায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার সপক্ষে প্রস্তাব আনবেন।
পরিষদ ভবনের রাস্তায় কোনো বাধাবিপত্তি না থাকার জন্য পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে ও ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য লাঠিচার্জ করে। ইউনিভার্সিটি, মেডিকেল কলেজ এবং পরিষদ ভবন-সংলগ্ন এলাকা তখন ধোঁয়াচ্ছন্ন রণক্ষেত্র। পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সরকার ট্রাকের পর ট্রাক সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করল। সেই সময় পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদে বাজেট অধিবেশন চলছে। গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে বিরোধীদলীয় সদস্য ঢাকার আনোয়ারা বেগম, রংপুরের খয়রাত হোসেন, কুমিল্লার আহম্মদ আলী অধিবেশন মুলতবির প্রস্তাব আনলে স্পিকার সে প্রস্তাব আগ্রাহ্য করেন। কিন্তু সরকারদলীয় পাবনার সদস্য মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ সোচ্চার হলেন। তিনি বলেন, ‘যখন আমাদের বক্ষের মানিক, আমাদের ভাবি নেতা ছয়জন ছাত্র রক্তশয্যায় শায়িত, তখন আমরা পাখার নিচে বসে হাওয়া খাবো, এ আমি বরদাস্ত করতে পারি না। আমি জালেমের জুলুমের প্রতিবাদে পরিষদ গৃহ পরিত্যাগ করছি এবং মানবতার দোহাই দিয়ে আপনার মাধ্যমে সকল মেম্বারের কাছে পরিষদ কক্ষ ত্যাগের আবেদন জানাচ্ছি।’ এটা বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাজেট অধিবেশন বয়কট করে বিরোধীদলীয় সদস্য ধীরেন দত্ত, আবুল কালাম শামসুদ্দিন ও কংগ্রেস পার্টির সদস্যসহ পরিষদ ভবন ত্যাগ করে মেডিকেল কলেজে শহীদ ও আহতদের দেখতে চলে আসেন। শহীদ ও আহতদের দেখা ও গুলিবর্ষণের স্থান দেখার জন্য লোক সমাগম তখন মেডিকেলের সর্বত্র। বর্ণনাতীত, এসব হূদয়বিদারক দৃশ্য অনুভব করা কেবল প্রত্যক্ষদর্শীর পক্ষেই সম্ভব।
মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসের বটবৃক্ষে মাইকের হর্ন বেঁধে ২০ নং ব্যারাকের ১নং রুম কন্ট্রোল রুম রূপে ব্যবহূত হয়। সেখান থেকে মাইকে বিক্ষোভে জ্বলন্ত ভাষায় মওলানা তর্কবাগীশ ও ধীরেন দত্ত বক্তৃতা করেন। ফলে সংগ্রামী চেতনা আরো উজ্জীবিত হয় এবং ছাত্রছাত্রী ও জনতার মনে নতুনভাবে আন্দোলনের সংগ্রামী রূপ নেয় এবং আত্মপ্রত্যয় জন্মে। এরই মধ্যে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের কমন রুমকেও কন্ট্রোল রুমে পরিণত করা হয়। মেডিকেল কলেজ কন্ট্রোল রুম ও সলিমুল্লাহ হল কন্ট্রোল রুম থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি ও সর্বশেষ পরিস্থিতির ঘোষণা অবিরাম চলতে থাকে।
মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং যুবলীগের নেতৃস্থানীয় সক্রিয় ব্যক্তিবর্গের যৌথসভায় যে কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হয়, তা নিম্নরূপ:
(ক) ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টায় মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাস প্রাঙ্গণে গণগায়েবি জানাজা।
(খ) গায়েবি জানাজা সমাপনের পর জনসভা ও জঙ্গি মিছিল। মেডিকল কলেজ ছাত্রাবাসের কন্ট্রোল রুম থেকে জনতার জ্ঞাতার্থে কর্মসূচি মাইকে বারবার ঘোষণা করা।
সরকার পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার জন্য ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সমগ্র ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করল। রাস্তায় রাস্তায় পুলিশ মোতায়েন করল। সর্বত্র সশস্ত্র পুলিশ টহল দিতে শুরু করল এবং বেপরোয়া গ্রেফতার করল অর্ধশতাধিক। রাত্রে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল কন্ট্রোল রুম থেকে ঘোষণা হচ্ছিল, ‘ভাইয়েরা, আপনারা আগামীকাল সকাল ৭টায় আসবেন। আমরা শহীদের লাশ মর্যাদার সঙ্গে রক্ষা করেছি। আমরা আপনাদের নিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে শহীদদের দাফন করব।’ ঘণ্টাখানেক পর আবার মাইকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে করুণ ঘোষণা ভেসে এল— “ভাইয়েরা, পারলাম না, পারলাম না রাখতে, পুলিশ আমাদের শহীদদের লাশ ছিনিয়ে নিয়ে গেল।’ এসব হূদয়বিদারক ঘোষণা আমাদের মনকে অভিভূত করে ফেলল। বিভিন্ন হলের কন্ট্রোল রুম থেকে সারা রাত অনবরত মাইকে আগামী দিনের অর্থাৎ পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি ঘোষণা হচ্ছিল কারফিউ দেয়া নিস্তব্ধ রাতের অন্ধকার ভেদ করে।
পরদিন শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, গায়েবানা জানজা। প্রাণচঞ্চল ঢাকা শহর তখন শোকের শহর। লক্ষাধিক লোক শরিক হলো এ জানাজায়। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হক এই জানাজায় শরিক হন এবং ব্যারাকের খুঁটি ধরে অঝোরে কাঁদেন। অন্যদের মধ্যে হাজির হলেন মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেন, আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক প্রমুখ।
গায়েবানা জানাজা শেষে জঙ্গি মিছিল হওয়ার কথা। পুরান ঢাকার মহল্লার সর্দাররা এবার আর সরাসরি আন্দোলনে যোগ না দিয়ে পারলেন না। কিংবদন্তির বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব বাইশ মহল্লার কাদের সর্দারসহ মাওলা সর্দার, মতি সর্দার, পিয়ারু সর্দার, ইলিয়াস সর্দার এরা সকলেই বিক্ষোভে আন্দোলনে যোগ দিলেন। শহীদদের রক্তাক্ত জামাকাপড় লম্বা বাঁশের মাথায় বেঁধে শুরু হলো জঙ্গি মিছিল। বলা বাহুল্য, তখনো ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা বলবৎ ছিল। মিছিলকারীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেই এগিয়ে যাচ্ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন, কার্জন হল, হাইকোর্ট, ফজলুল হক হল, রেলওয়ে হাসপাতাল, রমনা রেস্ট হাউজ, রেলওয়ে ক্রসিং, নবাবপুরের ঠাটারী বাজার। তখন পর্যন্ত মিছিলের শেষভাগ মেডিকেল কলেজ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল।
২২ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টায় মুহাম্মদ সুলতান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভবন শীর্ষে সমগ্র দেশব্যাপী প্রথম কাল পতাকা উত্তোলন করেন। তখন বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে গেছে। পুরান ঢাকার জনগণ আন্দালনবিরোধী প্রচারণার জন্য মর্নিং নিউজের ছাপাখানা জুবিলী প্রেস পুড়িয়ে দিল। সরকারি-বেসরকারি এমন কি সেক্রেটারিয়েটের কর্মচারী পর্যন্ত হরতাল পালন করল। বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিলের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ হলো। শফিক, জব্বারের রক্তে রঞ্জিত হলো ঢাকার রাজপথ। আহতদের সংখ্যা অগণিত, গ্রেফতারি তত্পরতা সরকার চালাল বেপরোয়াভাবে। আহতদের শুশ্রূষা ও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য শুরু হলো চাঁদা তোলার অভিযান। ওমেন রেসিডেন্সের ছাত্রীরাও টিন হাতে দলে দলে বেরিয়ে গেল চাঁদা সংগ্রহ করতে। যে মোসলেমা খাতুন পড়াশোনা ছাড়া কিছুই বুঝতেন না, তিনিও বাকি থাকলেন না, বেরিয়ে গেলেন চাঁদা সংগ্রহ অভিযানে।
২২ ফেব্রুয়ারিতে নয়জনের নামে হুলিয়া বের হলো। সরকারের স্বরাষ্ট্র (স্পেশাল) বিভাগ থেকে এই মর্মে যে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ দিনের মধ্যে এ নয়জনকে নিজ জেলা প্রশাসকের দফতরে হাজির হতে হবে। ঢাকা গেজেটে (এক্সট্রা অর্ডিনারি) যে নামের তালিকা প্রকাশিত হয় ২৮ তারিখে, সেসব ব্যক্তিত্ব হলেন আবদুল মতিন, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুব, খালেক নেওয়াজ, শামসুল হক, সৈয়দ নুরুল আলম, আজিজ আহম্মদ, আব্দুল আউয়াল এবং মোহাম্মদ তোয়াহা। এখানে উল্লেখ্য, ২২ ফেব্রুয়ারিতেই সাংসদ আনোয়ারা খাতুন এবং ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ মিসেস জোহা আমাকে হোস্টেলে দেখতে আসেন এবং কিছু সময় আমার সঙ্গে কাটান। আর যারা এসেছিলেন, তাদের নাম এখন মনে পড়ছে না।
২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি ছিল আন্দোলনের তুঙ্গ পর্যায়। মন্ত্রীরা সব আশ্রয় নিলেন ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়। সরকার আন্দোলনকে দমিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী তলব করে। রাস্তায় রাস্তায় পাক সৈন্যরা টহল দেয়। কিন্তু স্বাধিকারের প্রশ্নে, জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্নে ছাত্র-জনতার বিশাল শক্তিকে রুখবে কী দিয়ে। তাই ঢাকা শহরে সেদিন কারফিউ বলবৎ থাকা সত্ত্বেও ছাত্র-জনতার সভা ও মিছিল হয়। অফিস-আদালত বন্ধ থাকে, হরতাল পালিত হয়। সবাই কালো ব্যাজ ধারণ করে।
২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে শহীদ বরকতের গুলির স্থানে কেবল মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের উদ্যোগে নির্মিত হয় প্রথম শহীদ মিনার। মেধাবী ছাত্র বদরুল আলম অল্প সময়ের মধ্যে স্কেচ এঁকে দেন। বাইরে রাস্তায় কারফিউ। কিন্তু সংগ্রামী ছাত্ররা বেপরোয়া। কলেজ সম্প্রসারণ কাজের জন্য ইট, বালি ছিল। অ্যাম্বুলেন্সে পিয়ারু সর্দারের গুদাম থেকে সিমেন্ট জোগাড় করে সারা রাতের পরিশ্রমে ১০ ফুট উঁচু ও ৬ ফুট চওড়া একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে। অভাবনীয় দৃশের অবতারণা হয়েছিল ভোরবেলা নবনির্মিত শহীদ মিনারে। মিছিলের পর মিছিল ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাল। অসংখ্য মেয়ে তাদের হাতের, কানের সোনার অলঙ্কার খুলে দিল আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য। ফুল, টাকা আর সোনায় ভরে গেল শহীদ মিনারের পাদদেশ।
২৪ ফেব্রুয়ারি যে মহামান্য ব্যক্তিত্ব আবুল কালাম শামসুদ্দিন, যিনি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে আইন পরিষদের সদস্য পদ হতে ইস্তফা দেন এবং সরকারের বিরাগভাজন হন। সবার অনুরোধে তিনিই আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন। পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদ অবশেষে ২২ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবক্রমে কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট সুপারিশ পাঠায়। ভীতসন্ত্রস্ত নূরুল আমীন সরকার রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে ভারত সরকারের উসকানিমূলক কার্যকলাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির কার্যকলাপ বলে আখ্যায়িত করে। ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীন প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনে কলকাতার দুটি দৈনিক পত্রিকার অংশবিশেষ পাঠ করে এই মর্মে অবহিত করান। আন্দোলনের ভয়াবহ রূপ নূরুল আমীন সরকারকে বিচলিত করে তোলে। ফলে ২৪ ফেব্রুয়ারি সরকার পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ বাজেট অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি ঘোষণা করে।
২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ধর্মঘট পালিত হয়। বিপ্লবী জনতার পদভারে রাজধানীর রাজপথ প্রকম্পিত হয়। আপসহীন শপথের স্বাক্ষর বহনকারী সংগ্রামী ছাত্র-জনতার মিছিলে রাস্তার উভয় পার্শ্বে অবস্থিত বাড়ির ছাদ, বারান্দা, জানালা দিয়ে পুষ্পবর্ষণ করে হাত নেড়ে আবালবৃদ্ধবনিতা অভিনন্দন জানায়। সরকারি জুলুমে দেশবাসীর এরূপ ঘৃণা জন্মে যে, ধিক্কার আর ঘৃণায় ইতর, অবোধ রাস্তার কুকুর, গরু ও ছাগলের গায়ে লাল রঙ দিয়ে ‘খুনী নূরুল আমীনের বিচার চাই’, ‘খুনের বদলা খুন চাই’, ‘নূরুল আমীন গদি ছাড়’ ইত্যাদি লিখে ছেড়ে দিত।
