পহেলা বৈশাখ মূলত বাঙালির একটি সর্বজনীন উৎসব, যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে শত শত বছর ধরে পালিত হয়ে আসছে। এর গোড়াপত্তন হয়েছিল মূলত কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে। সে সময় এ অঞ্চলে অনেক দরিদ্র্য ছিল এবং মানুষ পুরোপুরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল। নবান্নে কৃষকদের ঘরে যখন রবি শস্য ও নতুন ধান উঠত, তখন তাদের হাতে টাকা আসত। সারা বছর দোকান থেকে তারা যে পণ্য বাকি নিত, এ সময়ে সে বকেয়া পরিশোধ করতে দোকানিরা ‘হালখাতা’ করতেন। এ আয়োজনকে কেন্দ্র করেই বৈশাখী উৎসব ও অর্থনীতির যাত্রা শুরু। আজ সে হালখাতার প্রথা হয়তো সেভাবে নেই, কিন্তু এটি এখন একটি বিশাল সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উৎসবে রূপ নিয়েছে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) শিল্প থেকে শুরু করে বড় বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ডের জন্য একটি বড় ভিত্তি।

ফ্যাশন বা পোশাক খাতের ওপর পহেলা বৈশাখের প্রভাব কতটা গভীর?

বর্ষবরণ এখন আর ১০০ বছর আগের মতো মিষ্টি বিতরণ বা মাটির তৈরি হাতি-ঘোড়া, বাতাসা বা হাতপাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সবার অংশগ্রহণে এটি একটি বড় ব্যবসায়িক ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈশাখ এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাশন উৎসবে পরিণত হয়েছে। আগে হয়তো মানুষ কেবল পাঞ্জাবি বা শাড়ির কথা ভাবত, কিন্তু এখন এটি পূর্ণাঙ্গ ‘লাইফস্টাইল’ সেক্টরকে প্রভাবিত করছে। মানুষ ব্যক্তিগত, পারিবারিকভাবে অনুষ্ঠান করছে, বিভিন্ন গ্রুপ বা সংগঠন করে বৈশাখ পালন করছে আবার উদযাপনের একটা করপোরেট কালচারও তৈরি হয়েছে। পোশাকের পাশাপাশি খাবার-দাবার, গিফট আইটেম ও মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্যের চাহিদাও অনেক বেড়েছে। বর্তমানে কুমার থেকে শুরু করে হস্তশিল্পের মতো কুটির শিল্পের কারিগর সবাই এ সময়ে ব্যস্ত থাকেন, যা একদম মাঠ পর্যায়ে টাকার প্রবাহ নিশ্চিত করে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতে তাই এটি আরো বেশি অবদান রাখে।

কয়েক বছর ধরে বৈশাখ ও রমজান একসঙ্গে পড়ছে। আবার বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বা জ্বালানি সংকট আপনাদের ব্যবসায় কোনো প্রভাব ফেলছে কি?

আগে বৈশাখ অনেক বড় পরিসরে উদযাপিত হওয়ায় বিক্রিও অনেক বেশি ছিল। করোনার কারণে দুই বছর এবং রমজানের কারণে গত কয়েক বছর তা কিছুটা ম্লান ছিল। করোনার অভিঘাত-পরবর্তী চার-পাঁচ বছর ধরে বৈশাখ উৎসবটি রমজানের ভেতরে পড়েছিল। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের কারণে তখন মানুষের মনোযোগ ইবাদত ও ঈদের কেনাকাটার দিকে বেশি ছিল। তবে বৈশাখ উদযাপনের সে আমেজটা নেই। কেননা এবারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো কিছুদিন আগেই ঈদ শেষ হয়েছে। ঈদের কেনাকাটায় মানুষের একটি বিশাল বাজেট খরচ হয়ে যায়। অনেকে গত মাসের বেতনের একটি অংশও ঈদে ব্যয় করে ফেলেছেন, ফলে এখন গ্রাহকদের মধ্যে একটি ‘সংকোচন নীতি’ বা কম খরচ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

করোনা মহামারীর পর বাংলাদেশের পোশাক খাত ও গার্মেন্টস সেক্টর বেশ ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে সবকিছুর ওপর একটা প্রভাব পড়েছে, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব ছোট-বড় সব ফ্যাক্টরির ওপর পড়ে। বাজারে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা বিরাজ করায় অনেক ফ্যাক্টরি আপাতত নতুন কোনো অর্ডারে যাচ্ছে না। এছাড়া বর্তমানে মার্কেট ও শপিং কমপ্লেক্সের সময়সীমা দুপুর ১২টা থেকে রাত ৭-৮টা পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। ফলে মানুষের যাতায়াত সংরক্ষিত হয়েছে। আবার তেলের প্রাপ্যতার সমস্যার কারণে চলাচল কমেছে। অনেক মানুষের পকেটে টাকা থাকলেও প্রয়োজনের বাইরে তারা মার্কেটে যেতে চাচ্ছে না। তবে আমরা আশাবাদী পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কিংবা নতুন সরকারের সঠিক পরিকল্পনায় অর্থনীতি আবার দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে।

ঈদ বা বৈশাখের মতো উৎসবে গ্রাহক টানতে আপনাদের বিশেষ প্রস্তুতি কী থাকে?

আমরা সবসময় গ্রাহকের চাহিদাকে গুরুত্ব দিই। বাংলাদেশে শীত ও রমজানের ঈদের পর বৈশাখই হচ্ছে সবচেয়ে বড় মার্কেট। তবে এখন বৈশাখ উদযাপনের ধরন আধুনিক হচ্ছে; মানুষ এখন আতশবাজি, বারবিকিউ বা বিভিন্ন ফাংশনের মাধ্যমে এটি পালন করছে। আগামী বছরগুলোয় বৈশাখ রমজান থেকে আরো দূরে সরে আসবে, তখন এর জাঁকজমক আরো বাড়বে। আমাদের পরিকল্পনা হলো দেশীয় ঐতিহ্যের এ পোশাকগুলো প্রবাসীদের কাছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে আরো বেশি পরিচিত করানো। আমাদের দেশীয় পোশাক খাতের মান এখন অনেক উন্নত এবং আমরা দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয় ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক মানের এক্সপোজার পাওয়ার চেষ্টা করছি। আশা করছি সামনের বছরগুলোয় সাধারণ মানুষ আরো বেশি আনন্দ ও উদ্দীপনার সঙ্গে এ উৎসব উদযাপন করতে পারবে।

ইনফিনিটিতে আমাদের বৈশাখী কালেকশনে শাড়ি, পাঞ্জাবি ও বাচ্চাদের পোশাকের বিশাল সমাহার থাকে। বিশেষ করে ‘ফ্যামিলি কম্বো’ বা বাবা-ছেলে ও মা-মেয়ের একই ধরনের ম্যাচিং পোশাকের প্রতি এখন মানুষের আগ্রহ অনেক বেশি। এছাড়া বর্তমানে কেবল পোশাক নয়, বিভিন্ন গিফট আইটেমের প্রতিও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।