মুসলিম লীগের ‘দ্বিজাতি তত্ত্বে’র ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এ রাষ্ট্র সৃষ্টির পেছনে পূর্ববঙ্গের অধিবাসীদের অবদান ছিল অনেক বেশি। কারণ ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ একমাত্র বাংলায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। বাংলার জনগণের মুসলিম লীগকে বেছে নেয়ার বড় কারণ ছিল অর্থনৈতিক। কারণ তারা মনে করেছিল, এর ফলে বাংলায় মুসলমানদের আর্থিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু নির্বাচনের পর মুসলিম লীগ তার প্রধান দাবি ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী একাধিক সার্বভৌম রাষ্ট্র থেকে একক পাকিস্তান রাষ্ট্র দাবি করে এবং তা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে যদিও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (১৮৭৬-১৯৪৮) প্রথম দিকে পাকিস্তান গণপরিষদের উদ্বোধনী বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘আপনি স্বাধীন, আপনি স্বাধীনভাবে মন্দির, মসজিদ অথবা উপাসনার অন্য যেকোনো জায়গায় যেতে পারেন। আপনি যেকোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। এটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের কোনো বিষয় নয়।’ কিন্তু তার এ বক্তব্য শুধু কথার কথাই রয়ে যায়। বরং পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এর বিভিন্ন দিকে ধর্ম অতি উদ্ভট রূপেই দেখা দিয়েছে।
অবশ্য একক পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময়ই একশ্রেণীর বাঙালি নেতা এর বিরোধিতা করে বলেছিলেন, অবাঙালি মুসলমান নেতারা বাংলায় মুসলমানদের বিশেষ সমস্যার প্রতি কখনো প্রয়োজনীয় গুরুত্বারোপ করতেন না এবং প্রস্তাবিত পাকিস্তান বাংলার জনগণের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। দুটি অসম অঞ্চলে বিভক্ত দুই পাকিস্তানের মধ্যে ভৌগোলিক ব্যবধানের সঙ্গে দুই অঞ্চলের মানুষের জীবন ব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সর্বোপরি জীবনের সবদিকের বিস্তর ব্যবধান বিদ্যমান ছিল।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই তা বাঙালির আশাভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কোনো রকম ঘোষণা না দিয়েই মুদ্রা, মানি অর্ডার ফর্ম ইত্যাদিতে উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় লেখা শুরু হয়। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির জন্য তা স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা মনে করেছিল, ৫৬ ভাগ লোকের ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা— সব বিচারে অগণতান্ত্রিক। ফলে নবীন রাষ্ট্র পাকিস্তানের অপ্রতিহত প্রভাবের মধ্যেই পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলা ভাষায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়।
এই আন্দোলনের ধারাবাহিতকায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি তার ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় এবং ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়া হয়।
বাঙালির রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ আন্দোলন। বাংলা ভাষাকে জন্মের পর থেকে ব্রাহ্মণদের পৃষ্ঠপোষক সংস্কৃত, ধর্মীয় ভাষা আরবি, রাজভাষা ফার্সি এবং উর্দুর সঙ্গে সংগ্রাম করে বিকশিত হতে হয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের রীতি অনুযায়ী তারা মনে করেছিল, বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে পারলেই বাঙালি দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হবে। এক্ষেত্রে তাদের বক্তব্য ছিল উদ্ভট। তারা মনে করত, বাংলা সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ভূত আর সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ভূত সব শব্দই পৌত্তলিকতা দোষে দুষ্ট, আর তাই না-পাক। তারা মনে করত পাকিস্তান হচ্ছে পাক-স্থান বা পুণ্য ভূমি। (যদিও আরবিতে প-অক্ষর নেই এবং পাক শব্দটি ফার্সি। ফার্সি সংস্কৃত ভাষার দুহিতা) এ পুণ্যভূমিতে শুধু আরবি, ফার্সি ও উর্দুর মতো মুসলমানদের ভাষা প্রচলিত থাকবে। এছাড়া তারা মনে করত, নবীন রাষ্ট্রে সংহতি বৃদ্ধির জন্য দুই অঞ্চলে এক ভাষা থাকবে। কিন্তু বাঙালি তাদের এ যুক্তি মেনে নিতে পারেনি। তারা মনে করেছে, সংহতি বৃদ্ধির জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত।
