পলমল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের শীর্ষস্থানীয় ও সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে অন্যতম। ১৯৮৪ সালে প্রয়াত ইঞ্জিনিয়ার নুরুল হক সিকদারের উদ্যোগে পলমল গ্রুপ আত্মপ্রকাশ করে। নুরুল হক সিকদার ছিলেন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক। পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালে তিনি সন্তান নাফিস সিকদারকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব অর্পণ করেন। তখন থেকে নাফিস সিকদারের গতিময় নেতৃত্বে গ্রুপটি গত ২৪ বছরে দেশের শীর্ষস্থানীয় রফতানি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বর্তমানে পলমল গ্রুপের অধীনে ৩০টির বেশি কারখানায় ৬০টির বেশি ইউনিট রয়েছে, যেখানে সব মিলিয়ে ২৮ হাজারের বেশি মানুষ কর্মরত। গ্রুপের অধীনে থাকা কারখানাগুলো কম্পোজিট এবং পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন করে। গ্রুপের প্রধান পণ্য হলো নিটেড কাপড়, প্রিন্টিং ও এমব্রয়ডারি, ট্রিম এবং আনুষঙ্গিক ও তৈরি পোশাক। এছাড়া নিজেদের কারখানাগুলোর জন্য ডাইং, ওয়াশিং, ফিনিশিং এবং লজিস্টিক সাপোর্টের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সেবা প্রদান করে পলমল। তাদের বেশির ভাগ ইউনিটই ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত। এছাড়া কুমিল্লার চান্দিনায় একটি এবং মৌলভীবাজারের শ্রীহট্ট ইকোনমিক জোনে আরো দুটি কারখানা রয়েছে।

পলমল গ্রুপের কারখানাগুলোর মাঝে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো—

নাফা অ্যাপারেলস লিমিটেড ইউনিট-১

পলমল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের অধীনে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বরইপাড়ায় ২০১১ সালের নভেম্বরে নাফা অ্যাপারেল লিমিটেড (এনএএল) যাত্রা শুরু করে। এখানে সব ধরনের নিটেড (বুননজাত) পণ্য তৈরি করা হয়। কারখানাটিতে দুটি সংযুক্ত প্রডাকশন বিল্ডিং আছে, যার একটি তিনতলা ও অন্যটি সাততলা। নিচতলায় ফ্যাব্রিকস ও যন্ত্রপাতির গুদাম এবং বাকিসব তলায় সেলাই, কাটিং ও ফিনিশিংয়ের কাজ করা হয়।

সাফা সোয়েটারস লিমিটেড

সাফা সোয়েটারস লিমিটেড শতভাগ রফতানিমুখী নিট পোশাক তৈরির কারখানা। এখানে পোলো শার্ট, টি-শার্ট, সোয়েট শার্ট, জ্যাকেট, বেসিক শার্ট, ট্রাউজার্স, আন্ডারগার্মেন্টস (বক্সার, প্যান্টি) ইত্যাদি উৎপাদিত হচ্ছে। বিশ্ববাজারের চাহিদা মেটাতে কারখানাগুলো সম্পূর্ণ আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজানো। এখানে ২৮টি প্রডাকশন লাইন রয়েছে, যাতে ২ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ কর্মরত।

আয়েশা ক্লথিং কোম্পানি লিমিটেড (ইউনিট ১ ও ২)

আয়েশা ক্লথিং কোম্পানি লিমিটেড (এসিসিএল) পলমল গ্রুপের অন্যতম প্রধান কারখানাগুলোর একটি। এর দুটি ইউনিটই সাভারের আশুলিয়ার বঙ্গবন্ধু রোডে অবস্থিত। ইউনিট-২-এর কারখানাটিতে সব ধরনের সৃজনশীল প্রিন্টিং ও নিট আইটেম তৈরি করা হচ্ছে ২০১৪ সাল থেকে। তিনটি প্রডাকশন বিল্ডিং রয়েছে এই ইউনিটে। গ্রাউন্ড ফ্লোরে অটো প্রিন্টিং মেশিন, সাবকেমিক্যাল স্টোর, কালার কিচেন, এক্সপোজ ও ওয়াশিং রুম, রিসিভ এবং ডেলিভারি রুম এবং সাবলিমেশন প্রিন্ট এরিয়া, প্রথম তলায় টেবিল প্রিন্টিং প্রডাকশন এরিয়া, স্যাম্পল সেকশন, ফ্লক প্রিন্ট এরিয়া ও ডিজাইন রুম, দ্বিতীয় ফ্লোরে গার্মেন্ট প্রডাকশন এরিয়া, সেলাই ও কাটিং ফ্লোর ইত্যাদি রয়েছে।

