শিল্পপতি হুমায়ুন জহিরের হাত ধরে ১৯৯১ সালে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে নিজস্ব ভবনে যাত্রা শুরু হয়েছিল অনন্ত অ্যাপারেলসের কারখানার। জন্মস্থান নোয়াখালীর অনন্তপুর গ্রামের নামানুসারে রেখেছিলেন নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম। এর মধ্যে ১৯৯৩ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন হুমায়ুন জহির। তখন প্রতিষ্ঠানটির হাল ধরেন তার স্ত্রী কামরুন নাহার জহির। বর্তমানে তিনি গ্রুপের চেয়ারম্যান। বড় ছেলে শরীফ জহির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ছোট ছেলে আসিফ জহির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক। আদমজী ইপিজেড, গাজীপুর, কাঁচপুর ও চট্টগ্রাম ইপিজেডে এখন অনন্ত গ্রুপের রয়েছে মোট সাতটি কারখানা। কর্মীসংখ্যা ৩২ হাজার।

বাবার তৈরি করা কোম্পানিটিকে শরীফ জহির ও আসিফ জহির দুই ভাই মিলে দেশের অন্যতম সেরা ডেনিম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বর্তমানে শীর্ষস্থানীয় এ গ্রুপটির তিনটি ডেনিম উৎপাদন কারখানায় মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ লাখ ইউনিট, যেখানে বিশ্বসেরা গ্রাহকদের জন্য পণ্য তৈরি হয়। এছাড়া অনন্ত গ্রুপের মালিকানাধীন দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম স্যুট তৈরির কারখানায় মাসে প্রায় আড়াই লাখ স্যুট উৎপাদিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য। অনন্তর কারখানাগুলোয় সব বয়সীদের জন্য ডেনিম, নারী ও পুরুষের স্যুট, নারীদের ব্যবহার্য ফরমাল পোশাক, আউটারওয়্যার, লাঁজরি এবং ব্যায়াম ও খেলাধুলায় ব্যবহার উপযোগী অ্যাক্টিভওয়্যার তৈরি করা হয়।

অনন্ত অ্যাপারেলস লিমিটেড, অনন্ত ডেনিম টেকনোলজি লিমিটেড ও অনন্ত ক্যাজুয়ালওয়্যার লিমিটেড—ডেনিম পণ্য তৈরির জন্য অনন্ত গ্রুপের অত্যাধুনিক তিনটি কারখানা। নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডে অবস্থিত কারখানাগুলোর সবই এলইইডি (লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন) সনদপ্রাপ্ত। এলইইডি হচ্ছে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি গ্রিন বিল্ডিং রেটিং সিস্টেম, যা পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং জ্বালানি দক্ষতার ওপর গুরুত্বারোপ করে। প্রতি মাসে ৩০ লাখ জিন্স উৎপাদন সক্ষম অনন্ত গ্রুপের এ তিন কারখানাই স্যাম্পলিং, সেলাই, ওয়াশিং ও ফিনিশিং ইউনিটের সমন্বয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ওয়াশিং প্লান্টে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক ইউরোপীয় ফ্রন্ট-লোডিং মেশিন, উন্নত লেজার ও ড্রাই প্রসেস মেশিন। রয়েছে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট বা রিসাইক্লিং প্লান্ট। অভিজ্ঞ কারিগর ও ডিজাইন টিমের সমন্বয়ে ডেনিম কারখানাগুলো সর্বোচ্চ মানের নান্দনিক, গুণগত মানসম্পন্ন ও স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা দিয়ে বিদেশী বায়ারদের কাছে পণ্য সরবরাহ করছে। তিনটি কারখানায় মোট পাঁচ হাজার সেলাই মেশিন ও ১০০ ওয়াশিং মেশিন রয়েছে। সেখানে কাজ করছেন প্রায় ১৪ হাজার কর্মী।

রোমানিয়ার টাইম ট্রেডিং এসআরএল ও অনন্ত গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার লিমিটেড’। আর এ প্রতিষ্ঠানের রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম স্যুট ও জ্যাকেট উৎপাদন কারখানা। পাঁচ লাখ বর্গফুট ফ্লোর স্পেসে নির্মিত এ কারখানা বিশ্বের অত্যাধুনিক সরঞ্জামসম্পন্ন কারখানার একটি। এতে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় কাটিং সিস্টেম, আড়াই হাজার বিশেষ সেলাই ও প্রেসিং মেশিন। পাশাপাশি উৎপাদন ও স্টোরেজ এলাকায় পণ্য পরিবহনের জন্য রয়েছে স্বয়ংক্রিয় কনভেয়র ব্যবস্থার মতো অত্যাধুনিক সরঞ্জাম। শুরুতে কারখানাটিতে পুরুষদের স্যুট, জ্যাকেট, কোট ও ট্রাউজার্স তৈরি হলেও বর্তমানে লেডিস ও কিডস স্যুটসহ আনুষঙ্গিক পণ্যও তৈরি হচ্ছে। জ্যাক অ্যান্ড জোন্স, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, এইচঅ্যান্ডএম, কিউবাস, সিলিওসহ বিশ্বের সমাদৃত দশের অধিক ব্র্যান্ড ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যারের বায়াররা। তাদের মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা আড়াই লাখ স্যুট ও ২ লাখ ৮০ হাজার ট্রাউজার। বর্তমানে পাঁচ হাজারের মতো লোক কর্মরত আছেন এ কারখানায়।

অনন্ত হুয়াজিয়াং লিমিটেড (এএইচএল) আদমজী ইপিজেডে অবস্থিত অনন্ত গ্রুপের আরেকটি বিশ্বমানের কারখানা। চীনের প্রতিষ্ঠান হুয়াজিয়াংয়ের সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এএইচএল। তাদের কারখানায় জার্মানি ও চীন থেকে আমদানি করা স্বয়ংক্রিয় বুনন মেশিনে উৎপাদন করা হয় মোটা ও সূক্ষ্ম দুই ধরনের সুতা, যা দিয়ে বোনা হয় ফ্যাশনেবল সোয়েটার। ডিজাইন ও প্রযুক্তিসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে মেরিনো, কাশ্মীর, ল্যাম্বসউল ও অন্যান্য উন্নতমানের সুতা সংগ্রহ করেও সোয়েটার উৎপাদন হয়। কারখানাটির উৎপাদন সক্ষমতা মাসে নয় লাখ ও বছরে এক কোটি পিস। প্রায় দুই হাজার জ্যাকার্ড নিটিং মেশিনসম্পন্ন এ কারখানায় বর্তমানে চার হাজারের মতো শ্রমিক কাজ করছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য প্রস্তুতকৃত তাদের বেশির ভাগ পণ্য ইউরোপে রফতানি হয়।

শীতের পোশাক উৎপাদনে অনন্ত গ্রুপের প্রতিষ্ঠানটির নাম ডিএনভি ক্লোথিং লিমিটেড, যা আদমজী ইপিজেডে অবস্থিত। আড়াই লাখ বর্গফুট আয়তনের কারখানাটি গড়া হয়েছে কুইল্টিং মেশিন, ডাউন ও ফেক-ডাউন ফিলিং, স্বয়ংক্রিয় টেমপ্লেট সেলাই, লেজার কাটিং, লেজার ওয়েল্ডিং ও টেপ সিম সিলিংয়ের মতো ১ হাজার ৮০০ উন্নত মেশিন দিয়ে। এটি ওয়াটার প্রুফ জ্যাকেট ও ট্রাউজার, প্যাডেড, কুইল্টেড ও ডাউন ফিলড জ্যাকেট, ওভারকোট, ট্রেঞ্চ কোট এবং পিইউ চামড়ার পোশাকের মতো মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনে সক্ষম। বছরে এ কারখানা ৩৬ লাখ জ্যাকেট উৎপাদনে সক্ষম। তাদের আছে আড়াই হাজার কর্মী।

