বছরের শুভ দিনটিতে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে এমন রঙ ও নকশার পোশাক পরার বিষয়েই সবার মনোযোগ থাকে। এ সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরার ক্ষেত্রে টাঙ্গাইলের বাহারি ডিজাইনের শাড়ি সবসময় মনোযোগের কেন্দ্রে থাকে। টাঙ্গাইলের শাড়ি বুননের মূল কাজ একেবারেই আলাদা। অনেক পুরনো একটা ঐতিহ্যের ধারায় চলে আসছে এ কাজ। এজন্য টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্প ও তাঁতের শাড়ির এত সুখ্যাতি। প্রবাদ আছে ‘চমচম, টমটম ও শাড়ি এ তিনে টাঙ্গাইল বাড়ি।’ বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ও হিউয়েন সাঙের ভ্রমণ বিবরণীতেও টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্পের বর্ণনা আছে।

পহেলা বৈশাখে লাল-সাদা রঙের মধ্যে ঢাকঢোলের নকশা থাকা শাড়ি বেশি জনপ্রিয়। তবে এবার কয়েক হাজার বাহারি ডিজাইনে টাঙ্গাইলের সুতি, ডিজিটাল প্রিন্ট, হাইব্রিড, সুতি, তাঁতের শাড়ি, সাদা লাল জামদানি ও সিল্ক জামদানি তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখানকার তাঁত ব্যবসায়ীরা আগে সাধারণত দুটি ঈদ ও দুর্গা পূজার জন্য অপেক্ষা করত। তবে দেশে পহেলা বৈশাখ বাঙালির জাতীয় উৎসব হওয়ায় দিনটিকে ঘিরে তাদের কর্মযজ্ঞ বেড়েছে। কিন্তু এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নেতিবাচক চিত্র। টাঙ্গাইল শাড়ির জনপ্রিয়তা ও চাহিদা বাড়লেও এর কারিগররা এখনো নানাভাবে সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত। দেশের সবচেয়ে বেশি তাঁত ঘনবসতি এলাকা টাঙ্গাইল। ১৯৯২ সালে তথ্যানুযায়ী, টাঙ্গাইল জেলায় এক লাখের অধিক তাঁত ছিল এবং ১ লাখ ৫০ হাজার তাঁতি সদর, কালিহাতি, নাগরপুর ও বাসাইল উপজেলায় বসবাস করত। ২০০৮ সালে এক লাখ ছোট ও বড় কারখানায় ৩৭ হাজার ২২২টি তাঁত ছিল। প্রায় ৭০ হাজার তাঁতি বিভিন্ন উপজেলার বেসিক সেন্টারের অধীনে কাজ করত। আবার ২০১৩ সালের আরেকটি শুমারি অনুযায়ী, টাঙ্গাইল জেলায় ৬০ হাজার তাঁতের তথ্য মেলে। এদিকে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড বেসিক সেন্টার টাঙ্গাইলের তথ্য বলছে, বর্তমানে ছয়টি উপজেলায় ৩ হাজার ১৮২ ইউনিট তাঁত রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৫টি পাওয়ার লুম, ১ হাজার ৪৮২টি সেমি অটো বা চিত্তরঞ্জন তাঁত এবং ৬২৫টি পিট তাঁত রয়েছে। টাঙ্গাইল সদর, দেলদুয়ার, কালিহাতি, বাসাইল ও নাগরপুর উপজেলায় তাঁত বেশি। সাধারণত তিন ধরনের তাঁতে পিটলুম, সেমি অটো বা চিত্তরঞ্জন তাঁত এবং পাওয়ারলুমে টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরি হয়। টাঙ্গাইল জেলার সদর উপজেলার বেলতা, পোড়াবাড়ী, ধুলটিয়া, বাজিতপুর, সুরুজ, বার্থা, বামনকুশিয়া, তারটিয়া; বাসাইল উপজেলার বাথুলী, ফুলকি; নাগরপুর উপজেলার কেদারপুর, বারাপোষা; কালিহাতী উপজেলার বল্লারামপুর গ্রামে কিছু তাঁত সচল আছে। তবে এখন টাঙ্গাইলজুড়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। একসময় শুধু দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইলসহ আশপাশের গ্রামগুলোয় ১৫-২০ হাজার তাঁত ছিল। এখন সেখানে এ সংখ্যা দেড় হাজার।

তাঁত কারিগরা জানান, প্রতি বছরের মতো এবারো তারা ঈদ ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে শাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। কিন্তু শাড়ি বিক্রি করে মহাজন কিংবা বিভিন্ন শোরুম মালিকরাই প্রকৃত লাভবান হচ্ছেন। তাঁত কারিগরদের মজুরি আগের মতোই রয়েছে। গত বছরের তুলনায় কিছু কাপড়ের ক্ষেত্রে মজুরি আনুমানিক ২৫ টাকার মতো বেড়েছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির এ সময়ে তা তাঁতিদের জীবনে তেমন পরিবর্তন আনতে পারেনি।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড বেসিক সেন্টার টাঙ্গাইলের লিয়াজোঁ অফিসার জায়দুর রহমান জানিয়েছেন, টাঙ্গাইলে দক্ষ তাঁতির অভাবে দিন দিন তাঁতের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। তাঁতিদের মূলধন সরবরাহে অল্প সুদে ঋণ দেয়া হচ্ছে। ঋণের পরিমাণ আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক তাঁতিদের মোটর দেয়া হয়েছে।

গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার অবশ্য বৈশাখ উপলক্ষে টাঙ্গাইলের শাড়ির চাহিদা বেশি। ব্যবসায়ীরাও কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছেন। টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোংয়ের মালিক রঘুনাথ বসাক জানান, পহেলা বৈশাখের সঙ্গে টাঙ্গাইলের শাড়ির ঐতিহাসিক যোগসূত্র কম। তবে শুরুতে এটি এ জেলার তাঁতিদের জন্য একটি অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দিন বলেই গণ্য হতো। এ দিনে কৃষকরা জমিদারদের কাছে খাজনা পরিশোধ করতেন এবং ব্যবসায়ীরা নতুন হিসাব খাতা খুলতেন, যাকে বলা হয় হালখাতা। সে সময় পরিবার-পরিজনদের নতুন কাপড় বা শাড়ি দেয়া হতো। রীতি অনুযায়ী এ উৎসব চলে আসছে। তবে এটি বাঙালির সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হওয়ায় টাঙ্গাইলের শাড়ির চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তিনি আরো জানান, করোনা মহামারীর পর এবার টাঙ্গাইলের তাঁত ব্যবসায়ীরা কিছুটা লাভ করতে পেরেছেন।

মনি ট্রেডার্স টাঙ্গাইল শাড়ির মালিক নিমাই বসাক জানান, বাঙালিদের সর্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ। ঈদ ও পূজা উপলক্ষে যেমন শাড়ি তৈরির ব্যস্ততা থাকে, তেমনি পহেলা বৈশাখের সময়ও নতুন শাড়ি বানানো হয়। দেশে তিনটি বড় ধর্মীয় উৎসবের পর চতুর্থ বড় অনুষ্ঠান পহেলা বৈশাখ। সে হিসেবে ঈদের সময় আলাদা ডিজাইনের শাড়ি, পূজার সময় আলাদা ডিজাইনের শাড়ি ও পহেলা বৈশাখের সময় আলাদা ডিজাইলের শাড়ি বানানো হয়। করোনা মহামারীর পর বৈশাখের আমেজ মানুষের মাঝে কম। তাছাড়া গত দুই বছর এ উৎসব আয়োজনের পরিসর কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। কিন্তু চলতি বছর আবারো মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে বলে জানান তিনি। চাহিদা বাড়ায় টাঙ্গাইলে বৈশাখ উপলক্ষে বানানো মোটামুটি সব শাড়িই বিক্রি হয়ে গেছে।