এ অঞ্চলের ১১টি ভাষাভাষী ১৩ জাতিগোষ্ঠীর অধিকাংশেরই নিজস্ব ঢঙে বর্ষবিদায় ও বরণ ঘিরে নানা আনুষ্ঠানিকতা এবং বর্ণাঢ্য আয়োজন থাকে। এসব আয়োজনকে ঘিরে যে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় তার শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিতও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। মূলত বিভিন্ন স্থানে মেলা আয়োজনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পণ্যের পশরা সাজানো হয়। প্রতি বছর রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য জেলা পরিষদের আয়োজনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট (উসাই) মাঠে পাঁচ-সাত দিনব্যাপী বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু, সাংক্রান, সাংলান ও পাতা উৎসব উপলক্ষে মেলার আয়োজন হয়। এ মেলায় পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন পোশাক, অলংকার, ঐতিহাসিকবাহী বস্ত্রসামগ্রী নিয়ে আসেন। বসানো হয় পাহাড়ি খাবারের স্টল। এসব মেলায় শুধু পার্বত্য অঞ্চলের মানুষই অংশ নেন এমন নয়। সারাদেশ থেকেই মানুষ বৈচিত্র্যময় আয়োজন দেখার উদ্দেশে ভিড় জমান এখানে। স্থানীয় গাইড থেকে শুরু করে পরিবহন খাতেও তাই থাকে বাড়তি চাপ। সেটা পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্ষবরণ উচ্ছ্বাসের পাঁচ-ছয়দিন একটানা অব্যাহত থাকে। এছাড়া স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট কিংবা আবাসন ব্যবস্থাগুলো রাখে আলাদা প্রস্তুতি। অধিকাংশ ভালো রিসোর্ট ও হোটেল শতভাগ বুকড থাকে। এমনকি স্থানীয় পরিসরেও থাকার ক্ষুদ্র উদ্যোগ দেখা যায়। মেলাজুড়ে প্রায় সব দিনেই থাকে সাংস্কৃতিক আয়োজন। এসব আয়োজনের জন্য ব্যস্ত সময় পার করতে হয় ডেকোরেটর সেবা থেকে শুরু করে মেলা আয়োজক কমিটিকেও। ঘুরতে আসা অনেকে মেলা থেকে সংগ্রহ করেন নানা স্যুভেনির।

বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো নতুন ও ঐতিহ্যবাহী পোশাক। এই সময়ে পাহাড়ি নারীদের তৈরি ‘কোমর তাঁত’ কাপড়ের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। চাকমাদের পিনন-হাদি, মারমাদের থামি এবং ত্রিপুরাদের রিনাই-রিসার বাজার এই সময় কয়েক কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। আগে কেবল নিজেদের ব্যবহারের জন্য পোশাক তৈরি হলেও, এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আধুনিক নকশায় এসব পোশাক বাজারে আসছে যা স্থানীয় তাঁতিদের জীবিকার প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে বাঁশ, বেত এবং কাঠের তৈরি হস্তশিল্পের বাজার বড় হচ্ছে। উৎসবের স্মারক হিসেবে পর্যটকরা হাতে তৈরি অলঙ্কার (যেমন: রূপার বা পুঁতির মালা) এবং গৃহস্থালির শৌখিন পণ্য কেনেন। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির স্থানীয় দোকানগুলোতে এই সময় বিক্রির পরিমাণ বছরের অন্য সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি থাকে। অন্যদিকে খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায়ও আলাদা আলাদাভাবে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান হয়। ১২ এপ্রিল চাকমা জাতিগোষ্ঠী ‘ফুল বিজু’, ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠী ‘হারি বৈসু’, তঞ্চঙ্গ্যারা ‘ফুল বিষু’ পালন করেন। এ সময় ফুল ব্যবসায়ীদের ব্যস্ত সময় পার করতেই হয়।

১৩ এপ্রিল চাকমাদের ‘বিজু’ (মূল বিজু), ত্রিপুরাদের ‘বৈসু মা’ ও তঞ্চঙ্গ্যাদের ‘বিষু’ উৎসব। এদিন ঘরে ঘরে চলে পাজনসহ বিভিন্ন ধরনের রান্নার আয়োজন, আতিথেয়তা ও আপ্যায়ন। পাজন বা পাঁচন হলো বিজু, বিষু ও বৈসুর মূল আয়োজন বা বিষয়বস্তু। বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে পাজন অবশ্যই থাকবে। পাজন এক ধরনের সবজিজাতীয় খাবার। পাজন রান্নার ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২০-৩০ পদের সবজির ব্যবহার করা হয়। পাজন রান্নার আয়োজন উৎসবের রূপ পাওয়ায় পাহাড়ি সবজি, বাঁশ কোড়ল এবং জুমের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। এ সময় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজি, শুটকি এবং অন্যান্য মশলার সরবরাহ বাড়ানোর তাগাদা বাড়ে। বিক্রি বাড়ায় দামও বাড়তে থাকে। ফলে বর্ষবরণের সময় স্থানীয়ভাবে যারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত তারা এ সময়টায় কিছু বাড়তি অর্থ আয় করতে পারেন। অন্যদিকে মারমা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ মূলত এদিনে সাংগ্রাই বাজার করে থাকেন, এটিকে ‘সাংগ্রাই জিহ’ বলেন তারা। এসব আয়োজনের অধিকাংশই কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

পাহাড়ে বর্ষবরণ উৎসবের আনুষ্ঠানিক সাঙ্গ ঘটে মারমাদের ‘রিলংপোয়ে’ বা জলকেলি উৎসবের মধ্য দিয়ে। এ উৎসবের আয়োজনে স্থানীয় বিভিন্ন পানীয়, মিষ্টিপণ্য এবং ফলের চাহিদা থাকে বেশি। সাংগ্রাই উৎসবের ক্ষেত্রে ধর্মীয় আয়োজন অনুসারে বুদ্ধ স্নান শেষ হওয়ার পর থেকেই গ্রামে গ্রামে শুরু হয় মারমাদের রিলংপোয়ে বা জলকেলি উৎসব। এ সময় ধর্মীয় নানা উপকরণ কেনাবেচা বাড়ে। সাংগ্রাই জলকেলি উৎসবে মারমা তরুণীরা ‘থামি’ ও তরুণরা মারমা লুঙ্গি পরিধান করে উৎসবে যোগ দেন। নানা উদ্যোগ নেয়ায় এখন থামি ও মারমা লুঙ্গির নকশাতেও এসেছে ফিউশন। সাংগ্রাই জলকেলি উৎসবের মধ্য দিয়ে সাঙ্গ হয় বৈচিত্র্যময় আনুষ্ঠানিকতা।