আমার বাবা, মরহুম হুমায়ুন জহির আমাদের এলিফ্যান্ট রোডের কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ে প্রথম প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন। শুরুতে কর্মী ছিল দেড় হাজার এবং মেশিন ৫০০টি। সেই আমলে এটি অনেক বড় কারখানা ছিল বলা যায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম সম্প্রসারণ ছিল ফরচুনা নামে একটি ফ্যাক্টরির মাধ্যমে গাজীপুরের টঙ্গীতে। কারখানাটির আকার ছিল প্রায় ৩ লাখ বর্গফুট। পরবর্তী সময়ে আমরা নিজেদের আরো কারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সম্প্রসারিত করি, যার সবই ছিল স্টেট অব দ্য আর্ট। বিশেষায়িত এ কারখানাগুলোয় ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পণ্য ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুত করা হচ্ছে। একের পর এক সব ফ্যাক্টরিই আদমজী ইপিজেডে তৈরি হতে থাকে। কারখানাগুলোয় সব আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। আমরা অ্যাপেক্স হেভি ক্যাটাগরিতে সব কারখানা নির্মাণ করেছি। অ্যাপেক্স হেভি অর্থ হলো পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতাবিশিষ্ট কারখানা।
স্যুটের যেই ফ্যাক্টরিটা সেটা মূলত আমার উদ্যোগ। ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম স্যুট উৎপাদনের কারখানা। এর আয়তন প্রায় ৫ লাখ বর্গফুটের বেশি। ফ্যাক্টরিটি প্রতিষ্ঠিত হয় আজ থেকে ১৫ বছর আগে। আমাদের অনেক পুরনো ক্লায়েন্ট ছিল এইচঅ্যান্ডএম, প্রায় ২০-২৫ বছর ধরেই তারা আমাদের সঙ্গে কাজ করছে। তাদের সঙ্গে আমরা একটা চুক্তি সাইন করেছিলাম পাঁচ বছরের জন্য। চুক্তিটি ছিল এমন যে আমরা একটি নতুন পণ্য উৎপাদন করতে চাই, যা বাংলাদেশে তৈরি হয় না। ওই সময় শুরু আমাদের স্যুট উৎপাদন। প্রথম পাঁচ বছর আমাদের পণ্য সব এইচঅ্যান্ডএমের কাছেই রফতানি হয়েছিল। এরপর যখন আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় ও কারখানা সম্পূর্ণ চালু হয় তারপর আমরা মার্ক অ্যান্ড স্পেন্সার, মসব্রোস এদের পণ্য পাঠাতে শুরু করি। মসব্রোস ইউকের খুব ভালো একটি ব্র্যান্ড, তাদের প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ কাজই আমাদের করা। আমাদের এ স্যুট কারখানা অনন্য, কারণ উৎপাদনক্ষমতা ও মান দুই দিক থেকেই অনন্য। এখানে জার্মানিতে তৈরি যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয় স্যুট উৎপাদনের জন্য। কারখানাগুলোর মাঝে সবচেয়ে বেশি অটোমেশন রয়েছে এ কারখানায়ই।
ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যারের পর আমরা সোয়েটারের ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করি, যার নাম অনন্ত ফ্যাশন লিমিটেড। এখানে আমাদের একজন চায়নিজ পার্টনার আছে। এ ফ্যাক্টরিতে এখন প্রায় ২০০০ জ্যাকার্ড মেশিন আছে। এটিও বেশ অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন কারখানা। অনন্ত অ্যাপারেলস নামে একটি ডেনিম ফ্যাক্টরি আছে আমাদের। এর আয়তন প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট। এই এক ফ্যাক্টরির ভেতর ডেনিমের ওয়াশিং, প্রিন্ট, এমব্রয়ডারি থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ উৎপাদনই সম্পন্ন করা হয়। এখানে সর্বশেষ ছয় বছর আগে আমরা আরেকটি কারখানা যুক্ত করি জেড অ্যান্ড জেড ইন্টিমেটস লিমিটেড নামে। সেখানে আমরা অ্যাকটিভওয়্যার আর ইনারওয়্যার তৈরি করছি। এ কারখানার আয়তন ৪ লাখ বর্গফুট। আমাদের সব কারখানাই লিড সার্টিফিকেট প্রাপ্ত এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। প্রথম দিন থেকেই ফ্যাক্টরিগুলো যেন গ্রাহক ও নীতিনির্ধারকদের সব চাহিদা মিট করতে পারে সেভাবেই আমরা নিজেদের নির্মাণ করা বিল্ডিংয়ে সব কারখানা তৈরি করেছি।
আমরা যেকোনো নতুন কারখানা বা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সময় শুরুতেই প্রতিষ্ঠানটির সঠিক অর্গানোগ্রাম তৈরি করে দায়িত্ববান, অভিজ্ঞ ও দক্ষ মানবসম্পদ (সিইও, সিএফও থেকে শুরু করে শ্রমিক পর্যন্ত) নিয়োগের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করি। ফলে প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। আমরা তো আর কারখানায় থাকতে পারছি না বা বসতে পারছি না প্রতিদিন। সেক্ষেত্রে একটি স্বাধীন টিম তৈরি করে কারখানা চালু করলে তারা ঠিকঠাক সব পরিচালনা করতে পারে আমাদের অপেক্ষায় না থেকে।
আমাদের কারখানাগুলোর সক্ষমতাও দেশ ও বিদেশের বাজার চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যারের সমান উৎপাদন সক্ষমতাবিশিষ্ট কারখানা বাংলাদেশে, ইভেন সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায়, কারো নেই। বর্তমানে প্রতি মাসে তিন লাখ পিস স্যুট তৈরি হচ্ছে এখানে। স্যুটগুলোর দাম ৫০ ডলার থেকে শুরু করে ১৫০ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে। স্যুটের মতো অ্যাকটিভওয়্যারেও ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য উৎপাদন হচ্ছে যার সক্ষমতা আরো বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ভালো ব্র্যান্ড যা ওদের চেইন স্টোরগুলোয় নিজেদের পণ্য রাখে যেমন সিঅ্যান্ডএ, এইচঅ্যান্ডএম, কেলভিন ক্লাইন, মার্ক অ্যান্ড স্পেন্সার, টমি হিলফিগার ইত্যাদির পণ্য তৈরি ও রফতানি করি আমরা।
ভবিষ্যতে আমাদের সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সিনথেটিক পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে। আমাদের যেই অ্যাকটিভওয়্যার (ফ্যাশনওয়্যার+ স্পোর্টস পণ্য) ও লাঁজরি সেকশন আছে সেটা আমরা আরো বাড়ানোর জন্য কাজ করছি।
২৫ বছর ধরেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দিন-রাত কাজ করছি। একটা ফ্যাক্টরি শুরু করলে এখানে প্রতি মুহূর্তেই চ্যালেঞ্জ থাকে। আগে হয়তো কিছুটা সহজ ছিল, কিন্তু এখন আরো বেশি কঠিন হয়ে গেছে। এখন নতুন একটি কারখানা নির্মাণ করতে চাইলে পাঁচ-ছয় বছর লেগে যায় তা সম্পূর্ণ করতে। আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ এফিশিয়েন্টভাবে সম্পূর্ণ উৎপাদন নিশ্চিত করা, কারখানা ব্যবস্থাপনা ও গোছানো, ইউটিলিটি (গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা) ইত্যাদি। গ্যাস প্রেসার ও সাপ্লাই নিয়ে আমরা খুব বেশি সাফার না করলেও হুট করে সমস্যা হলে উৎপাদন চালু রাখাই কষ্টকর হয়ে যায় আসলে। দেশের সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকাটা কারখানা ঠিকঠাক চালু রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। আমাদের আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কভিড মহামারী। তখন আমরা চার-পাঁচ মাস খুবই আতঙ্কিত ছিলাম উৎপাদন সচল রাখা নিয়ে, কীভাবে কী করব জানতাম না বলা যায়। আর সম্প্রতি ২০২২ থেকে আমরা নতুন একটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। তখন বাংলাদেশে বহির্বিশ্ব থেকে আসা তৈরি পোশাক ও গার্মেন্টস পণ্যের অর্ডার কমে গিয়েছিল। প্রায় এক বছর ৭০-৮০ শতাংশ কম অর্ডার এসেছে তখন কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে।
আপাতত আমাদের নতুন কোনো পণ্য আনার প্ল্যান নেই। সিনথেটিক অ্যাকটিভওয়্যার ও ইনারওয়্যার পণ্যের যেই পরিকল্পনা রয়েছে সেটাই এখন মূল লক্ষ্য। দেশে শুধু সিনথেটিক পণ্য তৈরির জন্য নিবেদিত বড় তেমন ফ্যাক্টরি নেই। আমরাই এখানে বাজারে নতুনত্ব আনতে চাইছি।










