এ উৎসবের শেকড় যেমন ইতিহাসে প্রোথিত, তেমনি এর শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়েছে সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্তরে। কিন্তু এ নববর্ষের উৎপত্তি, বিবর্তন ও বর্তমান রূপ নিয়ে রয়েছে নানা মতভেদ ও বিতর্ক, যা অবশ্য আমাদের ইতিহাসচর্চার বৈচিত্র্যকেই তুলে ধরে।
একাধিক মত প্রচলিত বাংলা সনের উৎপত্তি নিয়ে। কেউ কেউ মনে করেন প্রাচীন বাংলার রাজা শশাঙ্ক তার শাসনামলে বাংলা সনের সূচনা করেছিলেন। তবে এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ অপ্রতুল। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, বাংলা সনের বর্তমান রূপের প্রবর্তন ঘটে মোগল সম্রাট আকবরের আমলে। তার শাসনকালে প্রশাসনিক প্রয়োজন, বিশেষ করে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে চন্দ্রকলার পরিবর্তে সৌরভিত্তিক একটি বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়। নানা গবেষণা, জ্যোতির্বিদ্যার প্রয়োগ ও সামাজিক বাস্তবতা মিলেমিশে তা আজ এক অনন্য সময়পঞ্জি।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইসলামী হিজরি সনের সূচনা হয় ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে, হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঘটনাকে ঘিরে। এ সন সম্পূর্ণরূপে চন্দ্রভিত্তিক হওয়ায় মাস ও বছরের দৈর্ঘ্য নির্ভর করত চাঁদের কলাবদলের ওপর। ফলে কৃষিনির্ভর সমাজে এটি বাস্তবিক সমস্যার সৃষ্টি করত। কারণ ফসল উৎপাদন, ঋতুচক্র ও কর আদায়ের সময়সূচির সঙ্গে এ চান্দ্র পঞ্জিকার সামঞ্জস্য ছিল না। এ সমস্যার সমাধানে আকবরের দরবারের প্রধান জ্যোতির্বিদ ফতেউল্লাহ শিরাজির নেতৃত্বে চান্দ্র পঞ্জিকার পরিবর্তে সৌরভিত্তিক বাংলা সনের প্রবর্তন ঘটে।
এরপর থেকে মাস গণনা শুরু হয় সূর্যের গতিপথ ও দিন-রাত্রির নিয়ম অনুযায়ী। এতে কৃষি মৌসুমের সঙ্গে পঞ্জিকার সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পারস্যে প্রচলিত সৌরবর্ষ ও ‘নওরোজ’ উৎসবের ধারণা থেকেও এ সংস্কারে প্রভাব পড়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
বাংলা সনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর ছিল বছরের সূচনাকাল পরিবর্তন। আগে অগ্রহায়ণ মাস থেকে বছরের শুরু হতো, যা ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই একে বলা হতো ‘ফসলি সন’। কিন্তু হিসাব-নিকাশ ও রাজস্ব আদায়ে সুবিধার জন্য আকবর বৈশাখকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে নির্ধারণ করেন। ফলে বাংলা সন আরো কার্যকর ও ব্যবহারিক হয়ে ওঠে।
বাংলা সনের এ বিবর্তন কেবল একটি বর্ষপঞ্জিকা সংস্কারের ইতিহাস নয়; এটি বাঙালির জীবনযাত্রা, কৃষি অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আকবরের এ উদ্যোগ প্রমাণ করে সময়কে বুঝে তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার মধ্যেই টিকে থাকে একটি সমাজের অগ্রগতি। আজ যখন আমরা পহেলা বৈশাখ উদযাপন করি, তখন সামনে আসে সে ঐতিহাসিক প্রজ্ঞা ও বাস্তবতার প্রতিফলন; যা শতাব্দী আগে এক শাসকের দূরদর্শিতায় গড়ে উঠেছিল।
বাংলা নববর্ষের এ ঐতিহাসিক ভিত্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর সাংস্কৃতিক রূপান্তরও উল্লেখযোগ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নববর্ষ একটি ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে অসাম্প্রদায়িক উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নববর্ষকে একটি নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক রূপ দেন। তার গান ‘এসো হে বৈশাখ’ আজও নববর্ষ উদযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা নতুনের আহ্বান ও পুরনোর গ্লানি মোচনের প্রতীক।
গ্রামবাংলায় বৈশাখের আবহ আরো ভিন্নতর। সেখানে এটি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের একাত্মতার উৎসব—নতুন ফসল, পান্তা-ইলিশ, পিঠা-পুলি, আর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলনমেলা। শহুরে জীবনে যেখানে যান্ত্রিকতা প্রাধান্য পায়, সেখানে বৈশাখ যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। তবে এ উৎসবের পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। বিভিন্ন সময় ধর্মীয় গোঁড়ামি, রাজনৈতিক অপপ্রচার ও সহিংসতা এ উৎসবকে বাধাগ্রস্ত করেছে। রমনার বটমূলে বোমা হামলার মতো ঘটনাও ঘটেছে, যা বাঙালির চেতনাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সব বাধা অতিক্রম করে পহেলা বৈশাখ আজও স্বমহিমায় উদযাপিত হচ্ছে। এটাই বাঙালির শক্তি।
পহেলা বৈশাখ আজ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। এটি এমন একটি দিন, যখন মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেকে বাঙালি হিসেবে অনুভব করে। নতুন প্রজন্মের কাছে এ উৎসব কেবল আনন্দের নয়, বরং নিজের শেকড় ও সংস্কৃতিকে জানার একটি সুযোগ।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে যখন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও পরিচয়ের সংকট বাড়ছে, তখন পহেলা বৈশাখ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আমরা কারা, আমাদের ঐতিহ্য কী এবং আমাদের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে। এ উৎসব কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও বটে।
নতুন বছরের প্রাক্কালে তাই প্রত্যাশা পহেলা বৈশাখ শুধু উৎসবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি হয়ে উঠবে সাম্য, সম্প্রীতি ও মানবিকতার এক স্থায়ী প্রতীক। ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা’—এ চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বাঙালি এগিয়ে যাক এক নতুন সম্ভাবনার পথে।
ওবায়দুল্লাহ সনি: প্রধান সহসম্পাদক, বণিক বার্তা