ভাষা আন্দোলন হচ্ছে, বাঙালি নারীর প্রথম সোপান, যাতে সাধারণ নারী প্রাণের টানে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে এবং পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মায়ের ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ করেছে।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাসের মতোই ভাষার লড়াইও অত্যন্ত দীর্ঘ। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পূর্বের প্রস্তাবিত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, তা নিয়ে লেখক বুদ্ধিজীবীর মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। সে আলোচনায় নারী তার সরব উপস্থিতির স্বাক্ষর রেখেছে। ১৯৪৭ সালে বেগম পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের দাবি জোরালোভাবে প্রকাশ করা হয়। এছাড়া মোহেসনা ইসলাম পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা শিরোনামে এক লেখায় বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হলে সম্ভাব্য কী কী বিপদ হতে পারে, তা সবিস্তারে উল্লেখ করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার অনমনীয় দাবি জানান।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী, গ্রন্থ প্রকাশক ও বিশিষ্ট নাগরিকরা বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর নিকট যে স্মারকলিপি প্রদান করে, তাতে অন্যদের সঙ্গে মিসেস লীলা রায় এমএ (সম্পাদক, জয়শ্রী), মিসেস আনোয়ারা চৌধুরী বিএ বিটি (সেক্রেটারি, নিখিল বঙ্গ মোসলেম মহিলা সমিতি) স্বাক্ষর করেন। এছাড়া এ সময় আরো অনেক নারীর লেখায় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার দাবি ফুটে ওঠে।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদ পূর্ব বাংলা কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকে গণপরিষদের ভাষা হিসেবে ব্যবহারের যে প্রস্তাব করেন, তা অগ্রাহ্য হওয়ায় এবং তত্কালীন মুসলিম লীগের ভাষাবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠনের জন্য ২ মার্চ ফজলুল হক হলে কামরুদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে যে সভা অনুষ্ঠিত হয়, তাতে মিসেস আনোয়ারা খাতুন, লিলি খান উপস্থিত থেকে জোরালো ভূমিকা পালন করেন।
গণপরিষদের সরকারি ভাষার তালিকা থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে পাকিস্তানের মুদ্রা ও ডাকটিকিটে বাংলা ব্যবহার না করা ও নৌবাহিনী নিয়োগের পরীক্ষা থেকে বাংলাকে বাদ দেয়ার প্রতিবাদে এবং অবিলম্বে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা রূপে ঘোষণা করার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে যে সাধারণ ধর্মঘট ঢাকা হয়, তা সফল করার জন্য বহু ছাত্রী তাতে অংশগ্রহণ করেন। সেদিনের পিকেটিংয়ে যারা অংশগ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে বেগজাদী মাহমুদা নাসির, মমতাজ বেগম, মালেকা, সুলতানা রাজিয়া আফরোজা, লিলি খান, খালেদা খানম, লুলু বিলকিস বানু, মেহেরুন্নিসা, আফরোজা হোসেন, লায়লা, সামসুন্নাহার প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৯৪৮ সালের পর থেকে প্রতি বছর ১১ মার্চ ভাষা দিবসের আন্দোলনে ছাত্রদের সঙ্গে অনেক ছাত্রীও অংশগ্রহণ করত। এভাবে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের পূর্ব পর্যন্ত নারীদের সরব উপস্থিতি লক্ষণীয় ছিল।
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানে যখন ভাষা প্রশ্নে আবারো উর্দুর পক্ষে কথা বলেন, তখন ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ওই সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন মিসেস আনোয়ারা খাতুন (পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদ সদস্য)।
১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা এবং আরবি হরফে বাংলা ভাষা প্রচলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজে ছাত্রছাত্রীরা পূর্ণ ধর্মঘট পালন করে। ওই ধর্মঘট ও শোভাযাত্রায় বিপুল পরিমাণে ছাত্রী অংশগ্রহণ করে। এর পর ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নাদিরা বেগম ও শরিফা খাতুন প্রায় ৫০০ পোস্টার লেখার দায়িত্ব নেন। ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের যে ডাক দেয়া হয়, তা সফল করার জন্য যে প্রস্তুতি, তাতে মেয়েরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে লায়লা সামাদ, শামসুন নাহার, শাফিয়া খাতুন, সারা তৈফুর, রওশন আরা বাচ্চু, সুফিয়া ইব্রাহিম, রওশন আরা রহমান, হালিমা খাতুন, কায়সার সিদ্দিকী প্রমুখ ছাত্রী ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন বকশীবাজার কলেজ, (বর্তমান বদরুন্নেসা কলেজ), মুসলিম গার্লস স্কুল, বাঙলা বাজার গার্লস স্কুল, কামরুন্নেসা গার্লস স্কুল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে মেয়েদের আন্দোলনের পক্ষে উদ্বুদ্ধ করেন এবং এতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। এ সময় ইডেন কলেজের ছাত্রীরাও এসব কাজে অংশগ্রহণ করেন।
২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পর ছাত্রদের দু-তিনটি দল বাইরে বের হওয়ার পরই সুফিয়া ইব্রাহিম, শাফিয়া খাতুন, রওশন আরা বাচ্ছু, শামসুন্নাহার, সারা তৈফুর প্রমুখ ছাত্রী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাস্তায় নামেন। এর পর তাদের অনেকেই পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন। এভাবে প্রত্যক্ষ আন্দোলনেও মেয়েদের ভূমিকা অবশ্য স্মরণীয়। পরদিন আইন পরিষদে আনোয়ারা খাতুন মেয়েদের আহত হওয়ার বিষয়টি সবিস্তারে বর্ণনা করেন।
২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে গুলিবর্ষণের পর নারীরা বিভিন্ন স্থানে সভা করে এর প্রতিবাদ জানান। ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ইউনিয়নের সহসভাপতি শরিফা খাতুনের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সরকারের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করা হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি আজিমপুর কলোনির মেয়েরা প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি অভয়দাস লেনে নারীদের এক বিরাট প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। ওই সভায় সর্বদলীয় ঢাকা মহিলা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনেরও প্রস্তাব করা হয়।
২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের পর এ আন্দোলনের ঢেউ সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে এবং আন্দোলনকে সংগঠিত ও পরিচালনা করার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল। এ প্রয়োজনে নারীরা এগিয়ে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা বিশেষ করে মোসলেমা খাতুন, সুফিয়া খাতুন, সুফিয়া ইব্রাহিম, খুরশেদী আলম (ডলি), সাফিয়া খাতুন, লায়লা সামাদ প্রমুখ ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে আন্দোলনের জন্য চাঁদা উঠিয়েছেন। ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের ভাষ্য অনুযায়ী এ সময় প্রায় ১০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে ছাত্রীরা তাকে দিয়েছিলেন। এর পরও প্রতি বছর ভাষা দিবসে ছাত্রীরা ব্যাপক আকারে আন্দোলন শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতেন।
ছাত্রী বা নারীদের আন্দোলন সংগ্রামে এই যে অংশগ্রহণ, তা কেবল ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি পূর্ববাংলার প্রতিটি জেলা, মহকুমা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে গুলিবর্ষণের পর এ আন্দোলন সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলে কলেজে এমনকি হাটবাজার পর্যন্ত আন্দোলন বিস্তৃত হয়।
