প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে ব্যবসার দুর্বল জায়গা চিহ্নিত করে জায়গাগুলো উন্নত করা গেলে সাফল্য আসবেই। আর এর সঙ্গে থাকা চাই ব্যবসায়িক সততা ও সুনাম। বিষয়গুলো ধারণ করে সাফল্যের পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী স্কয়ার গ্রুপ। ব্যবসায় নতুন বৈচিত্র্য নিয়ে আসার অংশ হিসেবে স্কয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ চৌধুরী অধিক কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং মানসম্মত পোশাক উৎপাদনের লক্ষ্যে টেক্সটাইল সেক্টরে বিনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে স্কয়ারের টেক্সটাইলস বিভাগ যাত্রা শুরু করে এবং ১৯৯৭ সাল থেকে স্কয়ারের কারখানায় সুতা উৎপাদন শুরু হয়।

কারখানা নির্মাণে বিভিন্ন বড় চ্যালেঞ্জ থাকলেও নব্বই দশকে সরকার নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠার প্রচার করে এবং প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সুবিধার পাশাপাশি ট্যাক্স হলিডে সুবিধার ব্যবস্থা করতে সহায়তা করে। ট্যাক্স হলিডে বলতে বোঝানো হয় সরকার নির্ধারিত সময়কালে পণ্য আমদানি বা লেনদেন করতে কোনো প্রকার ট্যাক্স প্রদান করতে হবে না। শিল্পায়নের সুবিধার্থে সরকার দেশের নতুন শিল্প-কারখানাগুলোকে মূলত এ সুবিধা দেয়। সে সময় শ্রমিক পাওয়া সহজ ছিল, ফলে মানবসম্পদ সংস্থান ও সরকারি সহযোগিতা পেতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। স্কয়ার গ্রুপের মূল কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে বিনিয়োগ সংস্থানের পাশাপাশি ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিয়ে চালু করা হয় স্কয়ার টেক্সটাইলস।

১৯৯৭ সালে উৎপাদন শুরুর সময় কারখানায় মোট ৩০ হাজার ২৪০টি স্পিন্ডল ছিল, যা থেকে দৈনিক ২০ টন সুতা তৈরি হতো। তখন কারখানায় শ্রমিক ছিল ২৫৭ জন। বর্তমানে সম্প্রসারিত হয়ে স্কয়ারের ১০টি কারখানায় মোট ৩৫ হাজার ১৯ জন কর্মী কাজ করছেন। কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে উৎসব বোনাস, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, বার্ষিক লাভের অংশ, ডরমিটরি সুবিধা, গ্রুপ ইন্স্যুরেন্স, চিকিৎসা সুবিধা, সন্তানদের জন্য ডে কেয়ার, মাতৃত্বকালীন ছুটি, অর্জিত ছুটি এনক্যাশমেন্ট (ছুটি গ্রহণ না করে সেই দিনগুলোয় ডিউটি করলে অতিরিক্ত ভাতা প্রদান), ডিসকাউন্ট মূল্যসহ মুদি দোকান সুবিধা ইত্যাদি পেয়ে থাকেন। কর্মীদের মাঝে মোট সাতজন বিদেশী রয়েছেন, যারা মূলত গবেষণা ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ টিমের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন।

শুরুর কারখানাটিতে দৈনিক ২০ টন সুতা উৎপাদন হতো এবং প্রথম বছরের টার্নওভার ছিল ৯৮ কোটি টাকা। বর্তমানে স্কয়ারের ১০টি কারখানায় কম্পোজিট টেক্সটাইলের (সুতা, কাপড় ও গার্মেন্টস) জন্য সব আইটেম তৈরি করা হয়। কারখানাগুলো তৈরিতে স্কয়ার মোট ৪ হাজার ১৭২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।

স্কয়ার টেক্সটাইলসের কারখানাগুলোয় বর্তমানে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ইত্যাদি দেশ থেকে আমদানীকৃত উচ্চ প্রযুক্তিভিত্তিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। যন্ত্রপাতিগুলো আমদানিতে মোট ২ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা খরচ করেছেন তারা। উচ্চ প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতির ব্যবহার, বিশেষজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ জনশক্তি, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি এবং টেকসই উৎপাদন প্রক্রিয়ার সমন্বয় করার কারণে স্কয়ারের কারখানাগুলো সমসাময়িক অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনন্য।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্কয়ার টেক্সটাইলস ব্যবসার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সম্প্রসারণ কার্যক্রম চালু রেখেছে। তাদের বর্তমান দশটি কারখানা মোট ছয়টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ও পরিচালিত হচ্ছে। সংক্ষেপে কোম্পানিগুলোর তথ্য এখানে উল্লেখ করা হলো।

