বৈশাখকে ঘিরে অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়?

বৈশাখ বাংলার অন্যতম উৎসব। এ বৈশাখকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি আকারের ব্যবসায় বড় ধরনের কার্যক্রম দেখা যায়। সারা বাংলাদেশে এখনো ক্ষুদ্র ও ছোট ব্যবসাগুলোর আর্থিক বছরের হিসাব শেষ হয় এ বৈশাখেই। ব্র্যাক ব্যাংকের ২৫ বছরের অর্থায়ন অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এ সময়ে অনেক ব্যবসায়ী তাদের পাওনা মেটান। হালখাতার সময় পুরনো দেনা-পাওনা সমন্বয় করা হয়। ফলে এ সময়ে আমাদের ঋণ আদায়ও ভালো হয়।

বৈশাখ যেহেতু বাঙালির উৎসব, তাই এটাকে ঘিরে ব্যবসাও বাড়ে। নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ঈদুল ফিতরে। এরপর কিন্তু কোরবানির ঈদ নয়, বরং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিক্রি হয় বৈশাখে। কারণ ঈদ উৎসব ধর্মকেন্দ্রিক হলেও বৈশাখ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার উৎসব। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এ উৎসব আরো বেশি উদযাপিত হয়। এ সময়ে বিভিন্ন খাতে চাহিদা বাড়ে। আল্পনা তৈরির জন্য রঙের ব্যবসা বাড়ে। পাঞ্জাবি, ফতুয়া, নারীদের জন্য নকশিকাঁথা, রঙিন কাপড় ও ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাকের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদেরও পান্তা উৎসবের মতো বিভিন্ন পূর্বপরিকল্পনা থাকে। হালখাতা নিয়েও একটা বড় ব্যবসা হয়। এ সময়ে নতুন হালখাতা তৈরির চাহিদা থাকে, যেগুলো সাধারণ খাতার মতো নয় বরং একটু আলাদা ডিজাইনের হয়। সব মিলিয়ে বৈশাখ একটি বড় উৎসব এবং এটি অর্থনীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে চাঙ্গা করে।

এই বড় অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কী ধরনের চাহিদা তৈরি হয়?

বৈশাখ বাঙালির উৎসব, এটি সারা দেশে পালিত হয়। পার্বত্য অঞ্চল বা উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যেও এ সময়ে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষুর মতো বড় উৎসব হয়। এ উৎসবগুলো তাদের জন্য বছরের সবচেয়ে বড় আয়োজন হওয়ায় তাদের প্রস্তুতিও অনেক আগেই থেকেই শুরু হয়। পার্বত্য জনগোষ্ঠীর পোশাক ও গয়নার চাহিদা এ সময়ে বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাপনা। একইভাবে দেশের অন্যান্য জায়গায়ও চাহিদা বাড়ে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এ সময়ে বড় ধরনের চাহিদা তৈরি হয়।

এ বৈশাখী অর্থনীতিতে ব্র্যাক ব্যাংক কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?

ব্র্যাক ব্যাংক মূলত জনমানুষের ব্যাংক। জনমানুষের উৎসব মানেই আমাদের ব্যবসাও বাড়ে। আমরা মূলত ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি আকারের ব্যবসায় অর্থায়ন করে থাকি। বৈশাখকে কেন্দ্র করে যে অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রয়োজন হয়, সেটি বৈশাখেরও তিন-চার মাস আগে শুরু হয়। আমরা সে প্রস্তুতিতে সর্বোচ্চ সহায়তা দিয়ে থাকি।

বৈশাখকে কেন্দ্র করে ব্র্যাক ব্যাংক কোনো ধরনের ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে কিনা?

বৈশাখকে কেন্দ্র করে আমরা যে ধরনের ক্যাম্পেইন করি, সেটি উৎসবের ঠিক আগে নয়। আমাদের মূল কাজ যেহেতু অর্থায়ন, সেহেতু আমাদের ক্যাম্পেইন শুরু করতে হয় তিন-চার মাস আগে, যখন উদ্যোক্তারা তাদের পণ্য তৈরি শুরু করেন। এ সময় আমরা বৈশাখকেন্দ্রিক কিছু নির্দিষ্ট খাত চিহ্নিত করে সে খাতের ব্যবসায়ীদের বাড়তি সুবিধা দিই। অনেক ক্ষেত্রে সুদহারে ছাড়ও দেয়া হয়, যাতে এ বৈশাখকেন্দ্রিক ব্যবসাগুলো আরো উৎসাহিত হয়।

বৈশাখকে কেন্দ্র করে যে ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তার বড় অংশই মাটি, বাঁশ, বেতের মতো লোকজ ও হস্তশিল্প খাতের। এ খাতগুলোর উন্নয়নে ব্র্যাক ব্যাংক কী ভূমিকা রাখছে?

ঢাকা শহরে হয়তো শুধু মঙ্গল শোভাযাত্রা, রমনা বটমূলে অনুষ্ঠান বা আরো কয়েক জায়গায় কিছু অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু প্রায় সবগুলো জেলা শহরেই এ সময়ে মেলা বসে। সেখানে উদ্যোক্তারা স্টল দেন, বাতাসা-মন্ডার মতো বিভিন্ন মিষ্টি ও নানা জাতের পণ্য বিক্রি হয়। এগুলো বিচ্ছিন্নভাবে হয় বলে আমরা হয়তো খুব একটা আঁচ করতে পারি না। কিন্তু এ উৎসবকে কেন্দ্র করে বিশাল অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। যার প্রভাব ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রাম-শহর সর্বত্র রয়েছে। এসবের বড় অংশই ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি আকারের শিল্প খাতের। যেখানে আমাদের প্রায় ৩৩-৩৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে বৈশাখকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত ৪-৫ হাজার কোটি টাকার মতো অর্থনৈতিক চাহিদা তৈরি হয়। কারণ এ সময়ে কিছু স্বতন্ত্র পণ্যের চাহিদা বাড়ে। এ রকম একজনের উদাহরণ দিই। ময়মনসিংহ, জামালপুর ও শেরপুরে কাঁসার (পিতলের তৈরি পণ্য) ক্লাস্টার আছে। ময়মনসিংহ অঞ্চলে এ রকম একজন উদ্যোক্তা আছেন, যার ব্যবসার মূল বিক্রি হয় বৈশাখে। পাঁচ-সাত বছর ধরে আমরা তার ব্যবসার অগ্রগতি দেখছি। শুরুতে আমরা তাকে ৪-৫ লাখ টাকা অর্থায়ন করেছিলাম। পরে তা বাড়িয়ে প্রায় ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। এ রকম আরো অনেক ক্লাস্টার আছে। বাংলাদেশে আমরা ২০০টির বেশি ক্লাস্টার চিহ্নিত করেছি। সম্প্রতি আমরা চিহ্নিত করেছি ‘শামিয়ানা ক্লাস্টার’। বিষয়টি আমার কাছে বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। গ্রামের পর গ্রামজুড়ে বিভিন্ন বাড়িতে বসে মানুষ শামিয়ানা তৈরি করে, ডিজাইন অনুযায়ী কাজ ভাগ হয়ে যায় এবং সবাই বাসায় বসেই তা উৎপাদন করে। এ শামিয়ানারও বৈশাখকেন্দ্রিক চাহিদা আছে। এছাড়া মৃৎশিল্প ও ফুলের ক্লাস্টারও আছে; যেগুলোর চাহিদা বৈশাখে বেড়ে যায়। যশোরে গাঁদা ফুলের এবং ঢাকার সাভারে গোলাপ ফুলের ক্লাস্টার আছে। বৈশাখকে কেন্দ্র করে তারা তিন-চার মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়। এ জায়গাগুলোতেই আমাদের অর্থায়ন আছে।

বৈশাখকেন্দ্রিক এ অর্থনীতিকে কীভাবে আরো শক্তিশালী বা টেকসই রূপান্তর করা যায়?

গত কয়েক বছরে বৈশাখ রোজার মধ্যে পড়ায় ব্যবসায়ীরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। তবে আমি মনে করি, এ বছর থেকে তারা ঘুরে দাঁড়াবেন। এখানে একটা বড় বিষয় হলো সবাই একসঙ্গে কাজ করা। আমাদের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। যেমন আমরা বৈশাখকেন্দ্রিক ক্যাম্পেইন করি, যদি অন্য ব্যাংকগুলোও একইভাবে নির্দিষ্ট খাত চিহ্নিত করে সুদহার কিছুটা কমায়, তাহলে এসব ব্যবসা আরো প্রসারিত হবে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো এসএমই উদ্যোক্তাদের মার্কেট সীমাবদ্ধতা। তারা সাধারণত নিজেদের জেলা শহরের বাইরে যেতে পারে না। যদি তাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে নতুন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে তাদের বিক্রি বাড়বে এবং তারা আরো বড় হতে পারবে। সব ব্যাংক একসঙ্গে পরিকল্পনা করে আগে থেকেই কাজ শুরু করলে বাজারে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হবে এবং নতুন উদ্যোক্তা উঠে আসবেন।

বৈশাখের যে অর্থনীতি, তা মূলত এসএমই খাতনির্ভর। ব্র্যাক ব্যাংক এ খাতেই সবচেয়ে বেশি কাজ করে। বৈশাখী অর্থনীতির আকারটা কেমন হতে পারে?

একদম নির্ভুল সংখ্যা বলা কঠিন। তবে পুরো বাংলাদেশ বিবেচনা করলে বলা যায় যে বৈশাখকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার ৪-৫ হাজার কোটি টাকার মতো হবে। রড-সিমেন্টের মতো নির্মাণ খাত কিংবা মুদি দোকানের ব্যবসা হয়তো এখানে বাদ যাবে। এর বাইরে বাকি প্রায় সব খাতই কোনো না কোনোভাবে বৈশাখের সঙ্গে যুক্ত।

এসএমই খাতে ব্র্যাক ব্যাংকের বিনিয়োগ পরিস্থিতি কেমন?

আমাদের মোট ঋণের ৫০ শতাংশই এসএমই খাতে। সংখ্যার হিসাবে এটি ৪৬-৪৭ হাজার কোটি টাকার মতো হবে। গত বছর এসএমই শিল্পে প্রবৃদ্ধি কম হলেও ব্র্যাক ব্যাংক এসএমই ঋণে ১৫, আমানতে ৩২ ও ফান্ড আন্ডার ম্যানেজমেন্টে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। আমাদের এসএমই গ্রাহক সংখ্যাও বেড়েছে ২৪ শতাংশ। বর্তমান ঋণগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় দুই-আড়াই লাখ।

এ খাতের সম্প্রসারণে আর কী করা যায়?

আমরা চাই এ খাতে আরো অনেক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসুক। শুধু তা-ই নয়, কারো যদি সক্ষমতা বৃদ্ধি বা জ্ঞানভিত্তিক সহায়তার প্রয়োজন হয়, আমরা সেটাও শেয়ার করতে প্রস্তুত। এ খাতটাকে আমরা প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখি না। গত ২৫ বছরে আমরা প্রমাণ করেছি যে এ খাতে ঋণ দিয়ে লাভ করা সম্ভব এবং মানুষের জীবনমানেও পরিবর্তন আনা যায়। এখন যদি আরো ব্যাংক এ খাতে আসে তাহলে অর্থায়নের পরিমাণ আরো বাড়বে। ক্ষুদ্র ঋণ খাতে প্রায় ৭০০ প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এর মধ্যে অনেকগুলো হয়তো খুব কার্যকর নয়, কিন্তু অন্তত ৫০টি প্রতিষ্ঠান ভালোভাবে কাজ করছে। তারা যদি পারে তাহলে ব্যাংকগুলো কেন পারবে না?