ঢাকার পার্শবর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জে আন্দোলন সফল হওয়ার পেছনে নারী সমাজের ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মতো। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম প্রবাদতুল্য ভূমিকা পালন করেন। ২৯ ফেব্রুয়ারি সরকার যখন তাকে গ্রেফতার করে, তখন এ সংবাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ও শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। সরকার তাকে ঢাকা নেয়ার চেষ্টা করলে জনতা রাস্তা অবরোধ করে রাখে। সরকার বাধ্য হয়ে ১৪৪ ধারা জারি করে আন্দোলন থামানোর চেষ্টা করে। মমতাজ বেগম কারাগার থেকে বন্ড সই দিয়ে মুক্তিলাভে অস্বীকৃতি জানালে তার স্বামী তাকে তালাক প্রদান করেন। এভাবে নারী মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় চেষ্টা করেছেন।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের যে ডাক দেয়া হয়, তা থেকেই খুলনায় আন্দোলনের সূচনা। তখন আন্দোলনে যেসব মহিলা যুক্ত ছিলেন, তাদের মধ্যে আনোয়ারা খাতুন রেবা লুত্ফুন নাহার, ফাতেম চৌধুরী, রাবেয়া খাতুন, সাজেদা হেলেন প্রমুখ অন্যতম। তবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ব্যাপক সংখ্যায় মেয়েরা অংশগ্রহণ করেন। খুলনা করোনেশন গার্লস স্কুলের ছাত্রীরা নিজেদের উদ্যোগে স্কুলের দেয়ালে ভাষায় দাবিতে হাতে লিখে পোস্টার লাগান। ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের পরের দিন এক ছাত্রীর কালো শাড়ি কেটে তারা ব্যাজ বানিয়ে তা ধারণ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম খুলনার রাস্তায় প্রকাশ্যে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান প্রদান ও শোভাযাত্রা বের হয়। এ শোভাযাত্রায় পাইওনিয়ার, করোনেশন, সুলতান আহমদ আলী প্রভৃতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেয়েরাও অংশগ্রহণ করেন। এ মিছিলে রত্না, কৃষ্ণা এরা নেতৃত্ব দেন।
চট্টগ্রাম রাজনৈতিকভাবে অন্য এলাকা থেকে তুলনামূলক অগ্রসর ছিল। ১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মাহবুবুল আলম চৌধুরীকে আহ্বায়ক ও চৌধুরী হারুন অর রশীদ এবং এমএ আজিজকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ১৯ ও ২০ ফেব্রুয়ারি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন স্থানে পোস্টার লাগানো হয়। এ পোস্টার লাগানোয় জড়িত ছিলেন মিরা সেন, জাহানারা রহমান, জওশন আরা রহমান, হোসনে আরা মাক্ষী প্রমুখ।
২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে পূর্ণ দিবস হরতাল পালন হয়। মাহবুবুল আলম ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে এদিন একুশের প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ রচনা করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে মিছিল স্লোগানে চট্টগ্রাম শহর প্রকম্পিত হয়। এসব মিছিলে খাস্তগির স্কুলের ছাত্রী অপনাচরণ গার্লস কলেজের ছাত্রীরা অংশগ্রহণ করে। এ সময় তারা ট্রাকে করে মিছিল নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি মেয়েরা চোঙ্গা দিয়ে ভাষার দাবি প্রচার করেছে। এ সময় আন্দোলনে প্রতিভা মুত্সুদ্দি, তালেয়া রহমান, জওশন আর রহমান, হালিমা খাতুন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।
১৯৪৮ সাল থেকেই বরিশালে ভাষা আন্দোলনের সূচনা। ১৯৫২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বরিশালে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের জেলা কমিটি গঠন করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি জগদীশ সারস্বত উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রানী ভট্টাচার্য ওই স্কুলের মেয়েদের নিয়ে এক বিরাট মিছিল বের করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আন্দোলনে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি বরিশালে মিছিলের ঢল নামে। শহরের শত শত নারী মিসেস হামিদ উদ্দিনের নেতৃত্বে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। এ সময়ের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শামসুন্নাহার (মিসেস হামিদ উদ্দিন), হোসনে আরা বেগম (নিরু), আনজিরা বেগম, মঞ্জুশ্রী সেন, মাহেনূর বেগম (গোলেনূর বেগম), মিসেস অবনিনাদ ঘোষ, মিসেস প্রাণ কুমার সেন, হালিমা খাতুন, নূরজাহান প্রমুখ।