স্কয়ার টেক্সটাইলস পিএলসি

১৯৯৪ সালে গাজীপুরের কাশিমপুরের সারদাগঞ্জে স্কয়ার টেক্সটাইলসের প্রথম ইউনিটটি যাত্রা শুরু করে, যা ১৯৯৭ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। তাদের দ্বিতীয় ইউনিটটি অবস্থিত হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জের ওলিপুরে। এখানে রিং, রোটর ও ভোর্টেক্স সুতা উৎপাদন করা হচ্ছে, যার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৬৫ হাজার ৪৯০ টন।

স্কয়ার ফ্যাশনস লিমিটেড

স্কয়ারের টেক্সটাইল বিভাগের সবচেয়ে বড় কোম্পানি স্কয়ার ফ্যাশনস লিমিটেডের যাত্রা ২০০০ সালে। উৎপাদন শুরু হয় ২০০২ সাল থেকে। স্কয়ার ফ্যাশনসের একটি ইউনিট ময়মনসিংহের ভালুকায় এবং অন্যটি গাজীপুরের জয়দেবপুরে অবস্থিত। কারখানা দুটি থেকে মূলত ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানি করা হচ্ছে। তাদের উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে টি-শার্ট ও পোলো শার্ট, পায়জামা, স্পোর্টসওয়্যার, আন্ডার গার্মেন্টস, পুরুষ ও নারীদের জন্য তৈরি পোশাক এবং বাচ্চাদের পোশাক ইত্যাদি। স্কয়ার ফ্যাশনসের বার্ষিক পোশাক তৈরির সক্ষমতা সাড়ে চার কোটি পিস। দুটি কারখানায় বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৬ হাজার ৯২৫ জন।

স্কয়ার ফ্যাশনসের গার্মেন্টস ইউনিটের বর্তমান উৎপাদনক্ষমতা দৈনিক ১ লাখ ৩৫ হাজার পিস এবং ফ্যাব্রিক ইউনিটের মোট উৎপাদনক্ষমতা দৈনিক ৪০ টন। এখানে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার, ক্রিয়েটিভ ডিজাইন স্টুডিও (ফ্যাশন ও গ্রাফিকস) এবং থ্রিডি প্রযুক্তিনির্ভর স্যাম্পলিং ও ডেভেলপমেন্ট বিভাগ; যারা পণ্যের বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি গ্রাহকের সন্তুষ্টি নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ করছে। স্কয়ার ফ্যাশনস টেকসই উদ্যোগে বিশ্বাস করে এবং প্রকৃতি ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। তাই দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে তাদের কারখানার ইউনিটগুলোয় রয়েছে বর্জ্য শোধনাগার। পরিবেশবান্ধব হওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ গ্লোবাল রিসাইকেল স্ট্যান্ডার্ড, বেটার কটন ইনিশিয়েটিভ, GOTS, সার্টিফিকেশন ফর গ্লোবাল অর্গানিক টেক্সটাইল স্ট্যান্ডার্ড, কটন মেড ইন আফ্রিকা, কটন ইউএসএ ইত্যাদি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে পুরস্কৃত হয়েছে স্কয়ার ফ্যাশনস।

স্কয়ার টেক্সটাইলের মোট বার্ষিক টার্নওভারের ৩৫ ভাগেরও বেশি আসছে স্কয়ার ফ্যাশনস থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ২,৫৮১ কোটি টাকা। রফতানিতে বৃহৎ ভূমিকা রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ এইচএসবিসি এক্সপোর্ট এক্সেলেন্সি অ্যাওয়ার্ড সম্মাননা পেয়েছে স্কয়ার ফ্যাশনস লিমিটেড। পাশাপাশি গত অর্থবছরে তৈরি পোশাকে একক ইউনিট হিসেবে সবচেয়ে বেশি রফতানির তালিকায় তৃতীয় অবস্থান অর্জন করেছে স্কয়ার ফ্যাশনস।

স্কয়ার ডেনিমস লিমিটেড

দেশের বৃহৎ এ শিল্প গোষ্ঠীর নতুন সংযোজনগুলোর একটি রাজধানী ঢাকা থেকে ১৪০ কিলোমিটার দূরে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার ওলিপুরে ডেনিম ফ্যাব্রিকস উৎপাদনের বিশাল কারখানা। বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রায় ৩০০ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে কারখানাটি। তুরস্কের কারিগরি সহায়তা নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের বর্জ্য শোধনাগার, নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থাসহ পরিবেশবান্ধব কারখানা বা গ্রিন ফ্যাক্টরি। বস্ত্র উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে আধুনিক প্রযুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য রয়েছে আট মেগাওয়াটের ক্যাপটিভ জেনারেটর। এছাড়া স্কয়ার ডেনিমস কোম্পানির অধীনে আরেকটি কারখানা রয়েছে ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার জামিরদিয়ায়।

