জীবনসংগ্রাম ছিল কঠোর, কারণ আয় সীমিত। কিন্তু সম্পর্ক ছিল উষ্ণ আর সামাজিক পরিসরে আত্মমর্যাদা ছিল অটুট। কিন্তু ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের নববর্ষের সকালে গত চার দশকে বাংলাদেশের যাত্রাপথের দিকে তাকালে পরিবর্তনটা স্পষ্ট বোঝা যায়। সময় কেবল পঞ্জিকার পাতা বাড়ায়নি, বদলেছে সামগ্রিক অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা, উৎসব এমনকি জাতীয় চেতনার রূপ।

শৈশবের বৈশাখ ছিল অনাড়ম্বর অথচ পরিপূর্ণ। গ্রামের সাপ্তাহিক হাটই পহেলা বৈশাখে রূপ নিত এক প্রাণবন্ত মেলায়। বাবার হাত ধরে মেলায় যাওয়া ছিল আমাদের জন্য বছরের শ্রেষ্ঠ রোমাঞ্চ। দূর থেকে ভেসে আসা বাঁশির টান আর ঢোলের শব্দে তৈরি হতো এক জীবন্ত আবহ। মেলার এক প্রান্তে সারিবদ্ধভাবে বসত বিভিন্ন মিঠাইয়ের দোকান। বাকি অংশজুড়ে থাকত নানা পসরার মেলা। দূরদূরান্ত থেকে আসা দোকানিরা মাটিতে বসেই পসরা সাজাতেন। সেখানে বিক্রি হতো মাটির হাঁড়ি-পাতিল, হাতি, ঘোড়া আর পুতুল। কাঠের তৈরি ঢেঁকি এবং ঘোড়াও মিলত। নারীদের জন্য ছিল চুড়ি, ফিতা আর কিছু প্রসাধনসামগ্রী। বাঁশ ও বেতের ডালা-কুলা, বাঁশি, রঙিন হাতপাখা আর কাগজের ফুল মেলার আকাশকে বর্ণিল করে তুলত। তবে ছোট-বড় সবার মূল আকর্ষণ ছিল চক্রাকারে ঘোরা নাগরদোলার দিকে। হাতে গুঁজে দেয়া বাবার কয়েকটি কয়েন আর নাগরদোলার ঘূর্ণনই ছিল আমাদের কৈশোরের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। মেলা থেকে ফেরার পথে বাবার হাতে থাকত বড় একটি তরমুজ আর ঠোঙাভর্তি মচমচে জিলাপি। বাড়িতে এসে সেই তরমুজ সবার সঙ্গে ভাগ করে খাওয়ার যে তৃপ্তি, তা আজও আমার হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। খেলনা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা, বাঁশির সুরে মাতিয়ে তোলা উঠান-শৈশবের বৈশাখ ছিল এক নিরাভরণ সুখের নাম।

বৈশাখের সকাল মানেই ছিল ঘরের অন্দরমহলের এক অন্যরকম ব্যস্ততা। মা-চাচিদের রান্নাঘরে চলত বিশেষ আয়োজন। সকালের নাশতা হতো চিড়া-দই, মুড়ি-গুড়, খই, নারকেল দিয়ে। আজকের শহুরে জীবনে ‘পান্তা-ইলিশ’ যেভাবে আভিজাত্য বা আবশ্যিকতার তকমা পেয়েছে, তৎকালীন গ্রামীণ জীবনে তার এমন কৃত্রিম আধিপত্য ছিল না। দুপুরে থাকত সাধ্যমতো পোলাও, মাংস, ডিম, মাছ আর সবজির আয়োজন। লোকবিশ্বাস, বছরের প্রথম দিন ভালো কিছু খেলে সারা বছর ভালো কাটবে। বৈজ্ঞানিক যুক্তি যাই হোক, এ বিশ্বাস মানুষকে অসম্ভব আশাবাদী করত এবং ভেতরেও এক ধরনের মানসিক প্রাচুর্য তৈরি করত।

পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক ভিত্তিটি আগাগোড়াই কৃষিনির্ভর এবং প্রশাসনিক দূরদর্শিতার ফসল। মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৫৬ সালে সিংহাসনে আরোহণের পর লক্ষ করেন যে হিজরি বর্ষপঞ্জির সঙ্গে বাংলার ঋতুচক্রের মিল না থাকায় কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায়ে সমস্যা হচ্ছে। এ জটিলতা নিরসনে এবং রাজস্ব ব্যবস্থার সুবিধার্থে ১৫৮৪ সালে তিনি ‘ফসলি সন’ বা বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। মূলত কৃষিভিত্তিক সমাজ ও রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে চালু হওয়া এ ফসলি সনই আজকের বাংলা সনের রূপ, যার প্রথম দিনটি পহেলা বৈশাখ হিসেবে উদযাপন শুরু হয়। অর্থাৎ বৈশাখের সূচনা মূলত কৃষকের ঘাম, মাটির উর্বরতা এবং অর্থনৈতিক ন্যায়সংগতির এক অনন্য দলিল। হালখাতার রীতি ছিল পুরনো দেনা-পাওনার হিসাব চুকিয়ে নতুন আশায় পথচলার প্রতীক।

বর্তমানে বৈশাখ উদযাপনের বিরুদ্ধে কিছু উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর সংগঠিত বিরোধিতার চ্যালেঞ্জও সামনে রয়েছে। এক্ষেত্রে এ উৎসবকে অনেকে ধর্মবিরুদ্ধ আচরণ বলেও আখ্যায়িত করেন। তবে ভুলে গেলে চলবে না, পহেলা বৈশাখ কৃষিনির্ভর সমাজের চক্রাকার জীবনের ছন্দ মেনে তৈরি হওয়া এক ধর্মনিরপেক্ষ সময়চিত্র। ২০০১ সালের রমনা বটমূলে বোমা হামলার মতো ভয়াবহ ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে গেঁথে থাকলেও বাঙালির সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে তা স্তব্ধ করতে পারেনি। রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদে বিশ্বাসী হয়, তবে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক স্তরে নববর্ষের গুরুত্ব যথাযথভাবে তুলে ধরা উচিত। কালের বিবর্তনে বৈশাখ আজ জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। সাংস্কৃতিক চর্চা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, আলপনা, লাল-সাদা পোশাক এগুলো সবই বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। কিন্তু একই সঙ্গে এ উৎসবের কৃত্রিম বাণিজ্যিকীকরণও বেড়েছে। করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শনী, ব্যয়বহুল আয়োজনের কারণে বাংলা নববর্ষের উৎসবের সরলতা অধিকাংশ সময় আড়ালে পড়ে যায়। এজন্য প্রশ্ন জাগে, আমরা কী নববর্ষের সাংস্কৃতিক চেতনাকে ধারণ করেছি নাকি বাহ্যিক রূপটিকেই অবলম্বন করছি।

প্রজন্ম বদলায়, কিন্তু উৎসবের আবেগের সূত্র একই থাকে। এখনো নববর্ষ এলে আমরা সেভাবেই আসলে খুঁজতে চাই সবকিছু।

যে কৃষকের ফসলি সনের ওপর ভিত্তি করে এ উৎসবের শুরু, সেই কৃষকের মুখে হাসি না থাকলে বৈশাখ তার পূর্ণতা পায় না। এজন্য দেশে বাজার ব্যবস্থার অরাজকতা আর মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে কৃষক আজ দিশাহারা। নতুন বছরে আমাদের অন্যতম দাবি হওয়া উচিত, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। মাঠের ফসল যখন ঘাম ঝরিয়ে ঘরে আসে, তখন তার সঠিক দাম পাওয়া কৃষকের কেবল দাবি নয়, বরং অধিকার। ঐতিহ্য রক্ষার আগে মানুষকে রক্ষা করা এবং মেহনতি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই নববর্ষের প্রকৃত সার্থকতা। পহেলা বৈশাখ কেবল স্মৃতিচারণের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনারও দিন। সময় তার গতিতে চলবে, প্রজন্ম বদলাবে। কিন্তু বৈশাখ ফিরে আসবে প্রতিবারই নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে। আমাদের দায়িত্ব সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেয়া। কৃষির উন্নয়ন, কৃষকের অধিকার রক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক সংহতির মাধ্যমে।

মো. বশিরুল ইসলাম: কৃষিবিদ ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা