মেটামরফোসিস বলতে আমরা বুঝি, সবসময় পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের কাজের ধরনকে মানিয়ে নেয়া। শুধু মানিয়ে নেয়া নয়, এক পর্যায়ে সেই পরিবর্তন একটা গুণগত রূপান্তরে পৌঁছায়। যেমন শুঁয়োপোকা থেকে হঠাৎ প্রজাপতি বের হয়। আমরা আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটা কৌশলগত পরিকল্পনা করেছি। সেখানে একটি ভিশন নিয়ে এগোচ্ছি। এতদিন মাঠপর্যায়ে যে পরিবর্তনগুলো আমরা করেছি, সেগুলোর ধারাবাহিকতায় এখন বড় ধরনের রূপান্তরের সময় এসেছে বলে আমাদের মনে হয়। আমরা এখন টেক-অফ করতে চাই।

এতদিন আমরা যেটা করতাম, সেটা ছিল ‘‌ডেট-ইনস্ট্রুমেন্ট’ ভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম। এর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এখন সেই জায়গা থেকে সরে এসে দারিদ্র্য বিমোচনের প্রচলিত কাঠামো থেকে মানুষকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাওয়া নিয়ে কাজ করছি। সেই অনুযায়ী আমরা আমাদের কাজগুলো গঠন ও পুনর্গঠন করছি। এজন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছি। আমাদের কাজ এখন তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

ডিসেন্ট এমপ্লয়মেন্ট (কার্যকর কর্মসংস্থান), রিস্ক মিটিগেশন (ঝুঁকি কমানো) ও মানুষের সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা। আমরা প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রতিষ্ঠান। এখানে ‘প্রতিষ্ঠান’ বলতে আমরা শুধু অর্গানাইজেশন বুঝি না—বরং এমন একটি মূল্যবোধভিত্তিক কাঠামো বুঝি, যেটা টেকসইভাবে সেবা দিতে পারে।

আমাদের যে প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে, সেগুলোর মূল ভিত্তি হচ্ছে—এ দেশের নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে সেবা দেয়া। তাদের টেকসইভাবে আয় বাড়ানো, সম্পদ সৃষ্টি করা, উন্নতির পথে এগিয়ে নেয়া এবং ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়ানো। এ বিষয়গুলোতেই আমরা কাজ করি।

এ কাজগুলো করার জন্য মাঠপর্যায়ে যে মূল্যবোধভিত্তিক এবং টেকসই প্রতিষ্ঠান দরকার, সেগুলো গড়ে তুলতে আমরা অর্থায়ন থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন—সব ক্ষেত্রেই কাজ করি। তাই পিকেএসএফকে বলা যায় একটি ‘‌ইনস্টিটিউশন-বিল্ডিং অর্গানাইজেশন’, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করে।

বৈশাখকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে এ নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা কেমন? এ অর্থনীতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বৈশাখ একটি বড় উৎসব, যা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এ ধরনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা যায়। পহেলা বৈশাখের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এ সময় আকস্মিকভাবে চাহিদা বেড়ে যায়। রঙতুলি থেকে শুরু করে পোশাক-আশাক, মিষ্টান্নসহ নানা ক্ষেত্রেই বিশাল চাহিদা তৈরি হয়। কিন্তু এ চাহিদা পূরণের জন্য অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হয়। এ পণ্যগুলো সাধারণত বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারে না। এগুলো মূলত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই তৈরি করে। এ ধরনের উৎসব অর্থনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও ন্যায্যতাভিত্তিক বণ্টন। এখানে যে আয় তৈরি হয়, তা অনেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে একটি শক্তিশালী ‘‌মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ও কাজ করে। ব্যবসায়ী, পরিবহন খাত—সবকিছুই এতে যুক্ত হয়। ফলে অল্প সময়ের জন্য হলেও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের আকার অনেক বেড়ে যায়।

পিকেএসএফের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখানে কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?

এ সময় অর্থনীতিতে শত শত এমনকি হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এ লেনদেনগুলোকে যদি ডিজিটাল করা যায়, তাহলে এগুলো গ্রহণযোগ্য আর্থিক ডেটায় পরিণত হবে। এর ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তির যোগ্যতা অনেক বাড়বে। এতে তারা ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থা থেকে সহজে অর্থায়ন পেতে পারবে এবং কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করতে পারবে। আমরা তাদের সে ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছি।

আরেকটি বিষয় হলো, এ ধরনের ছোট উদ্যোক্তাদের পণ্যগুলোকে ব্র্যান্ডিং করা দরকার। বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বিদেশে থাকে। এ ডায়াসপোরা মার্কেটে আগে থেকেই পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে মার্কেটিং করা যেতে পারে। যদি বৈশাখের এক মাস আগে থেকেই পণ্যগুলো ওই বাজারে পৌঁছে দেয়া যায়, তাহলে উদ্যোক্তারা আরো ভালো দাম পাবে। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা বাংলাদেশীরা তাদের সাংস্কৃতিক বন্ধনটাও ধরে রাখতে পারবে। দেশের সঙ্গে সংযোগটা আরো শক্তিশালী হবে। এ জায়গাগুলোতে আমাদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ করার বড় সুযোগ আছে।

বৈশাখকে কেন্দ্র করে কি ঋণের চাহিদা বাড়ে?

হ্যাঁ, এ সময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের স্বল্পমেয়াদি ঋণের প্রয়োজন হয়। এ ধরনের কার্যক্রমের বৈশিষ্ট্য হলো—হঠাৎ করে চাহিদা বাড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সাধারণত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের স্বল্পমেয়াদি ঋণ দেয় না। এখানে তাদের প্রডাক্টগুলো পুনর্গঠন ও সাজানোর সুযোগ আছে। একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ঋণগ্রহীতার বিশ্বাসযোগ্যতা বুঝতে পারে, সেজন্য ডিজিটাল লেনদেন তথ্য দরকার। কেনা-বেচা যদি ডিজিটাল উপায়ে হয়, তাহলে সেই তথ্য দেখেই আর্থিক প্রতিষ্ঠান সহজে আস্থা পেতে পারে।

মৌসুমভিত্তিক এ ব্যবসাগুলোকে কীভাবে টেকসই রূপান্তর করা যায়?

পহেলা বৈশাখ প্রতি বছরই আসে। এ পুনরাবৃত্তির কারণে এটাকে পরিকল্পিতভাবে অর্থনীতির অংশে পরিণত করা সম্ভব। শুধু উৎসবকেন্দ্রিক না থেকে আমরা একে আরো বিস্তৃতভাবে দেখার চিন্তা করছি। এ ধরনের উৎসবকে কেন্দ্র করে কিছু পণ্যের হঠাৎ চাহিদা তৈরি হয়। সেই চাহিদা মেটাতে গিয়ে আমাদের শাড়ি, কাপড়, পাঞ্জাবির ডিজাইন ও বৈচিত্র্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কারিগররা নতুন নতুন পণ্য তৈরি করছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ পরিবর্তনটা চলমান। আজ থেকে ৫০ বছর আগে যে ধরনের পণ্য তৈরি হতো, এখন আর সেগুলো হয় না। এটা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মধ্যেই যদি আমরা ডিজাইন উন্নত করতে পারি, পণ্যের গুণগত মান বাড়াতে পারি, তাহলে এগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে বিশ্ববাজারেও জায়গা করে নিতে পারে। বিশ্বের অন্য দেশেও এমন উদাহরণ আছে। যেমন মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, এমনকি যারা মেক্সিকান না, তারাও তা পরছে। আমাদের দেশের পাঞ্জাবিও একসময় এভাবে আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় হতে পারে, যদি আমরা ডিজাইন ও গুণগত মানে উন্নতি করতে পারি।

আমাদের দেশে আরো অনেক বৈচিত্র্যময় পণ্য আছে, বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব পণ্য। মৃত্তিকা দিয়ে তৈরি অলংকারসহ নানা ধরনের হস্তশিল্প এখন নতুনভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্বে এখন একটি প্যারাডাইম শিফট হচ্ছে। ‘ইকোলজিক্যালি ফ্রেন্ডলি’ পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এ সুযোগে যদি আমরা পণ্যের ডিজাইন উন্নত করতে পারি এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করতে পারি, তাহলে বিশ্ববাজারে দীর্ঘমেয়াদে অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।

গ্রামীণ অর্থনীতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দক্ষতা উন্নয়নে পিকেএসএফ কী ধরনের ভূমিকা পালন করছে?

শুরু থেকেই পিকেএসএফ এ ক্ষেত্রে কাজ করছে। গত প্রায় ৩৫ বছরে আমরা প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এখন আমরা এ প্রশিক্ষণের সঙ্গে প্রযুক্তিকে আরো বেশি যুক্ত করছি, যাতে উদ্যোক্তারা প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি আমরা তাদের বিভিন্ন ধরনের সনদ নেয়ার জন্য সহায়তা করছি। কারণ বিশ্ববাজারে যেতে হলে আন্তর্জাতিক মানের সনদ প্রয়োজন।

বিশ্বে অনেক নিশ মার্কেট ও বুটিক মার্কেট আছে—যেগুলো ছোট হলেও উচ্চমূল্যের বাজার। যেমন রিসাইকেলড পণ্য, ন্যাচারাল ডাই—এসবের আলাদা বাজার আছে। এগুলো ছোট ছোট হলেও একত্রে একটি বড় বাজার তৈরি করে। চীন এ ধরনের বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে উচ্চমূল্যের ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্য বিক্রি করছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা কাজ করছি।

এ পর্যন্ত পিকেএসএফ প্রায় ১৫০টির মতো পণ্যের সনদ প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেছে। পাশাপাশি আমরা ঢাকার শ্যামলীতে একটি মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ প্রমোশন সেন্টার স্থাপন করছি। সেখানে মাইক্রো উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শন, বাজার সংযোগ এবং উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা হবে। আমাদের লক্ষ্য, আমরা পথ দেখাব, অন্যরাও এগিয়ে আসবে এবং উদ্যোক্তারা সাহস পাবে।