ভাষা আন্দোলনের মূল ব্যক্তিত্ব হলেন জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। যিনি সময়োচিত লেখনীর দ্বারা ক্ষমতাসীনদের চক্রান্তের নীলনকশা তুলে ধরেন জাতির সম্মুখে দেশ বিভাগেরও আগে থেকে। তারই নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি সরকারি নীতির কঠোর সমালোচনা করে। ফলে আকস্মিকভাবেই ২৫ ফেব্রুয়ারি অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় এবং অনতিবিলম্বে ছাত্রছাত্রীদের আবাসিক হল ত্যাগ করার নির্দেশ দেয়া হয়।
২৬ ফেব্রুয়ারি। নতুনভাবে গঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি। ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় হরতাল প্রত্যাহার করে। কেবল স্কুল-কলেজে ধর্মঘট অব্যাহত থাকে। রাত্র ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত সরকারি কারফিউ বলবৎ থাকে এবং প্রত্যহই ধরপাকড় চলে। আবাসিক হলগুলো বন্ধ ঘোষণার ফলে ছাত্রছাত্রীরা হল ছেড়ে বাড়ি চলে যেতে বাধ্য হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি সরকারি নির্যাতনের মাত্রা আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল। প্রায় ২৪ ঘণ্টা ঘেরাও করে বেলা প্রায় আড়াইটার সময় পুলিশ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের দরজা ভেঙে অভ্যন্তরে প্রবেশ করে প্রতিটি কামরায় গিয়ে ব্যাপক তল্লাশি চালায়। ক্রমাগত ২ ঘণ্টা তল্লাশির পর পুলিশ ৩০ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করে। এমন কি মুসলিম হলের হাউজ টিউটর ড. মফিজউদ্দিন আহম্মদকেও গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, মুসলিম হলের প্রভোস্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে তল্লাশির সময় হলে ঢুকতে দেয়া হয়নি।
সলিমুল্লাহ মুসলিম হল তল্লাশি শেষে পুলিশ ও সেনাবাহিনী পূর্ণ সামরিক সম্ভার নিয়ে মেডিকেল কলেজে ঢোকে। শহীদের স্মৃতিস্তম্ভের বিলোপ সাধন না করা পর্যন্ত নূরুল আমীন সরকার কিছুতেই এই অস্তিত্ব সহ্য করতে পারছিল না। জনমনে উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী শহীদের স্মৃতি ধ্বংস করতে না পারলে লীগশাহী টিকিয়ে রাখা মুশকিল। তাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সামান্যতম রশ্মিটুকুরও মূলোত্পাটন করতে বদ্ধপরিকর। শেষ বেলায় মাত্র কয়েকজন ছাত্র তখন ব্যারাকে। পুলিশ ব্যারাকে তল্লাশি চালিয়ে ১০ জনকে গ্রফতার করে এবং শুরু করে শহীদ স্মৃতির বিলোপের অপচেষ্টা। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ মতে প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত ট্রাক দিয়ে টেনে মিনারটি ভেঙে ফেলে। তার পর টুকরো টুকরো করে সব কিছু ট্রাকে তুলে নিয়ে যায়।
সরকারের চণ্ডালী নীতি ভাষায় ব্যক্ত করা কঠিন। শহীদ স্মৃতির মিনার ভাঙা আমাদের বুকের পাঁজর ভাঙার সমতুল্য। তাই আমাদের সহপাঠী বন্ধু আলাউদ্দিন আল আজাদ ক্ষোভে-দুঃখে কবিতায় গেয়ে গেলেন—
স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো
চার কোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো। যে ভিৎ কখনো কোন রাজন্য
পারেনি ভাঙতে।
ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যেসব স্মরণীয় ও মহামান্য ব্যক্তিত্ব গ্রেফতার বরণ করেছিলেন, তারা হলেন আবুল হাশিম, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, খন্দকার মোশতাক, আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, ওসমান আলী, মাদার বক্স, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক অজিত গুহ, অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী, অধ্যাপক পুলিন দে, ড. পি.সি. চক্রবর্তী, ড. আজমল, খয়রাত হোসেন, গোবিন্দ লাল মুখার্জি, মির্জা গোলাম হাফিজ, মুহাম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহম্মদ, ওলি আহাদ, এসএ বারী, এ.টি. খালেক নেওয়াজ, শওকত আলী, হাশিমুদ্দিন আহমদ, আবদুল মতিন, ফজলুল করিম, আনোয়ারুল হক, সাদেক খান, লতিফ চৌধুরী, হেদায়েত হোসেন চৌধুরী, মুজিবুল হক, হাসান পারভেজ প্রমুখ।
হাসান পারভেজকে পরে ছেড়ে দেয়া হয়। তার সম্পর্কে জনমনে ইনফরমার হিসেবে প্রশ্ন থাকে।
যে সবে বঙ্গেত জন্মি
হিংসে বঙ্গবাণী
সে সব কাহার জন্ম
নির্ণয় ন’ জানি
ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যেসব মহিলার জীবনে বড় রকমের মাশুল দিতে হয়, তাদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের মর্গান হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মমতাজ বেগম অন্যতম। তিনি শহীদদের রক্তশপথে নারায়ণগঞ্জবাসীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে উজ্জীবিত করেন। ফলে তাকে সরকারের চক্রান্তের বেড়াজালে জড়িয়ে কারাবরণ করতে বাধ্য করা হয়। সবচেয়ে দুঃখজনক কারাগার হতে বণ্ডসই করে মুক্তি লাভে অস্বীকৃতি জানালে তার স্বামী তাকে তালাক দেন। ফলে তার সাজানো সংসার ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
নারায়ণগঞ্জের ছাত্রী ইলা বকশী ও বেনু ধরকে কারাবন্দি করা হয়। সিলেটের ছালেহা বেগমকে স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলনের জন্য তখন সেখানকার ডিসি মি. ভি.কে. পাওয়ারের আদেশক্রমে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। বলা বাহুল্য, তার জীবনে আর পড়াশোনা হয়নি। খুলনায় স্কুলছাত্রী হামিদা খাতুন মহিলাদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রচেষ্টায় লাঞ্ছিত হন।
ভাষা সংগ্রামে সিলেটের মহিলাদের গৌরবজনক অবদান রাখার পেছনে প্রধান ভূমিকা ছিল যোবেদা নজিবুন্নেছা খাতুন চৌধুরী। তার সহযোগী ছিলেন শাহেরা বানু, সৈয়দা লুত্ফুন্নেছা খাতুন, সৈয়দা নজিবুন্নেছা খাতুন, প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খাতুন প্রমুখ।
সিলেটের ইস্টার্ণ হেরাল্ড নামের সাপ্তাহিক ইংরেজি পত্রিকায় এত নোংরাভাবে যোবেদা খাতুনকে আক্রমণ করা হয়, যা ছিল কদর্য, অশোভন উক্তি আর বিরূপ মন্তব্যে ভরা। এরই মধ্যে ছাত্র হত্যা ও পুলিশ কর্তৃক গুলি চালনার যথার্থতা বিবেচনা করার জন্য জাস্টিস এলিসের নেতৃত্বে প্রকাশ্য তদন্ত শুরু হয়।
জাতীয় ক্রান্তিলগ্নে যখন রাজনীতিবিদরা মুখ থুবড়ে পড়ে থাকেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাই তখন পথপ্রদর্শক, জাতির স্বপ্ন ও আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্তপ্রতীক। রক্তঝরা জাতীয় ইতিহাসের যুগসন্ধিক্ষণে দেশবাসীর বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান এবং সংগ্রামে ছাত্রছাত্রীরাই নেতৃত্ব দান করে গৌরবোজ্জ্বল পতাকা সমুন্নত রাখে। মহান ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ভূমিকা জাতীয় ইতিহাসে সমুজ্জ্বল। ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সূচনার পথ বেয়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়।
মাতৃভাষার জন্য লড়েছি। আটচল্লিশ আর বায়ান্নে জীবন বিসর্জন করে বর্ণমালার অক্ষরগুলোকে নিষ্কলঙ্ক রাখতে পেরেছি আমাদের গৌরব। সেদিনের রক্তক্ষয়ের চেতনা থেকেই আমরা আমাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে পেরেছি। যার ফলে জন্ম নিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। মহান একুশ আমাদের শিখিয়েছে মাথা নত না করতে। আপসহীনভাবে অন্যায়, অত্যাচার আর অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে।
মাতৃভূমি বাংলাদেশের তদানীন্তন পূর্ব বাংলার সাতচল্লিশোত্তর আপামর জনগণ বিশেষ করে ছাত্রছাত্রী, মধ্যবিত্ত কেরানী, কর্মচারী আর শিক্ষকের আবেগের মূর্তিমান রক্তাক্ত স্বাক্ষর মহান একুশ।
[ নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা থেকে প্রকাশিত ভাষাকন্যা বই থেকে সংকলিত ]
লেখক: ভাষাসংগ্রামী