স্কয়ারের কারখানার বিশেষত্ব হলো কাপড়ের ফিনিশিং, উচ্চ মূল্যের যন্ত্রপাতি স্থাপনের মাধ্যমে মানসম্পন্ন ফিনিশিং নিশ্চিত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই স্কয়ার ডেনিম সুতা উৎপাদন করে আসছে। ফলে নিজস্ব সুতা থেকেই তৈরি হচ্ছে কাপড়। ২০১৫ সাল থেকে উৎপাদন শুরু করা এ কারখানা থেকে এরই মধ্যে নামকরা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএমের পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।

স্কয়ার ডেনিমস লিমিটেডের উৎপাদনক্ষমতা বছরে ৩ কোটি ২০ লাখ ইয়ার্ড কাপড় ও ১ কোটি ১০ লাখ পিস তৈরি পোশাক। কারখানা দুটিতে কাজ করছেন মোট ৬ হাজার ৬৮০ কর্মী।

স্কয়ার ফ্যাশন ইয়ার্নস লিমিটেড

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনায় ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় স্কয়ার ফ্যাশন ইয়ার্নসের কারখানা। একই বছর কারখানাটির উৎপাদন শুরু হয়। ১ হাজার ৬৫ কর্মীর এ কারখানায় রিং, রোটর ও ভোর্টেক্স সুতা উৎপাদন করা হচ্ছে। স্কয়ার ফ্যাশন ইয়ার্নস লিমিটেডের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১০ হাজার ২৬৬ টন।

স্কয়ার টেক্সকম লিমিটেড

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার কাঠালীতে ২০১১ সালে স্থাপিত হয় স্কয়ার টেক্সকমের কারখানা। স্কয়ারের ১০টি কারখানার মধ্যে এটিই সবচেয়ে ছোট। কারখানাটিতে ৬৭৮ কর্মী রিং, রোটর ও ভোর্টেক্স সুতা উৎপাদনের কাজ করছেন। বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৭ হাজার ৭৮৮ টন।

স্কয়ার অ্যাপারেলস লিমিটেড

স্কয়ারের টেক্সটাইল বিভাগের সর্বশেষ সংযোজন স্কয়ার অ্যাপারেলস। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হাবরবাড়ী ও মামারিশপুরে এ কোম্পানির দুটি কারখানা অবস্থিত। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০১৭ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় স্কয়ার অ্যাপারেলসের কারখানায়। কারখানাগুলোয় ওভেন কাপড় ও তৈরি পোশাক উৎপাদনে নিয়োজিত আছেন ৪ হাজার ৯১৮ কর্মী। কারখানা দুটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ২ কোটি ৭০ লাখ ইয়ার্ড কাপড় এবং ৮০ লাখ পিস তৈরি পোশাক।

স্কয়ার দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক সব ব্র্যান্ডের জন্য নিয়মিত তৈরি পোশাক ও অন্যান্য পণ্য রফতানি করছে। তাদের কিছু প্রধান আন্তর্জাতিক গ্রাহকের মাঝে রয়েছে হুগো বস, টমি হিলফিগার, ভিএফ (টিম্বারল্যান্ড, লি, র‍্যাংলার, নাপাপিজরি), পুমা, জি. স্টার, নিউ এরা, এস অলিভার, ই স্ট্রস, এমঅ্যান্ডএস, এইচঅ্যান্ডএম, বেস্ট সেলার (জ্যাক অ্যান্ড জোন্স), কোল’স, সিঅ্যান্ডএ, ইন্ডিটেক্স (জারা), কন্ট্যুর, নেক্সট রিটেল, কেমারট, ক্যামেল অ্যাকটিভ, সিনারজিস, কটন অন কান্ট্রি রোড, ইউনিক্লো, বেন শেরম্যান, প্রিমিয়ার ইত্যাদি। যেসব দেশে স্কয়ারের পণ্য রফতানি হচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইতালি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, হংকং, মেক্সিকো, রাশিয়া, স্পেন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনা, চীন, উরুগুয়ে ইত্যাদি।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্কয়ার টেক্সটাইলসের ছয়টি কোম্পানি থেকে তাদের মোট বার্ষিক টার্নওভার ছিল ৭ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। এমনকি দেশের নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও গত বছর একক ইউনিট হিসেবে তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে তৃতীয় অবস্থানে ছিল স্কয়ার ফ্যাশনস লিমিটেড। ভবিষ্যতেও দেশের তৈরি পোশাক খাতে নিজেদের এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছে স্কয়ার কর্তৃপক্ষ।