নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি এলাকায় প্রায় নয় বিঘা জমির ওপর ১৯৯৮ সালে গড়ে ওঠে ‘ফতুল্লা অ্যাপারেলস’। সবুজঘেরা এ কারখানাটিকে যে কেউই প্রথম দেখায় রিসোর্ট ভেবে ভুল করবেন। চারপাশ পরিপাটি করে সাজানো। কারখানা ভবনের পর ছোট মাঠ। চারপাশে শোভা পাচ্ছে নানা রকম ফুল গাছ। এক পাশে সারি সারি নারকেলগাছ। তারপর বড় একটা পুকুর, যেখানে ঘুরে বেড়ায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। নান্দনিক ও খোলামেলা ভবনের অধিকাংশ কক্ষে দিনের বেলায় প্রয়োজন হয় বৈদ্যুতিক আলোর। কারখানাজুড়ে লাগানো হয়েছে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লটকন, রয়েল, আমলকীসহ বিভিন্ন ধরনের ফলদ ও ঔষধি গাছ। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য কারখানা ভবনের নিচে নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল ট্যাংক। বিশেষ ফিল্টারে পরিশোধিত সেই পানি ব্যবহার করা হয় বাথরুমের ফ্ল্যাশ ও বাগানের কাজে। বাবা-চাচাদের পোশাকের ব্যবসা থাকলেও ফতুল্লা অ্যাপারেলসের কারখানাটি একাই গড়েছেন ফজলে শামীম এহসান। প্রাথমিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩০ লাখ টাকা। পুরোটাই আসে ব্যাংক ঋণ থেকে। কারণ সে সময় তিনি সবেমাত্র পড়ালেখা শেষ করেন। তার নিজস্ব কোনো অর্থ ছিল না। বর্তমানে দুটি ইউনিটে পাঁচশর মতো মেশিন। কাজ করছেন ১ হাজার ৭০০-এর মতো কর্মী।
ফতুল্লা অ্যাপারেলসের মূল কারখানা ভবন ইস্পাতের তৈরি। যতগুলো মেশিন আছে সবগুলোই পরিবেশবান্ধব ও পরিবেশের দিকে নজর রেখে কেনা হয়েছে। এ কারণেই লিড সার্টিফিকেটের হাইয়েস্ট মার্কটা তারাই পেয়েছে। প্রতিটি মেশিন যার যার ক্যাটাগরিতে সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ খরচ করে। লাইট থেকে শুরু করে যে তারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিবাহিত হয়, সবই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখে। এছাড়া মোট বিদ্যুতের ৩০ শতাংশই আসে নবায়নযোগ্য উৎস অর্থাৎ সোলার প্যানেল থেকে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎই নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ব্যবহারের লক্ষ্য ফতুল্লার।
নতুন একটি কারখানা গড়ে তুলতে সব প্রতিষ্ঠানকেই কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। ফতুল্লা অ্যাপারেলসকেও সে প্রতিবন্ধকতাগুলো অতিক্রম করতে হয়েছে। ফজলে শামীম এহসান যখন কারখানাটির নির্মাণের উদ্যোগ নেন, ওই সময় অটোমেশন ছিল না। ফলে লাইসেন্সগুলো পেতে তার প্রচুর বেগ পেতে হয়েছে। মাঝপথে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ারও উপক্রম হয়। ব্যাংক প্রথমদিকে মেশিন কেনার জন্য লোন দিলেও পরবর্তী সময়ে ফ্যাক্টরি বড় করার জন্য যে টাকার দরকার, সেটা ম্যানেজ করা যাচ্ছিল না। কারণ ব্যাংকেরও কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে। পরিবার থেকেও কোনো সাপোর্ট নিতে চাচ্ছিলেন না এ উদ্যোক্তা। শেষ পর্যন্ত উপায় না পেয়ে মায়ের একটি জমি বন্ধক রাখেন। প্রথমদিকে মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রেও কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে সেগুলো মেনে নিয়েছিলেন। কেননা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই প্রথমদিকে এ সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে হয়।
ফতুল্লা অ্যাপারেলসের উৎপাদিত পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে স্পোর্টসওয়্যার, উইন্টার ওয়্যার যেমন- জ্যাকেট, হুডি ইত্যাদি এবং কিডস ও লেডিস নাইটওয়্যার। বর্তমানে ২২টি দেশে তাদের তৈরীকৃত পোশাক রফতানি হয়। ইতালি, ডেনমার্ক, স্পেন, বেলজিয়াম, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, সুইডেনসহ ইউরোপের প্রায় সব দেশেই এসব পণ্য যায়। ফতুল্লা অ্যাপারেলস কারখানার মাসিক উৎপাদনক্ষমতা দুই লাখ পিস। বার্ষিক টার্নওভার ১০ মিলিয়ন ডলার। নিট সেক্টরে পৃথিবীর সর্বোচ্চ মার্ক পাওয়া ফ্যাক্টরি ফতুল্লা ডায়িং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং মিলস। এটি ছিল শামীম এহসানের বাবা-চাচাদের। এখন তিনিই পরিচালনা করছেন।
শ্রম আইনের শতভাগই বাস্তবায়ন করে ফতুল্লা অ্যাপারেলস। আছে সবার জন্য খাওয়ার ব্যবস্থা। এর বাইরে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতি বছর চোখ পরীক্ষার জন্য করা হয় হেলথ ক্যাম্প। এছাড়া শ্রমিকদের জন্য প্রতিটা ফ্লোরেই বসানো আছে কার্বন ডাই-অক্সাইড মিটার। কোনো কারণে যদি এ গ্যাস নির্দিষ্ট মাত্রার ওপরে উঠে যায় তাহলে অ্যালার্ম বেজে ওঠে। আছে তাপমাত্রা মাপার মিটারও। ফলে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কুলিং সিস্টেম চালু হয়ে যায়। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে বিশেষ ধরনের চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা পেছনের দিকে একটু বাঁকানো। এতে তাদের পিঠের দিকে কোনো সমস্যা না হয়।
রাষ্ট্রীয়ভাবে অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছে ফতুল্লা অ্যাপারেলস। শিল্প পুলিশের কাছ থেকেও তাদের অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা ফজলে শামীম এহসান চারবার সর্বোচ্চ আয়করদাতা পুরস্কারও পেয়েছেন। এছাড়া বিশ্বে যতগুলো সার্টিফিকেট আছে এ খাতে সবগুলোই আছে তাদের ঝুলিতে।