অন্যদিকে প্রথম ইউনিটের নিচতলায় আয়েশা ওয়াশিং লিমিটেড নামে একই গ্রুপের আরেকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে কমনরুম, জেনারেটর, ড্রাইভারের বিশ্রাম কক্ষ, বয়লার, শিশুদের ডে কেয়ার, মেডিকেল রুম, ফায়ার কন্ট্রোল রুম, ল্যাব, নিষ্ক্রিয় মেশিন রুম, খালি কার্টন স্টোর, আনুষঙ্গিক দোকান, ঝুট রুম, ট্রেনিং রুম, কেন্দ্রীয় কেমিক্যাল স্টোর এবং ইটিপি। উপরের বাকি ছয়টি তলায় সেলাই ফ্লোর, স্পট রিমুভিং রুম, ফিনিশিং সেকশন, মেইনটেন্যান্স রুম, গুদাম, কাটিং সেকশন, ল্যাব রুম, প্যাকেজিং রুমসহ আরো বিভিন্ন বিভাগ বিন্যস্ত রয়েছে। প্রথম ইউনিটটিতে ৩২টি প্রডাকশন লাইনে ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ কর্মরত।

ARKAY নিটিং অ্যান্ড ডাইং মিলস-১1

ARKAY নিট ডাইং মিলস লিমিটেড গাজীপুরের জয়দেবপুর উপজেলার কাশিমপুরে (জিরানী বাজার) অবস্থিত প্রায় ৯ লাখ ৪৫ হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি বিশাল কারখানা। এই কারখানার দৈনিক নিটিং সক্ষমতা ৭০ হাজার কেজি, ডায়িং (রঙ করা) সক্ষমতা দৈনিক ৬০ হাজার কেজি ফ্যাব্রিক এবং প্রিন্টিং সক্ষমতা দৈনিক ১১ হাজার কেজি। বাংলাদেশের বৃহত্তম নিট ডায়িং কারখানাগুলোর মাঝে একটি ARKAY নিট ডায়িং মিলস লিমিটেড পলমল গ্রুপের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাফিস সিকদারের স্বপ্নের ফসল।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি সজ্জিত নিটিং, ডায়িং, ফিনিশিং ও অলওভার প্রিন্টিং সেটআপ রয়েছে এ কারখানায়। আধুনিক উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভালো জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তি দ্বারা কারখানাটি চলমান।

উল্লিখিত কারখানাগুলো ছাড়াও ২০২১ সালে আয়েশা ফ্যাশন লিমিটেড নামে নারায়ণগঞ্জের আদমজী এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনে একটি লিড (LEED) সার্টিফাইড গ্রিন ফ্যাক্টরি উদ্বোধন করে পলমল। কারখানাটির নিজস্ব সেলাই ইউনিট রয়েছে এবং প্রায় ৩০০০ মানুষ এখানে কাজ করছেন। স্বাস্থ্যগত ও পরিবেশগত নিরাপত্তা বজায় রেখে বানানো কারখানাটি ইপিজেডের দ্বিতীয় সবুজ বা পরিবেশবান্ধব কারখানা।

৩৪ বছর ধরে পলমল গ্রুপ তৈরি পোশাক খাতে নিজেদের পণ্য রফতানি করে দেশের শীর্ষস্থানীয় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারীদের একজন হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠিত করেছে। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরাসরি তৈরি পোশাক রফতানিতে শীর্ষ ১০-এ স্থান পেয়েছে পলমল গ্রুপ। তবে তাদের রফতানি শেষ দুই অর্থ বছরে আগের চেয়ে কমে গেছে। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে গ্রুপটি ৪৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার তৈরি পোশাক রফতানি করেছিল, যার পরিমাণ কমে গিয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৭ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের পোশাক রফতানিতে নেমে এসেছে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে গ্রুপটি ১৪ কোটি পিস পোশাক রফতানি করেছে বিশ্বের ৬৭টি দেশে। গ্রুপটি মূলত নিট পোশাক রফতানি করে। নিট পোশাকের মধ্যে রয়েছে টি-শার্ট, পোলো, শর্টস ইত্যাদি। পলমলের শীর্ষ দুই আন্তর্জাতিক ক্রেতা হলো ওল্ড নেভি ও ওয়াল-মার্ট।