অনন্তের ইনারওয়্যার বা লেডিস আন্ডারগার্মেন্টস এবং অ্যাক্টিভওয়্যার তৈরির প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘জেডঅ্যান্ডজেড ইন্টিমেটস লিমিটেড’। চট্টগ্রাম ইপিজেডে স্থাপিত ৩ লাখ ৬০ হাজার বর্গফুট আয়তনের এ কারখানায় উৎপাদন শুরু হয় ২০১৬ সালে। এতে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় কাটিং সিস্টেম, ফ্যাব্রিক মোল্ডিং সেকশন, স্বয়ংক্রিয় বেল্ট ও স্ট্র্যাপ অ্যাটাচিং মেশিন, উন্নত বন্ডিং ও প্রেসিং মেশিনসহ ব্রা, ব্রিফ ও বক্সার উৎপাদনের উন্নত সব সরঞ্জাম। বিভিন্ন ধরনের অন্তর্বাস, সাঁতার ও ব্যায়ামের পোশাক এবং শেপওয়্যার পণ্য তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রযুক্তিই রয়েছে জেডঅ্যান্ডজেড ইন্টিমেটস লিমিটেডের ফ্যাসিলিটিতে। কারখানাটির মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা ১৫ লাখ পিস ব্রিফ ও বক্সার, ১০ লাখ পিস ব্রা, ১০ লাখ পিস স্পোর্টস ব্রা ও টপস এবং ১৫ লাখ পিস লেগিংস ও শর্টস। প্রায় ২ হাজার ৮০০ মেশিনের বৃহৎ এ কারখানায় কাজ করছেন চার হাজারেরও বেশি কর্মী।

প্রতিটি কারখানার যন্ত্রপাতি ইউরোপ, জাপান ও চীনের সেরা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে অনন্ত গ্রুপ। তাদের ডেনিম কারখানার ওয়াশিং ক্ষমতা সর্বোচ্চ এবং পানির অপচয় কমাতে ব্যবহার করা হয় লেজার, ই-ফ্লো, এলইডি লাইটসহ অন্যান্য প্রযুক্তি। সেলাইয়ের ক্ষেত্রে অটোমেশন এবং গ্রাহকদের ডিজাইন ও ম্যাটেরিয়াল সাপোর্ট দেয়ার ক্ষেত্রেও অনন্ত অগ্রগামী। সেলাইয়ে ব্যবহার করা হয় সার্ভো মোটর ও লেজার মেশিন, যা উচ্চ অটোমেশন নিশ্চিত করে।

অনন্ত গ্রুপের পোশাক কারখানাগুলোয় সব মিলিয়ে ৩২ হাজারের বেশি কর্মী, যার দুই-তৃতীয়াংশই কাজ করছেন ইপিজেডের ভেতরের কারখানায় এবং তারা ২০ শতাংশ অতিরিক্ত বেতন পান। এছাড়া সব কর্মীর জন্য রয়েছে প্রভিডেন্ট ফান্ড, সাশ্রয়ী মূল্যের দোকান, বেতন থেকে কিস্তিতে শোধযোগ্য আগাম ঋণ এবং অন্যান্য সুবিধা। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, দক্ষতার উন্নতি এবং লাইফস্টাইল ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও বিশেষজ্ঞভিত্তিক কাজের জন্য কারখানাগুলোয় রয়েছেন কিছু বিদেশী কর্মীও।

বিদেশী স্বনামধন্য ব্র্যান্ডগুলো তাদের পণ্য অনন্তের কারখানা থেকে তৈরি করে নিচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের লেভিস, গ্যাপ, পিভিএইচ, আমেরিকান ঈগল এবং ইউরোপের এমঅ্যান্ডএস, মোস ব্রোস, বেস্ট সেলার, এইচঅ্যান্ডএম ইত্যাদি ব্র্যান্ড অনন্তের পণ্যগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্রেতা। বর্তমানে অনন্ত গ্রুপের বার্ষিক টার্নওভার ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। প্রতি বছরই তাদের ব্যবসা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে।