এসএমই খাতের সার্বিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো। তবে খুব বেশি ভালো হয়তো বলা যাবে না, কিন্তু আমরা ভালোর দিকেই এগোচ্ছি। আমরা অনেক কর্মসূচি গ্রহণ করছি; সরকার গ্রহণ করছে, বেসরকারি খাত থেকেও নেয়া হচ্ছে। সবার সম্মিলিত উদ্যোগের ফলে এসএমই খাত এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এর গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় নয়। যে মাত্রায় যাওয়ার কথা ছিল বা উদ্যোক্তাদের যে দাবি, সে পর্যায়ে এখনো পৌঁছতে পারেনি। এটা আসলে অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। অনেকগুলো বিষয় এখানে কাজ করে।

ফাউন্ডেশন ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। আগের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থানে আছে এখন। এখন আমরা যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি উদ্যোক্তাকে সেবা দিতে পারছি। গত অর্থবছরে আমরা ৪৬ হাজার উদ্যোক্তাকে সেবা দিয়েছি, আগের বছর যা ছিল ৩৪ হাজার। আমাদের কাছ থেকে তারা বিভিন্ন ধরনের সেবা পাচ্ছে। সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন, অর্থায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও উদ্ভাবন সেবাসহ সবকিছু মিলিয়ে আগের তুলনায় এসএমই ফাউন্ডেশনের অবস্থান এখন বেশ ভালো।

বাংলাদেশে অর্থনীতিতে উৎসবকেন্দ্রিক কার্যক্রমের বড় একটি অংশ আছে। অনেকে বলেন, ঈদুল ফিতরের পর বৈশাখকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আর্থিক কার্যক্রম দেখা যায়। এ কার্যক্রমকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আমাদের দেশে উৎসবকেন্দ্রিক অনেক অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ঈদ, পহেলা বৈশাখ, পূজা বা বিভিন্ন আঞ্চলিক উৎসব। এগুলোর মাধ্যমেও অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। এর প্রতিফলন আমরা দেখি মেলাগুলোর মাধ্যমে। গত রমজান মাসজুড়েই বিভিন্ন জায়গায় মেলার আয়োজন ছিল। সেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা অংশ নিয়েছেন, তাদের পণ্য নিয়ে এসেছেন, বিক্রি করেছেন। এতে পণ্যের প্রচার-প্রসার হয়েছে, তারা লাভবান হয়েছেন।

এখনো বৈশাখকে কেন্দ্র করে আমরা কার্যক্রম চালাচ্ছি। এরই মধ্যে রাঙ্গামাটিতে একটি আঞ্চলিক মেলা করেছি। সিলেটেও ১১ তারিখে আরেকটি আঞ্চলিক বা বিভাগীয় মেলা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আমরা সপ্তাহব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করছি। এসব মেলা ও উৎসবের মাধ্যমে বড় আকারের অর্থনৈতিক লেনদেন হয়। কাঠামোগতভাবে এ হিসাব না থাকার কারণে আমরা হয়তো এ লেনদেনের আকার জানি না। কিন্তু এ সময় বড় অংকের লেনদেন পরিচালিত হয় অর্থনীতিতে।

বৈশাখী অর্থনীতির বড় একটি অংশ গ্রামীণ অর্থনীতি। এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে শহরের উদ্যোক্তাদের একটি পার্থক্য আছে। শহরের উদ্যোক্তারা প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন, মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং, প্যাকেজিংসহ যেসব সুযোগ-সুবিধা পান, গ্রামীণ উদ্যোক্তারা সেখানে অনেক পিছিয়ে থাকেন।

এখানেই মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ মেলা বা প্রদর্শনীতে গ্রামীণ উদ্যোক্তারা শহরের উন্নত উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পান। এটাকে আমরা একটি মিলনমেলা বলতে পারি। এ দায়িত্বটাই পালন করে এসএমই ফাউন্ডেশন—যাতে গ্রামীণ উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা, তরুণ উদ্যোক্তারা বেশি করে অংশ নিতে পারেন। এর মাধ্যমে উন্নয়নের ধারাটি গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয় এবং আমরা সেই কাজটি করে যাচ্ছি।

কিছুদিন আগে আমরা জাতীয় এসএমই পণ্য মেলার আয়োজন করেছিলাম, যেখানে প্রায় ৪০০ উদ্যোক্তা অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ৩৭৭ জন বলেছেন তাদের বিক্রি ভালো হয়েছে, আগের তুলনায় বেশি ক্রয় আদেশ পেয়েছেন এবং পণ্যের প্রচার-প্রসার বেড়েছে।

বৈশাখী অর্থনীতির বড় একটি অংশই পরিচালিত হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তাদের দিয়ে; যাদের সঙ্গে এসএমই ফাউন্ডেশন নিবিড়ভাবে কাজ করে। এ বাজারের আকারটা কেমন হতে পারে বলে মনে করেন আপনি?

সংখ্যা দিয়ে বাজারের আসল চিত্রটা এ মুহূর্তে বলা একটু কঠিন। তবে আমরা যে ফিডব্যাক পাই এবং যা দেখি, তাতে বোঝা যায়, এ সময়ে বাজারে বড় ধরনের বেচাকেনা হয় এবং তা অর্থনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সরকারও লাভবান হয়। কারণ বেচাকেনার মাধ্যমে তারা সরকারকে কর, মূসক দিচ্ছে। এছাড়া উৎপাদন, বেচাকেনা ও মানুষের ভোগ বৃদ্ধির কারণে অর্থনীতিতে যে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়, এসবই ইঙ্গিত করে যে এ বাজারের আকারটা বেশ বড়।

বৈশাখী অর্থনীতি সম্প্রসারণে আরো কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া যায়?

বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ একটি আনন্দঘন উৎসব। মানুষ ঈদ বা পূজার মতোই, বরং অনেক ক্ষেত্রে আরো বেশি আগ্রহ নিয়ে এ উৎসবের জন্য অপেক্ষা করে। আমি বলব, নববর্ষকে কেন্দ্র করে আরো বেশি উৎসব ও মেলার আয়োজন করা উচিত। এতে উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়বে। এখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, পণ্য বিক্রির ভালো ব্যবস্থা করতে হবে এবং উদ্যোক্তারা যাতে কম খরচে অংশ নিতে পারেন—সেদিকে নজর দিতে হবে। তাহলে আরো বেশি উদ্যোক্তা আরো বেশি পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। এতে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও লাভবান হবে।