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাজশাহীতেও ধর্মঘট পালিত হয় এবং ভুবন মোহন পার্কে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ সালের শুরুতেই এখানে ভাষা আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ৪ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস পালন করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ণদিবস হরতাল পালিত হয়। বিকালে ভুবন মোহন পার্কে ডা. এসএমএ গাফফারের সভাপতিত্বে বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা চলাকালে ঢাকার আন্দোলনে গুলিবর্ষণের খবর আসে এবং জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরের দিনের বিক্ষোভ মিছিলের আহ্বান করে হাফিজা বেগম (টুকু), ফিরোজা বেগম (ফুনু), হাসিনা বেগম (ডলি) ও খুকু এরা মিলে পাল্কি গাড়িতে করে মাইকের পরিবর্তে চোঙ্গা নিয়ে প্রচারণায় বের হন। পরের দিনের আন্দোলনে মনোয়ারা, জাহানারা বেগম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নির্মিত ‘রাজশাহীতে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের নামফলক’-এ যেসব নারীর নাম রয়েছে, তারা হলেন— রাজশাহী কলেজের জাহানারা বেগম বেগু, রাজশাহী মেডিকেল স্কুলের মহসিনা বেগম, জেরিনা বেগম ও কুলসুম বেগম এবং পিএন গার্লস স্কুলের মনোয়ারা বেগম, হাফিজা বেগম টুকু, হাসিনা বেগম ডলি, রওশন আরা খুকু।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সিলেটের ভূমিকা ছিল স্মরণীয়। ১৯৪৭ সালের আগস্ট সংখ্যায় আল ইসলাহর (মাসিক পত্রিকা) সম্পাদকীয়তে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার প্রস্তাব করা হয়। ১৯৪৮ সালের ১১ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকারের যানবাহন ও যোগাযোগমন্ত্রী আব্দুর রব নিশতার সিলেট সফরে এলে বেগম জোবেদা রহিম চৌধুরীর নেতৃত্বে মুসলিম মহিলা লীগ মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করেন। এতে স্বাক্ষর করেন বেগম জোবেদা রহিম চৌধুরী (সভাপতি), সৈয়দা সাহার বানু চৌধুরী (সহসভাপতি), সৈয়দা লুত্ফুন্নেছা বেগম (সম্পাদিকা), সৈয়দ নজিবুন্নেসা বেগম (সিনিয়র সদস্য) এবং সিলেট সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষয়িত্রী রাবেয়া খাতুন।
১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাংলা ভাষার প্রস্তাবের জন্য সিলেট মুসলিম মহিলা লীগ তাকে সমর্থন জানিয়ে টেলিগ্রাম প্রেরণ করে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের আন্দোলন পূর্ব থেকেই এখানে এর পক্ষে-বিপক্ষে প্রচারণা শুরু হয়। ফলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। ২১ ফেব্রুয়ারি এখানে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। গুলিবর্ষণের সংবাদে মুসলিম লীগের অনেক নেতা পদত্যাগ করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি সিলেটের মতো রক্ষণশীল এলাকায় মেয়েরা মিছিল করে এবং গোবিন্দ চরণ পার্কের সভায় তারা অংশগ্রহণ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি সিলেটের মেয়েরা স্বতন্ত্রভাবে মিছিল বের করে, যা সেখানে ছিল অকল্পনীয়।
এভাবে দেখা যায়, পূর্ব বাংলার প্রতিটি এলাকায় পুরুষের সঙ্গে মেয়েরাও আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে। তবে নারীর এ অংশগ্রহণ সংখ্যার বিচারে মূল্যায়ন না করে সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। এ আন্দোলনে সফলতা আসার একটি বড় কারণ হলো, নারী-পুরুষ সবাই অংশগ্রহণ করেছে; যা আন্দোলনকে একটি যৌক্তিকতা দিয়েছে। এ আন্দোলনের আরেকটি বড় দিক হলো, পূর্ববঙ্গের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন হলো প্রথম সোপান। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই নারীরা প্রথম অবগুণ্ঠন ভেঙে প্রত্যক্ষ আন্দোলনে ব্যাপক হারে অংশগ্রহণ করেন। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি তার ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধ সুগঠিত করে এবং এ-জাতীয়তাবোধের ভিত্তিতে স্বাধিকার আন্দোলনের সূচনা করে। স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। বাঙালির এই যে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, তার প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করার মতো। আর এসব আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে ভাষা আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ভাষা-আন্দোলন ও নারী গ্রন্থের লেখক






