চট্টগ্রামের উদ্যোক্তা খলিলুর রহমান। পড়াশোনা শেষে আকৃষ্ট হন ব্যবসার প্রতি। আমদানি-রফতানির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে ব্যবসার জটিল বিষয়গুলো আয়ত্তে এনে প্রতিষ্ঠা করেন কেডিএস গার্মেন্টস। খলিলুরের প্রথম অক্ষর থেকে ‘কে’, স্ত্রী দেলোয়ারা থেকে ‘ডি’ ও বড় ছেলে সেলিম রহমান থেকে ‘এস’ নিয়ে রাখা হয় গ্রুপটির নাম। প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ একাধিকবার প্রেসিডেন্ট গোল্ড ট্রফি অর্জন করেছে। গোল্ড মেডেল পেয়েছে এএমসি টার্গেট ইউএসএর কোয়ালিটি গার্মেন্টস এক্সপোর্টার হিসেবে। তৈরি পোশাক রফতানি খাতে কোয়ালিটির শ্রেষ্ঠত্বের জন্য স্পেনের মাদ্রিদে গোল্ডেন ট্রফি ফর কোয়ালিটি ও বাংলাদেশের জাতীয় রফতানি ট্রফিসহ দেশী-বিদেশী শতাধিক পুরস্কার রয়েছে কেডিএসের ঝুলিতে।
খলিলুর রহমান গার্মেন্টস শিল্পে পদার্পণ করেন ১৯৮৩ সালে। এখন তার সেই প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ১০টি গার্মেন্টসের মধ্যে অন্যতম। মূলত গৃহসজ্জার যাবতীয় টেক্সটাইল পণ্য প্রস্তুত, সরবরাহ ও রফতানির মাধ্যমে টানা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আরএমজি সেক্টরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে চট্টগ্রামের এ প্রতিষ্ঠান। দেশের সবচেয়ে পুরনো গার্মেন্টস পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কেডিএস গ্রুপের অধীনে রয়েছে কেডিএস গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ক্যানভাস গার্মেন্টস প্রাইভেট লিমিটেড, কেডিএস অ্যাপারেলস লিমিটেড, কেডিএস ফ্যাশন লিমিটেড ও কেডিএস আইডিআর লিমিটেড। এর মধ্যে ক্যানভাস প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০১ সালে, অ্যাপারেল ২০০৩, ফ্যাশন ২০০৯ ও আইডিআর ২০১৩ সালে হয়। গার্মেন্টস পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি টেক্সটাইল, অ্যাকসেসরিজসহ পোশাক খাতের আরো একাধিক খাতে বিনিয়োগ করেছে কেডিএস গ্রুপ।
প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাসের লক্ষ্যে কেডিএস প্রতি বছর প্রায় ৯১ হাজার গ্যালন বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে, যা প্রতিষ্ঠানটির টয়লেট ও টেক্সটাইল ওয়াশিংয়ের কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। এমনকি ট্রিমস অ্যান্ড প্যাকেজিং উৎপাদনে যেসব কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে তা শতভাগ পুনর্ব্যবহার উপযোগী ও পরিবেশবান্ধব। কেডিএসের মূল কাঁচামালের উৎস হচ্ছে অর্গানিক কটন বা জৈব সুতা। অর্গানিক কটন কীটনাশকমুক্ত এবং শতভাগ পুনর্ব্যবহারযোগ্য। তাই এটি মাটি, মানুষ, পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমের কোনো ক্ষতি করে না। এছাড়া কেডিএস চূড়ান্ত পণ্য তৈরিতে পুনর্ব্যবহৃত কটন ব্যবহার করে, যা মোট টেক্সটাইল বর্জ্যের পরিমাণ অনেকাংশে হ্রাস করে। প্লাস্টিক পণ্যগুলোর কমপক্ষে ৫০ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়। পরিবাহিত বায়ু ও শব্দের মান সরকারি সংস্থা দিয়ে পরিমাপ করা হয় বছরে অন্তত দুবার। গ্রিনহাউজ গ্যাস, ওজোন হ্রাসকারী পদার্থ প্রস্তুত ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব কমানো হয়। আর এসব কারণে কেডিএস গ্রুপ বিশ্বের প্রায় সব সার্টিফিকেটই অর্জন করেছে।
বর্তমানে কেডিএস গ্রুপের গার্মেন্টস সেক্টরে কর্মরত রয়েছে,ৃ কমপক্ষে সাড়ে ২৫ হাজার কর্মী। মূলত তারা নিট, ওভেন, জ্যাকেট, ওয়াশিং, এমব্রয়ডারি, কুইল্টিং ইত্যাদি সেক্টরে দক্ষতার মাধ্যমে দ্রুত ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করে ক্রেতার সন্তুষ্টি অর্জন করেছে। সেই সঙ্গে পণ্য উৎপাদনের ধারাও অব্যাহত রেখেছে। ১৪টি পশ্চিমা দেশের প্রায় অর্ধশতাধিক শীর্ষ ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি করছে তারা। এর মধ্যে এএসডিএ, এইচঅ্যান্ডএম, টার্গেট, ওয়ালমার্ট, টেসকো উল্লেখযোগ্য। প্রতি বছর কেডিএস বিশ্বব্যাপী ৬০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক পণ্য রফতানি করে।
চট্টগ্রামের গার্মেন্টস খাতের শীর্ষ এ প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক মন্দা পরিস্থিতির মধ্যেও সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখেছে করপোরেট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। শ্রমিক কল্যাণ ও শ্রমিক সন্তুষ্টির মাধ্যমে পূরণ করে যাচ্ছে ক্রেতার চাহিদাও। বাংলাদেশের পোশাক খাত বিশেষত রানা প্লাজা ধসের ঘটনার পর নানান জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করেছে কেডিএস। তাছাড়া আমদানিকারকরা উৎপাদক দেশ ও উৎপাদন কারখানার পরিবেশ দূষণ, কার্বন নিঃসরণসহ পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সার্বিক কমপ্লায়েন্স বিবেচনায় নেয়। সবকিছু পূরণ করেই পণ্য রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে ধরে রাখার দিকেই মনোযোগী ছিল কেডিএস গ্রুপ। যার কারণে প্রতি বছরই তাদের পোশাক রফতানির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।










